বঙ্গবন্ধু কেন এখন আরও প্রাসঙ্গিক

আবদুল মান্নানঃ
আমি নিজেকে অনেক সৌভাগ্যবান মনে করি। কারণ আমার মতো নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নেওয়া একজন মানুষের জীবনে এতদূর উঠে আসা ভাগ্যের ব্যাপার। সেটা সম্ভব হয়েছিল বাংলা নামে এই দেশটা স্বাধীন হয়েছিল বলে। নিজেকে আরও সৌভাগ্যবান মনে করি, কারণ আমার তারুণ্যে সুযোগ হয়েছিল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের মতো একজন মহান নেতার নেতৃত্বের সাক্ষী হওয়া, তাঁর বক্তৃতা শোনা। আমার প্রজন্ম বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বেই দেশ স্বাধীন করতে যুদ্ধে গিয়েছিল। আমার অনেক বন্ধু আর সহপাঠী সেই যুদ্ধ শেষে স্বাধীন দেশে আর ফিরে আসেনি। তারা ৩০ লাখ শহীদের কাতারে শামিল হয়েছিল। গত কয়েক দিনের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে হঠাৎ স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে জাতির পিতার দেওয়া একটি বক্তৃতার অংশবিশেষ মনে পড়ছে। তাঁর ওই বক্তৃতাটি তিনি বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যানেই দিয়েছিলেন। ১৯৭৫ সালের ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবসে এই উদ্যানে তিনি এক দীর্ঘ বক্তৃতা দিয়েছিলেন। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে দেওয়া এটাই ছিল তাঁর শেষ বক্তৃতা। এই মুহূর্তে তাঁর সেই বক্তৃতার অংশবিশেষ খুবই প্রাসঙ্গিক। সেই বক্তৃতায় তিনি দেশের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী তথা আমলাদের উদ্দেশে কিছু রূঢ় বাস্তব প্রসঙ্গ উল্লেখ করেছিলেন।

তিনি তাঁর চিরাচরিত গোপালগঞ্জের দেহাতি ভাষায় বলেছিলেন, ‘আপনি চাকুরি করেন, আপনার মাইনা দেয় ওই গরিব কৃষক, আপনার মাইনা দেয় ওই গরিব শ্রমিক, আপনার সংসার চলে ওই টাকায়, আমি গাড়ি চড়ি ওই টাকায়,..ওদের সম্মান করে কথা বলেন, ওদের ইজ্জত করে কথা বলেন, ওরাই মালিক, … এই বেটা কোত্তেকে আসলি? সরকারি কর্মচারিকে বলবো, মনে রেখো- এটা স্বাধীন দেশ; ব্রিটিশ কলোনি নয়, পাকিস্তানি কলোনি নয়। যে লোকটা দেখবে তার চেহারা হবে তোমার বাবার মতো, তোমার ভাইয়ের মতো, ওরাই সম্মান বেশি পাবে। কারণ ওরা নিজে কামাই করে খায়, আর তোমরা কাজ কইরা। একটা কথা জিজ্ঞাসা করি আপনাদের কাছে, মনে করবেন না কিছু। আপনাদের কাছে জিজ্ঞাসা করি। আপনাদের বলবো কেন, আমি তো আপনাদেরই একজন। আমাদের লেখাপড়া শিখাইছে কেডা? আমার বাপ-মা, আমার বলি না- বাপ-মা আজ ডাক্তারি পাস করাইছে, ইঞ্জিনিয়ারিং পাস, সাইন্স পাস করাইছে…আজ অফিসার করে কে, …বাঙালি দুঃখী জনগণের টাকায়। আপনাদের কাছে আমার জিজ্ঞাসা, শিক্ষিত ভাইয়েরা, আপনার লেখাপড়ার খরচ দিয়েছে শুধু আপনার সংসার দেখার জন্য নয়, দিয়েছে আপনার ছেলেমেয়ে দেখাশোনার জন্য নয়। দিয়েছে তাদের আপনি কাজ করবেন, সেবা করবেন। তাদের আপনি কী দিয়েছেন? কার টাকায় ইঞ্জিনিয়ার সাব, কার টাকায় ডাক্তার সাব, কার টাকায় অফিসার সাব…কার টাকায় সব সাব? সমাজ যেন ঘুণে ধরে গেছে। এই সমাজকে আমি চরম আঘাত করতে চাই। এই আঘাত, যে আঘাত করেছিলাম পাকিস্তানিদের। সেই আঘাত করতে চাই এই ঘুণে ধরা সমাজকে।’ (সংক্ষেপিত)

