অতীত ষড়যন্ত্রেরই পুনরাবৃত্তি ভোলায়

এ কে এম শহীদুল হকঃ
ফেসবুক পোস্ট। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত। বিক্ষোভ, মিছিল, প্রতিবাদ, অরাজকতা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আক্রমণ। সংঘর্ষ, অ্যাকশন, গোলাগুলি। নিহত-আহত। একটি মহল এসব ঘটনায় জ্বালানি ঢেলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির সুযোগ গ্রহণ করে হীন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করতে চায়। ২০ অক্টোবর ২০১৯, ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলায় ফেসবুক পোস্টে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার অভিযোগে বিক্ষোভ, পুলিশের ওপর হামলা, আত্মরক্ষার্থে পুলিশের আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার, চারজন নিহত ও শতাধিক আহত হওয়ার ঘটনা অতীতের ধারাবাহিক ঘটনারই নিদর্শন।

বিপ্লব চন্দ্র শুভ নামে এক ব্যক্তির ফেসবুক অ্যাকাউন্টে ধর্মীয় অবমাননার স্ট্যাটাস দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়। এদিকে বিপ্লব আগেই থানায় গিয়ে পুলিশকে জানায়, তার ফেসবুক হ্যাক করা হয়েছে এবং হ্যাকাররা তার কাছে চাঁদা দাবি করছে। এ মর্মে সে থানায় জিডি এন্ট্রি করে। কিন্তু পুলিশ বিপ্লবকে ছাড়েনি। বিপ্লবকে এবং আরও দু’জনকে হ্যাকার সন্দেহে গ্রেফতার করে। তারপরও ‘তৌহিদী জনতা’র ব্যানারে প্রশাসনের অনুমতি ছাড়াই প্রতিবাদ সভা করা হয়। পুলিশ সভা পণ্ড করেনি। শুধু সভা দীর্ঘায়িত না করার অনুরোধ করেছিল। সভার শেষদিকে বিনা উস্কানিতে সভা থেকে এক দল উচ্ছৃঙ্খল যুবক পুলিশের ওপর ইটপাটকেল ছুড়তে থাকে। পুলিশ সভাস্থল সংলগ্ন মসজিদের দোতলায় একটি কক্ষে গিয়ে আশ্রয় নেয়। উচ্ছৃঙ্খল জনতা মসজিদের দোতলায় উঠে পুলিশকে কক্ষ থেকে বের করে আক্রমণ করতে চেষ্টা করে। তারা কক্ষের দরজা শাবল ও অন্যান্য বস্তু দিয়ে ভাঙার চেষ্টা করে। উচ্ছৃঙ্খল যুবকরা অত্যন্ত বেপরোয়া ও মারমুখী ছিল। তাদের আক্রমণে কয়েকজন পুলিশ আহত হয়। একজন বুলেটবিদ্ধ হয়। তাকে ঢাকা সিএমএইচে জরুরি ভিত্তিতে হেলিকপ্টারে স্থানান্তর করা হয়। পুলিশ আত্মরক্ষার্থে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে। গোলাগুলির ঘটনায় চারজন প্রাণ হারায়। পুলিশসহ শতাধিক ব্যক্তি আহত হয়।

এ ঘটনা কেন ঘটল? যার ফেসবুকে ইসলামের অবমাননামূলক স্ট্যাটাস দেওয়া হয়েছিল, সে তো গ্রেপ্তার হয়ে থানাতেই ছিল। তারপরও কেন এত অরাজকতা সৃষ্টি করা? বিপ্লব ফেসবুকে নিজে লিখেছে, না অন্য কেউ হ্যাক করে লিখেছে, তা তদন্তের জন্যই তো তাকে থানা থেকে ছাড়া হয়নি। সে গ্রেপ্তার হয়েছে। মামলা রুজু হচ্ছিল। তারপরও বিক্ষোভকারীরা আর কী চেয়েছিল? তাকে কি মেরে ফেলতে চেয়েছিল? বিচার না করে সঙ্গে সঙ্গে ফাঁসি দিতে চেয়েছিল? ইসলাম কি তা বলে? কেউ খুন করে পুলিশের কাছে এসে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিলে অর্থাৎ সে খুন করেছে- এ কথা স্বীকার করলেও তো তদন্ত ও বিচার ছাড়া তাকে তাৎক্ষণিক ফাঁসি বা সাজা দেওয়া যায় না। আইনেও সে বিধান নেই, ধর্মেও নেই। মামলা করতে হয়; তদন্ত করতে হয়। সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করতে হয়। আদালত বিচারকার্য শেষ করে অভিযোগের পক্ষে সাক্ষ্য-প্রমাণ পেলে তাকে সাজা দিয়ে থাকেন। বিক্ষোভকারীরা কি এটা বোঝেন না? নিশ্চয় বোঝেন। তারা বুঝে-শুনে পরিকল্পিতভাবে ধর্মপ্রাণ সাধারণ মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে এ ধরনের নাশকতামূলক ঘটনা ঘটায় শুধু হীন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য।

