সাম্প্রতিক হামলা নিয়ে নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা: ‘ঢিলেমি করলে আরও হামলা হবে’

মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে দুটি জঙ্গি হামলার পর সরকার কোনও ধরনের ঢিলেমি দেখালে বা করলে আরও হামলা ঘটতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। এটাকে ‘আদর্শিক’ হামলা উল্লেখ করে তারা বলেন, দুই হামলার ধরনে পার্থক্য থাকলেও একটার সঙ্গে আরেকটা সম্পর্কিত, বিচ্ছিন্ন নয়। এদের প্রতি ঢিলেমি দেখালে হামলার আশঙ্কা বাড়বে। কারণ তারা নাগরিকদের মনে জঙ্গিবাদ নিয়ে ভীতি সঞ্চার না করতে পারা পর্যন্ত ক্ষমতা প্রদর্শন করতে চাইবে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, গুলশান হামলার ধারাবাহিকতায় জামায়াত, শিবির, জেএমবি, আনসারুল্লাহ বাংলা টিম, পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই সম্মিলিতভাবে যে যার সামর্থ অনুযায়ী হামলা করবে। তবে এই সময়টা খুব দীর্ঘ হবে তেমনটা তারা মনে না করলেও পর পর কিছু ঘটনা ঘটার আশঙ্কা আছে বলে উল্লেখ করেছেন।

গত শুক্রবার ১ জুলাই রাতে গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলা চালায় অস্ত্রধারীরা। এতে দেশি-বিদেশি ২০ জিম্মিকে হত্যা করা হয়। এছাড়া অভিযান শুরুর আগেই জঙ্গিদের ছোড়া গুলি-বোমা হামলায় দুজন পুলিশ কর্মকর্তা নিহত হন। সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে সমন্বিত অভিযানে সেখান থেকে ১৩ জনকে জীবিত উদ্ধারও করা হয়। এরপর এক সপ্তাহ যেতে না যেতেই ঈদের দিন বৃহস্পতিবার কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানের আধা কিলোমিটারের মধ্যে বোমা হামলায় দুই পুলিশ সদস্যসহ চারজন নিহত এবং কমপক্ষে ১৩ জন আহত হন।

এই দুটি হামলা একটির সঙ্গে আরেকটি সম্পর্কিত মনে করছেন কিনা এক প্রশ্নে নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) আব্দুর রশিদ বলেন, দুটি হামলা সম্পর্কিত এবং পরিস্থিতি বিশ্লেষণে মনে হয়, এখনও হামলামুক্ত হয়নি বাংলাদেশ। আমাদের ধারণা বাংলাদেশে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নামে জঙ্গি দল ছিল, আছে। এদের প্রবণতা ছিল আইএস -আল কায়েদার সঙ্গে কাজ করার। এছাড়া গুলশানের হামলায় যারা অংশগ্রহণ করেছে তাদের আচরণের ভেতর কিছু চিহ্ন ফুটে উঠেছে। এটা আন্দাজ করা যায়- হামলাকারীরা সিরিয়া পর্যন্ত ঘুরে এসেছে। তথ্য অনুসন্ধান করলে এই যোগাযোগের চিহ্ন পাওয়া যাবে। কারণ যে প্রেজেন্টেশন ছিল তাতে ওখানের সঙ্গে ফুটপ্রিন্ট পাওয়া যায়।

দ্বিতীয় হামলার সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে গিয়ে তিনি আরও বলেন, গুলশানে হামলাকারীরা বাংলাদেশেরই ছেলে। এটা একটা সিন্ডিকেটিং অ্যাটাক যার মধ্যে জামায়াত, শিবির, জেএমবি, আনসারুল্লাহ বাংলা টিম, পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই এর যোগাযোগ আছে। এদের আবার পরস্পরের কিছু ক্ষেত্রে বিরোধিতা থাকলেও স্বার্থগত জায়গায় মিল হওয়ায় এক হতে পেরেছে বলেই আমি মনে করি। ফলে গুলশানের হামলার মধ্য দিয়ে এরা সবাই যে যার অবস্থানে, যার যতটুকু ক্ষমতা আছে সেটা দিয়েই আক্রমণ করবে। দ্বিতীয় আক্রমণটা তেমনই, এর মধ্যে আইএস-এর চিহ্ন নেই। কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণে এক ধরনের সংগঠিত বিষয় আছে, যেটা বাংলাদেশের জন্য আরও হুমকির।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশকে বিশ্বের কাছে জঙ্গি রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত করে তোলার পাশাপাশি সহিংস বার্তা পৌঁছে দিতে চেয়েছে। এদের বিরুদ্ধে সহনশীল আচরণ দেখালে এরা আবারও হামলা করবে। এজন্য আক্রমণাত্মক অভিযান পরিচালনাই এখন জরুরি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এদিকে কেন এ ধরনের হামলা করা হচ্ছে প্রশ্নে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘আমি বারবারই বলছি এটি একটি আদর্শিক হামলা হিসেবে যোগ থাকার সম্ভাবনা বেশি। সরাসরি না হলেও ওই যে আদর্শিক যোগ। যারা উগ্র আদর্শে বিশ্বাস করে তারা খিলাফত প্রতিষ্ঠা করার নাম দিয়ে রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল করে রাখতে চায়।

আইএস আছে কি নাই এ নিয়ে গত দেড়-দুই বছরের যে বিতর্ক তার অবসান ঘটানো জরুরি উল্লেখ করে এই সাবেক সেনা কর্মকর্তা বলেন, আন্তর্জাতিক রাজনীতির বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে এখন আর এসব অস্বীকারের উপায় নেই। যতই এগুলো অস্বীকার করবেন, তাতে তাদের ততই জায়গা করে দেওয়া হয়। আর প্রত্যেকবার অস্বীকারের মাশুল গুনতে হবে সবাইকে। কারণ আমাদেরই সন্তান এসব জায়গায় পৌঁছে গেছে। সেটা শঙ্কার।

[বাংলা ট্রিবিউন]