কক্সবাজারের দুই রূপ

মিজানুর রহমান খানঃ
এক যুগের বেশি সময় পরে পর্যটন নগরী কক্সবাজারে গিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার পাশাপাশি আশাবাদীও হয়েছি। উদ্বিগ্ন হওয়ার মূল কারণ, তিন লাখ কোটি টাকার বেশি উন্নয়নযজ্ঞ যে জনপদে, সেখানে রোহিঙ্গা সমস্যা ক্রমেই ডালপালা বিস্তার করছে। আর আশাবাদের প্রধান কারণ সরকারের নেওয়া ২৫ মেগা উন্নয়ন প্রকল্পের কয়েকটির বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার গতিশীলতা। কিন্তু চেষ্টা করেও প্রকল্পওয়ারি অগ্রগতির নির্দিষ্ট রূপটি ধরতে পারিনি। কক্সবাজার–২ আসনের সাংসদ আশেক উল্লাহ রফিকের সঙ্গে কথা বলে অনুমান হলো, মেগা প্রকল্পগুলো বাস্তবে ৫ থেকে ১০ ভাগ বাস্তবায়িত (মুখ্যত জমি অধিগ্রহণ অর্থে) হয়েছে। গত ১০ বছরে ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি হয়তো খরচ হয়েছে।

তবে পর্যটন শহর কক্সবাজারই বাংলাদেশকে উচ্চ–মধ্যম আয়ের দেশ হওয়ার পথে এক ধাপ এগিয়ে নিতে পারে। স্পেশাল ব্রাঞ্চ সূত্রে ট্যুরিজম বোর্ড ১০ এপ্রিল আমাদের বলেছে, ‘ছয় বছরে (২০১০–২০১৭) গড়ে বাংলাদেশে পৌনে ৬ লাখ বিদেশি এসেছেন।’ ২০১০ সালে বিদেশি পর্যটকদের থেকে আয় ছিল মাত্র ৭৯ মিলিয়ন ডলার। এটা বেড়ে দেড় শ মিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পুরোদমে চালু (এ পর্যন্ত ২৪টি ফ্লাইট ওঠানামা করেছে) হলে এখানে আসা বিদেশি পর্যটকেরা এখান থেকেই দেশে ফিরে যেতে পারবেন। তাঁদের আর ঢাকা শহরের যানজট দেখতে হবে না।ঢাকায় পর্যটন

করপোরেশনের চেয়ারম্যান আখতারুজ্জামান খান কবির আমাদের বলেন, ‘গত ১০ বছরে পর্যটনের সামর্থ্য বাড়াতে ১৯১ কোটি টাকার সরকারি বিনিয়োগ এসেছে। কিন্তু বিমানবন্দরগুলোর আধুনিকায়ন ও ড্রিমলাইনার কেনার মতো (কয়েক হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে) বিনিয়োগও পর্যটনের অন্তর্ভুক্ত।’ ২০০ কোটি টাকায় মোটেল প্রবাল ভেঙে তৈরি হবে নতুন প্রবাল। কম খরচে তরুণ ব্যাকপ্যাকারদের সমুদ্রবিলাসের জন্য হাতিয়া ও নিঝুম দ্বীপে ভিলা হবে, কক্সবাজারের ‘লাবণী’ সাজবে নতুন করে।

গত ৪ মার্চ সুরম্য রিসোর্ট রয়্যাল টিউলিপে কয়েক ঘণ্টা কাটানোর সময় এক সম্ভাবনাময় বাংলাদেশের কথাই মনে হয়েছে।ঢাকার কমলাপুর থেকে ট্রেনে চেপে ছয় ঘণ্টায় কক্সবাজার (আগামী ৪ বছরে সম্ভব হতে পারে), এরপরে চীনের কুনমিং। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি তাৎপর্যপূর্ণভাবে বলেছেন, চীনের ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড (সড়ক, নৌ ও আকাশ কানেকটিভিটি) নিয়ে ভারতের উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। সারা দেশের প্ল্যান্টগুলো এখন প্রায় ২০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ দিচ্ছে। মাতারবাড়ীর প্রস্তাবিত জ্বালানি কেন্দ্র দেবে ১৩ হাজার ৫৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। সোয়া ২ লাখ কোটি টাকার প্রকল্পটি শুধুই কষ্টকল্পনা নয়, (প্রকল্প পরিচালক জানান, চীনের সঙ্গে একটি অংশের চুক্তি হয়ে গেছে) এটি প্রাথমিক স্তর পার করছে। তবে সরেজমিনে ১২০০ মেগাওয়াটের কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্পে জাইকা সক্রিয়।