ইসলাম শান্তির ধর্ম। ইসলাম বিশৃঙ্খলা, ফ্যাসাদ ও ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি না করার শিক্ষা দেয়, যাতে পৃথিবীতে মনুষ্য সমাজে শান্তি-সম্প্রীতি বজায় থাকে। অথচ এক শ্রেণির আলেম সংকীর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে অরাজকতা সৃষ্টি করেন। এতে তারা ইসলামের হেফাজতের চেয়ে ক্ষতিই করেন বেশি। মহান আল্লাহ, আমাদের প্রিয় নবী ও ইসলামের অবমাননা করে কেউ কিছু বললে বা লিখলে তা কোনোক্রমেই আমরা বরদাশত করব না। শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করব। দেশের প্রচলিত আইনে তাদের বিরুদ্ধে সাজা নিশ্চিত করতে উদ্যোগ নেব; কিন্তু অরাজকতা নয়। ঘটনার সত্যতাও প্রমাণ করতে হবে। সমাজে দুষ্ট লোকের তো অভাব নেই।

অতীতেও একই কায়দায়, একই অভিযোগে ওই বিশেষ মহল এ ধরনের নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটিয়েছিল। ২০১২ সালে কক্সবাজারের রামুতে, ২০১৬ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে এবং ২০১৭ সালে রংপুরে একই কায়দায়, একই অভিযোগে ভিন্নধর্মাবলম্বীদের বাড়িঘর ও উপাসনালয়ে আক্রমণ করে ক্ষতিসাধন ও ভীতিকর পরিবেশের সৃষ্টি করে। রামুতে ১২টি বৌদ্ধ মন্দির এবং বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের অর্ধশতাধিক বাড়িঘর ব্যাপক ভাঙচুর করে। নাসিরনগরে হিন্দু সম্প্রদায়ের ১৯টি মন্দির এবং তিন শতাধিক বসতবাড়ির ক্ষতি করা হয়। রংপুরেও একই কায়দায় হিন্দু সম্প্রদায়ের উপাসনালয়, বসতবাড়িতে হামলা ও আগুন দিয়ে ব্যাপক ধ্বংসলীলা চালানো হয়।

রামুর ঘটনায় অভিযোগ ছিল, এক বৌদ্ধ যুবক তার ফেসবুকে ধর্মীয় অবমাননা করেছে। তদন্তে দেখা যায়, ওই ফেসবুক ভুয়া ছিল। ওটা ওই যুবকের ফেসবুকই নয়। কোনো ষড়যন্ত্রকারী ওই যুবকের নামে ফেসবুক খুলে মিথ্যা তথ্য প্রচার করে সাধারণ মানুষকে উত্তেজিত করে তুলেছিল। নাসিরনগরেও এক জেলে যিনি লেখাপড়া জানেন না, তার নামে ফেসবুক খুলে ধর্ম অবমাননাকর পোস্ট দিয়ে হিন্দুদের মন্দির ও বাড়িঘরে আক্রমণ করে। রংপুরে যে টিটু রায়ের নামে ভুয়া ফেসবুক খুলে ধর্ম অবমাননাকর পোস্ট দিয়ে ধর্মপ্রাণ লোকদের উত্তেজিত করে লঙ্কাকাণ্ড ঘটায়; তদন্তে জানা যায়, ওই টিটু এ সংক্রান্ত কিছুই জানে না। সে একজন খেটে খাওয়া গো-বেচারা লোক। দীর্ঘদিন যাবৎ নারায়ণগঞ্জে থাকে। এলাকার সঙ্গে যোগাযোগ নেই।

২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধাপরাধী দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির আদেশ হলে চাঁদে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ছবি দেখা গেছে- ফেসবুকে এ ধরনের একটি পোস্ট দিয়ে সারাদেশে ব্যাপক ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড চালানো হয়েছিল। বাড়িঘর, দোকানপাট ভাঙচুর ও আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। যানবাহন ভাঙচুরসহ ব্যাপক ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড চালিয়ে বগুড়া, চট্টগ্রাম, সাতক্ষীরাসহ অন্যান্য এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল। এ ঘটনায়ও জামায়াত-শিবির মুখ্য ভূমিকা পালন করে।

