পরম আত্মীয় কে ?

প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু

ইংরেজী রিলেটিভ এই বিশেষণটির বাংলা অর্থ আত্মীয়। আত্মীয় শব্দের আরও কিছু সমার্থক জ্ঞাতি, মিত্র, কল্যাণকামী ইত্যাদি। আমরা আত্মীয় বলতে যেটুকু বুঝি তা হল একই বংশে, একই পরিবারে জন্ম নিলে, কারো শরীরে একই বংশের রক্ত প্রবাহিত হলে সে আত্মীয় হিসেবে বিবেচিত হয়। বংশের বা কুটুমের বাইরে জন্ম নিলে আমরা তাদের আত্মীয় মনে করি না ; কাছের ভাবতে পারি না।

আত্মীয়ের মধ্যে ও আবার বিভাজন দেখা যায় ঘনিষ্ট আত্মীয়, দূর সম্পর্কীয় আত্মীয়। মা, বাবা, সহোদর, ভাই, বোন, দাদা, দাদী, চাচা, চাচী, জেঠা জেঠী, কাকা, কাকী, মাসি, পিসি, মামা, মামী ইত্যাদি এরা ঘনিষ্ট আত্মীয়ের মধ্যে পড়ে। আমরা অনেক সময় কিছু দিরুক্ত শব্দ ব্যবহার করি। যেমন বৃষ্টি বাদল, আত্মীয় স্বজন।

‘স্বজন’ শব্দটিকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় স্ব অর্থ নিজের। অর্থাৎ স্বজন মানে নিজের মানুষ একান্ত আপনজনকে বুঝায়, আর বিভিন্ন গোত্র বা সম্প্রদায়ের লোককে তো ভাবাই যায় না। অথচ বাস্তবতা তার বিপরীত। দেখুন এবার ; আত্মীয় কাকে বলে ? আত্মীয়ের লক্ষণ কি ? যিনি আমার সুখে সুখী আমার দুঃখে দুঃখী হন তিনি আমার আত্মীয়। যিনি আমার উন্নতিতে আনন্দিত হতে পারেন তিনি আমার আত্মীয়। যিনি বিপদের সময় আমার পাশে থাকেন তিনি আমার আত্মীয়। যিনি আমার উপর সদা দয়া পরবশ তিনি আমার আত্মীয়, যিনি আমার কল্যাণ কামনা করেন তিনি আমার আত্মীয়। যিনি আমার পেছনে অযথা আমার বদনাম করেন না তিনি আমার আত্মীয়। যিনি আমার সাথে মিত্ররূপী শত্রুর মত আচরণ করেন না তিনি আমার আত্মীয়। যিনি আমার স্বার্থে থাবা মারেন না তিনিই আমার আত্মীয়। এরকম আরো অনেক কথা। যার উপর আমি নির্ভর করতে পারি তিনিই আমার আত্মীয়।

তাহলে বলতে পারি বিশ্বস্ত লোকই পরম আত্মীয়। আর সেই বিশ্বস্ত লোক যে একই বংশের, একই গোত্রের, একই রক্তের হবে এমন কোন কথা নেই। অর্থাৎ বিশ্বাসঘাত লোকের যেমন কোন জাত নেই তেমনি বিশ্বস্ত লোকের ও বিশেষ কোন জাত নেই। তাই বিশ্বস্ত লোকের সান্নিধ্যও পরম দুর্লভ।

নিজের বিবেচনায় মিলিয়ে নিন; মা তার শিশুকে জন্মের পরে রাস্তায় অথবা ডাস্টবিনে ছোড়ে ফেলে দিচ্ছে। কিন্তু অন্য কোন পথচারী শিশুটিকে পরম মমতায় বুকে তোলে নিচ্ছে। স্ত্রী তার স্বামীকে নতুবা স্বামী তাঁর স্ত্রীকে খুন করছে। ভাই তার ভাইকে খুন করছে। বোন তার বোনকে বিধবা করছে নতুবা খুন করছে। ছেলের হাতে পিতা খুন হচ্ছে। রক্তের সাথে রক্ত বেঈমানী করছে। একই সম্প্রদায়ের লোক নিজ সম্প্রদায়ের লোক দ্বারা আর্থিক, কায়িক, ও মানসিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। নিজের সন্তান পরকে খাওয়ায় পরে খাওয়ায় তাকে। এবার বলেন কে আত্মীয় আর কে অনাত্মীয়। বিশ্বস্তলোক পাওয়া না গেলে বিনিময়ে দুঃখ ছাড়া আর কিছুই আশা করা যায় না।

এক ধনী লোক নিজের গাড়ি চালানোর জন্য এক প্রাইভেট ড্রাইভার রাখলেন। তাকে খাওয়া-ধাওয়া, ভরণপোষণ সব যোগাতেন। মাস শেষে বেতন ও দিতেন। একদিন ড্রাইভার ব্যবসায়ীকে অফিসে পৌছে দিলেন। তারপর তাঁর স্ত্রী দুই কণ্যাকে বিদ্যালয়ে পৌছে দিতে গেলেন। এরপর ড্রাইভারকে নিয়ে একা বাসায় আসলেন। সুযোগে ড্রাইভার মহিলাটিকে খুন করে ফেললেন। বাসায় সোনা দানা যত ছিল তা সব লুট করে নিয়ে গেলেন।

কোন পুরুষ কোন নারীর সম্ভ্রম হানি করল। এক পর্যায়ে তার অনৈতিক কর্মের ভিডিও চিত্র সবার মাঝে ছড়িয়ে দিলেন। নির্যাতিত প্রেমিকা ক্ষোভ আর অপমানে আত্মহত্যা করলেন। ঘরের বাচ্চাদের পড়ালেখা শেখানোর জন্য এক ব্যক্তিকে গৃহশিক্ষক করে রাখা হল। পড়াশোনার সুবাদে ঘরের মেয়ে অথবা তার স্ত্রীকে নিয়ে পালিয়ে গেলেন উক্ত গৃহ শিক্ষক।

বিদেশে গাধার মত খেটে টাকা উপার্জন করছেন এক শ্রমিক, তার আশা ছিল দেশে ফিরে বাড়িঘর নির্মাণ করে পছন্দের কাউকে বিয়ে করবেন। প্রতি মাসে টাকা পাঠালেন ভাইয়ের ঠিকানায়। অনেক বছর পর দেশে ফিরে এসে দেখলেন ভাইয়ের সব হয়েছে কিন্তু তার জন্য কিছুই নেই। এই ধরণের প্রতারনার ঘটনা হর হামেশা ঘটছে।

আবার দেখুন ; এক ব্যক্তি তার যাবতীয় সম্পত্তি কোন এক ব্যক্তিকে দেখার ভার দিয়ে বিদেশে চলে গেলেন পরিস্তিতির শিকার হয়ে। তিনি আর ফিরে না আসায় জনৈক ব্যক্তি প্রকৃত মালিকের সন্তানদের জন্য প্রমানসহ উক্ত ধন রেখে মারা গেলেন।

তাই বলা যায় বিশ্বস্ত লোকই পরম আত্মীয়। হোক না সে বিধর্মী, হোক না সে ভিনদেশী, হোক না সে পরবংশীয়।