পহেলা বৈশাখঃ জাতীয়তার প্রতীক

আহমদ রফিকঃ
বৈশাখী উৎসব এখন মূলত শহুরে, স্পষ্ট করে বলতে গেলে রাজধানী ঢাকাকেন্দ্রিক। এটা সময়ের দান। কিন্তু বাংলা নববর্ষের উৎসব- অগ্রহায়ণ বা বৈশাখ বা অন্য যে কোনো দিনেই হোক, সেই আদ্যিকাল থেকে গ্রামকেন্দ্রিক। লোকজ সংস্কৃতির প্রকাশ হিসেবে গ্রামাঞ্চলে এ উৎসব মেলাকে কেন্দ্র করে জমে ওঠে। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বলতে আমরা যা বুঝি, তা গ্রামের বৈশাখী উৎসবে দেখা যায়নি। এখন তো একেবারেই নয়। এক কথায় মেলাকেন্দ্রিক গ্রামীণ বৈশাখী উৎসব। ‘মেলা’ কথাটার মধ্যে রয়েছে সমষ্টিগত মিলনের তাৎপর্য। শুভেচ্ছা বিনিময় ও চিত্তবিনিময়েরও সুযোগ। সব মিলিয়ে এর সর্বজনীন চরিত্র সাংস্কৃতিক বিচারে গুরুত্বপূর্ণ। মেলা, বৈশাখী বা অবৈশাখী যেমনই হোক, রবীন্দ্রনাথের বিচারে সামাজিক গুরুত্ব বহন করে এসেছে। ‘মেলা’ শব্দটার মধ্যে হৃদয় খুলে ভরে দেওয়া ও ভরে নেওয়ার এবং বৃহতের যে ইঙ্গিত রয়েছে, সেই মর্মসূত্রটিকে তুলে ধরতে চেয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। উৎসব-আনন্দে তারই বহিঃপ্রকাশ।

একালের মতো গাছ কাটার ধুম না লাগায় গ্রাম তখনও গাছগাছালিতে ভরা। প্রায় প্রতিগ্রামেই অশ্বত্থ-বটের দেখা মিলত। আর বৈশাখী বাতাসে অশ্বত্থ বা বটের ছায়ায় জমে উঠত বৈশাখী মেলা, পহেলা বৈশাখের উৎসব। আজ থেকে ৬০-৭০ বছর আগে গ্রামে বৈশাখী মেলার ছবিটা ছিল এ রকমই। এমনকি এর কিছুকাল পরও। সেই ভোর থেকে ছোটদের কী প্রতীক্ষা- কখন থেকে মেলা শুরু হবে, কখন ঢাকের বাদ্যি, বাঁশির আওয়াজ শোনা যাবে। আর তখনই ভোরের বাতাস গায়ে মেখে মেলায় যাওয়া, এমনকি পরে কড়া-চড়া রোদও গায়ে লাগে না। ছোট ছোট কেনাকাটার মধ্যে ছোটদের উৎসবের আনন্দ। বিচিত্র সরঞ্জাম নিয়ে মেলা। রোদমাখা কচি অশ্বত্থ পাতার হালকা ছায়ায় মেলার শব্দময় সুরেলা জগৎ আর রঙিন পরিবেশ শিশু, কিশোর-কিশোরীদের জন্য যেন স্বপ্নময় হয়ে উঠত। পাশাপাশি বড়দের জন্যও ছিল বিনোদন ও প্রয়োজন মেটানোর ব্যবস্থা।

