সরকারি সেবার নামে দরিদ্র জনগণের অর্থ হাতিয়ে নেয়া রামুর সেই প্রতারক উধাও

সোয়েব সাঈদ, রামুঃ
সরকারি সেবার নামে দরিদ্র জনগণের অর্থ হাতিয়ে নেয়া রামুর রাজারকুল ইউনিয়নের কথিত চৌকিদার এলাকা থেকে উধাও হয়ে গেছে। প্রতারক নেজাম উদ্দিন প্রকাশ ছলিম উল্লাহ রামু উপজেলার রাজারকুল ইউনিয়নের ২ নং ওয়ার্ডের পশ্চিম হালদারকুল গ্রামের মৃত মো. কালুর ছেলে। গত সোমবার সন্ধ্যা থেকে তার মুঠোফোন বন্ধ রয়েছে। মঙ্গলবার প্রতারনার শিকার লোকজন এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা এলাকায় তাকে খোঁজে পাননি। এমনকি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাও তাকে ফোন করে সংযোগ বন্ধ পেয়েছেন।
নেজাম উদ্দিন প্রকাশ ছলিম উল্লাহর বিরুদ্ধে ভিজিডি, প্রতিবন্ধী ও বয়স্ক ভাতা এবং নতুন ঘর দেয়ার নামে হতদরিদ্র লোকজনের কাছ থেকে কৌশলে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ রয়েছে। এলাকার অসংখ্য ভুক্তভোগী জনতা এ নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে একাধিক লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। নিজেকে ইউনিয়ন পরিষদের চৌকিদার হিসেবে পরিচয় দিয়ে চেয়ারম্যান-মেম্বারের নাম ভাঙ্গিয়ে এসব অপকর্ম চালিয়ে আসছিলেন ওই যুবক।

রাজারকুল ইউপি চেয়ারম্যান মুফিজুর রহমান জানান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দেয়ার পর থেকে এলাকায় তাকে পাওয়া যাচ্ছে না। তার ফোনও বন্ধ রয়েছে। তিনি আরো জানান, নেজাম উদ্দিন প্রকাশ ছলিম উল্লাহ ইউনিয়ন পরিষদের চোকিদার নন। তবে সে ইতিপূর্বে চৌকিদার হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার জন্য আবেদন করেছিলেন এবং পরিষদের বিভিন্ন কাজে সহযোগিতা করে আসছিলেন। বিভিন্ন অজুহাতে সে লোকজনের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নিলেও বিষয়টি কেউ তাকে অবহিত করেননি। তাই প্রতারনার এসব বিষয় তিনি বিন্দুমাত্রও জানতেন না। তাই তিনি অভিযোগগুলো গুরুত্বসহকারে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য উপজেলা প্রশাসনের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন।

রাজারকুল ইউনিয়ন পরিষদের ২ নং ওয়ার্ডের মেম্বার শামসুল আলম জানিয়েছন, প্রতারনার বিষয়টি সংবাদ মাধ্যমে আসার পর এলাকার আরো অনেক প্রতারনা বিষয়টি তাকে জানিয়েছেন। ঘটনাটি এলাকায় তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। তিনি আরো জানান, নেজাম উদ্দিন প্রকাশ ছলিম উল্লাহ পরিষদের চৌকিদার পরিচয় দিয়ে সরকারি সুযোগ-সুবিধা পাইয়ে দেয়ার আশ^াসে লোকজনের কাছ থেকে বিপুল টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। সম্প্রতি বিষয়টি তিনি জানার পর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দিতে ভুক্তভোগীদের পরামর্শ দেন।

মঙ্গলবার (১৪ জানুয়ারি) উপজেলা নির্বাহী অফিসার প্রণয় চাকমার কাছে ৩টি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন প্রতারনার শিকার রাজারকুল ইউনিয়নের পশ্চিম হালদারকুল এলাকার মৃত শামসুল আলমের স্ত্রী আনোয়ারা বেগম, মৃত মো. জেনারুল হকের স্ত্রী রহিমা খাতুন ও আলী হোছনের স্ত্রী মছুদা বেগম। আগেরদিন সোমবার রামু উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে আরো ৩টি লিখিত অভিযোগ দেন প্রতারনার শিকার মনজুর আলমের স্ত্রী খুরশিদা আকতার ও প্রতিবন্ধী মেয়ে রোজিনা আক্তার, মৃত মো. হোছনের স্ত্রী আনোয়ারা বেগম এবং মৃত আবদুস সোবহানের ছেলে শামশুদ্দৌজা।

