আষাঢ়ী পূর্ণিমার স্মৃতিকথা

রুবেল বড়ুয়া:
আষাঢ়ী পূর্ণিমা বৌদ্ধদের অন্যতম সামাজিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। গৌতম বুদ্ধ যেমন নিজ প্রচেষ্টায় জীবনের পূর্ণতা সাধন করে মহাবোধি বা আলোকপ্রাপ্ত হয়েছিলেন এবং জগজ্জ্যোতি বুদ্ধত্বপ্রাপ্ত হন তেমনিভাবে পূর্ণ চন্দ্রের মতো নিজের জীবনকে ঋদ্ধ করাই প্রতিটি বৌদ্ধের প্রচেষ্টা। আষাঢ়ী পূর্ণিমা’র অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে বৌদ্ধরা এই প্রচেষ্টার প্রতি তাদের অঙ্গীকার নবায়ন করে থাকেন। শুধু সাধারণ বৌদ্ধ নয়, ভিক্ষুদের জন্যও আষাঢ়ী পূর্ণিমা বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। বৌদ্ধরা এদিনটিকে সচরাচর শুভ আষাঢ়ী পূর্ণিমা হিসেবে অভিহিত করে থাকেন।

পূর্ণিমাকে কেন্দ্র করেই গৌতম বুদ্ধের জীবনে নানা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। বর্ণিত আছে, আষাঢ়ে পূর্ণিমায় গৌতম বুদ্ধ সিদ্ধার্থরূপে মাতৃগর্ভে প্রবিষ্ট হয়েছিলেন। বর্ণিত আছে কপিলাবস্তু নগরে আষাঢ় মাসের পূর্ণিমা সাড়ম্বরে উদযাপিত হতো। এক আষাঢ়ী পূর্ণিমায় রাজা শুদ্ধোধনের মহিষী রাণী
মহামায়া উপোসথ ব্রত গ্রহণ করলেন। সে রাত্রে রাণী মহামায়া স্বপ্নমগ্না হয়ে দেখলেন যে চারদিক থেকে পাল দেবগণ এসে পালঙ্কসহ তাকে নিয়ে গেল হিমালয়ের পর্বতোপরি এক সমতল ভূমির ওপর। সেখানে মহামায়াকে সুউচ্চ এক মহাশাল বৃক্ষতলে রেখে দেবগণ সশ্রদ্ধ ভঙ্গিমায় এক পাশে দাঁড়িয়ে পড়ল। অত:পর দেবগণের মহিষীরা এসে মায়াদেবীকে হিমালয়ের মানস সরোবরে স্নান করিয়ে দিব্য বসন-ভূষণ ও মাল্যগন্ধে সাজিয়ে দিলেন।

অনতিদূরে একটি শুভ্র রজতপর্বতে ছিল একটি সুবর্ণ প্রাসাদ। চারিদিক থেকে পাল দেবগণ মহারাজা পুনঃপালঙ্কসহ দেবীকে সেই প্রাসাদে নিয়ে গিয়ে দিব্যশয্যায় শুইয়ে দিল। তখন অদূরবর্তী সুবর্ণ পর্বত থেকে এক শ্বেতহস্তী নেমে এসে উত্তরদিক থেকে অগ্রসর হয়ে রজতপর্বতে আরোহণ করলেন। রজত শুভ্রশু একটি শ্বেতপদ্মেররূপ পরিগ্রহ করে কবীবর মহাক্রোষ্ণনাদে সুবর্ণ প্রাসাদে প্রবেশ করলেন। তারপর ধীরে ধীরে তিনবার মাতৃশয্যা প্রদক্ষিণপূর্বক মায়ের শরীরের দক্ষিণ পার্শ্বভেদ করে মাতৃজঠরে প্রবেশ করলেন।

পর দিন প্রত্যুষে রাণী মহামায়া রাজা শুদ্ধোধনকে স্বপ্ন বৃত্তান্ত অবহিত করলেন। কালবিলম্ব না- করে রাজা শুদ্ধোধনকে চৌষট্টিজন জ্যোতির্বিদ এনে স্বপ্নের ফল জানতে চাইলেন। তারা বললেন, “মহারাজ চিন্তা করবেন না, আপনার মহিষী সন্তানসম্ভবা। তিনি এমন এক পুত্ররত্ন লাভ করবেন যার ফলে বসুন্ধরা ধন্য হবে।” জ্যোতিষীর বাণী বৃথা যায়নি।

buddhas-5-disciples copy

আষাঢ় মাসের আরেক পূর্ণিমা রাতে মাত্র ২৯ বৎসর বয়সে তিনি স্ত্রী-পুত্র- রাজ্য সব মায়া ছেড়ে গৃহত্যাগ করেন। গয়ার বোধিদ্রুম মূলে একাধারে ছয় বছর কঠোর তপস্যার পর পরম জ্ঞান “মহাবোধি” লাভ করেন। নবলব্ধ ধর্ম প্রকাশের উদ্দেশ্যে তিনি আরেক আষাঢ়ী পূর্ণিমাতে সারনাথের ঈষিপত্তন মৃগদাবে আগমন করেন। বুদ্ধ আষাঢ়ী পূর্ণিমার রাতে ঈষিপত্তন মৃগদাবে সেই পঞ্চবর্গীয় শিষ্যদেরকে প্রথম ধর্মদেশনা “ধর্মচক্র প্রবর্তন সূত্র” দেশনা করলেন। কৌণ্ডণ্য, বপ্প, ভদ্দীয়, মহানাম ও অশ্বজিত্—এ পঞ্চবর্গীয় শিষ্যদের কাছে তাঁর নবলব্ধ সদ্ধর্মকে প্রকাশ করেন। পরে আরো এক পূর্ণিমা তিথিতে তিনি মাতৃদেবীকে সদ্ধর্ম দেশনার জন্য তাবতিংস স্বর্গে গমন করেন। আষাঢ়ী পূর্ণিমা তিথিতেই বৌদ্ধ ভিক্ষুসংঘ ত্রৈমাসিক বর্ষাব্রত অধিষ্ঠান করেন।সবাইকে শুভ আষাঢ়ী পূর্ণিমার মৈত্রীময় শুভেচ্ছা জানাই। ‘জগতের সকল প্রাণী সুখী হউক’