মোদীর হিন্দুরাষ্ট্র বনাম বাংলাদেশ ইসলামী রাষ্ট্র

হাসান মাহমুদঃ
অগ্নিগর্ভ ভারত।

সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় জ্বলছে দিল্লী, নিহত ৪৬ জন। উত্তাল দেশ, প্রচণ্ড হট্টগোলে মুলতুবি সংসদ অধিবেশন। দীর্ঘ পরিকল্পনায় মোদী-অমিত চক্র সুদৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়েছে ‘হিন্দুরাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠায়, কাশ্মীর গ্রাস, বাবরী মসজিদ ভেঙে মন্দির স্থাপন ও এখন নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল ২০১৬। বিদ্রোহে ফেটে পড়েছে সব ধর্মের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা ভারতের ধর্ম নিরপেক্ষ শক্তি। এ বিলের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে মেঘালয়, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড, পশ্চিমবঙ্গ, পাঞ্জাব, তামিলনাড়ু ও কেরালার সরকার প্রধানেরাও। সব মিলিয়ে নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর ভাষায়- ‘সেকুলার ইন্ডিয়া ফাইটস্ ব্যাক’।

রাজনীতিতে যাই ঘটুক বাস্তবে হিন্দুরাষ্ট্র সম্ভব নয়। যে ধর্ম কয়েক হাজার বছর ধরে গড়ে উঠে প্রচুর বিবর্তিত হয়েছে, যে ধর্মের কোনও প্রেরিত পুরুষ বা একক ধর্মগ্রন্থ নেই, যে ধর্মের এক জায়গা বা এক যুগের কিছু দেবতাকে অন্য জায়গা বা অন্য যুগে খুঁজে পাওয়া যায়না, সেই ধোঁয়াশার ভিত্তিতে কোন রাষ্ট্র হতে পারেনা। জোর করে ও রাষ্ট্র বানালে তার কাজই হবে মুসলিম বা অন্যকোনও ধর্মাবলম্বীর ওপরে জুলুম করা। সমস্যা আরও আছে, তা হল ইসলামী খেলাফতের যেমন একটা রাষ্ট্রীয় কাঠামো ছিল তেমন কোন হিন্দু রাষ্ট্রের মডেল সামনে নেই। তাছাড়া হিন্দু আইনগুলোও কোডিফায়েড অর্থাৎ বিধিবদ্ধ নয়। কাজেই হিন্দু রাষ্ট্রের আইন বানাতে হলে মনু সহ বিভিন্ন সংহিতার ভিত্তিতেই বানাতে হবে। কিছু উদ্ধৃতি দিচ্ছি ‘অন্যতম অগ্রগণ্য ইন্ডোলজিস্ট’, টাইমস অব ইন্ডিয়া’র ভাষায় ‘বিরল পর্যায়ের বিশেষজ্ঞ’ ড. সুকুমারী ভট্টাচার্য্যের বই প্রাচীন ভারত: সমাজ ও সাহিত্য থেকে :-

* সতীদাহ বৈধ – সূত্র – “জীবিত নারীকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে মৃতের বধূ হতে…এই নারী পতিলোকে যাচ্ছে, এ-প্রাচীন রীতি অনুসরণ করছে” – অথর্ববেদ ১৮/৩/১, ১৮/৩/৩)। “সহমৃতা না হলে পরজন্মে ওই পতি পাওয়া যাবেনা” – বাৎস্যায়ন ৯/১৩।

* নারীকে গৃহবন্দী রাখতে হবে নাহলে তার “শক্তিক্ষয় হবে” – শতপথ ব্রাহ্মণ ১৪/১/১/৩১।

* সন্তান না জন্মালে ১০ বছর ও পুত্র না জন্মালে ১২ বছর পর স্ত্রীকে তালাক দেয়া বৈধ – আপস্তম্ভ ধর্মসূত্র ১/১০-৫১-৫৩।

* লাঠি দিয়ে স্ত্রীকে মেরে দুর্বল করতে হবে যাতে দেহ ও সম্পত্তির ওপরে তার কোন অধিকার না থাকে – শতপথ ব্রাহ্মণ ৪/৪/২/১৩।

