ধর্ষকেরা বিশ্রাম নেবে কবে?

অর্ণব সান্যালট
এ দেশের ধর্ষকদের ক্লান্তি নেই। তারা লাগাতার ধর্ষণ করতে পারে। বাসে ১০ মিনিটের দূরত্বেও তাদের ধর্ষণ করার দক্ষতা রয়েছে। খেতে বসা ছয় বছর বয়সী শিশুকেও তারা টেনে নিয়ে ধর্ষণ করতে পারে। কিশোরীকে ধর্ষণের পর তার হাত-পা বেঁধে ড্রেনে ফেলে দিতেও তাদের জুড়ি নেই। কিন্তু এই পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণীকেই তো বিশ্রাম নিতে হয়। প্রশ্ন হলো, এ দেশের ধর্ষকেরা বিশ্রাম নেবে কবে?

নারীর প্রতি যৌন সহিংসতার অন্যতম ভয়াবহ রূপ ধর্ষণ। সেই ধর্ষক, যে অন্যের অসম্মতি সত্ত্বেও জোর করে শারীরিক সংসর্গ করে। মানবসভ্যতার যত দিনের ইতিহাস জানা যায়, তার প্রতিটি স্তরেই নারীর প্রতি এমন যৌন নির্যাতনের ইতিহাস রয়েছে। তত্ত্বমতে, নারীকে মানসিকভাবে ‘শক্তিহীন’ প্রমাণ করতেই পুরুষেরা যুগে যুগে এমন নিপীড়ন চালিয়ে এসেছে। এই বিশ্বে যত বড় বড় যুদ্ধ হয়েছে, তার প্রতিটিতেই নারীর বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতা চালানোর উদাহরণ পাওয়া গেছে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধেও এমন ঘটনা বিস্তর ঘটেছে। কিন্তু সেসব নিদারুণ অতীত ভুলেই এখন এ দেশের ‘কতিপয়’ পুরুষ ধর্ষণকে একটি নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত করেছে।

মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, চলতি মাসের প্রথম ৮ দিনে সারা দেশে ৪১ শিশু ধর্ষণ ও ৩ শিশু ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছে। এ বছরের মে মাসের ১ থেকে ৮ তারিখ পর্যন্ত ছয়টি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ৩৭টি মেয়েশিশু ধর্ষণ এবং ৪টি ছেলেশিশু বলাৎকারের শিকার হয়েছে। ধর্ষণের চেষ্টা চালানো হয়েছিল ৩ জনের ওপর। ধর্ষণের শিকার হয়ে মারা গেছে ৩টি মেয়েশিশু । আহত হয়েছে ৪১ শিশু।

এই আহত ৪১ শিশুর পরবর্তী জীবনটা কেমন হবে? এই সমাজের ‘চরিত্র’ যেমন, তাতে ধরে নেওয়াই যায় যে আহত শিশুগুলোর ‘ট্রমা’ শেষ হতে ঢের সময় লাগবে। কারণ আমাদের আপাত-আত্মকেন্দ্রিক সমাজ ঠিক এই ক্ষেত্রে বেজায় বহুমাত্রিক। এই সমাজ অন্যায়ের প্রতিবাদে ততটা উৎসাহী না হলেও, অন্যের মনের ক্ষত খুঁচিয়ে বের করতে মোটেও অনুৎসাহী নয়। বিভিন্ন অনুন্নত সমাজের মতো আমাদের এই জনপদেও যৌন সহিংসতায় আক্রান্ত নারীদেরই সব সময় ‘একঘরে’ করে রাখা হয়, আক্রমণকারী পুরুষকে নয়। নারীদের বোঝানোর চেষ্টা করা হয়, নিজের দোষেই তারা আক্রান্ত হয়েছে। তাই পোশাকের দোষ তোলা হয়, ওঠে চালচলন নিয়ে অভিযোগ। সন্তর্পণে নিজেদের ত্রুটি ও অপরাধ এড়িয়ে যেতে চায় পুরুষশাসিত সমাজ।

