করোনাভাইরাস ও ফর্মুলা ‘ঘরে থাকা’

তন্ময় ইমরানঃ
‘বাইরে যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন করোনাভাইরাসের ভয় নাই?’

রিকশাওয়ালা ভাড়া নিতে নিতে বললেন, ঘরে বইসা থাকলে চলবে? মরা মাইনসের আর ডর কী!

আমি কিছুটা বিস্মিত হলাম। ঠিক করলাম রিকশাওয়ালার সাথে একটু আলাপ চালাই। ‘চাল, ডাল কিনছেন কিছু’!

৪৫ এর কাছাকাছি বয়স হবে। বুড়োটে হয়ে গেছেন। মাথা নাড়তে নাড়তে বললেন- আরে না, ট্যাকা কই!

কথা চালাতে গিয়ে জানলাম আগে কৃষিকাজ করতেন। বছর খানেক আগে ধানচাষ করে ধরা খেয়েছেন। সেবার নাকি কানে ধরেছিলেন- আর চাষ করবেন না। তারপরও এবছর পেঁয়াজ চাষ করেছেন। কিন্তু বাজারে দাম থাকলেও তার হাতে মুনাফার টাকা ছিল না। ঢাকায় প্রতি দুইমাস অন্তর এসে একমাস রিকশা চালিয়ে যান।

রিকশাওয়ালা আবারও বললো- ঘরে বইসা থাকলে আমগো চলতো না। আমরা বাবা আগেই মইরা গেছি।

জ্বি ভাই, মধ্যবিত্ত সেন্টিমেন্ট থেকে যারা বলছি- ঘরে থাকুন, হ্যান করুন বা ত্যান করুন, তারা জেনে রাখুন দেশের প্রায় ৮০ ভাগেরও বেশি মানুষ, ঘর থেকে না বেরোলে হয়তো এক সপ্তাহের বেশি টিকে থাকতে পারবেন না। স্রেফ খাদ্য সংকটেই মারা যাবেন।

আপনি যদি এসব শ্রমজীবী মানুষকে বোঝাতে চান, ভাই আপনার থেকে তো অন্যদের ভাইরাস ছড়াবে!

উত্তরটাও পরিষ্কার শুনে রাখুন- বাঁচা-মরা আল্লার হাতে। আমরা তো মইরাই আছি। আপ্নে মরলে আমার কী!

তাই তো। কৃষক যখন উৎপাদিত ফসলের দাম পান না, শ্রমিক যখন মজুরি পান না, তখন আপনি-আমি, যারা মধ্যবিত্তীয় সেন্টিমেন্ট নিয়ে ‘ঘরে বসে থাকার পরিকল্পনা’ করেছি, যারা কখনোই তাদের পাশে দাঁড়াইনি- তারা মরে গেলে ওদের সমস্যা কী! ওরা তো মরেই গেছে।

আতংকের কারণে দেশে পর্যাপ্ত চাল থাকা সত্ত্বেও আপনি টনকে টন মজুদ রাখছেন, বাকিদেরও পরামর্শ দিচ্ছেন মজুদ রাখার। ভাবুন একবার গরীব মানুষ কোথায় যাবে! দাম হু হু করে বাড়বে। ব্যবসায়ীদের মুনাফা হবে। তেলা মাথায় তেল দিয়ে আপনি নিজেকে খুব চালাক ভাববেন হয়তো- কিন্তু করোনাভাইরাস পরিস্থিতি যদি মাস ছয়েক চলে? তখন হয়তো নিজের পাতা ফাঁদে নিজেই পা দিবেন। চাল আপনাকেও কিনতে হবে চড়া দরেই।

এই দু:সময়েও নিম্ন আয়ের মানুষকে কাজে বের হতে হবে। পরিবহনকর্মীকে তার গাড়ি নিয়ে বের হতে হবে, চা দোকানদারকে দোকান খুলতে হবে, কাপড়ের ব্যবসায়ীকে মার্কেটে গিয়ে বসতে হবে। লক ডাউন হয়তো ধনী দেশে চলতে পারে। আমার দেশে ডেকে নিয়ে আসতে পারে দুর্ভিক্ষ।

‘মধ্যবিত্তের প্যানিক’ বরাবরই আমাদের দেশের মতো একটি অরাজক, দুর্নীতিগ্রস্ত এবং অব্যবস্থাপনার দেশে পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে করে তুলেছে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি, হবেও না। সত্যি কথা হচ্ছে, ভাইরাস আপনারা আটকাতে পারবেন না। কোনও প্রস্তুতি নেই। সব বন্ধ করে দেওয়ার আগে কীভাবে অর্থনীতি চলবে তা ভাবা উচিত। নতুবা ভাইরাসে মরবে হয়তো ১০০ তে ১০ জন। আর না খেয়ে ৫০জন।

আপনার মধ্যবিত্তীয় প্যানিকে জিনিসপত্রের দাম হুহু করে বাড়বে, গরীব বা স্বল্প আয়ের মানুষের নাভিশ্বাস তুলে ছাড়বে। এবং শেষ পর্যন্ত যা হবে- হাইজিন-টাইজিনের তোয়াক্কা না করে, ভাইরাসের ক্যারিয়ার হিসেবে বিস্তর ভূমিকা রাখবে।

এখন পর্যন্ত সরকার চিকিৎসা কীভাবে দেবে তার কোনও দিকনির্দেশনা দিতে পারেনি। কেউ মারা গেলে সৎকার বা দাফনকাফন কীভাবে হবে সেটিও বলতে পারেনি। চিকিৎসার খরচ কীভাবে সাধারণ মানুষ জোগাড় করবে সেটাও বলতে পারেনি। দুনিয়াব্যাপী এই প্যানডেমিক দমনে আমরা কৌশল হাতে নিয়েছি যুক্তরাষ্ট্র স্টাইলে- ভাই ঘরে থাকুন।