কক্সবাজার জেলা আওয়ামীলীগের সহ সভাপতি ও রাজারকুল ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান জাফর আলম চৌধুরী জানিয়েছেন, পরিষদের নামে এ ধরনের ন্যাক্কারজনক প্রতারনার ঘটনা মেনে নেয়া যায়না। এতে এলাকার লোকজন যেমন ভোগান্তির শিকার হয়েছে, তেমনি সরকারের ভাবমূর্তিও চরমভাবে ক্ষুন্ন হচ্ছে। তিনি এসব প্রতারনার ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য প্রশাসনের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন।

রামু উপজেলা নির্বাহী অফিসার প্রণয় চাকমা জানিয়েছেন, নেজাম উদ্দিন প্রকাশ ছলিম উল্লাহর বিরুদ্ধে ভুক্তভোগী একাধিক ব্যক্তি তাঁর কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। এ ব্যাপারে তদন্ত করে দোষি ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এদিকে ইউএনও’র কাছে দেয়া লিখিত অভিযোগে খুরশিদা আকতার ও তার প্রতিবন্ধী মেয়ে রোজিনা আকতার উল্লেখ করেছেন, ২ নং ওয়ার্ডে গ্রাম পুলিশের অস্থায়ী দায়িত্ব পালনকারি নেজাম উদ্দিন প্রকাশ ছলিম উল্লাহ প্রতিবন্ধী রোজিনা আকতারকে ভাতা পাইয়ে দেয়ার আশ^াস দেন। এজন্য ‘স্যারের অফিসে’ দেয়ার অজুহাতে ৫ হাজার টাকা দাবি করেন। বিভিন্ন লোভ-লালসার ফাঁদে ফেলে তার কাছ থেকে দাবিকৃত ৫ হাজার টাকা নিলেও এখনো কোন ভাতা তাকে দেয়া হয়নি। এরআগে ভিজিডি দেয়ার আশ^াসে খুরশিদা আকতারের কাছ থেকে নেন আরো ২ হাজার ১০০ টাকা। অর্থাৎ ভিজিডি ও প্রতিবন্ধী ভাতা দেয়ার আশ^াসে তাদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেন ৭ হাজার ১০০ টাকা। পরবর্তীতে সরকারি সুবিধার কোনটি না পেয়ে তারা এসব টাকা ফেরত চান। তবে ওই কথিত চৌকিদার টাকা ফেরত না দিয়ে উল্টো তাদের বিভিন্ন হুমকী দেন। তাই বাধ্য হয়ে তারা ইউএনও’র কাছে অভিযোগ দিয়েছেন।

বিধবা, হতদরিদ্র আনোয়ারা বেগম অভিযোগ করেছেন, ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে নতুন সেমি পাকা ঘর বরাদ্ধ দেয়ার আশ^াসে তাঁর কাছ থেকে ৬ মাস পূর্বে ৪ হাজার ৩০০ টাকা নিয়েছিলেন চৌকিদার পরিচয়দানকারি নেজাম উদ্দিন প্রকাশ ছলিম উল্লাহ। কোন ঘর দূরের কথা এখন টাকা ফেরত চাইলে উল্টো তাকে হুমকী দিচ্ছে ওই যুবক।

ইউএনও’র কাছে দেয়ার অপর অভিযোগে বয়োবৃদ্ধ শামসুদ্দোজা উল্লেখ করেছেন, ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে নতুন সেমি পাকা ঘর বরাদ্ধ দেয়ার আশ^াসে তাঁর কাছ থেকে ৪ হাজার ৮০০ টাকা নিয়েছিলেন চৌকিদার পরিচয়দানকারি নেজাম উদ্দিন প্রকাশ ছলিম উল্লাহ। ঘর না পেয়ে তিনি টাকা ফেরত চাইলেও দিচ্ছে না। তাই নিরুপায় হয়ে তিনি প্রশাসনের দ্বারস্থ হয়েছেন।

এ ব্যাপারে জানার জন্য অভিযুক্ত যুবক নেজাম উদ্দিন প্রকাশ ছলিম উল্লাহর মোবাইল ফোনে মঙ্গলবার রাতে একাধিকবার কল করা হলেও সংযোগ বন্ধ ছিলো। ফলে তার বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।