সবকিছু মিলিয়ে জৈবনিক প্রয়োজন, বিনোদন ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্যে বৈশাখী মেলা গ্রামীণ জীবনে একদিনের জন্য হলেও সর্বজনীন চরিত্র নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থেকেছে। ছোট-বড় সবার জন্যই যেন এক আকাঙ্ক্ষা পূরণের জগৎ। বৈশাখী মেলায় ছোটদের আনাগোনা বেশি হলেও সেখানে গ্রামের বয়স্ক মানুষের উপস্থিতিও ছিল যথেষ্ট। এমনকি লম্বা ঘোমটা-টানা গ্রামীণ গৃহবধূদেরও অনেক সময় পুরুষসঙ্গী নিয়ে মেলায় আসতে দেখা যেত। গ্রামের বৈশাখী মেলা এভাবে সম্প্রদায় নির্বিশেষে সবার জন্য একদিনের আনন্দ-উৎসব ও জাগতিক প্রয়োজন মেটার উৎস হয়ে থেকেছে। বলা বাহুল্য, দীর্ঘকাল থেকে এবং এভাবেই বৈশাখী মেলার একটা জাতীয় চরিত্র তৈরি হয়েছে। পরবর্তী সময়ে, সম্ভবত এখনও গ্রামের অর্থনৈতিক দুর্দশার সঙ্গে সঙ্গে মেলা তার ঝলমলে রূপ হারিয়েছে। এমনকি হারিয়ে গেছে গ্রামের ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক, জাগতিক চরিত্রের বেশ কিছু উৎসব। যেমন নবান্ন, তেমনি বর্ষায় নৌকাবাইচ, শুকনো মৌসুমে ঘুড়ি উৎসব, গরুদৌড় ইত্যাদি উৎসব-অনুষ্ঠান। সত্যি বলতে বর্তমান বাস্তবতা হলো, বৈশাখী নববর্ষের মেলা তার সব জৌলুস নিয়ে চলে এসেছে রাজধানী ঢাকায়; বিশেষ করে স্বাধীনতা-উত্তরকাল থেকে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রকমারি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, এমনকি মেলাও। এক কথায় ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিকতার সমন্বয়ে বাংলা নববর্ষের উৎসব-অনুষ্ঠান। এখানে শিক্ষিত, মধ্যবিত্ত, বিত্তবানরাই প্রধান। মূলত সাংস্কৃতিক এলিট শ্রেণির উদ্যোগে এ অনুষ্ঠানের নানামাত্রিক প্রতিফলন। তবে এ কথাও সত্য যে, ঢাকার জমজমাট উৎসব-নাট্যে প্রাকৃতজন অর্থাৎ শ্রমজীবী মানুষ দেখা যায় না। যদিও গ্রাম উঠে এসেছে নগরে। গ্রামীণ মেলার সর্বজনীন চরিত্র এখানে অনুপস্থিত।

একসময় ছায়ানটের মতো সাংস্কৃতিক সংগঠনের উদ্যোগে রমনার বটমূলে গানের সুরে ‘এসো হে বৈশাখ’ উচ্চারণে চলেছে বৈশাখের আবাহন। গান-বাজনার পাশাপাশি চলেছে সাংস্কৃতিক এলিটজনকে নতুন পাজামা-পাঞ্জাবি পরে ইলিশ-পান্তায় গ্রামীণ ঐতিহ্য ধরে রাখার চেষ্টা। চলেছে শহরের কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের চেষ্টায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন- গান-বাজনা, আবৃত্তি, আলোচনার আসর। আর সংস্কৃতিমনস্ক পরিবারে দই-চিড়া-মিষ্টির সঙ্গে কিছু গান-বাজনা। পাকিস্তানি আমলে এমন সীমাবদ্ধতার মধ্যে চলেছে বৈশাখী অনুষ্ঠান। স্বাধীনতার পর থেকে মুক্ত পরিবেশে ঢাকায় পহেলা বৈশাখের জমকালো যাত্রা শুরু। ক্রমে এর সামাজিক-সাংস্কৃতিক বিস্তার। রাজপথে জনতার ঢল, সকাল থেকে প্রায় সারাদিন। গণসঙ্গীত, লোকগীতি, রবীন্দ্রসঙ্গীত আর নজরুলসঙ্গীতে রাজপথে বৈশাখী আবেগের প্রকাশ। বছর কয় ধরে সেই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেক উৎসবের আনুষ্ঠানিক মাত্রা। চারুকলা ইনস্টিটিউটের বকুলতলা থেকে শুরু বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক শোভাযাত্রায় তরুণ-তরুণীদের সঙ্গে শিল্পী, কবি, শিক্ষক, লেখক, বুদ্ধিজীবী অনেকে এক কাতারে এবং তা বয়স-নির্বিশেষে। মনে হতে পারে, ঢাকার একদা-খ্যাত মহররম ও জন্মাষ্টমীর মিছিল নতুন রূপে, নতুন চরিত্রে রাজপথে নেমে এসেছে; তবে বিশালত্বে পূর্বজদের ছাড়িয়ে গেছে বৈশাখী উৎসব এবং বৈশাখের খর রোদ উপেক্ষা করে এর যাত্রা চলমান।

