শোকের মাস আগস্ট

বছর ঘুরে আবার এল শোকের আগস্ট। আসছে ১৫ আগষ্ট জাতির পিতার প্রয়াণ দিবস। এই দিন রাষ্ট্রীয় শোক দিবস। মাতৃভূমির স্বাধীনতা এবং এই দেশবাসীকে শোষণ-নিপীড়ন থেকে মুক্তি দিতে যিনি জীবন দিলেন, তাঁর মৃত্যুতে রাষ্ট্রের সবাই শোকাহত হওয়ার কথা এই চিন্তা থেকেই দিনটিকে রাষ্ট্রীয় শোক দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। কিন্তু তাঁর মৃত্যু এই দেশে বসবাসকারী সবাইকে শোকাহত করতে পেরেছে কিনা?

পরাধীন বাংলাদেশে (তৎকালীন পূব পাকিস্তান)তিনি যতটা নিরাপদ ছিলেন, স্বাধীন বাংলাদেশে ততটা নিরাপদ ছিলেন না এই সত্যকে তিনি প্রমাণ করে গেলেন এই জাতির বিপদগামী কিছু মানুষের হাতে জীবন দিয়ে। জাতির পিতাকে আমি যতই জানার চেষ্ঠা করি, ততই আমার জানার ক্ষুধা মিটেনা।’৭১ কে ছাড়িয়ে ’৭৫ এ তাঁর এই মৃত্যুকে কিছুতেই মেনে নিতে পারি না। আমার সৌভাগ্য যে, তাঁর এই নির্মম হত্যার দৃশ্য এবং পবিত্র রক্তস্রোত আমাকে দেখতে হয়নি।আমার দুর্ভাগ্য যে, তাঁর জীবদ্দশায় তাঁকে দেখার সৌভাগ্য আমার হয়নি।
পাকিস্তান বিভক্তির জন্য পাকিস্তানের চির শত্রুর নাম শেখ মুজিব। তথাকথিত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার নামে তাঁকে হত্যা চেষ্ঠা করেও পাকিস্তান সরকার তাঁকে মারতে পারেননি। তাঁকে পশ্চিম পাকিস্তানে নিজেদের ভূমিতে আটকে রেখেও মারার সাহস কুলাতে পারেননি ওরা। অথচ সেই নেতাকে জীবন দিতে হল স্বাধীন বাংলাদেশের আপন ভাইদের হাতে, যাদের জন্য তিনি স্বাধীনতা এনেছিলেন। পাকিস্তান যা করতে পারেনি তা করলেন এই দেশের কিছু কান্ডইঝানহীন ক্ষমতা লিপ্সু মানুষ। পরাজিত হবার পরও পাকিস্তান যেমন বাংলাদেশকে মেনে নিতে পারেনি, তেমনি স্বাধীনতার স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমানের পিছুও ছাড়েনি। পাকিস্তান হয়তো আন্দাজ করতে পেরেছিলেন যে, মুক্তিযুদ্ধে যেহেতু এদেশের একাংশ তাদের পক্ষ নিয়ে রাজাকার, আলবদরের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে, দেশ স্বাধীনের পরও তাদের সহযোগিতা পাওয়া যাবে। না হলে স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি পর্যন্ত পৌছানোর সুযোগ কোথায়?

শেখ মুজিব ক্ষমতার দ্বন্দের শিকার হলেন, না পাকিস্তানী ষড়যন্ত্রের শিকার হলেন?এই প্রশ্নের উত্তর মেলানো কষ্টকর হলেও একটা বিষয় পরিস্কার বুঝা যায় যে, তিনি এদেশীয় ক্ষমতালোভী কিছু বিপদগামী মানুষের প্রতিহিংসার শিকার হয়েছেন।’৭৫ এ সংঘটিত এই পাপ এই দেশকে এখনো ছাড়েনি, ছাড়বেও না।