দুর্নীতি সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘আমার কৃষকরা দুর্নীতি করে না। আমার শ্রমিকরা দুর্নীতি করে না। তাহলে কে ঘুষ খায়? কে কালোবাজারি করে? কে বিদেশিদের চর হয়ে কাজ করে? বিদেশে টাকা পাচার করে কে? কে মজুদদারি করে? আমরা করি, শতকরা পাঁচভাগ শিক্ষিত মানুষ। আমাদের চরিত্র বদল করতে হবে। আমাদের আত্মা পরিশুদ্ধ করতে হবে।’ দুর্নীতি সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘আমি জানি না এত চোর কোথা হতে আসলো! পাকিস্তানিরা সব নিয়ে গেছে, রেখে গেছে এই সব চোরের দল। তারা এই সব চোরদেরও যদি নিয়ে যেত, তাহলে আমরা আরো ভালো থাকতাম। কিছু দালাল দেশ ছেড়ে চলে গেছে। চোরেরা যদি তাদের সাথে চলে যেত, আমরাও অনেক ভালো থাকতাম।…সোনার মানুষ ছাড়া সোনার বাংলা গড়া সম্ভব নয়। জনগণের সমর্থন ছাড়া শুধু আইন দ্বারা দুর্নীতি বন্ধ করা যাবে না।…আপনাদের কাছে আমার একটা অনুরোধ আছে। একদিন আপনাদের আমি দুর্গ গড়ে তুলতে বলেছিলাম, শত্রুর বিরুদ্ধে জেহাদ করতে বলেছিলাম। আমি বলবো আজ বাংলাদেশের মানুষের সামনে আর একটি কাজ আছে। আর তা হচ্ছে সমাজ হতে, এই বাংলার মাটি হতে দুর্নীতিবাজদের উৎখাত করা। তার জন্য আপনাদের সাহায্য দরকার।’ (ইংরেজি হতে অনূদিত)

১৯৯২ সালে হল্যান্ডের রটারডেম শহরে শীতের এক সন্ধ্যায় পরিচয় হয়েছিল ডা. ইউসুফের সঙ্গে। ১৯৭১-এ বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর সঙ্গে ইউরোপে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে জনমত সৃষ্টি করার জন্য দিনরাত কাজ করেছিলেন। পরে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে পরিচয় হয়। ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু পিত্তথলিতে অপারেশন করানোর জন্য লন্ডন গেলে ডা. ইউসুফও সেখানে গিয়ে হাজির হন। আমার হোটেলে এক বরফ পড়া সন্ধ্যায় এসে তিনি বলেন, “বঙ্গবন্ধুকে ওটিতে নিয়ে যাচ্ছে। আমরা তাঁর পাশে হাঁটছি। ওটিতে প্রবেশের আগে হঠাৎ তিনি আমার হাত চেপে ধরে বললেন, ‘ডাক্তার সাহেব, আমার সাথে যে কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তা এসেছে, তারা নাকি দামি হোটেলে উঠেছে।’ উত্তরে আমি বলি, ‘তাদের যে ভাতা দেওয়া হয়েছে তাতে সাধারণ মানের হোটেলেও থাকা তাদের জন্য কষ্টকর।’ ওটিতে যাওয়ার আগেও বঙ্গবন্ধু দুর্নীতির ব্যাপারে সচেতন ছিলেন। দেশের প্রতি মমত্ব না থাকলে তা সম্ভব হয় না। বর্তমানে ক’জনের আছে দেশের প্রতি এমন মমত্ব? ডা. ইউসুফ বছর দুই আগে রটারডেমেই ইন্তেকাল করেছেন।