২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজতে ইসলাম ঢাকা মহানগরীতে যে তাণ্ডব চালিয়েছিল, তা মনে হলে এখনও গা শিউরে ওঠে। তারা পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ করে অনেককে আহত করেছে। একজন এসআইকে হত্যা করেছে। শান্তিনগরে ট্রাফিক অফিসে আগুন দিয়ে পুলিশকে পুড়িয়ে মারার চেষ্টা চালায়। একজন পুলিশ সদস্য আগুনে পুড়ে মৃতপ্রায় ছিল। প্রধানমন্ত্রী তাকে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসার জন্য প্রেরণ করায় আল্লাহর রহমতে তিনি কোনোরকম বেঁচে আছেন। সংঘর্ষে আরও কয়েকজন নিরীহ ব্যক্তি নিহত হয়। অসংখ্য যানবাহন ভাঙচুর ও আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়। দোকানপাট ধ্বংস করে। আইল্যান্ডের গাছগুলো কেটে ফেলে। অনেক কোরআন শরিফ পুড়িয়ে ফেলে। আওয়ামী লীগ অফিস পুড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা চালায়। পুলিশের বাধা পেয়ে ব্যাপক সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। পরদিন হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব মাওলানা জুনায়েদ বাবু নগরীকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি আদালতে ১৬৪ ধারায় দীর্ঘ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। তার জবানবন্দিতে প্রকাশ পায়, বিএনপি-জামায়াতপন্থি মাওলানারা বিএনপি-জামায়াতের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের পরিকল্পনা মোতাবেক তাণ্ডব চালিয়েছিল। তাদের কথাতেই শাপলা চত্বরে অবস্থান অব্যাহত রেখেছিল। পরদিন বিএনপি-জামায়াত তাদের সঙ্গে এক হয়ে সরকারের পতন ঘটাতে চেয়েছিল। বাবুনগরী স্বীকার করেছিলেন, ওই আন্দোলন বিএনপি-জামায়াতপন্থি আলেমদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। তাদের কথায় তিনি নিজেও উস্কানিমূলক বক্তব্য দিয়েছিলেন।

রাতে অবস্থানকারীদের শাপলা চত্বর থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। সে অভিযানে একটি লোকেরও প্রাণহানি হয়নি। অথচ মিথ্যাচার করা হয়েছিল- শত শত লোক মারা গেছে। আমি সংবাদ সম্মেলন করে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিলাম এই বলে- অবস্থানকারীদের তাড়িয়ে দেওয়ার সময় একটি লোকও মারা যায়নি। পুলিশ কোনো আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করেনি। সাউন্ডগান ব্যবহার করে তাদেরকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। ওই দিন হেফাজত পুলিশের সঙ্গে ওয়াদা ভঙ্গ করে শাপলা চত্বরে তাদের অবস্থান অব্যাহত রেখেছিল।

২০১২ সালে রামু, ২০১৬ সালে নাসিরনগর, ২০১৭ সালে রংপুর এবং ২০১৩ সালে দেশব্যাপী যে ধ্বংসলীলা চালানো হয়েছিল, তা ছিল জামায়াত-শিবির ও বিএনপির পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র। ভালোমন্দ না বুঝে হুজুগে রামু ও নাসিরনগরের ঘটনায় কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীও জড়িত ছিল। এ দেশের সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটিয়ে সরকার পতনের আন্দোলন জোরদার করার লক্ষ্য নিয়েই এ ষড়যন্ত্র করা হয়েছিল।

প্রতিটি ঘটনায় পুলিশ একাধিক মামলা করেছে। তদন্ত শেষে অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, কোনো মামলারই বিচারকার্য সম্পন্ন হয়নি। বিচারের মাধ্যমে দোষীদের সাজা দেওয়া সম্ভব হলে হয়তো এ ধরনের ষড়যন্ত্রের প্রবণতা হ্রাস পেত বলে অনেকের ধারণা।

সরকার বাংলাদেশকে ডিজিটালাইজ করেছে দেশ ও জনগণের কল্যাণে। অথচ তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করেই একটি মহল সরকারের বিরুদ্ধে নানারকম মিথ্যা প্রচারণা ও ষড়যন্ত্র অব্যাহত রেখেছে। একটির পর একটি ঘটনা ঘটিয়ে যাচ্ছে। মনুষ্যত্ব ও বিবেকসম্পন্ন কোনো ব্যক্তি এহেন জঘন্য কাজ করতে পারে না। যারা করে তাদের হৃদয়ে বিবেক, মনুষ্যত্ব ও নৈতিকতার দ্বার রুদ্ধ হয়ে গেছে। তারা দেশ ও জনগণের শত্রুতে পরিণত হয়েছে। কাজেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা ও সাধারণ জনগণকে তাদের ব্যাপারে সর্বদা অত্যন্ত সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

সাবেক ইন্সপেক্টর জেনারেল, বাংলাদেশ পুলিশ

সূত্রঃ সমকাল