তিনি এদেশের মানুষের স্বপ্ন পূরণে আজীবন লড়েছেন, স্বাধীনতার স্বাদ এনে দিয়েছেন কিন্তু আমরা তাঁর স্বাধীনতা পরবর্তী সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন পূরণ হতে দিইনি। দেশ এবং দেশবাসীর মুক্তির জন্য যেমন শেখ মুজিবুর রহমানের মত নেতা প্রয়োজন, তেমনি দেশকে গড়ার জন্যও তাঁর মত নেতা প্রয়োজন। কিন্তু আমরা তো তাঁকে বাঁচতে দিইনি, বাঁচাতে পারিনি। তিনি জানতেন এদেশের একাংশ দেশদ্রোহীতায় লিপ্ত ছিলেন। তারা স্বদেশীয় হয়েও এদেশের মা-বোনদের ইজ্জত নিয়েছিলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের নির্মমভাবে হত্যা করেছিলেন, জ্বালা-পোড়াও, লুণ্ঠনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।এরপরও তিনি বললেন এরা আমার ভাই। তিনি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করলেন। অনেকের মতে, তাঁর এই রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছিল ভুল সিদ্ধান্ত যা তাঁকে জীবন দিয়ে শোধরাতে হয়েছে।

তিনি তাঁর জীবন তো এদেশের মানুষের জন্য অনেক আগে থেকেই উৎসর্গ করেছিলেন। জীবনের মায়া তাঁর কাছে কখনো বড় ছিল না। তাঁর পরিবারের নিরাপত্তার কথাও আলাদা করে ভাবার সুযোগও নেননি। ক্ষমা করা তাঁর ভুল হলেও অপরাধ ছিল না।দেশের মানুষকে ভাই হিসেবে, মিত্র হিসেবে জানবেন না তো কাকে জানবেন? কিন্তু ভাইয়ের মর্যাদা এবং ভালোবাসার মূল্য দিতে না পারা অপরাধ। স্বাধীনতা পরবর্তী মুজিব হত্যার দীর্ঘ চার দশক সময় হতে চলল অথচ রাষ্ট্র এখনো তার স্থপতির খুনের বিচার শেষ করতে পারল না, জাতি হিসেবে এদেশের মানুষও এই বিচার কার্য শেষ করতে পারলেন না।এই অক্ষমতা বড়ই গ্লানিকর।

যে নেতার ডাকে একটি দেশের নিরস্ত্র মানুষেরা মরণাস্ত্রের সামনে বুক পেতে দাঁড়ায়, শসস্ত্র হিংস্র একটি বিশাল সৈন্য বাহিনীকে পরাজিত করার সাহস রাখে এমন একজন নেতার জন্ম এদেশের মাটিকে পবিত্র করেছিল, আমাদেরকে করেছে বীর এবং গর্বিত। কিন্তু দেশদ্রোহীতা এবং ভ্রাতৃহন্তারকের এমন ঘৃণ্য নজির বিশ্ববাসীর কাছে আমাদেরকে কলংকিতও করেছে।

রাষ্ট্র এখনো তাঁর আত্ম জীবনী সম্পর্কে জানার জন্য ভবিষ্যত প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করার কাজটি পুরোপুরি করতে পারেনি। উল্টো এই প্রজন্ম থেকে তাঁকে ঘৃণা করার শিক্ষা, অবজ্ঞা করার শিক্ষা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে লাভ করছে। শিক্ষার সব স্তরে জাতির পিতার আত্মজীবনী শ্রেণি ভেদে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয়ে জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে গবেষণা কর্ম হয় কিনা আমার আদৌ জানা নেই। না হয়ে থাকলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত বলে মনে করি।

রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিত্তিতে এবং ক্ষমতার দ্বন্ধে আমাদের নিজেদের মধ্যে বিতর্ক থাকতে পারে।কিন্তু জাতির পিতাকে নিয়ে নয়। পিতার মৃত্যুতে পরিবারের সবাই শোক প্রকাশ করতে না পারলেও কোন সন্তানের আনন্দ উল্লাস করা উচিত হবে না।এটাকে পাড়া-প্রতিবেশীরা নিন্দার চোখে দেখেন।

হে পিতা,
তুমি সবার স্বাধীনতা এনে দিয়েছ
কিন্তু ওরা; তোমার বাঁচার স্বাধীনতা হরণ করল
তুমি সবাইকে আপন করার শিক্ষা দিয়েছ
অথচ ওরা তোমার ওপর শত্রুর
মত ভয়ংকর আঘাত হানল।

তুমিই মানচিত্র, তুমিই বাংলাদেশ
তুমি ছিলে, তুমি আছ, তুমি থাকবে
হদয়জুড়ে সবাকার।

জেনেছে ওরা, তাদের নয়
মরণে জয় হয়েছে তোমার
পেয়েছে তারা লজ্জা,
তোমার পারলৌকিক সদগতি কামনা করি
জানাই অশেষ শ্রদ্ধা।