হলি আর্টিজান কাভারেজ বিতর্ক

আনিস আলমগীর:

অভিশপ্ত পহেলা জুলাই হচ্ছে রাজধানীর গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারির জিম্মি ঘটনা, যেখানে ১৭ বিদেশিসহ ২৮ প্রাণ ঝরে গেলো, তার কাভারেজ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ রাষ্ট্রের নানা স্তরের লোক প্রশ্ন তুলেছেন। প্রশ্ন উঠেছে- বাংলাদেশের সাংবাদিকতার মান নিয়েও। বিশেষ করে টিভি সাংবাদিকতার মান। প্রধানমন্ত্রী সরাসরি ক্ষোভ জানাতেও ভুলেননি। বলেছেনে—আমি দিতেও জানি, নিতেও জানি। মানে টিভি বন্ধ করা কোনও ব্যাপার না সরকারের জন্য। উনি শুধু অভিযোগ, ক্ষোভ প্রকাশ করে বসে থাকেননি। উদাহরণও দিয়েছেন- অভিযানের সামরিক প্রস্তুতির জন্য কোনও একটি বাহিনীর সদস্য ড্রেস পরছেন তাও টিভিতে দেখানোর বিষয় কিনা।

সবচেয়ে বেশি বিতর্ক চলছে লাইভ সম্প্রচার নিয়ে। কিছু মিডিয়া লাইভ সম্প্রচারের পক্ষে, আর কিছু বিপক্ষে। সরকারের পক্ষ থেকে র‌্যাবের ডিজি অনুরোধ করেছিলেন টিভি লাইভ সম্প্রচার বন্ধ করতে। সেটা মেনেই টিভিগুলো লাইভ বন্ধ করে দেয়। তবে কয়েকটি টিভি ওই অনুরোধ রক্ষা করেনি।
যারা রক্ষা করেনি তাদের কাভারেজ নিয়েই মূলত অনেকের ক্ষোভ এবং সাংবাদিকতার মান নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ হয়েছে। একজন সাংবাদিক লাইভে জানাচ্ছেন, আমি এখন এখানে, আমি দেখতে পাচ্ছি… এখান থেকে ৬ বাড়ি পর, আমি যে বাহিনীর সঙ্গে আছি নিরাপত্তার স্বার্থে তাদের নাম বলছি না।
স্টুডিওতে বসে উপস্থিত একজনের সঙ্গে কথা বলছেন অ্যাংকর। পরে লাইভে সংযুক্ত হচ্ছেন রিপোর্টারের সঙ্গে। রিপোর্টার যা বলছেন সেটাকে বলছেন… না না আপনার কাছে আপডেট তথ্য নেই। আমাদের কাছে খবর আছে… ড্রাইভার মারা গেছেন ঢাকা মেডিক্যালে। আবার ফিরে যাচ্ছেন অন্যের কাছে। আবার আসছেন স্টুডিওতে। না না যেটা আগে বলেছিলাম সেটা ঠিক না। ড্রাইভার মারা যাননি, আসলে আমাদের নিজেদেরকেও আরও সতর্ক হয়ে কথা বলা উচিত। সব যেন চিড়িয়া কাজ কারবার।

পুরো এই ঘটনার তাৎক্ষণিক সংবাদ প্রচারে, ব্রেকিং দেওয়ার ক্ষেত্রে হযবরল অবস্থাটা দর্শকদের কাছে ধরা পড়ে। অদক্ষতার চিত্রও ফুটে উঠে। আবার যে দর্শকরা এর সমালোচনা করেন তারাও কিন্তু বসে থাকেন টিভি কী বলছে সেটা দেখতে। অনলাইলে কিছু পাওয়া যায় কিনা খুঁজে বেড়ান। তাহলে ডিমান্ড যখন আছে তখন দর্শক চাহিদা না মিটিয়ে টিভি মিডিয়া বসে থাকতে পারে না। এমন একটি ঘটনা ঘটছে তখন টিভি সেটাকে বাদ রেখে চিংড়ি চাষের সমস্যা নিয়ে টকশো করবে এটা দর্শক আশা করে না। তাহলে সমাধান হচ্ছে টিভি এ বিষয়ে খবর দেবে। তবে কতটুকু দেবে, কি দেবে না- সেটাই মূল বিষয়।

