হঠাৎ করে কেন ‘যুদ্ধক্ষেত্রে’ পরিণত হচ্ছে বান্দরবান

                 পাল্টাপাল্টি খুনোখুনিতে শান্তিপ্রিয় মানুষের ঘুম হারাম

অনলাইন ডেস্কঃ
হঠাৎ করে কেন ‘যুদ্ধক্ষেত্রে’ পরিণত হচ্ছে বান্দরবান? দেশের তিন পার্বত্য জেলার মধ্যে বান্দরবানকেই তুলনামূলক শান্ত বলে মনে করা হয়। রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত লেগে থাকলেও বান্দরবানে এমন ঘটনা খুব একটা ঘটে না। এমনকি শান্তিচুক্তির পর খুন-পাল্টা খুনে যখন রাঙামাটি আর খাগড়াছড়ির মাটি রক্তে রঞ্জিত হচ্ছিল, তখনও শান্তির সুবাতাস বইছিল এই পাহাড়ি জনপদে। ফলে বছরের সব সময়ই পর্যটকের আনাগোনায় মুখর থাকে এখানকার পর্যটন স্পটগুলো। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু সংঘাত-হানাহানিতে সম্প্রীতির সুনাম হারাতে বসেছে এই পার্বত্য জেলা। গত ৮ জুলাই এখানে ব্রাশফায়ারে ছয় পাহাড়ি খুন হওয়ার পর শান্তিপ্রিয় সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

বাঘমারা বাজারে ব্রাশফায়ারে খুন হওয়া সবাই জনসংহতি সমিতির সংস্কারপন্থি দলের নেতাকর্মী হিসেবে পরিচিত। এই পক্ষের অভিযোগ, প্রতিপক্ষ জেএসএস এ হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে। অভিযোগ অস্বীকার করে জেএসএস দাবি করেছে, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তারা নয়। জেএসএসের পক্ষে স্পষ্ট করে বলা না হলেও তাদের ইঙ্গিত মগ লিবারেশন পার্টির (এমএলপি) সংক্ষেপে মগ পার্টির দিকে।

এই ছয় খুন নিয়ে যখন আলোচনা-সমালোচনা চলছে, তার মধ্যেই গত শুক্রবার বান্দরবানের রোয়াংছড়ি আলেক্ষ্যং ইউনিয়নের গহিন এলাকায় গুলিতে খুন হন এক মা। এ সময় তার শিশুসন্তানটিও আহত হয়।

রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জনসংহতি সমিতি-জেএসএসের পাশাপাশি সংস্কারপন্থি জেএসএস এবং ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) সক্রিয় রয়েছে। ইউপিডিএফ ভেঙে গড়া গণতান্ত্রিক ইউপিডিএফসহ অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন সংগঠনের কমবেশি তৎপরতা থাকলেও বান্দরবানে এখনও আধিপত্য বিস্তার করে আছে মূলধারার জেএসএস। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে তাদের চ্যালেঞ্জ জানিয়ে আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করেছে সংস্কারপন্থি নামে পরিচিত জেএসএস। তাদের বাইরে মগ লিবারেশন পার্টি (এমএলপি) নামে আরেকটি সংগঠনও হঠাৎ করে তৎপরতা বাড়িয়ে দিয়েছে। মূলত তারাই ‘খেলছে’ বান্দরবানে অথবা খেলার সামগ্রী হয়েছে। সংশ্নিষ্টরা বলছেন, এ খেলারই সর্বশেষ পরিণতি হচ্ছে ‘সিক্স মার্ডার’।

অভিযোগ রয়েছে, পার্বত্যবাসীর অধিকার আদায়ের কথা বলা হলেও আধিপত্য বিস্তারের এমন চেষ্টার নেপথ্য রয়েছে একচ্ছত্র চাঁদাবাজির সম্পর্ক। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বছর দুয়েক আগেও বান্দরবান ছিল সংঘাতমুক্ত এলাকা। মগ পার্টির উত্থানের পর থেকে পরিস্থিতি বদলে যেতে শুরু করে। শুরু হয় সংঘাত, হানাহানি। এই মগ পার্টি মূলত মিয়ানমারের আরাকান লিবারেল পার্টি (এএলপি) দলছুট কয়েক নেতাকে নিয়ে গঠিত হয়েছে। স্থানীয় আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা এই সংগঠনকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

যদিও বরাবরই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন সংশ্নিষ্ট আওয়ামী লীগ নেতারা। জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও পৌর মেয়র ইসলাম বেবি বলেন, ‘বান্দরবানকে শান্তি আর সম্প্রীতির জনপদ বলা হতো। বর্তমানে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তার দায় জেএসএসকেই নিতে হবে। তারা আমাদের অনেক নেতাকে নিয়ে গেছে, যাদের হদিস পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। এসব ঘটনা যারা করছে, তারা সবাই বান্দরবানের বাইরের। শান্তিবাহিনী আত্মসমর্পণ করেছে, কিন্তু বীজ রেখে গেছে। আর তারাই অশান্তি তৈরি করছে।’