২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু এই বক্তৃতা দেওয়ার পর ১৫ আগস্ট তাঁকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। তারপর দীর্ঘ ২১ বছর তাঁর নাম নেওয়াও অনেকটা নিষিদ্ধ ছিল। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ছিল ক্ষমতার বাইরে। শত সংগ্রাম, অসংখ্য বাধা-বিপত্তির পর ১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা সরকার গঠন করে পিতার আরাধ্য কাজ শেষ করার চেষ্টা করেন। কিন্তু ততদিনে সমাজের প্রত্যেকটি শাখা-প্রশাখায় শুধু ঘুণে নয়, পচন ধরে গেছে। বঙ্গবন্ধু যাঁদের ওপর ভর করে যাত্রা শুরু করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে জাতীয় চার নেতাকে ঘাতকরা ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর কারা-অভ্যন্তরে হত্যা করেছে। আর যে ক’জন বেঁচে ছিলেন, তাঁদেরও অনেকের মৃত্যু হয়েছে। তারপরও বঙ্গবন্ধুকন্যা সেই ১৯৯৬ সাল থেকে চেষ্টা করে যাচ্ছেন ১৯৭৫ সালে হারিয়ে যাওয়া বাংলাদেশকে পুনরুদ্ধার করতে। কিন্তু এটি একটি কঠিন কাজ। কারণ বঙ্গবন্ধু যেমন বলেছিলেন, ‘সোনার বাংলা গড়তে হলে সোনার মানুষ চাই’, তেমন সোনার মানুষ তো এখন দেশে থাকলেও বঙ্গবন্ধুকন্যার ধারেকাছে তেমন একটা ভিড়তে পারেন না বা ভিড়তে দেওয়া হয় না। এর ফলে যেটা হয়েছে; প্রশাসন, দল আর সমাজের রল্প্র্রেব্দ রল্প্রেব্দ ঢুকে গেছে সেসব দুর্বৃত্ত, যারা ৪০ হাজার টাকার চাকরি করেও ৮০ লাখ টাকা নগদ বাসায় রাখে। শতকোটি টাকা নিয়ে দেশের বাইরে পাচার করে পালিয়ে যায় আর ভিন্ন দেশে বসতবাড়ি গড়ে তোলে। পাকিস্তান আমলে কেন্দ্রীয় সরকারের চাকরি আর ক্যাডার সার্ভিসে বাঙালির সংখ্যা ছিল ১৫ শতাংশ। অথচ পাকিস্তানের জনসংখ্যার ৬০ শতাংশ মানুষের বাস ছিল পূর্ব বঙ্গে। স্বাধীন বাংলাদেশে শতভাগ সরকারি চাকরি (আমলাসহ) বর্তমানে এই দেশেরই মানুষের মুঠোয়। দেশে অন্য যে কোনো চাকরির চেয়ে সরকারি চাকরির প্রতি তরুণদের আকর্ষণ অকল্পনীয়। কারণ এই চাকরিতে ঢুকলেই এবং চাইলে যে কেউ অল্প দিনের মধ্যে বাড়িতে ৮০ লাখ টাকা জমা করতে পারে। গুলশান, উত্তরা, ধানমণ্ডিতে আলিশান ফ্ল্যাট, মার্কেটের মালিক হতে পারে। এই একটি চাকরি, যেখানে একজন রাতারাতি স্বজনসহ ভিআইপি বনে যেতে পারে। নিজে ফেরি পার হওয়ার জন্য ফেরি আটকে রেখে অ্যাম্বুলেন্সে থাকা একজন মুমূর্ষু রোগী, স্কুলছাত্র কিশোর তিতাসকে হত্যা করতে পারে। আর নিজের অথবা স্ত্রীর মোবাইল ফোন নদীর পানিতে পড়ে গেলে প্রয়োজনে তিনজন ডুবুরি নদীতে নামিয়ে তা উদ্ধার করা যায়।

বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে বেশ কিছু নিবেদিতপ্রাণ সৎ, যোগ্য ও দক্ষ সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন, যারা নিজেদের সব পাপ থেকে দূরে রাখতে পেরেছেন। এমন বেশ কয়েকজন মানুষের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয়েছে। তাদের কাছ থেকে শুনেছি, বঙ্গবন্ধু নিভৃতে তাদের উপস্থিতিতে মাঝেমধ্যে কীভাবে নিজের অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরতেন। বঙ্গবন্ধুকন্যার সরকার ও তাঁর ধারেকাছেও এমন মানুষ আছেন, তবে তাদের সংখ্যা হাতেগোনা। তাই তো তিনি মাঝেমধ্যে বলেন, ‘বাংলাদেশে সকলকে কেনা যায়, শুধু আমাকে ছাড়া।’ চারদিকে বর্তমানে বিরাজমান ক্ষয়িষুষ্ণ অবস্থা দেখে মনে হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে; তিনি যা বলেছেন, ঠিকই তো বলেছেন। এ ক’দিনের অবস্থা দেখেশুনে একজন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী, আপনার অনুপস্থিতিতে আমরা তো অসম্ভব অসহায় বোধ করছি।’ তিনি তো মোটেও ভুল লেখেননি বলে মনে হচ্ছে।

বিশ্নেষক ও গবেষক