আমাদের সমাজবিজ্ঞানী ও সংস্কৃতি-বিশেষজ্ঞদের বিশ্বাস, স্বতঃস্ম্ফূর্ত ও সুসংগঠিত বিশাল বৈশাখী উৎসব বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার প্রতীক। যদি কেউ তুলনা টেনে গ্রামীণ নববর্ষ উদযাপনের তাৎক্ষণিক সময়ক্ষণের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন, জবাবে বলা যায় গ্রামীণ জীবন কিন্তু বরাবরই বাংলা সন-তারিখ ও বাঙালিয়ানার আচার-অনুষ্ঠান মেনেই চলেছে, এখনও চলে। তাদের পারিবারিক, সাংস্কৃতিক উৎসবে, অনুষ্ঠানে বাংলা দিন-তারিখ এখনও সচল। এমনকি উৎসবের চরিত্রেও ধর্মীয় আচার ও ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির সমন্বিত প্রতিফলনে কোনো সংস্কার বাধা সৃষ্টি করে না।

নববর্ষের উৎসব-অনুষ্ঠানের দুটি ছবি- গ্রামীণ ও নাগরিক। আমাদের জাতীয় চেতনার ভিত্তিতে এমন দাবি রাখতে পারে যে, একদিকে দুস্থ গ্রামে বর্ণাঢ্য নাগরিক নববর্ষের উদযাপন প্রসারিত করে সেখানে ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির পুনরুজ্জীবন ঘটানো হোক; অন্যদিকে বাঙালিয়ানার ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ আদর্শ নাগরিক জীবনে প্রতিষ্ঠিত করা এবং এভাবে গ্রাম-নগরের বাস্তবসম্মত সমন্বয় ঘটানো, বলা যেতে পারে গ্রাম-নগর পারাপার। এ পারাপারে অর্থনৈতিক দিকের অর্জন কঠিন; তবু জাতীয় স্বার্থে তা শুরু তো করতে হবে। তবে এর সাংস্কৃতিক দিকটা অপেক্ষাকৃত সহজ। সেখান থেকে জনসংস্কৃতির ঐতিহ্যনির্ভর আধুনিকায়নের প্রক্রিয়া শুরু করা যেতে পারে। এ দায়িত্ব আমাদের সমাজ-সচেতন, প্রগতিবাদী সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে নিতে হবে। এ জন্য সাংস্কৃতিক দলবল নিয়ে যেতে হবে ছোট ছোট শহরে এবং তৃণমূলস্তরে গ্রাম-গ্রামান্তরে। যেমন বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী উৎসবের পুনরুজ্জীবনে, তেমনি আধুনিকতার চেতনা বিস্তারে। দেখা যাবে বাউল ও সুফি-মারফতি গানের যেমন হার্দ্য সংঘাত নেই, তেমন সঙ্গতির অভাব নেই গণসঙ্গীতের সঙ্গে লোকজ সঙ্গীতের। সাধারণ জনমানস এসব ক্ষেত্রে সংস্কারহীন। এমন সর্বজনীন সহজিয়া চেতনার অধিকারী বলেই গ্রামীণ মুসলমান নির্বিচারে চৈত্রসংক্রান্তি বা কালীপূজা উপলক্ষে অনুষ্ঠিত মেলায় স্বচ্ছন্দে যোগ দিতে পারে, ভিড় জমাতে পারে কেনাকাটা বা বিকিকিনির উৎসবে।

অতীতে আমরা দেখেছি, জাতীয় জীবনে বাঁকফেরা সাংস্কৃতিক আন্দোলন শুধু সংস্কৃতিচর্চার প্রচলিত ধারারই পরিবর্তন ঘটায়নি, রাজনীতিতে তার সুপ্রভাব পড়েছে। পড়েছে গণতান্ত্রিক জাতীয়তাবাদী চেতনায়, পড়েছে আধুনিকতা ও প্রগতিশীলতার যাত্রায়। ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সমন্বয়ে সংস্কৃতির মননশীল চর্চা তাই আমাদের জাতীয় জীবনের সুস্থ, প্রগতিশীল পথচলায় খুবই জরুরি।

ভাষাসংগ্রামী, রবীন্দ্র গবেষক, কবি ও প্রাবন্ধিক