সমাপনী পরীক্ষা বন্ধের সুপারিশ দ্রুত বাস্তবায়ন হোক

মো. সিদ্দিকুর রহমান:

শিশুরা আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ। তাদের সুস্থ, সুন্দর ও সৎ নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা এদেশের বিবেকবান সকল নাগরিকদের কর্তব্য। এ দায় থেকে বিগত কয়েক বছর শিক্ষাবিদ ড. জাফর ইকবাল, ড. মো. ছিদ্দিকুর রহমানসহ আমরা অনেকে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক্স মিডিয়ার মাধ্যমে ৫ম শ্রেণির সমাপনী পরীক্ষা বাতিলের যৌক্তিকতা তুলে ধরেছি। এ প্রসঙ্গে শিক্ষাবিদ আমলাদের সমন্বয়ে সেমিনারে প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী এবছর পরীক্ষা তুলে দেওয়ার প্রসঙ্গে মন্ত্রী পরিষদের সভায় উপস্থাপনের বক্তব্যকে সাধুবাদ জানাই।

৫ম শ্রেণির এ অনাহুত পাবলিক পরীক্ষা শিশুদের নৈতিক অবক্ষয়, জ্ঞান অর্জনের পরিবর্তে নোট গাইডের বোঝা, কোচিং সেন্টার বা স্কুলে অসংখ্য পরীক্ষার অত্যাচার প্রাক-প্রাথমিক থেকে ৪র্থ শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান গুরুত্বহীন করে রাখা ও পরীক্ষার কর্মকাণ্ড ব্যস্ত থাকা।

শিশুদের নৈতিক অবক্ষয়: ২০১৫ শিক্ষাবর্ষ ছাড়া অন্যান্য সময়ে অভিভাবক, শিক্ষক যৌথভাবে প্রশ্ন সংগ্রহ করে শিশুদের হাতে তুলে দিয়েছে। শিশুরা এটাকে স্বাভাবিক কর্ম হিসেবে গন্য করার অভ্যাস করছে। পরীক্ষার হলে উত্তর সমাধান করে দিয়ে জিপিএ-৫ পাওয়ার নিশ্চয়তা দিচ্ছে। এহেন অনৈতিক কাজে শিক্ষক অভিভাবক যৌথভাবে পরম তৃপ্তি লাভ করছে। এভাবে তারা নিজেদের বা প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা বৃদ্ধি করছে।

এ যেন বিশাল প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র। কার সন্তান কত ভালো ফল করবে, কার স্কুল কত বেশি জিপিএ-৫ বা বৃত্তি পাবে। এ অশুভ প্রতিযোগীতা ব্যনারে ব্যানারে সারাদেশ সজ্জিত হচ্ছে। এ নিয়ে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক্স মিডিয়াগুলোতে বিজ্ঞাপন প্রচারের প্রতিযোগিতা চলছে। বহুনির্বাচনী পরীক্ষার আধিক্যের ফলে শিশুদের মাঝে নকল প্রবণতা বেড়ে যাওয়ায় অনেক কাজে তারা অভ্যস্থ হয়ে পড়ছে। নোট, গাইড বই যোগ্যতাভিত্তিক প্রশ্নের নামে ও পাঠ্যপুস্তক বহির্ভূত প্রশ্ন, রচনা শিশুদের এমনকি শিক্ষকদের, অভিভাবকদের অস্থির করে তোলে। সে সুযোগে শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীর প্রিয় বন্ধু হিসেবে একাধিক প্রকাশনীর গাইড সমাদৃত হয়ে আসছে।

বইগুলো এমনভাবে লেখা বা অনুশীলনীতে এমন প্রশ্ন আছে যা পাঠ্য বইয়ের সাথে সম্পর্কবিহীন। যেমন বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচয় বইয়ে জেনারেল অরোরা বা কর্ণেল ওসমানি বড়দের বা শিক্ষকদের কাছে থেকে জেনে নেওয়ার জন্য অনুশীলনীতে প্রশ্ন দেওয়া আছে। এরকম অসংখ্য প্রশ্নে ভরা বই। বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষক, অভিভাবকদের বেশির ভাগের এসব প্রশ্নের উত্তর বিশদভাবে জানা নেই। আমরা যারা স্বাধীনতার সময়ের আমাদেরই অনেকের ব্যাপকভাবে বিভিন্ন প্রশ্নের ব্যাপক বিবরণ জানা বা মনে নাই। পাঠ্য বই ও পরীক্ষা সকলকে নোট গাইডের প্রতি আসক্ত করে তুলেছে।

