ছুটি

নঈম আল ইস্পাহান:
আবিদের সাথে দেখা করতে তার রুমে গেলাম।বিছানায় মানিব্যাগ পড়ে থাকতে দেখে মানিব্যাগ চ্যাক করে দেখলাম ছয়শ ষাট টাকা আছে।আমি ষাট টাকা নিজের পকেটে নিয়ে ভদ্র ছেলের মত বসে রইলাম।আবিদ আসল।এসেই আমার দিকে সন্দেহের চোখে তাকিয়ে তার মানিব্যাগ চ্যাক করে বলল,এখন দিয়ে দে?আমি বললাম,কী দিব?সে বলল,দশ টাকার একটা নোট ছিল।সেটা দিয়ে দে।আমি বললাম,কী?আমি চুরি করেছি?ছি!তাও আবার দশ টাকা?

আবিদ কে বললাম,বীচে যাবি?সে এক বাক্যে রাজি হয়ে গেল।কিন্তু,টাকা নেই।তাকে বললাম,মাত্র একশ টাকা খরচ হবে।সে বলল,পঞ্চাশ টাকা আছে।আমি বললাম,সে পঞ্চাশ আমাকে দিয়ে দে।আসা,যাওয়ার সব খরচা আমার।আবিদ আমাকে পঞ্চাশ টাকার নোটটি ধরিয়ে দিল।সাথে আরো কয়েকজন কে নিয়ে যাব কিনা জানতে চাওয়াতে আসে বাধা।না,থাক।তোর আমার মধ্যে অন্য কাউকে সাথে নেয়ার দরকার টা কী?আমি বললাম,দাঁড়া।কয়েকজনের সাথে মজা করি।সৌরভ,সরোয়ার,সহীদ মামা,এক বড়ভাইকে কল দিয়ে বললাম,আপনার বেকার সময় কাটানোর জন্য একটা অফার আছে।তারা সবাই বলল,কী?আমি বললাম,চলেন বীচে যাই।সৌরভ,সরোয়ার,সহীদ মামা বলল,তারা ব্যস্ত টিউশনির কারণে।বড় ভাই টি বলল,ইন্টারেস্ট নেই।কারণ,বেকার সময় বলাতে তিনি মাইন্ড করেছেন।অনেকদিন বেকার থাকার পর মাত্র গতকাল থেকে তিনি চাকরি জীবনে পদার্পণ করেছেন।
1280962

টমটমে উঠলাম।গাড়িওয়ালা পাঁচ টাকার ভাঁড়া দশ টাকা দাবি করল।মাথার চান্দি গরম হয়ে গেল।এমনিতে বাজেট কম।সেখানে আবার,গাড়ি ভাড়া বেড়ে গেল।গাড়ি থেকে নেমে গাড়িওয়ালা কে একটি একশত টাকার নোট দিলাম দুজনের ভাড়া নেয়ার জন্য।গাড়িওয়ালা একজনের ভাঁড়া নিয়ে আমাকে নব্বই টাকা ফেরৎ দিল।মানে সে ভুলে পুরাতন হিসেবে পাঁচ টাকা করে ভাঁড়া নিয়েছে।আমি মাইন্ড করলাম না।তাই,তাকে দশ টাকা ফেরৎ দেয়নি।

কক্সবাজার যেতে বাসে উঠতে হবে।কক্সলাইনে উঠলে দাঁড়িয়ে যেতে হবে একজনকে বিশ টাকা ভাঁড়া দিয়ে।চকরিয়া লাইনে গেলে দুজন বিশ টাকায়।আমরা চকরিয়া লাইনে উঠলাম।ভাঁড়া পে করলাম দুজনের দশ টাকা।এসিস্টেন্ট রেগে আগুন।সে বলল,দুজন বিশ টাকা দেন।দশ টাকা ভাঁড়া কোন আক্কেলে দেন।আমি ও রেগে আগুন।কলেজে যাওয়ার সময় আমরা দুজন দশ টাকা করেই যায়।মনে মনে বললাম,মামা কলেজ ড্রেস থাকলে তোরে দেখাতাম!