* রাষ্ট্রের খরচে গণিকাদের উচ্চশিক্ষা দিতে হবে যাতে “মার্জিত রুচী এবং শিক্ষার অধিকারী মানুষ গণিকার কাছেই মানসিক সাহচর্য পায়, বধূর কাছে নয়” – পৃষ্ঠা ৬২।

* স্বামীর জন্য বাড়ীতে উপপত্নী আনা বা বেশ্যাগমন করা বৈধ – মৈত্রায়নী-র বিভিন্ন আইন ও তৈত্তিরীয় সংহিতা ৬/৫/৮/২।

অন্যদিকে, বাংলাদেশে লক্ষাধিক আলেম অজস্র ওয়াজে গণতন্ত্রকে ‘কুফরী আকিদা’ ঘোষণা করে জনগণের একাংশকে ইসলামী রাষ্ট্রের সমর্থনে টেনে আনছেন কিন্তু তাদের সমস্যাও কম গভীর নয়। ওয়াজে তাদের মধ্যে যে ভয়াবহ কুরুক্ষেত্র চলছে, জুতো দেখিয়ে অশ্রাব্য ভাষায় গালাগালি চলছে- তাতে রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচনে গৃহযুদ্ধের আশংকা আছে। তারপরে আছে শারিয়া আইনের সংকট, যা জাতিকে জানানো জরুরি। পশ্চিমা দেশে ইসলাম-বিদ্বেষীরা যখন এসব আইন উদ্ধৃত করে আমাদেরকে আঘাত করে তখন তার জবাব দেয়া আমাদের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। উদাহরণ দিচ্ছি পৃথিবীর সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য কিছু শারিয়া কেতাব থেকে, কেউ চাইলে পৃষ্ঠার ফটোকপি পাঠিয়ে দেব। এ কেতাবগুলো যদি কারো পছন্দ না হয় তবে কোন কেতাবের আইন প্রয়োগ করবেন তার নাম বলুন, আমরা খতিয়ে দেখি।

১. বি-ই-আ বা বাংলাদেশ ইসলামি ফাউণ্ডেশন প্রকাশিত ৩ খণ্ডের ‘বিধিবদ্ধ ইসলামি আইন’।

২. বাংলা কোরান (অনুবাদ, মওলানা মুহিউদ্দিন খান)

৩. হানাফী আইন- ‘হেদায়া’, অনুবাদ চার্লস হ্যামিল্টন। মুখবন্ধে আছে, এ বইটি কাউন্সিল অব লিগ্যাল এডুকেশন দ্বারা

ইংল্যাণ্ডের ব্যারিস্টারি সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত।

৪. শাফি-ই আইন, (শাফি আইন ‘উমদাত আল সালিক, অনুবাদ নু. হা. মিম. কেলার, মিসরের আল আজহার

বিশ্ববিদ্যালয়ের স্ট্যাম্প ও সই দ্বারা সত্যায়িত।)

৫. শারিয়া দি ইসলামিক ল’, বিশ্ববিখ্যাত ইসলামী বিশেষজ্ঞ ড. আবদুর রহমান ডোই।

৬. ‘ক্রিমিন্যাল ল’ ইন্ ইসলাম অ্যান্ড দি মুসলিম ওয়ার্ল্ড’ (বর্ষীয়ান শারিয়া-বিশেষজ্ঞ ডক্টর তাহির মাহমুদ লিখেছেন)। জেনারেল জিয়াউল হক পাকিস্তানকে সাংবিধানিকভাবে “শারিয়া রাষ্ট্র” ঘোষণা করার আগে তাকে উপদেষ্টা হিসেবে আনিয়েছিলেন।

৭. ইসলামিক ল-জ – (“জাফরী” শারিয়া) – শিয়াদের বর্তমান সর্বোচ্চ শারিয়া-ইমাম গ্র্যান্ড আয়াতুল্লাহ সিস্তানী।

৮. দি পেনাল ল অব ইসলাম – মো. ইকবাল সিদ্দিকী।

ইত্যাদি। সূত্র বিশেষে কিছু আইনের পার্থক্য দেখা যায়। মনে রাখতে হবে, দুনিয়ার সকল মুসলিম একমত হলেও আল্লাহর আইনে বিন্দুমাত্র পরিবর্তন করার অধিকার রাখেনা –(মৌদুদী – ‘ইসলামী ল’ অ্যাণ্ড কনস্টিটিউশন’, পৃষ্ঠা ১৪০)। শারিয়া আইনের বিভাগগুলো হল:-

