বড় ভুল হয়ে যাচ্ছে কোথাও

মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেনঃ
মন বড় বিষণ্ণ হয়ে আছে। করোনা মহামারিতে মানুষের-প্রিয়জনের অসহায় মৃত্যু, দেশে জীবন-মৃত্যুর এই সময়েও হিংসা-দ্বেষ-দলাদলির বাইরে এসে একযোগে কঠিন যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে অসমর্থ হওয়া, বিত্তবান ও ক্ষমতাবানদের সীমাহীন লোভ, কিংবা জীবনের পড়ন্ত বেলায় মৃত্যুভয় – এ সব কিছু আমাকে ক্লান্ত-বিষণ্ণ করার জন্য যথেষ্ঠ। কিন্তু আমার বিষণ্ণতা সে কারণে নয়। কোথায় যেন বড় ভুল হয়ে যাচ্ছে। সর্বনাশা সে ভুল। অন্য দেশ নয়, মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে কঠিন আত্মত্যাগে অর্জিত বাংলাদেশে এই ভুলগুলো হচ্ছে। তার বিরুদ্ধে সরব উচ্চারণ নেই, সক্রিয় প্রতিবাদ নেই। এমন এক ভয় ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে জনপদে, যা অজানা আততায়ী করোনাভাইরাসের ভয়ের চাইতেও আরো গভীর। তাই সবাই চুপ করে আছে। আমার ভেতরে চেপে বসা বিষণ্ণতা সে কারণে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই জন শিক্ষককে কারাগারে নেওয়া হয়েছে। কারাগারে আছেন সাংবাদিক, সমাজসেবী, কার্টুন শিল্পী। এঁদের ‘অপরাধের’ ধরনে মিল আছে। সমাজের নানা অসংগতি, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, ক্ষমতাবানদের সীমাহীন ঔদ্ধত্য ও দাপট – এ সবের বিরুদ্ধে তারা স্বাধীন মত প্রকাশ করেছেন। সহিংস কোনও পন্থায় নয়। নিতান্ত সাধারণ তুলি-কলমের মাধ্যমে। তার জন্য তাদের এই অপমান, নিগ্রহ, কারাবাস। ডিজিটাল আইনে মামলা। ঔপনিবেশিক শৃঙ্খলের নিগড়ে বাঁধা কোন দেশে নয়, স্বাধীন বাংলাদেশে।

১.

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রভাষক সিরাজুম মুনিরাকে ডিজিটাল আইনে গ্রেপ্তার করে কারাগারে নেওয়া হয়েছে, রিমান্ড চাওয়া হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। এসব বিষয়ে বিবিসির প্রশ্নের উত্তরে তাজহাট থানার ওসি রবিউল ইসলাম বলেন, “মোহাম্মদ নাসিমের মৃত্যু সংবাদের খবর প্রকাশিত হওয়ার পর অভিযুক্ত শিক্ষিকা তাকে ব্যঙ্গ করে ফেসবুকে একটি পোস্ট দেয়। তিনি লিখেছিলেন, ‘অবশেষে দেশ নাসিম্যা মুক্ত হল’।”

বিবিসিকে দেওয়া ভাষ্যে মামলার বাদী বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার আবু হেনা মোস্তফা কামাল বলেন, “ঐ শিক্ষিকাকে এরই মধ্যে শোকজ নোটিশ এবং সরকারি চাকরি আইন ২০১৮ মোতাবেক নোটিশ দেয়া হয়েছে।”

নোটিশে তিন দিনের মধ্যে জবাব দিতে বলা হয়েছিল। কিন্তু নোটিশের জবাব দেবার পূর্বেই তাজহাট মেট্রোপলিটান থানা ও বিশ্ববিদ্যালয় ফাঁড়ির পুলিশ শনিবার গভীর রাতে তাকে বাসা থেকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায়। পরদিন রোববার দুপুরে তাকে আদালতে প্রেরণ করে থানা পুলিশ এবং আদালতের কাছে পাঁচ দিনের রিমান্ড আবেদন করে। সোমবার (১৫ জুন) বেরোবির প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজ, নব প্রজন্ম শিক্ষক পরিষদ এবং বঙ্গবন্ধু ক্লাব থেকে সিরাজুম মুনিরাকে বরখাস্ত করা হয়।

বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পরও বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষিকার বিরুদ্ধে কেন আনুষ্ঠানিকভাবে মামলা করা হলো– বিবিসির এ প্রশ্নের উত্তরে রেজিস্ট্রার মোস্তফা কামাল জানান ঘটনাটি উচ্চ পর্যায়ে আলোচনা তৈরি করায় পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে মামলা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

১৪ জুন, ২০২০ তারিখে প্রকাশিত The Business Standard জানায়, “এই স্ট্যাটাসে ক্ষোভে ফেটে পড়েন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ সহ স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ। তবে বিষয়টি শিক্ষিকা সিরাজুম মুনিরা বুঝতে পেরে তা ডিলিট করে দেন। … শনিবার রাত ১০টার পূর্বে বিষয়টি ভুল করেছেন স্বীকার করে ক্ষমা চেয়ে পরপর দুইটি ফেসবুক স্ট্যাটাস দিয়েছেন সেই অভিযুক্ত শিক্ষিকা সিরাজুম মুনিরা।”

পাঠক একটু বিবেচনা করুন। ১৩ জুন ২০২০, শনিবার বেগম রোকেয়ার নামে প্রতিষ্ঠিত একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক ফেসবুকে পাঁচ শব্দের একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন। একই দিন বিক্ষোভে ফেটে পড়েছে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগসহ স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতারা। ভুল বুঝতে পেরে সাথে সাথে শিক্ষক ফেইসবুকে তার মন্তব্য মুছে দিয়েছেন, দু দুবার ক্ষমা চেয়েছেন। ‘ঘটনাটি উচ্চ পর্যায়ে আলোচনা তৈরি করায় পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে’ করোনাভাইরাসের এই লকডাউনের মধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ওই একই দিনে তাকে তিন দিনের মধ্যে জবাব দেওয়ার জন্য নোটিশ জারি করেছেন; মামলা করেছেন। তাতেও শেষ হয়নি। নোটিশের জবাব দেওয়ার পূর্বেই একই দিন শনিবার গভীর রাতে এই নারী শিক্ষককে বাসা থেকে তুলে নিয়েছে পুলিশ। পরদিন রোববার আদালতে হাজির করে পুলিশ পাঁচ দিনের রিমান্ড আবেদন করে। এর মধ্যেই শিক্ষককে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়। কি দ্রুত লয়ে ঘটে যাওয়া দৃশ্যপট! কেমন যেন পরাবাস্তব। বিশ্বাসও করতে ইচ্ছা হয় না। কেউ কেউ বলতে পারেন যে সিরাজুম মুনিরার দেয়া স্ট্যাটাসে একটি শব্দচয়ন কাঙ্ক্ষিত ছিল না। হয়তো কেউ বলবেন একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের কাছ থেকে আমরা আরো বিবেচনাপ্রসূত মন্তব্য আসা করি। একজন মানুষ কখন কিভাবে নিজের ভাব প্রকাশ করবে তা সমাজ প্রায়ই ঠিক করে দেয়, কিন্তু একটি সুস্থ ও সবল গণতান্ত্রিক সমাজ চেষ্টা করে সেই ঠিক করে দেয়ার মাত্রাটি যতদূর সম্ভব কম রাখতে। পরবর্তীতে সিরাজুম মুনিরা ক্ষমা চেয়েছেন। সব মিলিয়ে তাকে নিয়ে যা হয়ে গেল তা কি কোনও বিচারে গ্রহণযোগ্য? সাথে সাথে এ প্রশ্নও জাগে, প্রয়াত সাবেক স্বাস্থ্য মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম এমনই পূত-পবিত্র এক মহান ব্যক্তি, যার বিরুদ্ধে একটি মাত্র শব্দ উচ্চারণে তার ভাবমূর্তির এমনই ক্ষতি হয়ে যাবে যে তা পুনরুদ্ধারে ছাত্রলীগ, আওয়ামী লীগ, বিশ্ববিদ্যালয়, রাষ্ট্র- সবাইকে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে! এক দিনের মধ্যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষককে কারাগারে পাঠিয়ে দিতে হবে। যেখানে লক্ষ লক্ষ মামলা জটে বিচারালয়গুলো ভারাক্রান্ত, সেখানে এমন তুচ্ছ বিষয়ে মামলাই বা কেন হবে?

