কমান্ডো স্টাইলে ৫ দিনে ৪ খুন, আহত শতাধিক: মহেশখালীতে আইনশৃংঙ্খলা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি

এ.এম হোবাইব সজীব:
কক্সবাজারের মহেশখালীতে সার্বিক আইনশৃংঙ্খলা পরিস্থিতি মারাত্ম অবনতি ঘটেছে। উপজেলার সর্বত্র হত্যা, গুম,দাঙ্গা-হাঙ্গামা ডাকাতি এবং বিচার বহির্ভূত সন্ত্রাস ও অপরাধমূলক কর্মকান্ড আশংকাজনকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে।

এমন দিন নেই যে মহেশখালীতে কোথা ও না কোথাও একটা না একটা সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটছে না। এতে জনমনে মারাত্মক নিরাপত্তাহীনতা দেখা দিয়েছে। তাই বলা যায় গুম, খুন দাঙ্গা-হাঙ্গামা সন্ত্রাসী কার্যক্রমের ক্ষেত্রে ফটিকছড়ি, লক্ষীপুরের চেয়ে মহেশখালী একেবারেই পিছিয়ে নেই।

জানা গেছে, চলতি মাসে ৫ দিনের ব্যবধানে ৪ জন খুন হয়েছে। সমানতালে ডাকাতি, অপহরণ, মাদক, ছিনতাই, চাঁদাবাজি অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার বেড়ে গেছে বহুগুণ। চলতি মাসে কোন ভাবে থামছেনা দাঙ্গা-হাঙ্গামা আর খুনের ঘটনাও। মানুষ খুন, উধা ও আহত হচ্ছে। লাপাত্তা হয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি যে ঘটনা গুলো ঘটছে তার বেশির ভাগই বিচ্ছিন্ন ও ব্যক্তিগত পর্যায়ের এমন কথা ও শোনা যাচ্ছে।

জানা গেছে, মহেশখালী থানার পুলিশ নিজের আখের গোছানোর কাজে তৎপর থাকায় কিছুতেই রোধ হচ্ছে না ডাকাতি, চাঁদাবাজি দাঙ্গা-হাঙ্গামা, মাদকের চালান কিংবা হত্যার ঘটনা। এতে আতংকিত হয়ে পড়েছে দেশের সাধারণ মানুষ। বিভিন্ন ইউনিয়নে অপরাধ ঘটছে বেশি। ছোট-খাটেও ব্যবসা থেকে শুরু করে নিজ এলাকায় ঘর বাঁধতে এখন চাঁদা দিতে হচ্ছে।

অনুসন্ধান চালিয়ে দেখা গেছে, চলতি মাসে খুন হয়েছে ৪ জন আহত হয়েছে শতাধিক। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের পরিসংখ্যান মতে, গত ৩ জুলাই রাত ১০টার দিকে উপজেলার কুতুবজোম ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সোনাদিয়া ওয়ার্ডের চারবারের নির্বাচিত মেম্বার আব্দুল গফুর ওরফে নাগু মেম্বারকে গুলি ও কুপিয়ে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। নাগু মেম্বার খুনের ১২ ঘন্টা পার না হতেই ৪ জুলাই বেলা ১০টার দিকে একই ইউনিয়নের প্রবাসী শহিদুল্লাহ (২৯) গুলি ও ধারালো অস্ত্রের আঘাতে খুনের শিকার হয়েছেন। তিনি কুতুবজোম ইউনিয়নের কামিতাপাড়া গ্রামের মো. জহিরুল ইসলাম খলিলের ছেলে।

অপরদিকে শাপলাপুর জেমঘাট নয়াপাড়া এলাকার নুরুল আলমের পুত্র লোকমান হোসেন (৩৫) মোটর সাইকেল যোগে বদরখালী থেকে বাড়ি আসার পথে রাত ১১ টায় একই ইউনিয়নের ষাইটমারা -জেমঘাট মধ্যবর্তীস্থান গলাছিরা ব্রীজে পৌঁছলে একদল দুর্বৃত্ত প্রথম পিছন থেকে গুলি করে মোটর সাইকেল থেকে মাটিতে পেলে দেওয়ার পর কুপিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর চলে যায়।

১০ জুলাই রবিবার রাত ১১ টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। পুলিশ জানায়, পৃথক ঘটনায় কালারমারছড়া দুই ডাকাত দলের মধ্যে বন্দুকযুদ্ধে এক ডাকাত নিহত ও অস্ত্র গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। কালারমারছড়া মাঝের পাড়া পাহাড়ী এলাকায় স্থানীয় বিবাদমান দুই ডাকাতদল ফরিদুল আলম ও আরোকটি ডাকাত গ্রুপের মধ্যে বন্দুক যুদ্ধের ঘটনা ঘটে। নিহত ফরিদুল আলম (৪০) কালারমারছড়া মাঝের পাড়া গ্রামের বদিউল আলমের ছেলে। রোববার দিবাগত রাত সাড়ে ৪ টার দিকে মাঝের পাড়া পাহাড়ী এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। এ ব্যাপারে পরস্পর বিরোধী বক্তব্য পাওয়া গেছে।