কোচিং বা বাড়তি চাপ: সমাপনী পরীক্ষা শিশুর মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্থ করে। পাঠ্য পুস্তককে অকার্যকর করে শুধু নোট গাইডের বহুনির্বাচনী প্রশ্ন, পাঠ্য বই বহির্ভূত প্রশ্ন রচনার কমন পড়ানোর কোচিং বা বিশেষ পাঠ দিয়ে শিশুর তথা অভিভাবকের স্বাভাবিক ঘুম তথা আরাম হারাম করে দেয়। শিশু ঘুম থেকে উঠে একটু হাটাহাটি, বিকেলে একটু খেলা ও টিভিতে বিশেষ অনুষ্ঠান দেখা তার জীবনে শিশুকাল থেকে হারিয়ে যায়। সাধারণত অভিভাবক তথা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো ৪র্থ শ্রেণি থেকে সমাপনী উপলক্ষে শিশুর ওপর চাপ প্রয়োগ করা শুরু করে। ১ম-২য় শ্রেণিতে ৩টা বই। ৩য়-৫ম শ্রেণিতে ৬টি বই। এরপর ৬ষ্ঠ শ্রেণি থেকে ১৪টা বই এরপর বিষয়ভিত্তিক এক বা একাধিক নোট গাইডতো আছে।

প্রাক প্রাথমিক থেকে ৪র্থ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পাঠদান গুরুত্বহীন: সমাপনী পরীক্ষার ব্যস্ততার ও অন্যান্য কাজে শিক্ষকেরা নিচের ক্লাসের শিক্ষার্থীর ওপর তেমন যত্ন নেয়না। যেমন গোড়ায় পানি না দিয়ে আগায় পানি দেওয়ার মতো। যার ফলে ৫ম শ্রেণির শিক্ষার্থীর পাঠদান তেমন ফলপ্রসু হয় না।

সমাপনী কাজে শিক্ষকদের ব্যস্ত রাখা: সমাপনীর সমুদয় কাজ শিক্ষকদের করতে হয়। সারা বছর বিশেষ করে আগস্ট থেকে বহু স্কুলে স্বাভাবিক পাঠদান হয় না। এছাড়াও সমাপনী পরীক্ষায় চারু কারু, শারীরিক শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক কর্মকা-ের কোন পরীক্ষা হয় না ফলে নিচের ক্লাস থেকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এ বিষয়গুলোর পাঠদান অনেকটা বিলুপ্তির পথে। সমাপনী পরীক্ষা এবছর থেকে বাতিল করে শিশুর সার্বিক বিকাশে কতিপয় সুপারিশ করছি:

বর্তমান পরীক্ষা পদ্ধতি সার্বিক জ্ঞান অর্জন যাচাইয়ের সুযোগ থাকে না। বরং অনেকটা বাণিজ্যিক ভিত্তিক। সমাপনীতে বিশাল বাজেট খরচ সহ ১ম-৫ম শ্রেণির পরীক্ষার সময় প্রত্যেক থানা/উপজেলা বছরে লক্ষ লক্ষ টাকা আয় করে। পরীক্ষা ব্যবস্থার শিশুর ভীতি বা চাপ প্রয়োগ না করে স্বয়ং সম্পূর্ণ প্রশ্নপুস্তিকা সরবরাহ করে অধ্যায় বা গল্প ভিত্তিক মূল্যায়ন ব্যবস্থা গড়ে তোলা হোক। দুর্বল বা অনুপস্থিত শিক্ষার্থীকে বিশেষ পাঠের মাধ্যমে তাদের পাঠে স্বয়ং সম্পূর্ণ করা। দিনে, সপ্তাহে এমনকি মাসে পাঠদানে মাঝে মাঝে শিশুর অর্জিত জ্ঞান যাচাই করা।

শিশুর আচরণগত পরিবর্তনের লক্ষ্যে শিশুর সার্বিক বিকাশের জন্য খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকা বিতর্ক প্রতিযোগিতা, চারু কারু, শারীরিক শিক্ষায় সকলকে অংশগ্রহণ সহ মিলাদ মাহফিল, জাতীয় দিবসগুলো সফলভাবে পালন করতে হবে। শিক্ষার্থীর নিয়মিত উপস্থিতি, বাথরুম ব্যবহার, নখ, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা, সহপ্রার্থীদের সাথে তাদের আচার আচরণ মূল্যায়নের আওতায় থাকবে। এক কথায় সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার জন্য শিক্ষার্থীকে এসব কর্মকা-ের পরীক্ষা কঠোরভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। বিদ্যালয়গুলোতে পর্যাপ্ত শিক্ষকের ও ব্যবস্থা থাকতে হবে। শিক্ষার্থীকে স্বয়ংসম্পূর্ণ জ্ঞান অর্জনে শিক্ষকদের পুরস্কার ও তিরস্কার বা শাস্তির ব্যবস্থা থাকতে হবে। যাতে পরীক্ষা জ্ঞানে অর্জনের যাচাই পুরোপুরি হয়।

স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রশ্ন পুস্তিকা, শিশুকে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার জন্য সার্বিক মূল্যায়ন, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত শিক্ষক, সুযোগ সুবিধা ও সর্বশেষে শিক্ষকসহ সর্বমহলের জবাবদিহীতার মাধ্যমে শিশুর সার্বিক জ্ঞান অর্জন করানো সম্ভব। এবছর থেকেই প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রীর উদ্যোগে ৫ম শ্রেণির সমাপনী পরীক্ষায় সমাপ্তি হোক এ প্রত্যাশায়।

লেখক: আহ্বায়ক, প্রাথমিক শিক্ষক অধিকার সুরক্ষা ফোরাম।

(সংগৃহিত)