করোনা-মহামারী যখন এলো, তখন স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় চরম দুর্গতি ও তার অন্যতম কারণ হিসেবে এই মন্ত্রণালয়ে সীমাহীন দুর্নীতি ও তার সাথে মোহাম্মদ নাসিমের পরিবারের সংশ্লিষ্টতার কথাতো কোন গোপন বিষয় ছিল না।

তাই দেখা যায় ১৪ জুন, ২০২০ তারিখের বিবিসি বাংলা সংবাদভাষ্য শেষ হয়েছিল এই মন্তব্য করে, “সাবেক স্বাস্থ্য মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের মৃত্যুর খবর প্রকাশিত হওয়ার পর সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেক মানুষকেই তার রাজনৈতিক জীবন এবং সরকারি দায়িত্বে থাকা অবস্থায় নেয়া পদক্ষেপের সমালোচনা করে মন্তব্য করতে দেখা গেছে।”

২.

১৮ জুন, ২০২০ তারিখে প্রকাশিত দৈনিক প্রথম আলো সংবাদ করেছে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক কাজী জাহিদুর রহমানকে ফেইসবুকে প্রয়াত সাবেক স্বাস্থ্য মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতা মোহাম্মদ নাসিমকে নিয়ে কটূক্তির অভিযোগে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে আগের দিন ১৭ জুন তারিখ রাত দুইটার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসা থেকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। রিপোর্টে আরো জানানো হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর মো লুৎফর রহমান বলেন, ‘ঐ শিক্ষকের বিরুদ্ধে মামলা বা গ্রেপ্তারের ব্যাপারে কিছু জানি না। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে তাঁর বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।’ বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সভাপতি বিমল কুমার প্রামানিক বলেন, ‘তাঁর বিরুদ্ধে মামলা বা গ্রেপ্তারের বিষয়ে কিছু শুনিনি।’

১৮ জুন তারিখে প্রকাশিত বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম-এর সংবাদ, “নাসিম অসুস্থ হওয়ার পর তাকে নিয়ে ১ ও ২ জুন কাজী জাহিদুর রহমান ফেইসবুকে লেখেন। কিন্তু সে সময় ঘটনাটা পেছনেই থেকে যায়। শনিবার নাসিমের মৃত্যুর পর বিরূপ মন্তব্য করে সেদিনই গ্রেপ্তার হন রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রভাষক সিরাজুম মুনিরা। এরপর সোমবার কাজী জাহিদুর রহমানের ওই লেখা সামনে এনে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ। তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এম আব্দুস সোবহানের কাছে স্মারকলিপি দিয়ে এই দাবি জানায়। তার দু’দিনের মাথায় শিক্ষককে গ্রেপ্তার করা হয়।”

এ ক্ষেত্রে গুরুতর বিষয় হলো রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অজান্তে একজন শিক্ষককে রাতের অন্ধকারে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসা থেকে উঠিয়ে নিল পুলিশ। কি উপাচার্য, শিক্ষক সমিতি বা কোন বিদ্যজন, কেউ কোন প্রতিবাদ করলেন না।

চকিতে মনে পড়লো ২০০৭ সালের ২৩ অগাস্টের কালো রাতের কথা। মধ্যরাতের পর তৎকালীন যৌথবাহিনী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক এলাকায় হানা দিয়েছিল। চোখ বেঁধে, হ্যান্ডকাফ পরিয়ে আমাকে ও আমার সহকর্মীকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল ডিজিএফআই বন্দিশালায়। ছাত্ররা বাদ পড়েনি। একই ঘটনা ঘটেছিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকদের ক্ষেত্রেও। কিন্তু আমাদের উপর রাষ্ট্রের এমন নিপীড়নের ঘটনা ঘটেছিল অবৈধ সেনাচালিত সরকারের আমলে। রিমান্ডে অত্যাচার, কারাবাস, সেনা-নিয়ন্ত্রিত সিএমএম আদালতে তথাকথিত শাস্তি– এ সবই চালানো হয়েছিল শিক্ষক-ছাত্রদের উপর। তাতে জাগ্রত হয়েছিল বিবেক। বাংলাদেশে এক দীর্ঘস্থায়ী সামরিক শাসন চাপিয়ে দেয়ার নীল-নকশা আমরা ব্যর্থ করে দিয়েছিলাম। তার ফলেই গণতান্ত্রিক শাসনের নব অভিযাত্রা সূচিত হয়েছিল। আর এখন ছাত্রলীগের ধমকে মামলা হচ্ছে শিক্ষকদের উপর। রাতের অন্ধকারে বাসা থেকে উঠিয়ে নেওয়া হচ্ছে তাঁদের।

৩.