বাজারঘাটা নেমেই আবিদ সোজা এসআলম কাউন্টারে টিকেট কাটতে গেল।দুইশ পঞ্চাশ টাকায় টিকেট কেটে সে আমাকে আবার পঞ্চাশ টাকা দিল।আমি তো খুশিতে আটখানা!

আমরা দুজন আবার হাঁটতে শুরু করলাম।সে বলল,আমরা কেন হাঁটছি?আমি বললাম,বাজেট কম।তাই,হাঁটছি।সে বলল,ভাই ফইন্নিগিরি করিস না।দয়া করে গাড়ি নে।আমি একজন রিকশাচালক কে ইশারা করলাম।বললাম,কবিতা চত্বর যাবা?সে বলল,কোথায়?আমি বললাম,মহিলা মাদ্রাসার রোড টা দিয়ে যেতে হবে।সে বলল,বিশ টাকা।আমি বললাম,পনের টাকা।সে বলল,বিশ টাকা।আমরা হাঁটা শুরু করলাম।রিকশাচালক ডাক দিল।সে রাজি পনের টাকাতে।

এই রোডটিতে প্রচুর পরিমাণে বাংলা সিনেমার শুটিং হয়।বিশেষ করে বাংলাদেশে বদিউল আলম খোকন নামের একজন আবুল মার্কা ডিরেক্টর আছে।যিনি তার প্রায় ছবির শুট্যিং এই রোডটাতেই সেরে ফেলে।কবিতা চত্বর পৌছে রিকশাচালক কে পনের টাকার বদলে বিশ টাকা দিলাম।দর করতে ইদানিং ভাল লাগে।কিন্তু,রিকশাচালক কে কম দিতে ভাল লাগেনা।আমরা কবিতা চত্বর দিয়ে বীচে নামলাম।সাগরে তখন জোয়ার চলছে।চর বলতে কিছু নেই।সব পানিতে একাকার।আবিদ,আমি দুজনে সাগরের জলে পা ভিঁজালাম।ছবি তোললাম অনেকগুলো।একটি ভিডিও করেছি।ভিডিও চলাকালীন আবিদ আমাকে গালি দিয়েছে।কিন্তু,দুর্ভাগ্যবশত ভিডিও টিতে সাউন্ড রেকর্ড হয়নি।

বীচে ষাট ভাগ মানুষ স্থানীয়।মানে কক্সবাজারের।বাকিসব বাইরের।আমরা তাদেরই কীর্তিকলাপ খেয়াল করছিলাম।গতকাল অনেকগুলো জুটিকে আমরা খেয়াল করেছি।তন্মধ্যে কয়েকটা জুটির কথা বলব।একটা জুটিকে খেয়াল করলাম,ছেলেটি অনেক মোটা।মেয়েটির হাড্ডি মার্কা।দুজনে পাবলিক প্লেসে কত ঢং যে করছিল।যেন,সাগর পাড় তাদের বেডরুম।কেউ দেখছেনা।আরেকটা জুটিকে দেখলাম,মেয়েটি খুব মোটা।ছেলেটি হাড্ডি মার্কা।আমরা তাদের দেখে শিখলাম,যা পেয়েছো তাতেই এডজাষ্ট করে নাও।সুখি হবে!

আরেকটা জুটিকে দেখলাম।ছেলেটি সুন্দর।মেয়েটি খুব বিশ্রী।তাদের থেকে আমরা শিখলাম,প্রেমের চাইতে এ্যারেন্জ ম্যারেজ উত্তম।যদি রুচি খারাপ হয়!

ঝাল মুড়ি খেতে মন চাইল।কিন্তু,কোন ঝালমুড়ি বিক্রেতা পাঁচ টাকায় ঝালমুড়ি দিবেনা।সবাই দশ টাকা করে ফেলছে।একজন কে বললাম,ঈদ উপলক্ষ্যে দাম বাড়িয়ে ফেলেছো তাইনা?সে হেসে বলল,হ্যাঁ।আমরা কোথাও পাঁচ টাকায় না পেয়ে অবশেষে দশ টাকায় খেতে রাজি হলাম।শর্ত,প্রচুর মরিচ দিতে হবে।যেন,টাকাটা কোন রকম উসূল হয়।দুজনে একটিতে কাজ সারলাম।ঝালমুড়ি ওয়ালা দুটো দিতে চেয়েছিল।আমি বললাম,না বাছাধন।লুঠের টাকা না এসব।একটা দাও।টেষ্ট করে দেখি।খাওয়া শেষে ঝালে জিহবার অবস্থা খারাপ।আশে পাশে পানি নেই।যা আছে তা পনের টাকার পানি বীচে ভ্রমণ করেছে তাই ত্রিশ টাকায় বিক্রি হবে।আমরা সাগরের লোনাজলে কুলি করে কোনরকম ঝাল টা কমালাম।

