মেজর (অব.) সিনহা হত্যা মামলাঃ আসামি নন, সাক্ষী হচ্ছেন সিফাত ও শিপ্রা

অনলাইন ডেস্কঃ
মেজর (অব.) সিনহা মো. রাশেদ খানের মৃত্যুর ঘটনায় টেকনাফ ও রামু থানায় দুটি মামলা করেছিল পুলিশ। একটি মামলায় সিনহার সঙ্গী সাহেদুল ইসলাম সিফাত ও অন্যটিতে শিপ্রা দেবনাথকে আসামি করা হয়। তারা দু’জনই স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী। আইন বিশেষজ্ঞ ও দুই শিক্ষার্থীর স্বজনরা বলছেন, বানোয়াট অভিযোগে ওই মামলা দায়ের করা হয়েছে। কোয়াশমেন্ট বা মামলা বাতিল অথবা পুলিশের ফাইনাল রিপোর্টের মাধ্যমে অভিযোগ থেকে তাদের মুক্তি মিলতে পারে। মুক্তি পেলে সিফাত ও শিপ্রা হতে পারেন সিনহা হত্যা মামলার মূল সাক্ষী। তদন্ত সংস্থা র‌্যাব মনে করছে, সিফাতের সামনেই যেহেতু ঘটনা ঘটেছে, তাই এ মামলায় তার বক্তব্য আগে জানা দরকার। গতকাল শিপ্রার জামিনের পর তার সঙ্গে কথা বলেছে র‌্যাব।

র‌্যাব বলছে, সিফাত ও শিপ্রার বক্তব্য জানার পর রিমান্ডে নিয়ে টেকনাফ থানার সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশসহ অন্যদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। সিফাতের বক্তব্য আগে জানার দরকার বলেই গতকাল পর্যন্ত সাত আসামিকে রিমান্ডে নেওয়া হয়নি। আজ সোমবার প্রদীপসহ অন্য আসামিদের রিমান্ডে নেওয়ার কথা রয়েছে।

সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ সমকালকে বলেন, সিফাত ও শিপ্রার বিরুদ্ধে মামলায় করা অভিযোগ সত্য না হলে তারা মামলা বাতিল বা কোয়াশমেন্টের আবেদন করতে পারেন। এরপর তারা চাইলে সাক্ষীও হতে পারেন। আদালতে নিজেরা অথবা আইনজীবীর মাধ্যমে আবেদন করে তারা বলতে পারেন যে ওই ঘটনায় তারা সাক্ষী হিসেবে বক্তব্য দিতে চান।

আইনজীবী মনজিল মোরসেদ সমকালকে বলেন, এটা এখন স্পষ্ট, দুই শিক্ষার্থীকে জড়িয়ে যে মামলা হয়েছে, তার ভিত্তি নেই। কোয়াশমেন্ট বা চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিলের মধ্য দিয়ে তারা অভিযোগ থেকে রেহাই পেতে পারেন। আদালত চাইলে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিলের সময়সীমা বেঁধে দিতে পারেন, যাতে দ্রুত তারা মামলার ঝামেলা থেকে রক্ষা পান। আর যেহেতু তারা সিনহার সঙ্গী ছিলেন, তারা সাক্ষী হতেই পারেন।
র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লে. কর্নেল আশিক বিল্লাহ সমকালকে বলেন, ময়নাতদন্ত ও সুরতহাল প্রতিবেদন চেয়ে রোববার তারা আদালতে আবেদন করেছেন। সোমবার থেকে আসামিদের এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে যা রয়েছে :জানা গেছে, এরই মধ্যে সিনহার মৃত্যুর ঘটনায় ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, বাঁ কাঁধ, বাঁ হাত ও বুকের বাঁ পাশের নিচে বড় ক্ষত রয়েছে। বাঁ পাশের স্টার্নোক্লেডোমাস্টয়েড মামল ছিঁড়ে গেছে। পিঠে, পিঠের নিচে ও বাঁ ঘাড়ে ক্ষত রয়েছে। ৮, ৪ ও ৫ নম্বর রিব ফ্যাকচার এবং বাঁ পাশের স্টার্নোক্লেডোমাস্টয়েড মাসল রাপচার্ড। রক্ত বুকের পাজরের গহ্বরে জমাটবাঁধা অবস্থায় পাওয়া গেছে। মৃত্যুর কারণ হিসেবে বলা হয়, প্রচুর রক্তক্ষরণ, যা ফায়ারআর্ম উইপন দিয়ে হয়েছে।