হুদুদ :- খুন-জখম, চুরি-ডাকাতি, মদ্যপান, জ্বেনা ও মানহানী, ইসলাম ত্যাগ, কিছু কেতাবে ধর্ষণ যোগ হয়েছে। এক্ষেত্রে শাস্তি কোরান-রসূল (স) দ্বারা নির্ধারিত, সরকারের কিছু করার নেই।

দিয়াত :- খুনীকে নিহতের পরিবার ক্ষমা বা রক্তপণ নিয়ে মুক্তি দিতে পারে, সরকারের কিছু করার নেই। যেসব কোটিপতি খুনীদের “ওপরের সাথে কানেকশন” ও গুণ্ডাবাহিনী আছে, এ আইনে তাদের হাতে গরীব দুর্বলেরা অসহায় অরক্ষিত।

কিসাস:- হত্যার বদলে হত্যা, চোখের বদলে চোখ, নাকের বদলে নাক ইত্যাদি।

বাকি সব মামলা “তাযীর” যেক্ষেত্রে বিচারক নিজের বিচারবুদ্ধি বা অতীত উদাহরণ প্রয়োগ করতে পারবেন।

এবারে আইনের উদাহরণ। টেক এ ডিপ ব্রেথ অ্যান্ড ফ্যাসেন ইয়োর সিট বেল্ট!

১. কোনো অমুসলমানকে খুন করার অপরাধে কোন মুসলমানের মৃত্যুদণ্ড হবে না – পেনাল ল অব ইসলাম পৃ. ১৪৯, শাফিই আইন o.1.2.2।

২. ইসলামী রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধান হুদুদ অপরাধ করলে (খুন-জখম, চুরি-ডাকাতি, মদ্যপান, জ্বেনা …) তাঁর শাস্তি তো দূরের কথা তাঁর বিরুদ্ধে মামলাই করা যাবে না – বি-ই-আ ৩য় খণ্ড ৯১৪গ এবং হানাফি আইন পৃঃ ১৮৮।

৩. হুদুদ ও কিসাস মামলায় নারী-সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয় – বি-ই-আ ১ম খণ্ড ধারা ১৩৩ ও ২য় খণ্ড ধারা ৫৭৬, হানাফি আইন পৃ. ৩৫৩, শারিয়া দি ইসলামিক ল পৃ. ২৩৫, ক্রিমিন্যাল ল’ইন্ ইসলাম অ্যাণ্ড দ্য মুসলিম ওয়ার্লড পৃ. ২৫১, বাংলা কোরান পৃ. ২৩৯, ৯২৮, পেনাল ল অব্ ইসলাম পৃ. ৪৪, শাফিই আইন o.24.9।

৪. হুদুদ মামলায় নারী-বিচারক অবৈধ – বি-ই-আ ২য় খণ্ড ধারা ৫৫৪।

৫. মুসলিম-সংশ্লিষ্ট মামলায় অমুসলিমের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয় – বি-ই-আ ২য় খণ্ড ধারা ৫৭২।

৬. হুদুদ মামলায় সাক্ষ্য গোপন করা অপরাধ নয় – বি-ই-আ ২য় খণ্ড ধারা ৫৭৫খ। এ আইন ইসলাম-বিরোধী কারণ “তোমরা সাক্ষ্য গোপন করো না”- বাকারা ২৮৩ ইত্যাদি।

৭. কেউ তার বাবা-মা, দাদা-দাদি, বা নানা-নানিকে (ঊর্ধ প্রজন্ম) ইচ্ছাকৃত খুন করলে খুনীর মৃত্যুদণ্ড হবে। কিন্তু বাবা মা, দাদা-দাদি বা নানা-নানি যদি ছেলে-মেয়ে বা নাতি-নাতনিকে (অধ: প্রজন্ম) ইচ্ছাকৃত খুন করলে খুনীর মৃত্যুদণ্ড হবে না – বি-ই-আ ১ম খণ্ড ধারা ৬৫ ক ও খ, শাফি’ই আইন o.1.2.4।