অপরদিকে ফরিদুল আলমের ভাই মনির আহমদ জানান, ঘটনা ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে দুই বিবদামান ডাকাত গ্রুপের মধ্যে বন্দুক যুদ্ধের ঘটনায় আমার ভাই মারা যায় বলে পুলিশ বিভিন্ন গণমাধ্যমে জানায়। মুলত পুলিশ আটক করে বন্দুক যুদ্ধের ঘটনা সাজিয়ে আমার ভাই ফরিদকে গুলিবিদ্ধ করে নিহত করে। কিন্তু পুলিশ বলছে অপর পক্ষ ডাকাতের গুলিতে ফরিদ মারা গেছে। ফরিদ হত্যার ঘটনায় মঙ্গলবার রাতে মহেশখালী থানায় মামলা দায়ের করেছে পুলিশ। ১৪ জনের নাম উল্লোখ করে আরো ৮/১০ জনকে অজ্ঞাত আসামী করে মামলা দায়ের করে। উক্ত মামলায় কালারমারছড়া উত্তরনলবিলা মাঝের পাড়ার শফিউল আলমের পুত্র জমির উদ্দিনকে হয়রানী মূলক আসামী করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন তার পরিবার। নাগু মেম্বারকে হত্যার প্রধান আসামী বতইল্ল্যা ও বামাইয়া ইলিয়াছ ১৪ জুলাই বৃহস্পতিবার ভোর রাত ৮ টার দিকে টেকনাফে দুই বাহিনীর মধ্যে বন্দুক যুদ্ধে তার মারা যায় বলে পুলিশ জানায়।

অপরদিকে কালারমারছড়া জায়গা জমির মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় দখল-বেধখলকে কেন্দ্র করে নিত্য দিন চলছে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা। এসব ঘটনায় রাজনৈতিক দলের ক্যাডারা অবৈধ অস্ত্র ব্যবহার করে থাকে বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সাধারণ লোকজন জানান। এসব অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের প্রয়োজন মনে করছে এলাকাবাসী। ঢুকছে ইয়াবা, মাদক গাঁজার বড় বড় চালান। উঠতি বয়সের যুবকেরা এসব মাদক দ্রব্য সেবন করায়, চুরি ডাকাতি, দাঙ্গা-হাঙ্গামা,অপহরণ, ধর্ষনের মত ঘটনায় বৃদ্ধি পাওয়ায় আইনশৃংখলার চরম অবনতি ঘটছে।

এমনকি এলাকায় আতংক ছড়াতে কোন না কোন দিন ডাকাতও সন্ত্রাসীরা ফাঁকা গুলি ছুড়ে জানান দিচ্ছে তাদের আধিপত্য। যার কারণে উপজেলার কয়েক লাখ মানুষ চরম নিরাপত্তার হুমকিতে আছে বলে জানা গেছে। জনশ্রুতি আছে, উপজেলার কুতুবজোম, বড় মহেশখালী, হোয়ানক, কালারমারছড়া, ধলঘাট এলাকায় আধিপাত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে চলে রক্তক্ষয়ী সংর্ঘষ।

তথ্যানুসন্ধানে দেখা যায়, বিভিন্ন খুনের মামলায় দাগী আসামী, অস্ত্রও মাদক ব্যবসায়ীর স্বর্গরাজ্য এখন মহেশখালী দ্বীপ। দেখা গেছে, এই দ্বীপের বেশি ভাগ জায়গা পাহাড়ী এলাকা হওয়ায় সন্ত্রাসীরা সন্ত্রাসী কার্যক্রম ঘটিয়ে সহজে গা ঢাকা দেয়। কালারমারছড়া- মাতারবাড়ী সংযোগ সড়কে এবং শাপলাপুর সড়কে ডাকাতি ঘটছে প্রায় সময়। দ্বীপের চার পাশ্বে সাগর হওয়ায় আনোয়াসে মরণ নেশা ইয়াবা,হোরোইন, গাঁজা,ও বিভিন্ন দেশী বিদেশী মাদক দ্রব্য সাগর এবং স্থল পথ দিয়ে ঢুকে পড়ছে এই দ্বীপে। যার কারণে উঠতি বয়সের তরুনরা মাদক দ্রব্য সেবন করায় চুরি, ডাকাতি রাহজানি, অপহরণ, ধর্ষন দাঙ্গা-হাঙ্গামা লিপ্ত হওয়ায় আইনশৃংখলার চরম অবনতি ঘটছে চারদিকে।

স্থানীয় লোকজন জানান, ৫ দিনের ব্যবধানে ৪ জন জ্যান্ত মানুষ খুন হলে বতইল্ল্যা বন্দুক যুদ্ধে নিহত হলে পুলিশ এ পর্যন্ত এজাহার নামীয় কোন গডফাদার ও সন্ত্রাসীদেরকে আটক করতে পারেনি। উল্টো সাধারণ মানুষকে গ্রেফতার করে টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে। তাই পুলিশের প্রতি বিশ্বাস হারিয়ে ফেলছে এ দ্বীপের সাধারণ মানুষ।

মহেশখালী থানার ওসি বাবুল চন্দ্র বণিক বলেন, সন্ত্রাসীরা কোথাও মাথাচড়া দিয়ে উঠতে না পারে সে জন্য পুলিশি টহল জোরদার রাখা হয়েছে। তিনি আরো ও জানান, পুলিশের অজান্তে ছোট-খাটো ও ঘটনা ঘটতে পারে, বড় ধরনের সহিংসহতা যেন না হতে পারে সে জন্য সন্ত্রাসীদের কঠোর হস্তে দমন করার জন্য অভিযান চালানো হচ্ছে।