অন্য একটি সূত্র জানায়, সিনহার শরীরে কয়টি গুলি করা হয়েছে, তা নিয়ে তদন্ত চলছে। পুলিশের মামলায় বলা হয়, চারটি গুলি করা হয়েছিল। আর সুরতহালে ছয়টি গুলির চিহ্ন পাওয়া যায়। সত্যি সত্যি ছয়টি গুলি নাকি চারটি গুলি ছোড়ার পর ছয়টি চিহ্ন হয়েছে, তা নিবিড়ভাবে তদন্ত চলছে। অনেকে বলছে, কারও শরীরে একটি গুলি ছুড়লে একাধিক ক্ষত হতে পারে।

প্রদীপের সম্পদের অনুসন্ধান :দুদকসহ একাধিক সংস্থা ওসি প্রদীপ ও তার স্ত্রীর সম্পদের অনুসন্ধান চালাচ্ছে। প্রদীপের চট্টগ্রামের লালখান বাজারে একটি ফ্ল্যাট, কক্সবাজারে দুটি হোটেলের মালিকানা ও স্ত্রী চুমকির নামে কয়েক কোটি টাকার সম্পদ থাকার তথ্য মিলেছে। এছাড়া তার মৎস্য খামার ও বিদেশে বাড়ি থাকার বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তার স্ত্রী চুমকি গৃহিণী হলেও ১৩ লাখ ৫০ হাজার টাকার মৎস্য খামার তার নামে করা হয়। পাথরঘাটায় চার শতক জমি রয়েছে চুমকির নামে। যার মূল্য ৮৬ লাখ ৭৬ হাজার টাকা। ওই জমির ছয়তলা ভবনের বর্তমান মূল্য ১ কোটি ৩০ লাখ ৫০ হাজার। পাঁচলাইশে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ১ কোটি ২৯ লাখ ৯২ হাজার ৬০০ টাকার জমি কেনা হয়। ২০১৭-১৮ সালে কেনা হয় কক্সবাজারের ঝিলংজা মৌজায় ৭৪০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট, যার দাম ১২ লাখ ৩২ হাজার টাকা।

প্রদীপের বিরুদ্ধে অভিযোগ আসছেই :ওসি প্রদীপ জেলে যাওয়ার পর টেকনাফের অনেকেই মুখ খুলতে শুরু করেছেন। প্রদীপের মাধ্যমে নির্যাতন-হয়রানির শিকার অনেকে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। টেকনাফের বাসিন্দা ছনুয়ারা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘গত বছরের ৩ ডিসেম্বর আমার স্বামীকে (আবদুল জলিল) আটকের পর থানায় ৮ মাস টর্চার সেলে নির্যাতন শেষে চলতি বছরের ৭ জুলাই গুলিতে হত্যা করে পুলিশ। আমার স্বামী এমন কী অপরাধ করেছিল, তাকে এমনভাবে গুলি করে মারতে হয়েছে।’

তিনি বলেন, তার স্বামী একজন সিএনজি চালক ছিলেন। দুই সন্তান নিয়ে স্বল্প আয়ের সংসার ছিল সুখের। এর মধ্যে সংসারের আয় বাড়াতে বিদেশ যাওয়ার স্বপ্ন প্রায় শেষ পর্যায়ে ছিল। কিন্তু বিদেশ পাড়ি দেওয়ার সুযোগ হয়নি তার স্বামীর।

টেকনাফের বেলুজা ও আমিনা খাতুন জানান, ‘গত ৫ জুলাই দুপুরে থানা পুলিশের এএসআই নাজিমের নেতৃত্বে একদল পুলিশ ঘরে ঢুকে তাদেরসহ ঘরের লোকজনকে ব্যাপক মারধর করে। এরপর আলমারি ভেঙে ২ ভরি স্বর্ণ, দেড় লাখ টাকা ও জায়গাজমির কাগজপত্র নিয়ে যায়। এরপর তাদের ছেড়ে দেওয়ার নামে আরো ২ লাখ টাকা আদায় করে পুলিশ অফিসার নাজিম। পরে ১০০ পিস করে ইয়াবা দিয়ে কারাগারে চালান দেওয়া হয়। দেড় মাস কারাভোগ শেষে তারা জামিনে বেরিয়ে আসেন। এখনও কারাভোগ করছে পরিবারের আরেক সদস্য কবির। এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত চান তারা।
ফরিদা বেগম কাজল নামের আরেক ভুক্তভোগী বলেন, ঘর থেকে তাদের তিনজনকে জোরপূর্বক থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর থানা ভবনে তিনতলায় একটি কক্ষে আলাদা করে তাদের নির্যাতন চালানো হয়। এ সময় তাকে চোখ-মুখ বেঁধে মারধর করে। পরদিন ৩০০ পিস ইয়াবা দিয়ে কক্সবাজার কারাগারে পাঠায় পুলিশ। এ সময় তার গলায় থাকা একটি স্বর্ণের চেইন থানার কম্পিউটার অপারেটর রাজু জোর করে নিয়ে নেয়। তখনও জানা ছিল না তার ভাই আবদুর রহমান এবং স্বামী আবদুল কাদেরের কী পরিনতি হয়েছিল?

