কক্সবাজারের সেই পোকা ‘ঘাসফড়িং, আগে থেকেই আছে’

অনলাইন ডেস্কঃ
কক্সবাজারের টেকনাফে গাছের পাতা খেয়ে পঙ্গপাল আতঙ্ক সৃষ্টি করা সেই পোকাটি ঘাসফড়িংয়ের একটি প্রজাতি; এছাড়া আগে থেকেই এদেশে এই পোকার অস্তিত্ব রয়েছে বলে দাবি কীটতত্ত্ববিদদের।

শনিবার টেকনাফ সদর ইউনিয়নের লম্বরী পাড়ায় সেই পোকার হানায় ক্ষতিগ্রস্ত বসত ভিটার গাছপালা ও আঙিনা পরিদর্শন শেষে ঢাকা থেকে আসা বিশেষজ্ঞ দলের সদস্যরা সাংবাদিকদের এ তথ্য জানিয়েছেন।

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইন্সটিটিউট, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউট, বঙ্গবন্ধু কৃষি গবেষণা কেন্দ্র এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বিশেষজ্ঞ ও বিজ্ঞানীদের সমন্বয়ে চারটি প্রতিনিধিদল যৌথভাবে টেকনাফের ক্ষতিগ্রস্ত বসতভিটা পরিদর্শন করে। প্রতিনিধিদলে ১০ জন বিশেষজ্ঞ ছিলেন।

পরিদর্শন শেষে তারা যৌথভাবে জানান, এই পোকাটি পঙ্গপাল নয়; এটি সাধারণ ঘাসফড়িংয়ের একটি প্রজাতি।

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইন্সটিটিউটের অধ্যক্ষ ও বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. নাজমুল বারী বলেন, টেকনাফে দেখা দেওয়া পোকাটি পঙ্গপাল নয়। এটা ঘাসফড়িং, এটা বাংলাদেশেরই পোকা এবং আগে থেকেই আছে।

“পোকাটি ডিম দেয়। ডিম থেকেই বাচ্চা হয়; বাচ্চাকে বলা হয় নিম। আর নিমটাই এখানে [টেকনাফে] দেখা দিয়েছে।”

অনেকগুলো ‘নিম’ একসঙ্গে থাকার কারণেই অনেকে এ পোকাগুলোকে ‘পঙ্গপাল’ বলে ভুল করছেন বলে মন্তব্য করেন এই বিশেষজ্ঞ।

নাজমুল বারী বলেন, পোকাটি যখন বড় হবে এবং এর পাখা গজাবে তখন এটির গায়ে ফোটা ফোটা দাগ দেখা যাবে। এ জন্য পোকাটিকে ‘স্পটেড গ্রাসহপার’ বলা হয়।

“এছাড়া এ পোকাটির একটা ডিফেন্স মেকানিজম রয়েছে; যখন সে বড় হবে এবং অন্যান্য পোকা তাকে খেতে বা ক্ষতি করতে যায়, তখন সে তার মুখ দিয়ে এক ধরনের ফোম নির্সরণ করে। সেই ফোমটা বিষাক্ত ফোম। বিষাক্ত ফোমের কারণে অন্যান্য পোকা বা শত্রুরা তার কাছে আসতে পারে না।”

পোকাটি ‘বিধ্বংসী পোকা পঙ্গপাল’ নয় দাবি করে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউটের কীটতত্ত্ববিদ ও প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. নির্মল কুমার দত্ত বলেন, কৃষি মন্ত্রণালয় কর্তৃক গঠিত তদন্তদলের সদস্যরা প্রাথমিকভাবে এটিকে বিধ্বংসী পোকা পঙ্গপাল নয় বলে শনাক্ত করেছেন। এটি ঘাসফড়িং বা ঘাসফাড়িংয়ের একটি প্রজাতি।

“এটি আসলে বনজ, ফলজ এবং ক্ষেত্র বিশেষে কিছু ফসলের অপ্রধান ক্ষতিকারক পোকা। এটা তেমন কিছু ক্ষতি করে না। অল্পকিছু ক্ষতি করতে পারে।”

নির্মল দত্ত বলেন, এ পোকা নিয়ে আতঙ্কিদ হওয়ার কিছু নেই। এটি অনেক আগে থেকেই বাংলাদেশে রেকর্ডেট পোকা, যা টেকনাফে স্থানীয়দের কাছে ‘বর্মাচন্ডালী’ হিসেবে পরিচিত।”

এ ধরনের পোকা বাংলাদেশের পাশাপাশি ভারত, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে আগে থেকে অস্তিত্ব রয়েছে বলে জানান ড. নির্মল।

সাধারণ কীটনাশক বা বালাইনাশক ছিটিয়ে এ ধরনের পোকা দমন করা সম্ভব হয় বলে মন্তব্য করে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ঢাকার খামারবাড়ীর উপ-পরিচালক রেজাউল করিম বলেন, পোকাটি দেখা যাওয়ার পর ঊর্ধ্বতন মহলে অবহিত করা হলে স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তাদের সাধারণ কীটনাশক বা বালাইনাশক ছিটানোর পরামর্শ দেওয়া হয়। এতে কার্যকর ফলও পাওয়া গেছে। এখন তদন্তে আসা বিশেষজ্ঞরা ক্ষতিগ্রস্ত বসতভিটায় এসব পোকার উল্লেখযোগ্য সন্ধান পায়নি।

“সাইপারমেথ্রিন [Cypermethrin] জাতীয় কীটনাশক স্প্রে করে এটা দমন বা বিস্তার রোধ করা সম্ভব হয়েছে। পরপর ২/৩ দিন ধরে স্প্রে করার কারণে একটা জীবন্ত পোকাও খুঁজে পাওয়া যায়নি। ক্ষতিগ্রস্ত বসতভিটার আশপাশেও এ ধরনের পোকার অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।”

তারপরও অন্য কোথাও এ পোকার সন্ধান পাওয়া গেলে সাধারণ কীটনাশক বা বালাইনাশক স্প্রে করে এর দমন রোধ করা সম্ভব হবে বলে জানান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের এ কর্মকর্তা।

স্প্রে করে দমন করার আগে স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তারা কিছু পোকার জীবন্ত নমুনা সংরক্ষণ করেছেন জানিয়ে ধান গবেষণা ইন্সটিটিউটের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. পান্না আলী বলেন, সংগৃহীত নমুনাগুলো পরীক্ষা নিরীক্ষা এবং গবেষণা করে বাংলাদেশে এ ধরনের পোকার ব্যাপক হারে প্রাদুর্ভাবের সম্ভাবনা আছে কিনা তা যাচাই করা হবে। এ ধরনের পোকা কিছুটা হলেও ফসলসহ ফলজ ও বনজ গাছের ক্ষতি করে থাকে।

পরবর্তীতে গবেষণা লব্ধ ফলাফলের ভিত্তিতে ঘাসফড়িং জাতীয় এ পোকার দমন, বংশ বিস্তার ও আগ্রাসন প্রতিরোধে আরো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।

সূত্রঃ বিডিনিউজ