মন্ত্রিপরিষদের তদারকে জমি অধিগ্রহণ যে কত দ্রুত হতে পারে, তার এক দৃষ্টান্ত তৈরি হয়েছে কক্সবাজারের মাতারবাড়ী প্রকল্পে। ওই জ্বালানি কেন্দ্রের জন্য পাঁচ হাজার একরের বেশি জমি অধিগ্রহণ ও হস্তান্তর শেষ। আরও অর্ধশতাধিক প্রকল্পে ১৩ হাজার একর জমির অধিগ্রহণ দরকার। গত ছয় মাসে আট হাজারের বেশি একর জমি (রেল, বিমানবন্দর, মাতারবাড়ী) সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কাছে বুঝিয়ে দিয়েছে বলে জেলা প্রশাসন সূত্রের দাবি। এর বাইরে মহেশখালীতে বিভিন্ন প্রকল্পের জন্য আরও আট হাজার একর জমির স্থায়ী বন্দোবস্ত সম্পন্ন করা হয়েছে। ৭ জন ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা, ১৪ জন কানুনগো এবং ৪২ জন সার্ভেয়ার, যাঁদের কাজের চাপ কম ছিল, সারা দেশ থেকে অস্থায়ীভাবে জড়ো করা হয়েছে কক্সবাজারে।

বর্তমানে দেশে চাহিদার বিপরীতে ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি। আমরা ঢাকায় বাসাবাড়িতে গ্যাস–সংকটে ভুগি, চট্টগ্রামের সংকট কেটে গেছে। কাতার থেকে আমদানি করা এলএনজি গ্যাস প্রতিদিন এখন ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট ঢুকছে নবনির্মিত ৩১ ইঞ্চি পাইপলাইনে, ৪২ ইঞ্চি ব্যাসার্ধের পাইপলাইন নির্মাণ শেষ হলে ঢাকার গ্যাস–সংকটও অনেকটা ঘুচবে। কক্সবাজারের নয়নাভিরাম খুরুশকুল বিচে ৮০০ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নামে পাঁচ তারকা হোটেলের সুবিধা–সংবলিত ১০ তলা টাওয়ার এবং ৫ তলাবিশিষ্ট ১৩৭টি ভবন হবে। বিমানবন্দর তৈরির ফলে উচ্ছেদ হওয়া প্রায় চার হাজার পরিবার ঠাঁই পাবে এসব ভবনে। অনন্য এই আশ্রয়ণ প্রকল্পের প্রথম ২০টি পাঁচতলা ভবনের নির্মাণ দৃশ্যমান।

এই উন্নয়ন পরিকল্পনার পাশাপাশি কক্সবাজারে প্রায় ৩৬ হাজার প্রতিবন্ধীর জন্য সুইস রেডক্রসের অর্থানুকূল্যে একটি বহু সুবিধাবিশিষ্ট ভবন ‘অরুণোদয়’–এর কাজ শেষের পথে। সরেজমিনে গিয়ে শুনলাম, সরকারি জায়গাটি বেহাত ছিল। এখন এ ভবনেই শুরু হবে কক্সবাজারের প্রথম ব্লাডব্যাংক। বিনা মূল্যে প্রবীণ ও পথশিশুদের স্বাস্থ্যসেবা, বিনোদনের ব্যবস্থাও থাকবে। রুটিন কাজের বাইরে একজন ডেপুটি কমিশনারের বিশেষ উদ্যোগের এটি একটি ভালো উদাহরণ। ৪ মার্চ একটি মতবিনিময় সভায় যোগ দিই, সেখানে অভিভাবকেরা এসেছিলেন; তাঁরা এই কাজের জন্য স্থানীয় প্রশাসনকে সাধুবাদ দেন।

ছয় হাজার একর জমিতে থাকা ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর অর্ধেকের বেশি শিশু–কিশোর। অবিলম্বে স্বেচ্ছা–প্রত্যাবাসনের পাশাপাশি তাদের জনসম্পদে পরিণত করা একটি চ্যালেঞ্জ। কুতুপালংয়ে ইউনিসেফ পরিচালিত একটি স্কুলে যাই। তাদের দুটি বই। একটি বর্মি, অন্যটি ইংরেজিতে। বাংলা নেই। বয়সের কোনো বিষয় নেই। কোনো পরীক্ষা নেই। বছরের পর বছর তারা একই বই পড়বে। শিক্ষা বিভাগের কর্মকর্তারা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা দিয়ে তাদের কাজে লাগানোর পক্ষে। ৩০টি ক্যাম্পের পরিবেশ কোথাও ভালো, কোথাও ভালো নয়। তবে রোহিঙ্গাদের প্রতি গোড়াতে স্থানীয় লোকজনের মনে যত সহানুভূতি ছিল, এখন আর তত নেই। স্থানীয় বাসিন্দারা উদ্বিগ্ন। আবার রোহিঙ্গাদের মধ্যে অন্তঃকলহ বাড়ছে। তাই ২৪ ঘণ্টার টহলদারিতে সেনাবাহিনীও যুক্ত হয়েছে।