‘এটা ঠিক নয়’ বলে দাবি করেন জেএসএস কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের সদস্য কে এস মং। তিনি বলেন, ‘জেএসএস হত্যার রাজনীতিতে বিশ্বাসী নয়। যে ছয়জনকে হত্যা করা হয়েছে, তদন্ত করে তাদের হত্যাকারীদের আইনের আওতায় আনা হোক। পরিস্থিতি স্বাভাবিক ও সুন্দর থাকুক- এটা আমরাও চাই।’ জেএসএসের এই কেন্দ্রীয় নেতা কার পতনে কার উত্থান ঘটে, তা খতিয়ে দেখার পরামর্শ দেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মগ পার্টি বান্দরবানের বিভিন্ন পাহাড়ি জনপদে বেশ কিছুদিন উৎপাত চালালেও মাঝে কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়েছিল। আর এ সুযোগে উত্থান ঘটে জেএসএস সংস্কারপন্থিদের। নানাভাবে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিতে থাকে তারা। জেএসএসের কয়েক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতের পেছনে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের ইন্ধন রয়েছে। অন্তর্কোন্দল, আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি বিষয়টি মিডিয়ার সামনে এনে ঘটনার প্রকৃত কারণ ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে। শান্তিচুক্তি পূর্ণ বাস্তবায়ন না করার যুক্তি তৈরির জন্যই এসব সংঘাতের সৃষ্টি করা হয়।

অবশ্য বান্দরবানের শান্তিপ্রিয় সাধারণ মানুষ এত জটিল সমীকরণ বুঝতে চান না। তারা কেবল শান্তিতে বসবাস করতে চান। এখানকার মানবাধিকার ও নারী নেত্রী ডনাই প্রু নেলীর কথাতেই তা স্পষ্ট। তিনি বলেন, ‘আমরা সাধারণ মানুষ শান্তি চাই। কোন্দল বাড়ছে, নতুন নতুন সংগঠন তৈরি হচ্ছে, নেতার সংখ্যাও বাড়ছে। কিন্তু আমরা এমন নেতৃত্ব চাই না, যে নেতৃত্ব শান্তি বিঘ্নিত করে। আর কারা এই কাজটি করছে, শক্তি জোগাচ্ছে, তাদের খুঁজে বের করা দরকার।’

অশান্তির শুরু যেভাবে :
অশান্তি শুরু হয় ২০১৮ সালের এপ্রিল মাস থেকে। মগ পার্টির উত্থানের পর মূলধারার জেএসএসের সঙ্গে সংঘাতে জড়ায়। উভয়ের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘাতে মারা গেছে কিছু নিরীহ মানুষ, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী-সমর্থক, জেএসএসের ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ের কর্মী-সমর্থক। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকে মগ পার্টি জেলায় প্রভাব বিস্তার করতে থাকে। একসময় জেলা ছাড়াও পার্শ্ববর্তী রাঙামাটি জেলার রাজস্থলী উপজেলায়ও অবস্থান নিয়ে নিজেদের শক্তি-সামর্থ্য জানান দিতে থাকে। মগ পার্টি গত বছরের ২৫ জুন থেকে জেএসএসের একাধিক কর্মী-সমর্থককে হত্যা করে। পাল্টা খুন হন সদর উপজেলা রাজবিলা ইউনিয়নের এক আওয়ামী লীগ নেতা এবং এ জন্য দায়ী করা হয় জেএসএসকে। ২৫ মে পৌর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ও পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর চ থোয়াই মংয়ের গুলিবিদ্ধ মরদেহ উদ্ধার করা হয় কুহালং ইউনিয়নের দুর্গম পাহাড়ি এলাকা থেকে। দেখা যায়, আওয়ামী লীগের যত নেতাকর্মীই খুন হয়, প্রতিটি ঘটনায় জেএসএসকে দায়ী করা হয়। এ থেকেই বোঝা যায়, স্থানীয় রাজনীতিতে আঞ্চলিক সংগঠনটির সঙ্গে কতটা দূরত্ব আওয়ামী লীগের। আর দু’দলের এ দূরত্বের মাঝখানে ফুলেফেঁপে বেড়ে ওঠে মগ পার্টি।

মগ পার্টির দুর্বলতায় সংস্কারপন্থিদের উত্থান :