৮. (একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের মতো) দলবদ্ধ হয়ে গণহত্যা, গণধর্ষণ, লুট ও অগ্নিসংযোগের অপরাধীরা তওবা করলে

“শাস্তি হইতে রেহাই পাইবে” – বি-ই-আ ১ম খণ্ড ধারা ১৩।

৯. “কোন ব্যক্তির অপরাধ প্রকাশ্য আদালতে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তাহাকে গ্রেপ্তার বা আটকের মাধ্যমে তাহার ব্যক্তিগত স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা যাইবে না” – বি-ই-আ ৩য় খণ্ড ধারা ১২৮২। অর্থাৎ খুন ডাকাতি জঙ্গী হামলা সহ যে কোনো অপরাধের প্ল্যানিংয়ের সময় ক্রিমিন্যালদেরকে গ্রেপ্তার করা যাবেনা।

১০. দাস-দাসী, পেশাদার গায়িকা এবং সমাজের নীচু ব্যক্তির (রাস্তা পরিষ্কারকারী বা শৌচাগারের প্রহরী, ইত্যাদি) সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয় – বি-ই-আ ২য় খণ্ড পৃঃ ২৬৩, হানাফি আইন পৃঃ ৩৬১, শাফি’ই আইন o.24.3.3, পেনাল ল’অব্ ইসলাম পৃঃ ৪৬।

১১. জেনার ক্ষেত্রে বোবার সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয়- বি-ই-আ ১ম খণ্ড পৃষ্ঠা ৩১১।

১২. স্বামী তার স্ত্রীকে ইচ্ছে হলেই তাৎক্ষণিক তালাক দিতে পারবে। কোনো কোনো কেতাবে আছে অত্যাচারের চাপে, নেশার ঘোরে বা হাসি-ঠাট্টাতে ‘তালাক’উচ্চারণ করলেও পুরো তালাক হয়ে যাবে – হানাফি আইন পৃঃ ৮১ ও ৫২৩, শাফিই আইন n.3.5, বি-ই-আ ১ম খণ্ড ধারা ৩৪৭, ৩৪৯, ৩৫১, ‘দ্বীন কি বাঁতে’- মওলানা আশরাফ আলী থানভি, পৃঃ ২৫৪ আইন নং ১৫৩৭, ১৫৩৮, ১৫৪৬ ও ২৫৫৫। এই আইন পৃথিবীর প্রত্যেকটি মুসলিম স্ত্রীকে কার্যত: স্বামীর ক্রীতদাসী বা জুতো-কাপড়ের মতো করে রাখে যা ইচ্ছে হলেই ছুঁড়ে ফেলা যায়। এই শারিয়া আইন কেন কোরান-রসূল (স) বিরোধী (নারী-বিরোধী তো বটেই) তা বিস্তারিত আছে ‘মতামত’-এর এই নিবন্ধে। শিয়া শারিয়ায় তাৎক্ষণিক তালাক অবৈধ।

১৩. স্ত্রী সাধারণ তালাকে তিনমাসের খোরপোষ পাবে কিন্তু তাৎক্ষণিক তালাকে কিছুই পাবে না – হানাফি আইন পৃঃ ১৪৫, শাফি’ই আইন m.11.10-1 এবং 3।

১৪. “(স্বামীর জন্য) বৌ-তালাকে সাক্ষ্য শর্ত নহে”- বি-ই-আ ১ম খণ্ড, ধারা ৩৪৪। কিন্তু ইসলামে দুজন সাক্ষী ছাড়া তালাক অবৈধ – সুরা ত্বালাক আয়াত ২। সহি ইবনে মাজাহ ৩য় খণ্ড হাদিস ২০২৫ অনুযায়ীও সাক্ষী ছাড়া তালাক অবৈধ ।

১৫. স্বামী খাবার, বাসস্থান ও পোশাক দিতে বাধ্য থাকবে শুধুমাত্র বাধ্য স্ত্রীকে, অবাধ্য স্ত্রীকে নয়। এর বাইরের সব খরচ এমনকি ডাক্তারের, ওষুধের বা সৌন্দর্য্য-চর্চার খরচ ইত্যাদি হবে স্বামীর করুণা ও দয়া – হানাফি আইন পৃঃ ১৪০, শাফি’ই আইন m.11.4।

