আজ আমাদের সম্মিলিত হওয়ার দিন

তুষার আবদুল্লাহ:

পহেলা জুলাই রাতে বাংলাদেশকে নতুন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হলো। সন্ত্রাসী বা জঙ্গি আক্রমণের সঙ্গে পরিচয় থাকলেও, এভাবে জিম্মি সংকটের কবলে বাংলাদেশ পড়লো প্রথমবারের মতো। খবরটি যখন গণমাধ্যমের এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে প্রথম আসে, তখন তাৎক্ষণিক ধারণা করা হয়েছিল কোনও সন্ত্রাসী গ্রুপ হয়তো হলি আর্টিজান নামের রেস্টুরেন্টটিতে ডাকাতি বা চাঁদাবাজির উদ্দেশ্যে অবস্থান নিয়েছে। চাঁদা আদায়ের জন্য রেস্টুরেন্টের কর্মচারী-গ্রাহকদের হুমকি দিচ্ছে। তারা গ্রাহকদের জিম্মি করে আইন-শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর দিকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেবে এমন ধারণা আসেনি।

তাদের প্রস্তুতি ও সক্ষমতা সম্পর্কে সঠিক তথ্য ছিল না বলেই পুলিশের দুই কর্মকর্তা সাধারণভাবেই সন্ত্রাসীদের কাবু করতে গিয়েছিলেন। কিন্তু সন্ত্রাসীরা গ্রেনেড ও গুলি ছুঁড়লে দুইজন পুলিশ কর্মকর্তা নিহত হন। সন্ত্রাসীদের আচমকা আক্রমণে হতভম্ব হয়ে পড়ে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা। অবশ্য দ্রুতই তারা পরিস্থিতি সামলে নেয়। ধীরে ধীরে র‌্যাব, পুলিশ, বিজিবি ও সশস্ত্র বাহিনী গুলশান এলাকায় জমায়েত হতে থাকে। প্রস্তুতি চলতে থাকে জিম্মি উদ্ধার অভিযানের। শুক্রবার রাত বাংলাদেশ নির্ঘুম কাটিয়েছে বলতে হবে। যারা বাংলাদেশে আছেন আর আছেন যারা প্রবাসে, সবার নজর ছিল হলি আর্টিজানে। আন্তর্জাতিক দৃষ্টি ছিল আরও তীক্ষ্ণ। শুক্রবার ও শনিবার বিদেশি গণমাধ্যমের আচরণ দেখেই আমরা সেটা বুঝতে পেরেছি।

সমালোচনার মুখে পড়েছে স্থানীয় গণমাধ্যমও। বিশেষ করে টেলিভিশন চ্যানেল। কেবল সরকারের নয়, দর্শকদের সমালোচনাও সইতে হয়েছে। পুলিশের ওপর যখন গুলি ও গ্রেনেড ছোঁড়া হয়, তখন গণমাধ্যমও সেখানে উপস্থিত ছিল। সরাসরি সম্প্রচার করেছে কোনও কোনও চ্যানেল। কিন্তু যখন উদ্ধার অভিযানের কৌশলগত কারণে র‌্যাবের মহাপরিচালক সরাসরি সম্প্রচার না করার অনুরোধ করেন, তখন ধীরে ধীরে টেলিভিশন চ্যানেলগুলো সরাসরি সম্প্রচার থেকে সরে আসতে থাকে। হলি আর্টিজানের বদলে হাসপাতাল থেকে সম্প্রচার চলে। তবে সরাসরি সম্প্রচার থেকে টেলিভিশন চ্যানেলগুলো সরে আসতে সময় নিয়েছিল সত্য। কারণ পারস্পরিক প্রতিযোগিতা দর্শক হারানোর ভয়।

যে চ্যানেল আগে বের হবে, সেই চ্যানেল থেকে দর্শক আগে সরে যাবে। তাই দর্শক ধরে রাখতে সরাসরি সম্প্রচারের থেকে সরে এসে টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর সংবাদ উপস্থাপক ও বার্তাকক্ষের সদস্যরা নিজেরা ঘটনা নিয়ে পর্যবেক্ষণ আলোচনা করেছেন। সকল আলোচনা যে পরিপক্ক ছিল, সেই দাবি গণমাধ্যমগুলো হয়তো করবে না। তবে তারা নিশ্চয়ই এই দাবিটি করতে পারেন, দর্শকরা যতোই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচারের যৌক্তিকতা ও মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেন না কেন, তারা শেষ পর্যন্ত ঘটনার কী পরিণতি দাঁড়ায় তা জানতে যে টিভি সেটের সামনে বসে থাকতে চেয়েছেন, গণমাধ্যম তাদের সেই চাহিদার সঙ্গী হতে চেয়েছে মাত্র। আর যেহেতু এধরনের অভিজ্ঞতা সকলের জন্যই প্রথম, তাই কিছু ভুল গণমাধ্যমেরও ছিল। আগামীতে তারা সেটি নিশ্চয়ই তা শুধরে নেবে। তবে এবারও কিন্তু একটি বিষয়ে টেলিভিশনগুলো সংযমের পরিচয় দিয়েছে। হতাহতের খবর ও সংখ্যা তারা কোনও একটি দায়িত্বশীল সূত্র নিশ্চিত না করা পর্যন্ত জানায়নি। অনুভূতি জানতে দেখা যায়নি জিম্মিদের চেপে ধরতেও।

তবে বাংলাদেশ এখন যে চ্যালেঞ্জের মুখে। বিশ্ব আজ বাংলাদেশকে যে চোখে দেখতে চাইবে। বাংলাদেশকে সেই গন্তব্য থেকে সরে দাঁড়াতে হবে। ওই অনাকাক্ষিত পরিচয় বাংলাদেশের গন্তব্য হতে পারে না। সরকারে যারা আছেন, যারা আছেন সরকারের বাইরে সেই রাজনৈতিক দলগুলোকে এখন আর বিচ্ছিন্ন অবস্থানে থেকে পারস্পরিক দোষারপের রাজনীতি করলে চলবে না। নিরাপত্তা ইস্যুতে তাদের ঐক্যমতে পৌঁছতে হবে। দেশের জনগণকে নিয়ে তাদের রাজনীতি। জনগণ যদি নিরাপত্তা নিয়ে স্বস্তিতে না থাকে, তাহলে সরকার বা রাষ্ট্র স্বস্তি থাকে কী করে? একক ভাবে গণমাধ্যম, রাজনৈতিক দল, সরকার এই স্বস্তি নিশ্চিত করতে পারবে না। ২০ জন নিরাপরাধ মানুষ, ২ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে হারানোর এই দিনটিই বুঝি আমাদের সম্মিলিত হতে কড়া নেড়ে গেল।