আমাদের সমালোচক গোষ্ঠী এবং মিডিয়া- দু’পক্ষের চিন্তা করা উচিত, এ জাতীয় ঘটনা আমরা সবসমবয় ফেস করছি না। বেসরকারি টিভি মিডিয়ার যুগে বাংলাদেশের ইতিহাসে আমরা প্রথম এমন ঘটনা পাই ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি বিডিআর বিদ্রোহ দিয়ে। তার কাভারেজের ক্ষেত্রেও দেখা দিয়েছিল বিতর্ক। বিডিআর-এর জোয়ানদের বক্তব্যের ওই ফুটেজ বিনা বিচারে, এক তরফা প্রচার করা ঠিক আছে কিনা- বিতর্ক উঠেছিল সেখানে।

বিদ্রোহের পর বিডিআর টিভি মিডিয়ার প্রধানদের ডেকে নিয়েছিল, একজন একজন করে। তারা অনেক ফুটেজ সংগ্রহ করেছিল। মিডিয়াকেও দিতে বলেছিল। যাদেরকে তারা ডেকেছিল, সওয়াল জবাব করেছিল, তাদের মধ্যে আমিও একজন ছিলাম। অন্য যারা ছিলেন তাদের মধ্যে মনজুরুল আহসান বুলবুল, সৈয়দ ইশতিয়াক রেজার নাম মনে পড়ছে। সেদিন তাদের যে প্রশ্নগুলোর জবাব দিয়েছিলাম পিলখানায় তার কিছু এখনও প্রাসঙ্গিক বলে উল্লেখ করছি।

আমি তখন আরটিভির সংবাদ বিভাগের প্রধান। তারা প্রশ্ন করেছিল আপনারা কার অনুমতি নিয়ে নিউজ প্রচার করেছেন? আমি বলেছিলাম অনুমতি কার থেকে নেব? বিডিআর-এ জবাব দেওয়ার মতো কেউ কি ছিল? আইএসপিআর- এর কোনও নির্দেশনা ছিল না। যোগাযোগও করা যায়নি। বললাম আমার রিপোর্টার সংবাদ সংগ্রহ করতে এসেই হামলার শিকার হন। তাদের গাড়িকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হয়। আমি ধানমণ্ডির বাসিন্দা, নিজের চোখে দেখছি ঘটনাবলী। এসব প্রচার করার জন্য আপনার অনুমতির দরকার না পড়লেও আমরা দেখাইনি। অপেক্ষা করেছি দুপুর পর্যন্ত। কিন্তু ইটিভি লাইভ দেখানো শুরু করার পর, আমরা আমাদের পরবর্তী সংবাদে এটা না দেখানোর কিছু ছিল না, যেখানে আশপাশের সব মানুষ জানছে কি ঘটছে। আপনারা তখন কোথায়, সরকার কোথায়, তথ্য মন্ত্রণালয় কোথায়, আইএসপিআর তখন কোথায় ছিল? তাদেরকে আমরা তো খুঁজে পাইনি নির্দেশনার জন্য। পরবর্তীতে প্রায় দুদিন পর যখন নির্দেশনা এলো তখন শুরু হলো আইএসপিআর-এর এক নির্দেশনা, সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ের এক নির্দেশনা, বিশেষ সংস্থার আরেক রকম নির্দেশনা।

