গৃহকর্মী সুরক্ষা: আইন হওয়া দূরের কথা, প্রয়োজন নিয়েই দ্বিধা!

অনলাইন ডেস্কঃ
নীতিমালা গ্রহণের চার বছরেও আইনে রূপান্তর করা যায়নি ‘গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতিমালা’। মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, একের পর এক গৃহকর্মী নির্যাতনের ঘটনায় বিচারহীনতা, বেতন ঠিক না থাকা, ন্যূনতম অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে না পারার ঘটনা যেমন আছে, আইন না থাকায় তেমনই অনেক ক্ষেত্রে হেনস্তা হতে হয় গৃহকর্তাকেও।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সমাজের প্রয়োজনের ওপর নির্ভর করে আইন প্রণীত হয়। গৃহকর্মীরা যেখানে শ্রমিকের মর্যাদা পায়নি, সেখানে অধিকার চেয়ে প্রশ্ন তোলার জায়গা কোথায়? আর শ্রম মন্ত্রনালয় বলছে, ২০১৩ সালে সংঘটিত রানা প্লাজা দুর্ঘটনা নিয়ে ব্যস্ত থাকায় নীতিমালা নিয়ে কাজ বেশি এগোয়নি। নীতিমালায় যা যা করণীয় উল্লেখ আছে, তার ব্যত্যয় ঘটলে বিদ্যমান অন্য আইনে ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। তবে তারা নতুন আইন নিয়ে খুব বেশি উৎসাহী নয়।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাব বলছে, ২০১৫ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ১৬৪টি নির্যাতনের ঘটনা ঘটলেও এর অর্ধেকেরও কম সংখ্যক ঘটনায় বিভিন্ন থানায় নির্যাতন ও অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ তথ্য মতে, ৫০ ভাগ গৃহপরিচারিকা ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার। তাদের ৬০ শতাংশই শিশু।

২০১৪ সালে বিচারপতি সালমা মাসুদ ও বিচারপতি হাবিবুল গণির সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের বেঞ্চ গৃহকর্মীদের নিরাপত্তা ও অধিকার সংক্রান্ত পলিসি এবং শিশুশ্রম নীতিমালা কার্যকর করতে প্রয়োজনীয় আইন তৈরির পদক্ষেপ নিতে নিষ্ক্রিয়তাকে কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চান। বাংলাদেশে গৃহকর্মীদের অধিকার এবং সুরক্ষার জন্য আইন প্রণয়নে পদক্ষেপ নিতে সরকারকে নির্দেশও দেন আদালত। পরবর্তীতে মাতৃত্বকালীন ছুটি ১৬ সপ্তাহের বিধান রেখে ২০১৫ সালে গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতিমালা আইন অনুমোদন দেয় মন্ত্রিসভা।

নীতিমালায় গৃহকর্মীদের সুবিধার জন্য হেলপ লাইন চালুসহ ১৪ বছরের নিচে কাউকে গৃহকর্মী নিয়োগ দেওয়া যাবে না, তাদের শ্রমঘণ্টা এবং বেতন আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে ঠিক করার মতো অধিকার নিশ্চিতের কথা বলা হয়। নীতিমালা অনুমোদন পাওয়ায় শ্রম আইন অনুযায়ী গৃহকর্মীরা বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার কথা। নীতিমালায় গৃহকর্মীদের বিশ্রামের পাশাপাশি বিনোদনের সময় দেওয়ারও কথাও বলা আছে। গৃহকর্মীদের নির্যাতন করলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী সরকার ব্যবস্থা নেবে।

নীতিমালা থাকলেও আইন না থাকায় এর প্রয়োগটা যথাযথভাবে হচ্ছে না বলে মনে করেন গৃহকর্মী সুরক্ষা ও অধিকার নিয়ে সোচ্চার বাংলাদেশ নারী সাংবাদিক কেন্দ্রের সভাপতি নাসিমুন আরা হক মিনু। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আইন হলে এটি প্রয়োগের জন্য সরকারকে চাপ দেওয়া যায়। গৃহকর্মীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার বিষয়টি আমাদের পারসেপশনের জন্যই খুব সহজ হওয়ার কথা নয়। সমাজ তাদের যেভাবে দেখে বা দেখতে চায়, সেখান থেকে বের হয়ে অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি নিয়ে হাজির হওয়ার মতো সংগঠিত তারা নন। ফলে বর্তমানে আইনের পশাপাশি জরুরি দরকার তাদের নিবন্ধন। নিবন্ধন হলে গৃহকর্মী ও গৃহকর্তা উভয়ই উপকৃত হবেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘আইন করার বিষয়ে এক ধরনের অবহেলা আছে বলে আমার মনে হয়েছে।’

অন্য অনেক কাজের মধ্যে এই নীতিমালাটি নিয়ে কাজ অনেকটা কম হয়েছে বলে মনে করেন শ্রম মন্ত্রণালয়ের উপসচিব (রফতানিমুখী শিল্প অধিশাখা) মো. রুহুল আমিন। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘নীতিমালা থেকেই অনেক কিছু করার আছে। সেগুলো সব করা সম্ভব হয়নি। আইন তো হয় সমাজের প্রয়োজনে। এখন দেখতে হবে গৃহকর্মীদের জন্য আসলে সমাজ কতটা প্রয়োজন মনে করছে।’

এতদিনেও কেন আইন করতে উদ্যোগ নেওয়া হয়নি প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমরা ২০১৩ থেকে গার্মেন্টস নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। ২০১৫ সালে নীতিমালা হলেও নজর দেওয়া হয়নি। তবে শিশুরা গৃহকর্মী হলে সেসব ক্ষেত্রে করণীয়সহ বেশকিছু বিষয় আমরা চাইলেই বাস্তবায়নের দিকে যেতে পারি। নীতিমালা নিয়ে বেশকিছু সভাও হয়েছে। কিন্তু আইন যে দরকার এমন কোনও সিদ্ধান্ত হয়নি।’

অতিরিক্ত সচিব (শ্রম অনুবিভাগ) রেজাউল হক বলেন, ‘এই আইনের বিষয়টি এখনও আলোচনার মধ্যে আছে। আমাদের দেশে গৃহকর্মী সুরক্ষার বিষয়টি ছিল না, সেটি প্রতিষ্ঠিত করা জরুরি। বিভিন্ন সভা ও সেমিনার থেকে আইনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সুপারিশ আসছে। আগামীতে সেগুলো বিবেচনায় নিয়ে একটি সিদ্ধান্তে আসা হবে।’ কোনও বিষয়ে আইন প্রয়োজন হলে প্রাথমিক টুলস হিসেবে নীতিমালা আনা হয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘গৃহকর্মীর শ্রম স্বীকৃত ছিল না। নীতিমালার মাধ্যমে সেটা হয়েছে। কিন্তু সেটি না মানলে কী হবে— এই প্রশ্নের জবাব পেতে আইন দরকার হয়। এখনও তেমনকিছু ঘটেনি।’

আইনে সরকারের অনীহা আছে উল্লেখ করে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন বলেন, ‘গৃহ শ্রমিকরা সংগঠিত নয় এবং ঘরে ঘরে আইনের প্রয়োগ করতে গেলে প্রতিরোধের মুখে পড়তে হতে পারে। এই শঙ্কা থেকে বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে না। গৃহ শ্রমিকদের বিষয়ে আমরা যে মানসিকতা পোষণ করি তাতে করে নতুন কিছু করা বেশ চ্যালেঞ্জিং।’

সূত্রঃ বাংলা ট্রিবিউন