ভুলে গেছি, এখানে অনেকেরই কোনও বাড়ি নেই। থাকার জায়গা থাকলেও দরজা-জানালা নেই। লকডাউন তো বহু পরে। ভুলে গেছি, কাজের বুয়া ও দারোয়ান ছাড়া আমাদের এক মুহূর্ত চলে না।

ভাইরাস ছড়াবেই। আপনাকে-আমাকে কেবল মানবিক হতে হবে। রাষ্ট্রকে যেটা করতে হবে- কর্তৃত্ব নিয়ে সব হাসপাতালগুলো খুলে দিতে হবে সাধারণ মানুষের জন্য। করোনাভাইরাসের চিকিৎসা হবে ফ্রি। মানুষকে আশ্বস্ত করতে হবে তার পাশে রাষ্ট্র আছে। এলাকায় এলাকায় ভলান্টিয়ার টিম এখন থেকেই তৈরি করতে হবে, যাতে ‘লক ডাউন’ করলে তারা বাড়ি বাড়ি খাবার পৌঁছে দিতে পারে।

কেবল মাত্র মানসিকভাবে নিম্নবিত্তের মধ্যে যখন এ আস্থা তৈরি হবে- তারা না খেয়ে মরবে না, তাদের বিনে পয়সায় চিকিৎসা হবে, তাদের দৈনন্দিন কেনাকাটা ভলান্টিয়াররা সামলাবে তখনই ভাইরাসের ব্যাপক সংক্রমণ আটকানো সম্ভব হবে। এখান থেকে শুরু করতে হবে সাম্যের পথে প্রথম যাত্রা।

স্লোভেনিয়ার দার্শনিক স্লাভয় জিজেক তার লেখায় বলছেন, এখনকার পরিস্থিতিতে পৃথিবীবাসীর সামনে সময় এসেছে বাছাই করার।

সরাসরি উক্তিটি এরকম, “করোনাভাইরাস নিয়ে ভীতি ছড়িয়ে পড়ার এসময়ে, আমাদেরকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে- আমরা কি যোগ্যতমই অধিতম নামক নিষ্ঠুর তত্ত্বে আটকে থাকব, নাকি বৈশ্বিক সমন্বয় ও সহযোগিতার মধ্য নিয়ে নবায়িত কমিউনিজমের (শ্রেণি-বৈষম্যহীন সমাজের) পথে হাঁটবো।”

রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত ও ব্যক্তি স্বাধীনতার খর্ব করার অভিযোগ তুলে যে সমাজতন্ত্রকে ধনীরা ‘ইউটোপিয়া’ বলে ব্যঙ্গের হাসি হাসেন, করোনাভাইরাস মোকাবিলায় সেই ব্যবস্থারই নানা কৌশল পশ্চিমা বিশ্ব হাতে নিচ্ছে। স্পেন সব হাসপাতালকে সরকারের আওতায় নিয়ে এসেছে, কানাডা বাড়ি বাড়ি খাবার পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে, সুইজারল্যান্ড, ব্রিটেনসহ পশ্চিমের অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী সব দেশের সরকারই জনকল্যাণমূলক পন্থা হাতে নিয়েছে। আর চীনের ব্যাপারটা তো আমরা জানি। ১৫০ বছর ধরে মার্ক্সবাদীরা যে স্বপ্নের সমাজ গড়ার কথা বলছেন- আজ সেই স্বপ্ন মূর্ত হয়ে উঠেছে। দুঃখের বিষয় হলো এর জন্য পৃথিবীকে গুণতে হচ্ছে কড়া মাসুল। হয়তো আরো গুণতে হবে।

পৃথিবীর অর্থনীতি বদলাচ্ছে। হয়তো মন্দা আসছে। তবে এ অবস্থা কেটে যাওয়ার পর যদি অন্য সব বারের মত মানুষ শিক্ষা নেয়, তাহলে মৌলিক চাহিদার সংগ্রাম থেকে মানুষের মুক্তি মিলবে। ভাইরাসের এই দুঃসময় অতিক্রম করে আমরা যদি বেঁচে থাকি একটা সুন্দর পৃথিবী দেখতে পাবো বলে আশা করতে তো ক্ষতি নেই। সেই পৃথিবী এখন যারা শোষিত তাদের জন্য সুন্দর হবে। আমাদের শিশুরা রোদ গায়ে মাখবে, আমাদের ধর্ম পরিশুদ্ধ হবে। মানুষ মানুষকে মুনাফার দৃষ্টিতে না দেখে, ভালোবাসার দৃষ্টিতে পরিমাপ করবে।

খুব যত্নে প্রকৃতি অন্যতম অসহায় প্রাণী মানুষকে এই পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। হিংসা, লোভ তাকে কেবল স্বজাতির প্রতি নির্মম করেনি, অন্যসব প্রাণীকেও সে করে চলেছে নির্মূল।

আমি ঠিক জানিনা প্রকৃতি (সৃষ্টিকর্তাও পড়তে পারেন কেউ কেউ) আরেকবার সুযোগ দিবে কিনা। যদি দেয় তাহলে বুঝতে হবে আমাদেরকে ভালোবাসার সুযোগ দিয়েছে সে। ভালোবাসার চর্চাটা এখন থেকেই শুরু হোক। তাতে হয়তো আপনার আমার পরিশ্রম হবে, কিন্তু কোয়ারেন্টিন আতঙ্কে থাকতে হবে না। অজানা মৃত্যু আতঙ্কে কাটাতে হবে না পুরোটা জীবন।

সূত্রঃ বিডিনিউজ