তিনি আরও বলেন, পরের দিন জানতে পারলাম তাদের দু’জনকে গুলিতে হত্যা করা হয়। শুনে আমার হাত-পা অবশ হয়ে যায়। ভাই মিস্ত্রি ও স্বামী সিএনজি চালক ছিলেন। কী এমন দোষ ছিল যে তাদের গুলি করে মারা হয়েছে। আমাদের থাকার মতো একটি ঘরও ছিল না।

ইলিয়াস কোবরার সঙ্গে লিয়াকতের ফোনালাপ নিয়ে গুঞ্জন :ঘটনার দিন বাহারছড়া পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ লিয়াকত আলীর সঙ্গে খল অভিনেতা ইলিয়াস কোবরার ফোনালাপ দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা গুঞ্জন ছড়াচ্ছে। বলা হচ্ছে, সিনহা ডকুমেন্টারি তৈরির কাজে ওসি প্রদীপ দাশের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন। আর তখন থেকেই তাকে টার্গেট করা হয়। তবে মামলার তদন্তসংশ্নিষ্ট একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, সিনহার পক্ষ থেকে প্রদীপের কোনো সাক্ষাৎকার নেওয়ার তথ্যটি সঠিক নয়। আর ইলিয়াস কোবরার সঙ্গে সিনহার ইস্যুর কোনো সংশ্নিষ্টতা পাওয়া যায়নি। ইলিয়াস কোবরা বলেন, লিয়াকতের সঙ্গে আমার পরিচয় আছে। তার সঙ্গে সিনহার মৃত্যুর দিনেও কথা হয়েছে। আমাদের এখানে একটা বস্তা পাওয়া গিয়েছিল। তখন আমি টেলিফোনে জানানোর পর লিয়াকত আসেন। তিনি এসে বস্তাটা নিয়ে যান। এর সঙ্গে সিনহার ঘটনার কোনো সম্পর্ক নেই। সিনহাকে আমি চিনিও না।

চেকপোস্টটি ছিল এপিবিএনের :সিনহাকে যে চেকপোস্টে গুলি করা হয়, তা বাহারছড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের অধীনে ছিল না। সেটি ছিল এপিবিএন-১৬’র চেকপোস্ট। তবে সিনহার মৃত্যুর পর পুলিশের দায়ের করা মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, ঘটনার দিন রাত ৯টা ১৫ মিনিটে সেই শামলাপুর পুলিশ চেকপোস্টে যানবাহন তল্লাশি করছিলেন এসআই শাহজাহান, কনস্টেবল রাজীব ও আবদুল্লাহ। চেকপোস্টে পুলিশ প্রাইভেটকার থামিয়ে তল্লাশি করতে চাইলে সংকেত না মেনে অতিক্রম করার চেষ্টা করেন সিনহা।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে কক্সবাজারের ১৬ এপিবিএনের অধিনায়ক হেমায়েতুল ইসলাম সমকালকে বলেন, যে চেকপোস্টে ঘটনা ঘটেছিল, তা এপিবিএনের ছিল। বাহারছড়া তদন্ত কেন্দ্রের পরিদর্শক লিয়াকত আলী তাদের লোকজনকে ফোন করে বলেছিলেন, একটি গাড়ি আসবে, তা যেন থামানো হয়। তাদের লোকজন ওই রঙের গাড়িটিকে সিগন্যাল দিলেও সেটি থামেনি। ততক্ষণে লিয়াকত আলী চেকপোস্টে চলে আসেন। তিনি একটু সামনে গিয়ে ব্যারিকেড দিয়ে গাড়িটি থামান।

এদিকে সিনহার মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে আরও যে তিন মামলা হয়েছে, তার তদন্তভার র‌্যাবে যাচ্ছে। এরই মধ্যে এসব মামলার তদন্ত র‌্যাবের কাছে দিতে আবেদন করা হয়েছে। আজকালের মধ্যে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হবে।

সূত্রঃ সমকাল