চারপাশে বসা সওয়ালকারীরা কড়া কড়া কথা বলেছেন কিন্তু এর সদুত্তর দেননি। একটি টিভি বিডিআর জোয়ানদের বক্তব্য বাছ-বিচার ছাড়া, প্রতিপক্ষের বক্তব্য ছাড়াই প্রচার করেছিল। সেই ক্ষোভ সব প্রশ্নকারী ব্যক্ত করেছেন। ওই ফুটেজ আমার কাছেও ছিল, আমাদের রিপোর্টার মাজহার নিয়ে এসেছিলেন ওই টিভিতে প্রচারের আগেই। আমরা দেইনি, সংবাদে শুধু প্রয়োজনীয় সাউন্ডবাইট ব্যবহার করেছি। একটি টিভি সেনা সদস্যদের পচা-গলা লাশ বের করছে ম্যানহোল থেকে ক্রেন দিয়ে তা দেখাচ্ছে- আমরা তা করিনি। সংবাদে যা দিয়েছি যথাযথভাবে, লাশের সম্মান করে- যারা অপসাংবাদিকতা করেছে তাদের বিরুদ্ধে আপনারা কি ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন? যারা সংযত এবং যথাযথ সাংবাদিকতা করেছে তাদেরকে ধন্যবাদ দেওয়া তো দূরে থাক, কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে কটু কথা বলছেন এবং সাংবাদিকতার রীতি শেখাচ্ছেন।

হলি আর্টিজান বেকারির ঘটনায় এই চোখ রাঙানি এবং কাঠগড়ায় দাঁড়ানোর ঘটনা এখনও পর্যন্ত ঘটেনি তবে কারও কারও অপসাংবাদিকতার তিরস্কার সবার গায়ে লেগেছে বলা যায়। একদল দোষ করবে আর সবাই তিরস্কারের শিকার হবে এটা নিশ্চয়ই অব্যাহত থাকতে পারে না। এর জন্য আমাদের দরকার স্ব স্ব ভূমিকা এবং দায়িত্বের প্রতি সজাগ হওয়া।

সরকারের যে মহল আজ সাংবাদিকদের সমালোচনা করছেন তারা কি নিজেদের দায়িত্বটা কী ছিল ভেবে দেখেছেন? এ জাতীয় ঘটনার ক্ষেত্রে উন্নত বিশ্ব মিডিয়া কী করে আমরা সেটার উদাহরণ দেই, কিন্তু উন্নত বিশ্বের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং তাদের সংশ্লিষ্ট মহল মিডিয়া কিভাবে হ্যান্ডেল করে সেটা জানি না। এখানে কোনও ঘটনা ঘটলে পুলিশ কনস্টেবল থেকে শুরু করে সরকারের মন্ত্রী-আমলা যে কেউ মন্তব্য করেন- সারাবিশ্বে কি সেটা ঘটে? উন্নত বিশ্বে ঘটনা ঘটার পর পরই তা নিয়ে কথা বলার জন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগের যথাযথ মুখপাত্র পাওয়া যায়- আমাদের ক্ষেত্রে আমরা কি তা দেখি? এই ঘটনার কতক্ষণ পর সরকারের কাউকে আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের জন্য পেয়েছে মিডিয়া? রাতভর তারা কি আপডেট দিয়েছে?

ঘটনার কাছাকাছি যাওয়ার, পারলে হলি আর্টিজান বেকারিতে ঢুকে যাওয়ার চেষ্টা সাংবাদিক করবেই, এটা সহজাত। কোথাও যুদ্ধ হলে সেখান থেকে লোক পালিয়ে যায়, আর যুদ্ধ বলেই দেশ বিদেশ থেকে সেখানে সাংবাদিকরা ছুটে যান। তাই এটা নিয়ে সমালোচনা করার আগে তাকে কতটুকু যেতে দেব এই দায়িত্ব পালন করতে হবে সরকারের ঘটনা সংশ্লিষ্ট মহলকে। এখানে কি তার প্রতিফলন ছিল গভীর রাতের আগ পর্যন্ত?

সাংবাদিকদের দায়িত্ববোধ সম্পর্কে বলতে গেলে আবারও বলবো, বিষয়টি নতুন। বিডিআর-এর ঘটনা ছাড়া এই প্রজন্মের সাংবাদিকরা এমন ঘটনার কাভার করেনি। তাদের সীমাবদ্ধতা আমাদেরকে মাথায় রাখতেই হবে। তবে এক্ষেত্রে মিডিয়া হাউজগুলোর গেট কিপাররা তাদের দায়িত্ব এড়াতে পারেন না।