বান্দরবানে বেশ কিছুদিন ‘তা ব’ চালানোর পর গত বছরের ডিসেম্বরের দিকে নানা কারণে কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়ে মগ পার্টি। এ সুযোগ কাজে লাগায় জেএসএসের সংস্কারপন্থিরা। চলতি বছর ১৩ মার্চ চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে বান্দরবানে আনুষ্ঠানিক পথচলা শুরু করে। এরপর ৩১ মে জেলা কমিটির দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা তাদের খাগড়াছড়ি অংশের সশস্ত্র গ্রুপের সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে বিশেষ নিরাপত্তাবলয়ের মধ্য দিয়ে বান্দরবানে প্রবেশ করেন। সংস্কারপন্থিরা মাঠে নেমেই মুখোমুখি হয় মূলধারার জেএসএসের। আর এর এক মাস ছয় দিনের মাথায় গত ৮ জুলাই খুন হন দলটির বান্দরবান জেলা সভাপতি রতন তঞ্চঙ্গ্যাসহ ছয় নেতাকর্মী।

জেএসএস সংস্কারপন্থি গ্রুপের বান্দরবান জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক উবামং মারমা চলমান সংঘাতের জন্য মূলধারার জেএসএসকে দায়ী করেন। তিনি বলেন, ‘সন্তু লারমা নিজেদের স্বার্থের কথা চিন্তা করে শান্তিচুক্তি করেছেন। তাই সংঘাত বাড়ছে। তারা অস্ত্রের মাধ্যমে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে চায়। আর আমরা গণতান্ত্রিক উপায়ে শান্তি চাই। এ জন্য আমরা বান্দরবানেও সংগঠনের কমিটি করে কাজ শুরু করেছি। বিষয়টি তারা মেনে নিতে না পেরে আমাদের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা করছে। আধিপত্য খর্ব হওয়ার আশঙ্কায় তারা আমাদের দলের জেলা সভাপতিসহ ছয়জনকে ব্রাশফায়ারে হত্যা করছে।’

রহস্যজনক ভূমিকায় ইউপিডিএফ :
খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটিতে ইউপিডিএফের শক্ত অবস্থান থাকলেও বান্দরবানে ইউপিডিএফের অবস্থান খুব বেশি ভালো নয়। এখানে কমিটি থাকলেও তাদের তেমন কোনো তৎপরতা নেই। জেএসএসের মূলধারার সঙ্গে তাদের একটা গোপন সম্পর্ক রয়েছে বলে জানা যায়। তবে চলমান পরিস্থিতিতে অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করছে তারা। ইউপিডিএফ জেলা কমিটির আহ্বায়ক ছোটন কান্তি তঞ্চঙ্গ্যা বিষয়টি নিয়ে স্পষ্ট করে কিছু বলতে চাননি। তিনি বলেন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামে আধিপত্য বিস্তার করতে গিয়ে চাঁদাবাজি, খুনোখুনির ঘটনা ঘটছে বলে বিভিন্ন সময় মিডিয়া হাইলাইট করলেও বাস্তবতা হলো, এটি একটি শাসকশ্রেণিই করাচ্ছে। সমস্যা যেটি, সেটি হলো শাসকেরা সমাধান না দিয়ে ইন্ধন দিচ্ছে। এতেই সমস্যা আরও বাড়ছে।’
ফের রক্তারক্তির শঙ্কা, জনমনে আতঙ্ক :সাধারণত আঞ্চলিক কোনো দলের নেতাকর্মী প্রতিপক্ষ দলের হাতে খুন হলে এর বদলা নিতে পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটে। এটাই পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক সংঘাতের চরিত্র। রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে এভাবেই খুনোখুনির ঘটনা ঘটে আসছে। বান্দরবানে জেএসএস সংস্কারপন্থিদের ছয় নেতাকর্মী খুনের পর এখানে এমনটাই ঘটবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বান্দরবানে আগে থেকে বিচ্ছিন্নভাবে ঘটনা সংঘটিত হয়ে আসছিল জানিয়ে জেলা পুলিশ সুপার জেরিন আখতার জানান, নতুন করে সহিংসতা যেন ছড়িয়ে না পড়ে, তার জন্য পুলিশ সতর্ক রয়েছে। তিনি বলেন, ‘ছয় খুনের ঘটনায় সন্দেহভাজন একজনকে আটক করে কোর্টে চালান দিয়েছি আমরা। অন্য আসামিদের ধরতে বিভিন্নভাবে চেষ্টা চালানো হচ্ছে।’ পুলিশ সুপারের মতে, এখানে যেসব ঘটনা ঘটছে, তা সমাধানে এখানকার স্থানীয়দেরই সঠিক পথটি বেছে নিতে হবে।

সূত্রঃ সমকাল