কিন্তু তাই বলে কি শাক দিয়ে মাছ ঢাকা যায়? এ দেশে নারীর প্রতি যৌন সহিংসতা এত তীব্র হয়েছে সুবিচারের অভাবে। গত বছর চালানো প্রথম আলোর এক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ধর্ষণ, যৌন পীড়নের মতো ৬টি নির্দিষ্ট অপরাধে ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে দায়ের করা মামলায় ৯৭ শতাংশ ক্ষেত্রে সাজা হয়নি। ২০০২ থেকে ২০১৬—এই ১৫ বছরে দায়ের করা ৭ হাজার ৮৬৪টি মামলার তথ্য বিশ্লেষণ করে এই ফলাফল পাওয়া গেছে (সাজা মাত্র তিন শতাংশ, প্রথমা প্রকাশন)। তাই কুমিল্লার ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী ও নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনু হত্যা মামলার তদন্ত তিন বছরেও শেষ হয় না। এমনকি ওই মামলার আসামিও শনাক্ত হয় না। যখন একজন দেখবে এ ধরনের চরম মাত্রার অপরাধ করেও পার পাওয়া যাচ্ছে, তখন আরেক হনেওয়ালা অপরাধীকে ঠেকাবে কে? তাই এসে যাচ্ছে ধর্ষকদের ইচ্ছাকৃত বিশ্রাম নেওয়ার প্রসঙ্গ। এ ছাড়া আর উপায় কি বলুন?

এখন ধর্ষকেরা শুধু ধর্ষণ করেই ক্ষান্ত হচ্ছে না, নির্যাতনের শিকার নারীর জান কেড়ে নিতেও তারা সিদ্ধহস্ত। আবার সেই ধর্ষণ ও হত্যাকে নিছক ‘দুর্ঘটনা’ বলে প্রতীয়মান করতেও তারা মাথা খাটাতে পারে। ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে নার্স হিসেবে কাজ করতেন শাহিনুর আক্তার। বাড়িতে ফিরতে চেয়েছিলেন তিনি। কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী থেকে বাজিতপুরের পিরিজপুর বাসস্ট্যান্ড যাওয়ার পথে যাত্রীবাহী বাসে ধর্ষণের শিকার হন তিনি। চালক নুরুজ্জামান, চালকের সহকারী লালন মিয়াসহ তিনজন ধর্ষণ করেন তাঁকে। এরপর শাহিনুরকে বাস থেকে ফেলে হত্যা করা হয়। ধর্ষণ ও হত্যাকে লুকাতে নানা ছলচাতুরীর আশ্রয় নেয় অভিযুক্ত ব্যক্তিরা। যদিও সবশেষে আদালতের কাছে অপরাধের কথা স্বীকার করেছে অপরাধীরা। তবে ততক্ষণে ঝরে গেছে একটি তাজা প্রাণ, মৃত্যুর আগে চরম অপমান সইতে হয়েছে তাঁকে। অন্য যাত্রীরা নেমে গেলেও তিনি বাসে ছিলেন—এই ছিল তাঁর অপরাধ!

সব সমাজেই অপরাধী আছে। আবার সমাজে ভালো মানুষেরও জন্ম হয়। একটি সমাজ তখনই সভ্য হয়, যখন খারাপের তুলনায় ভালোর আধিক্য থাকে। কিন্তু আমাদের সমাজে খারাপের অনেক ‘শেড’ আছে, অপরাধীর অনেক সমর্থক আছে। এখনো রাজধানীর পাবলিক বাসে নারীদের জন্য নির্ধারিত আসনে বসতে কিছু পুরুষের প্রবল বাগ্‌বিতণ্ডা চোখে পড়ে, অনেকে কুৎসিত কথা বলতেও ছাড়েন না। আর প্রাত্যহিক চলাফেরায়, রাস্তাঘাটে যেকোনো বয়সের নারীর প্রতি ইঙ্গিতপূর্ণ ও অনাকাঙ্ক্ষিত শারীরিক স্পর্শ তো আছেই। এ ধরনের হেনস্তার শিকার হননি, এমন নারীর সংখ্যা এ দেশে খুবই কম। এসব কাজ যেসব পুরুষ করে থাকেন, তাঁরা হয়তো আক্ষরিক অর্থে ধর্ষক নন, কিন্তু তাঁরা ধর্ষকামী। এরাই এক সময় ধর্ষকের পক্ষ নেন। নারীর প্রতি এই প্রবল বিরূপ দৃষ্টিভঙ্গি যে এ দেশে একটি ব্যাপক সামাজিক সমস্যা তৈরি করেছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।

বিশ্বব্যাপী মা দিবস পালনের দিন, এ দেশের তাবৎ পুরুষের প্রতি নারীদের মানুষ হিসেবে গণ্য করার অনুরোধ রইল। কেননা, এই একটিমাত্র পথেই পুরুষেরা ‘মানুষ’ হয়ে উঠতে পারবে।

অর্ণব সান্যাল: সাংবাদিক
arnab.sanyal@prothomalo.com

সৌজন্যেঃ প্রথম আলো