আহমেদ কবির কিশোর বাংলাদেশের স্বনামধন্য কার্টুনিস্ট। অন্যায়, অসংগতির বিরুদ্ধে তার আঁকা কার্টুন শাণিত অস্ত্র। বাংলাদেশে করোনা-মহামারী কালে তিনি রাজনীতি ও দুর্নীতি নিয়ে ফেইসবুকে ‘লাইফ ইন দ্য টাইম অব করোনা’ নামে একটি কার্টুন জার্নাল প্রকাশ করছিলেন। গত ৫ মে তাকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় গ্রেপ্তার করে কারাগারে অন্তরীণ করা হয়। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, করোনাভাইরাস পরিস্থিতি নিয়ে তিনি ফেসবুকে গুজব ও মিথ্যে তথ্য ছড়িয়েছেন। প্যারিসভিত্তিক স্বাধীন উন্নয়ন সংস্থা ‘রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার’ (আরএসএফ) কারাবন্দি কার্টুনিস্ট আহমেদ কবির কিশোরসহ ৩০ জন সংবাদকর্মী সম্পর্কে জানায়, “এসব মানুষ ও প্রতিষ্ঠানের সাহস, ঐকান্তিকতা ও উদ্ভাবনী ক্ষমতা মহামারীতে বিশ্বাসযোগ্য ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের প্রসারে কাজ করেছে। আর এজন্য তাদের দিতে হয়েছে চড়া মূল্য।”

আরএসএফ এই ৩০ জন সংবাদকর্মীকে অভিহিত করেছে ‘ইনফরমেশন হিরোজ’ হিসেবে। ‘করোনাভাইরাস: ইনফরমেশন হিরোজ – জার্নালিজম দ্যাট সেইভস লাইফ’ নামের প্রতিবেদনে বলেছে, “মহামারির সময় মুক্ত গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তাদের কেউ কেউ জেল খেটেছেন, কেউ কারারুদ্ধ হয়েছেন, কেউ আর কখনোই সাংবাদিকতা করতে পারবেন না, কেউ আবার এই করোনারকালেই দেশান্তরী হয়েছেন।”

আরএসএফ-এর ৩০ জন ‘ইনফরমেশন হিরোজ’-এর মধ্যে কিশোর ছাড়াও জর্ডানের কারাগারে আটক বাংলাদেশের নাগরিক সাংবাদিক সালিম আকাশও রয়েছেন।

International Crimes Strategy Forum (ICSF) বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই সংগঠনের পক্ষ থেকে প্রচারিত ধারাবাহিক অনুষ্ঠান ছিল ‘মুক্তিযুদ্ধের গল্প শোনো’। কার্টুনিস্ট আহমেদ কবির কিশোর এই অনুষ্ঠানের জন্য কার্টুন আঁকতেন। ICSF-এর প্রতিষ্ঠাতা ড. রায়হান রশিদ এক পোস্টে বলেন, “Cartoonist Ahmed Kabir Kishore and 10 other individuals have been arrested under a gagging law of Bangladesh. They have allegedly made some critical comments regarding the government’s response to the Covid19 crisis! What is so wrong with comments and satires asking for greater scrutiny and transparency in the middle of a global pandemic? … Government of Bangladesh should immediately drop all charges and release the individuals arrested. As we demanded before – the gagging laws in question must also be repealed without question.”

৪.

সাবেক ছাত্রনেতা ‘পক্ষকাল’ পত্রিকার সম্পাদক ও বণিক বার্তার ফটোসাংবাদিক শফিকুল ইসলাম কাজল ও তার পরিবার খুবই সৌভাগ্যবান। ১০ মার্চ, ২০২০ তারিখে বাসা থেকে বের হওয়ার পর থেকে তিনি নিখোঁজ ছিলেন। ৫৩ দিন পর তাঁকে ‘জীবিত’ অবস্থায় পাওয়া যায় বেনাপোলের রঘুনাথপূর সীমান্তে। দীর্ঘদিন গুম থাকার পর এমনভাবে উদয় হওয়ার ‘গল্প’ নতুন নয়। প্রশ্ন হলো আর কতদিন এমনসব আষাঢ়ে গল্প আমাদের শুনতে হবে। ৩ মে, ২০২০ তারিখে প্রকাশিত বাংলাদেশে ডয়চে ভেলের কন্টেন্ট পার্টনার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম জানায়, “এর আগে কারাগারে আটক যুব মহিলা লীগ নেত্রী শামিমা নূর পাপিয়ার সঙ্গে বিভিন্ন ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতা নিয়ে দৈনিক মানবজমিনে একটি খবর প্রকাশিত হয়। কাজল তার ফেসবুকে এই খবরটি শেয়ার করেছিলেন। এই খবরে ক্ষুব্ধ হয়ে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য সাইফুজ্জামান শিখর মানবজমিন সম্পাদক মতিউর রহমানসহ ৩২ জনের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে একটি মামলা করেন। ওই মামলায় তিন নম্বর আসামী কাজল। এই মামলার একদিন পর নিখোঁজ হন তিনি।”