এরপর,আবিদ কে ফুচকা খাওয়ালাম।তবে সেটাও দুজনে এক প্লেটে খেলাম।যদি মজা না হয়?তখন বেশি টাকা গচ্ছা যাবে।আসলেই ফুচকা ভাল ছিলনা।আমরা একটি নিয়ে জিতেছি।

কবিতা চত্বর থেকে হেঁটে হেঁটে লাবণী পয়েন্ট চলে এসেছি।এখানে জনকোলাহল একটু বেশি।লোকজন জোয়ার মানছেনা।সাঁতার কাটছে।জুটিরা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে ব্যাচেলরদের মনে বার,বার ঘূর্ণিঝড় রোয়াণুর মত আঘাত হানছে।ব্যাচেলররাও জুটিদের রোমান্স দেখে হা করে তাকিয়ে আছে।আমরা দুজনে ব্যাচেলর।সেহেতু আমরা বাদ যায় কিভাবে?আরেকটা জুটিকে কবিতা চত্বরে দেখেছিলাম।তাদের লাবণী পয়েন্ট ও দেখতে পেলাম।দুজন কানের কাছে মোবাইল নিয়ে কীসব শোনছে।মানুষজন কে কী ভাবছে তারা তা কেয়ার করছেনা।

আমরা লাবণী পয়েন্ট থেকে গাড়িতে উঠলাম না।কারণ এখান থেকে উঠলে দশটাকার ভাঁড়া পঁচিশ টাকা নিবে।তাই পুনরায় কবিতা চত্বর চলে আসলাম।কবিতা চত্বরে কোন রিকশা নেই।হেঁটে,হেঁটে মেইন রোড চলে এলাম।সেখান থেকে রিকশায় পনেরো টাকা দর করে বার্মিজ মার্কেটে প্রাইডের শো-রুমে যাব।রিকশা ভাঁড়া আবার পনেরোর জায়গায় বিশ টাকা দিলাম।প্রাইডের শো-রুম বন্ধ।আম্মুর জন্য আজ ও শাড়ি কেনা হলোনা।

আবিদ নাস্তা খেতে চাইল।চিকেন ফ্রাই খাব ঠিক করেছিলাম।লাবণী পয়েন্টের কোন রেষ্টুরেন্টে খেলে দাম পড়বে দেড়শ থেকে দুশত টাকা।একই চিকেন বাজারঘাটা পাঁচ টাকা গাড়ি ভাঁড়া দিয়ে এসে খেলে ষাট বা সত্তর টাকা।

খাওয়া শেষে বাস পায়নি তাই মাহিনদ্রাতে করে তেচ্ছিপুল চলে আসলাম।তেচ্ছিপুলে সরোয়ার,নঈম মাহমুদ সিদ্দিকি ভাইয়ের সাথে দেখা হল।তার পর পাঁচ টাকার ভাঁড়া দশ টাকা দিয়ে বাড়ির পথে রওয়ানা দিলাম।ঝড়-বৃষ্টির দিনে আমরা দুই বন্ধু অসাধারণ একটি সময় কাটালাম।প্রতিটি মূহুর্ত ছিল মনে রাখার মত।আবিদের সাথে বছরের দুইটি ঈদের সময়ে দেখা হয়।সারা বছর দেখা হয়না।তাই ঈদের সময়গুলো আমরা একটু স্পেশাল ভাবে কাটাই।আমরা বাড়িতে ফিরেছি রাতে দশটায়।তবে আমার বাড়িতে না।আবিদের বাড়িতে।সারারাত আড্ডা হয়েছে।কারণ,পরেরদিন সে চট্রগ্রাম চলে যাবে।আবার হয়তোবা দেখা হবে ঈদুল আযহার ছুটিতে।