১৬. উদ্ধৃতি: “স্ত্রীর যে প্রয়োজনীয় ব্যয়ভার বহন করা স্বামীর জিম্মায় ওয়াজিব তা চারটি বস্তুর মধ্যে সীমাবদ্ধ – আহার, পানীয়, বস্ত্র ও বাসস্থান। স্বামী এর বেশি কিছু স্ত্রীকে দিলে অথবা ব্যয় করলে তা হবে অনুগ্রহ, অপরিহার্য নয়।”- বাংলা কোরান পৃঃ ৮৬৭। বলাই বাহুল্য, স্ত্রী অবাধ্য কি না সেটা ঠিক করবে ওই স্বামীই।

১৭. খুনিকে মাফ করতে পারে শুধু নিহতের পুত্ররাই, কন্যারা নয় – শারিয়া দি ইসলামিক ল’পৃঃ ২৩৫। তাহলে নিশ্চয় খুনির কাছ থেকে নিহতের রক্তমূল্যও (দিয়াত) দাবী করতে পারে শুধু নিহতের পুত্ররাই, কন্যারা নয়।

১৮. বিবাহিতা যুদ্ধবন্দিনীদের বিয়ে তৎক্ষণাৎ বাতিল হয়ে যাবে- শাফি’ই আইন o.9.13। এ আইন কি প্রয়োগ করা সম্ভব?

১৯. মদ্যপানের প্রমাণ দু’জন পুরুষ মুসলমানের চাক্ষুষ সাক্ষ্য। নারী বা নারী-পুরুষের মিলিত সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয় –

বি-ই-আ ১ম খণ্ড ধারা ১৭৪।

২০. “কোনো কারণে ধর্ষকের শাস্তি মওকুফ হইলে ধর্ষণকারী কর্তৃক ধর্ষিতাকে মোহরানা প্রদান বাধ্যতামূলক হইবে”- বি-ই-আ ১ম খণ্ড পৃঃ ৩০১, শাফি’ই আইন m.8.10। কি এমন “কারণ” যাতে ধর্ষণের মতো মারাত্মক অপরাধের শাস্তি মওকুফ হতে পারে? তাছাড়া, ধর্ষক কপর্দকহীন হলে কি হবে তা বলা নেই।

২১. মুসলিম পুরুষের (দিয়াত) রক্তমূল্য অপেক্ষা (ক) মুসলিম নারীর রক্তমূল্য অর্ধেক, (খ) ইহুদী-খ্রিস্টানের রক্তমূল্য তিনভাগের একভাগ ও (গ) অগ্নি-উপাসকের রক্তমূল্য পনেরো ভাগের একভাগ – বাংলা কোরাণ পৃঃ ২৭৫, শাফি’ই আইন o.4.9।

২২. “রাষ্ট্রপ্রধানের পুরুষ হওয়াও অপরিহার্য শর্ত।”- বি-ই-আ ৩য় খণ্ড ধারা ৯০০। কিন্তু তারপরেই শর্তটা আর ততটা ‘অপরিহার্য’ থাকেনি, বলা হয়েছে যদি “ইসলামি রাষ্ট্রের বিশেষজ্ঞ ফকিহ্গণ কোন বিশেষ পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে জাতির সার্বিক কল্যাণ বিবেচনা করিয়া উক্ত সর্বোচ্চ পদ নারীর জন্য অনুমোদন করিতে পারেন”- (পৃষ্ঠা ১৯৯)। যে আলেমদের মধ্যে এতো মারমূখী কুরুক্ষেত্র তাঁরা হানাহানি না করে “জাতির সার্বিক কল্যাণ” কত প্রকার ও কি কি এবং কোন নারী “উপযুক্ত নেত্রী” তাতে একমত হবেন তা কি আশা করা যায়?