যমপুরী থেকে বেঁচে যাওয়া কাজলকে পিছমোড়া করে দুই হাতে হ্যান্ডকাফ লাগিয়ে আদালতে নিয়ে যাওয়ার করুণ দৃশ্য আমরা কিভাবে ভুলবো? তার ছেলে মনোরম পলক দেশ জুড়ে করোনাভাইরাস সংকটের এ সময়ে তার বাবাকে কারাগারে না রেখে জামিন দেয়ার আবেদন জানিয়েছিল। তাতে কাজ হয়নি। বাংলাদেশে ক্ষমতাবানদের ভাবমূর্তি রক্ষা করা মানুষের জীবনের চেয়ে আরো বেশি জরুরি।

৫.

২১ মে, ২০২০ তারিখের প্রথম আলোর সংবাদে বলা হয়, “হবিগঞ্জে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে করা মামলায় স্থানীয় সাংবাদিক সুশান্ত দাস গুপ্তকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। … মামলায় অভিযোগ আনা হয়, প্রেস ক্লাবের আজীবন সদস্য, হবিগঞ্জ-৩ আসনের সাংসদ ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. আবু জাহিরের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় ওই সাংবাদিক তাঁর পত্রিকার অনলাইন সংস্করণ এবং ফেইসবুকে অসত্য সংবাদ প্রচার করে আসছেন।”

গ্রেপ্তারের পর সুশান্ত জানিয়েছিলেন, ‘যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় মুক্ত হয়ে আসব। জয় বাংলা।’

সুশান্ত পড়াশোনা করেছেন হবিগঞ্জের বৃন্দাবন দাস কলেজে এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে। পরে ব্রিটেনের ইউনিভার্সিটি অব ইস্ট লন্ডনে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়েছেন। বছর কয়েক আগে যুক্তরাজ্যের কোভেন্ট্রিতে অবস্থান কালে বঙ্গবন্ধুর একনিষ্ঠ ভক্ত এই সপ্রতিভ যুবকের সাথে কথা বলে মুগ্ধ হয়েছিলাম।

ডিজিটাল আইনে এমন গ্রেপ্তারের তালিকা দীর্ঘ। তাতে যুক্ত হতে পারেন কবি, কলামনিস্ট ও সাংবাদিকসহ অনেকে।

শুরুতে বলছিলাম বড় ভুল হয়ে যাচ্ছে কোথাও। রাষ্ট্র, সরকার, প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরে কারা সেই অপশক্তি, যারা সে সর্বনাশা ভুলের ফাঁদে ফেলছে সরকার প্রধানসহ গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানসমূহকে। কারা অকার্যকর করে দিচ্ছে রাজনীতি ও রাজনৈতিক পরিমণ্ডলকে। বিরাজনীতির কোন ক্ষেত্র প্রস্তুত করা হচ্ছে বাংলাদেশকে আরো একবার অসাংবিধানিক স্বৈর শাসনে বেঁধে ফেলবার। অবিলম্বেই তা খুঁজে বের করা দরকার। দরকার আইসিটি আইনের ওইসব ধারার বিলোপ যাতে মুক্ত চিন্তা নিরাপদে থাকে। গুম-খুনের যে ভয়াবহ সংস্কৃতি বাংলাদেশের সরকার ও রাষ্ট্র চালু করেছে, তার ইতি টানা বড়ই জরুরি। ইতিমধ্যেই যে ভুলের কারণে প্রতিবাদী নাগরিকেরা কারাগারে, তাঁদের মুক্তি দেওয়া খুব বেশি প্রয়োজন।

মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন ইউজিসি অধ্যাপক, প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

সূত্রঃ বিডিনিউজ