জঙ্গি সংগঠন আরসার নামে অনধিক ২০ জন সক্রিয়, এমন দাবি করেন একজন রোহিঙ্গা নেতা। কর্মকর্তারা অবশ্য বলেন, তাঁরাও এমন শোনেন,
কিন্তু সুনির্দিষ্টভাবে তাদের চিহ্নিত করা যায়নি। তবে বিশ্বকে যেটা জানাতে হবে, সেটা হলো সংরক্ষিত বন ও পাহাড় কেটে গড়ে ওঠা রোহিঙ্গা বসতির নিরাপত্তা প্রতিবছরই বর্ষায় বাড়তি ঝুঁকিতে থাকবে। বড় ঝড়, ভূমিধসে প্রাণহানি বেশি হতে পারে। কুতুপালং বিশ্বের বৃহত্তম উদ্বাস্তু শিবির। প্রশাসন তাদের ‘উদ্বাস্তু’ বলে না। রোহিঙ্গাও বলে না। বলে বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিক। রোহিঙ্গাদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য মহা ঝুঁকিতে। কিন্তু বৈশ্বিক সহায়তা বাড়ছে না। গত বছর চাওয়া ৯০০ মিলিয়ন ডলার সাহায্যের ৬৭ ভাগ অর্জিত হয়েছিল, এবারেও তার চেয়ে কম প্রত্যাশিত নয়।

কক্সবাজারের জনজীবনে অবশ্য সহিংসতা কম। কারণ, সেখানে গোষ্ঠীগত হাঙ্গামা নেই। এমনকি আওয়ামী লীগ ও বিএনপির লোকজনও মিলেমিশে আছেন। তবে মাদকই বৃহত্তম নিরাপত্তাঝুঁকি। কর্মকর্তাদের মতে, সব মিলিয়ে দুই হাজার মানুষ মাদকে জড়িত। আত্মসমর্পণকারী ১০২ জনের পুনর্বাসনের প্রক্রিয়া চলমান। মাদক পাচারে কিছু রোহিঙ্গার অংশ নেওয়ার যোগসূত্র আছে। আশার দিক হলো, স্থানীয় লোকজন মাদকাসক্ত হয়নি। মাদক পাচারের দায়ে একজন রোহিঙ্গার সম্প্রতি ১০ বছরের কারাদণ্ড হয়েছে। বিজিবি–পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ দুজন রোহিঙ্গা নিহত হয়েছে। আত্মসমর্পণকারী ১০২ জনের মধ্যে সাবেক এমপি আবদুর রহমান বদির তিন ভাই ও ভাগনেও আছেন। ডেপুটি কমিশনার মো. কামাল হোসেন অকপটে বললেন, এর সঙ্গে একবার জড়ালে মুক্ত হওয়া কঠিন।

সমুদ্র অর্থনীতি বা ব্লু ইকোনমি নিয়ে কম জায়গায় বেশি জিডিপি করার দৃষ্টান্ত সিঙ্গাপুর। দেশটি কক্সবাজারের চেয়ে আয়তনে তিন ভাগের এক ভাগের কম। নিশ্চয় ভৌগোলিক ও অন্যান্য সুবিধায় অগ্রণী সিঙ্গাপুরের সঙ্গে কক্সবাজারের কোনো তুলনা চলে না।আবার এটাও ঠিক, চীনের কুনমিং, উত্তর–পূর্ব ভারত, নেপাল, ভুটান ও মিয়ানমারের চীন ও রাখাইনের অন্তত ৩০ কোটি মানুষের নিকটতম গভীর সমুদ্রবন্দর হতে পারত সোনাদিয়া।সাংসদ রফিক বলেন, জাপান মাতারবাড়ীতে একটি কয়লাবন্দর করছে, যা পরে বাণিজ্যিক বন্দরে রূপান্তর করা হতে পারে। এখানে চ্যানেল খননের কাজ প্রায় ২০ শতাংশ শেষ।

কক্সবাজারকে সিঙ্গাপুরের আদলে কিছু করার মূল বাধা ছিল সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়ন। এখন তার সঙ্গে নতুন যে মাত্রা নিয়ে যুক্ত হয়েছে, সেটা রোহিঙ্গা পুনর্বাসন।

মিজানুর রহমান খান: প্রথমআলোর যুগ্ম সম্পাদক
mrkhanbd@gmail.com

সৌজন্যেঃ প্রথম আলো