‘সংঘাত ও সহিংসতা’ নিয়ে রিপোর্ট করা একটি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ আসে এবং আসতে পারে রাষ্ট্র, মিডিয়া হাউস ও পরিবার- সবদিক থেকেই। তাই সতর্কতা, পূর্বপ্রস্তুতি না থাকলে একজন রিপোর্টারের পুঙ্গুত্ববরণ বা জীবন বিপন্ন হতে পারে। সে কারণে একজন সাংবাদিককে সংঘাত ও সহিংসতা নিয়ে রিপোর্ট করতে গেলে অনেক বিষয় খেয়াল রাখতে হয়। এসব ক্ষেত্রে রিপোর্টারের নিজের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে:

– গুপ্তচরবৃত্তি করা বা সে ধরনের কোনও আচরণ করা থেকে বিরত থাকা;

– অবজ্ঞা, অবন্ধুসুলভ বা আগ্রাসী আচরণ করা থেকে বিরত থাকা;

– যুদ্ধবন্দিসহ যে কাউকে জনসম্মুখে লজ্জা দেওয়া, ছোট করা, অপমান করা থেকে বিরত থাকা বা যারা এটা করছে তাদের উৎসাহ দেওয়া থেকে বিরত থাকা;

– সিভিলিয়ানদের বিরুদ্ধে সহিংসতা উসকে দেওয়া থেকে বিরত থাকা;

– কোনও অবস্থাতেই সন্ত্রাস উসকে না দেওয়া।

প্রতিবেদককে এটা মনে রাখতে হবে যে, তার প্রতিবেদনের তথ্যের সত্যতা একসময় প্রশ্নের মুখোমুখি হলে তথ্যসূত্র জানাতে বাধ্য হবেন তিনি। সেটা বিশেষ ক্রাইম ট্রাইব্যুনালেও হতে পারে। আমাদের রিপোর্টাররা অনেকে সেটা জানেন না। তাদের বসরাও তা শেখান না। আর ওই যে বললাম, এমন ঘটনা প্রথম প্রথম বলেই আমরা এসব চিন্তা করি না। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে এসব নিউজ কাভার করতে আমাদের দেশে কয়টি মিডিয়া হাউস সাংবাদিকদের লাইফ জ্যাকেট ও অন্যান্য সরঞ্জাম প্রদান করে। সন্ত্রাসীর গুলিতে নিহত হলে মিডিয়া হাউসের পক্ষ থেকে কি তার ইন্স্যুরেন্স সুরক্ষা ব্যবস্থা আছে?

আগেই বলেছি মিডিয়ার বসদের দায়িত্ব এ সময় সবচেয়ে বেশি। তাদের থাকে শারীরিক, মানসিক, আবেগ ও রাজনৈতিক চাপ। সবচেয়ে বেশি চাপ প্রতিদ্বন্দ্বী মিডিয়ার সঙ্গে আগ্রাসী প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হওয়া। তারা অনেকে এসব ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন, দেশীয় আইনগুলো যদি খেয়াল রাখেন এবং মানবাধিকার বিষয়ক প্রতিবেদনকে সংবাদমূল্য দেন তাহলে সব ধরনের বিপর্যয় এড়ানো যায়। কিন্তু আমরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানো; বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হওয়া; আন্তর্জাতিক বা দেশীয় নিউজ এজেন্ডা বাস্তবায়ন; সেল্ফ সেন্সরশিপ; সাংবাদিকদের দলীয় সমর্থক হয়ে যাওয়ার প্রবণতা থেকে মিডিয়া সমালোচনার মুখোমুখি হয়। বাংলাদেশ তার ব্যতিক্রম নয়।

হলি আর্টিজানের ক্ষেত্রেও এর অনেকটা প্রতিফলিত হয়েছে। মিডিয়া বসরা অন্য টিভি দেখে উত্তেজিত হয়েছেন। প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছেন। হুস জ্ঞান হারিয়েছেন। যাচাই না করে তথ্য প্রচার করেছেন। জাতীয় স্বার্থ চিন্তা, ঘটনার পরবর্তী প্রতিক্রিয়া বিবেচনায় নেননি।

লেখক: সাংবাদিক ও শিক্ষক

[email protected]

[সংগৃহিত]

******************************************************************************************************************

প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। আমাদের  রামু -এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য  আমাদের  রামু কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।