শারিয়া কেতাবে এমন আইন অজস্র আছে। কাউকে দোষারোপ করছিনা, সাধারণ মুসলিম হিসেবে আমি শুধু সমস্যাটা দেখাচ্ছি। দেশের অনেক কিছু নিয়ে আমরাও অত্যন্ত ক্ষুব্ধ, পরিবর্তন আমরাও চাই। কিন্তু ওসব আইন দিয়ে তা সম্ভব নয় কারণ:

“আমি সবাইকে স্মরণ করাইয়া দিতেছি, এযুগে শারিয়াকে চালাইতে হইলে অবশ্যই প্রচণ্ড ঘষামাজা করিতে হইবে…সেই যুগে যে উদ্দেশ্যে শরিয়ার উসুল বানানো হইয়াছিল অনেক কারণেই এখন উহা সেই উদ্দেশ্য অর্জন করিতে সক্ষম নহে।” – ‘প্রিন্সিপলস অব ইসলামিক জুরিসপ্রুডেন্স’, পৃষ্ঠা ১৩, ৫০০ – বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শারিয়া-বিশেষজ্ঞ ড. হাশিম কামালী।

কালতামামি

(ক) আপনি আচরি ধর্ম শেখাও অপরে। আমরা ভুলে গেছি রসূল (স) নিজে মিষ্টি খাওয়া ছেড়ে তারপরে এক বালককে মিষ্টি ছাড়ার উপদেশ দিয়েছিলেন। আমরা ভুলে গেছি আল্লাহর নির্দেশ – “হে মু’মিনগণ! তোমরা এমন কথা কেন বল যা নিজেরা করো না?”- সূরা সূরা আস সফ আয়াত ২।

আমরা ভারতে হিন্দুরাষ্ট্রের বিরোধিতা করার নৈতিক অধিকার হারিয়েছি (১) ১৯৪৭ সালে ইসলাম/মুসলিমের নামে পাকিস্তান বানিয়ে, (২) ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানকে “ইসলামী প্রজাতন্ত্র” ঘোষণা করে, (৩) ১৯৭৯ সালে পাকিস্তানকে সাংবিধানিকভাবে “শারিয়া রাষ্ট্র” ঘোষণা করে, (৪) পাকিস্তান আমলে হিন্দুদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস করে, যেমন “এনিমি প্রপার্টি আইন” ইত্যাদি। এসবের সুযোগ নিয়ে মোদী-অমিত চক্র হিন্দুরাষ্ট্র কায়েম করবে না তা হয়না।বাংলাদেশে গণতন্ত্র “কুফরী আকিদা” আর ভারতে আমরা হিন্দুরাষ্ট্রের বদলে গণতন্ত্র চাইব- তা হয়না।

(খ) হাদিস ও তফসীরগুলোতে ন্যায়বিচারের অনেক উপদেশ আছে। কিন্তু রাষ্ট্র উপদেশ দিয়ে চলেনা, চলে আইন দিয়ে। তাই, আগে শারিয়া আইনের সেই “প্রচণ্ড ঘষামাজা”টা হোক, শালীন আলোচনা হোক যাতে ইসলামী মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠিত হয়। সেই ইঙ্গিত দিয়ে গেছেন মুসলিম-বিশ্বের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের সর্বোচ্চ বিশেষজ্ঞ (প্রয়াত ১৯০৫) বহু আগে:

“আমি পশ্চিমা দেশে গিয়া মুসলিম দেখিলাম না কিন্তু ইসলাম দেখিলাম। ফিরিয়া আসিয়া আমি মুসলিম দেখিলাম কিন্তু ইসলাম দেখিলাম না”– আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়াত গ্র্যান্ড মুফতি মোহাম্মদ আবদুহ।

একই সত্য উঠে এসেছে ১৫৩টি দেশের মধ্যে ওয়াশিংটনের ‘ইসলামসিটি ফাউন্ডেশন’-এর জরিপে। ‘ইসলামী মূল্যবোধ’ প্রতিষ্ঠায় সর্বোচ্চে নিউজিল্যাণ্ড, তারপরে সুইডেন, হল্যাণ্ড, আইসল্যাণ্ড ও সুইজারল্যাণ্ড। অর্থাৎ গণতন্ত্রের কাঠামোতেই ইসলামী মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।

সবাইকে সালাম।

হাসান মাহমুদ, মুসলিম রিফর্ম মুভমেন্ট-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, সাংস্কৃতিক ও মানবাধিকার কর্মী, শারিয়া আইনের ওপর গবেষক, লেখক ও আন্তর্জাতিক সম্মেলনের বক্তা।

সূত্রঃ বিডিনিউজ