তিনদিন চুলা জ্বলে না, আমাদের আবার ঈদ !

ইমরান হোসাইন. পেকুয়া:
‘ঘরে পানি উঠছে, আমরা পানিতে ভাসি, আপনেরা ছবি তুলে সরকারের কাছে দিবেন, সরকার আমাদের জন্য চাল দিবে, কিন্তু ওই চাল তো আর আমরা পাবো না, মেম্বার-চেয়ারম্যানরা সেই চাল দিবে তাদের পছন্দের মানুষকে। আমরা তো বঞ্চিত থাকব, তাই ছবি তুইল্যা কি লাভ।’

ক্ষোভের সঙ্গে এ কথাগুলো বলছিলেন পেকুয়া সদর ইউনিয়নের হরিণাফাঁড়ি গ্রামে মাতামুহুরী নদীর জোয়ারের পানিতে বন্দি রওশন আক্তার(৪৩)। তিনি বলেন, একদিকে বেড়িবাঁধে ভাঙন অন্যদিকে টানা বৃষ্টির পানিতে ভাসতেছি, আমরা কোথায় আশ্রয় নিবো।

জোয়ারের পানিতে প্লাবিত একই এলাকার গৃহবধূ নুর নাহার বলেন, পানিতে ঘরের চুলা ডুবে আছে, তিনদিন ধরে ঘরে রান্না চুলা জ্বলে না’ পোলাপানরা(সন্তান) খাওয়ার জন্য চিৎকার চেচামেচি করতাছে। কিছু কিনে খাওয়ানোর সেই টাকাও নেই। আমাদের কষ্ট কেউ দেখে না। তাই, আমাদের আবার কিসের ঈদ ?

তিনি আরো বলেন, ভাঙ্গা বাঁধ দিয়া পানি পানি ঢুকছে, এভাবে চললেও আমরা ঈদ করতো পারবো না’। পানির মধ্যেই ভাসতে হবে’।

টানা বৃষ্টি, পূর্ণিমায় সৃষ্টি জোয়ারের প্রভাবে এবং বাঁধ ভেঙে প্লাবিত শুধু আনোয়ারা ও নুর নাহার নয়, তাদের মতো অসংখ্য মানুষ পানিবন্দি। জোয়ার এবং ভাটার ওপর নির্ভর করেই দিন কাটাচ্ছেন তারা।

পেকুয়া উপজেলার সদর, রাজাখালী, মগনামা ও উজানটিয়া ইউনিয়নের ২০গ্রামের লাখো মানুষ পানিবন্দি হয়ে দুর্বিসহ দিন কাটাচ্ছেন।

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানায়, সোমবার, ৪ জুলাই বিকেলে নদীর পানি বিপদসীমার ৩ দশমিক ৬৯ মিটার উচ্চতায় প্রবাহিত হয়েছে। এতে নিম্নাঞ্চল এবং বাঁধের বাইরের অংশ ছাড়াও ভাঙ্গা বাঁধ দিয়ে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে।

এদিকে, তিনদিন ধরে জোয়ারে পানি প্রবেশ করায় বন্যাদুর্গত এলকায় এখন খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে, ছড়িয়ে পড়েছে পানিবাহিত রোগ।

মগনামা ও রাজাখালী ঘুরে দেখা গেছে, জোয়ারের পানিতে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। পানিতে তলিয়ে গেছে ঘর-বাড়ি, রাস্তাঘাট, মসজিদ, মাদ্রাসা, স্কুল, টিউবওয়েলসহ বিভিন্ন স্থাপনা।

পানি থেকে বাঁচতে অনেকেই ঘরের উঁচু স্থানে কেউবা ঘর থেকে উঁচু রাস্তায় আশ্রয় নিয়েছেন। রোজার মধ্যে অনেকেই ইফতার সামগ্রী তৈরি করতে পারেননি, শুধু পানি খেয়ে ইফতার করতে হয়েছে অনেককে।

মগনামা কালারপাড়া গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে, সাগর-নদী মোহনা তীরের বেশিরভাগ এলাকা প্লাবিত। সেখানকার বাসিন্দা হনুফা, কল্পনা, আমেনা, ইয়াসনুর, নুরুল হক, জেসমিনসহ অনেকেই জানান তাদের দুর্ভোগের কথা।

তারা বলেন, জোয়ারের পানিতে বার বার ক্ষতিগ্রস্থ হলেও কেউ তাদের খোঁজ খবর নেয় না। শুধুমাত্র ইউপি চেয়ারম্যান শরাফত উল্লাহ চৌধুরী ওয়াসিমের একান্ত প্রচেষ্টায় এখনো ঠিকে আছে তারা। তিনি বেড়িবাঁধ রক্ষায় প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন বলেও জানান তারা।

বানভাসি জুলেখা ও সালমা বলেন, অমাবস্যা ও পূর্ণিমার জোয়ারে ভাসি, তবুও স্থায়ীভাবে বাঁধ নির্মাণ করা হয় না। কিন্তু ঈদ ঘনিয়ে এলেও ছেলে-মেয়েদের নতুন জামা-কাপড় কিনে দিতে পারিনি।

এদিকে, খবর নিয়ে জানা গেছে পেকুয়া উপজেলার সদর, রাজাখালী, মগনামা ও উজানটিয়া ইউনিয়সহ সকল ইউনিয়নের ২০গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। সেখানে ২/৩ফুট পানিতে তলিয়ে রয়েছে বেশিরভাগ এলাকা।

পেকুয়া সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বাহাদুর শাহ বলেন, টানা বৃষ্টি ও বাঘগুজারা অংশে বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে মাতামুহুরী নদীর ঢলের পানি প্রবেশ করার জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। এতে, ইউনিয়নের অধিকাংশ গ্রাম পানিতে নিমজ্জিত রয়েছে।

মগনামা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শরাফত উল্লাহ চৌধুরী ওয়াসিম আমাদের রামু ডটকমকে বলেন, কাকপাড়া, লম্বাঘোনা ও বিন্দার পাড়া অংশে প্রায় ২চেইন বেড়িবাঁধ বিলীন হয়ে সাগরের জোয়ারের পানি প্রবেশ করে ইউনিয়নের বিপুল অংশ পানির নিচে রয়েছে।

রাজাখালী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ছৈয়দ নূর আমাদের রামু ডটকমকে বলেন, পর্যাপ্ত নিষ্কাশন ব্যবস্থা (সুইসগেট) না থাকায় বৃষ্টির পানি জমে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে বেশ কয়েকটি গ্রাম পানিতে তলিয়ে গেছে।

উজানটিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শহিদুল্লাহ চৌধুরী আমাদের রামু ডটকমকে বলেন, টেকপাড়া, আতর আলী পাড়া, মিয়াজী পাড়া, ঘোষাল পাড়া ও করিয়ারদিয়ায় ৬/৭ চেইন বেড়িবাঁধ বিলীন হয়ে ইউনিয়নের বিপুল অংশ সাগরের পানিতে তলিয়ে গেছে।

পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মারুফুর রশীদ খান আমাদের রামু ডটকমকে বলেন, ঈদের আগেই দুর্গত এলাকায় ভিজিএফ ও ভিজিডি বিতরণ করা হয়েছে। এর আগেও দুর্গত এলাকার মানুষকে সহায়তা দেওয়া হয়েছে।