চৈত্র সংক্রান্তিতে বিদায় বসন্ত

অনলাইন ডেস্কঃ
এবারের বসন্ত অন্যবারের চেয়ে একদমই আলাদা। চৈত্রের দাবদাহের পরিবর্তে এবার বৃষ্টির শীতল পরশ বেশি ছিল। তাই আবহাওয়া অনুসরণ করে চৈত্র সংক্রান্তি আয়োজনে একটু ভাটা পড়তে পারে বলে ধারণা করছেন সংস্কৃতি বিশেষজ্ঞরা।

লোকসংস্কৃতির গবেষকদের মতে, চৈত্র সংক্রান্তি প্রধানত হিন্দু সম্প্রদায়ের শাস্ত্রীয় উৎসব। ক্রমেই এ উৎসব লোকসংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠেছে। শাস্ত্র ও লোকাচার অনুসারে এই দিনে স্নান, দান, ব্রত, উপবাস প্রভৃতি পুণ্যের কাজ। প্রকৃতির হালচাল দেখেই সংক্রান্তির খাবারও নির্ধারণ হয়েছে। পাহাড়ে ইতোমধ্যে ফুল বিজুর মধ্য দিয়ে বর্ষ বিদায় ও বরণের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে।

বছরের শেষ দিনটি উদযাপনে শহরের তুলনায় গ্রামের আয়োজন বেশি থাকে। নানা পদের খাবার তৈরি করে বছরকে বিদায় দেন গ্রাম-বাংলার নারীরা। যেহেতু চৈত্রমাসে আবহাওয়াতে তাপের আধিক্য বেশি তাই সংক্রান্তি পাতে গুরুপাক কোনও খাবার থাকে না। তিতা, শাক পাতা, ঝাল এগুলোই মূল খাবার। বসন্তের শেষ দিনের খাবার তালিকা আকর্ষণীয় করে তুলেছে- তিতকুটে পাট শাকের ঝুড়ি, সঙ্গে কাঁচা সরিষার ভর্তা, ধোয়া ওঠা লালচে আউশ চালের ভাত আর ডালায় রাখা শুকনো মরিচ। চৈত্রের শেষদিন নাকি তিতকুটে আর ভর্তা খেতে হয়। এতে সমস্ত রোগ বালাই বৈশাখের প্রথম ঝড়ের সঙ্গে নাকি চলে যায়। তবে ইতোমধ্যে বেশ কয়েকবার কালবৈশাখী হয়ে যাওয়ায় প্রকৃতিতে এখন শীতলতা।

সংক্রান্তির আয়োজনে গ্রামেগঞ্জে পূজার চল রয়েছে। কোথাও চড়কপূজা হয়। দিনটি উদযাপনে মেলা থাকবে না তা কী করে হয়। প্রতিটি গ্রামেই মেলা হয়। পাশাপাশি বাড়িতে বাড়িতেও থাকে নানা আয়োজন। এসময় বাড়িতে নাইওর আসেন মেয়ে ও জামাইরা। তাদেরকে ঘিরে পিঠা বানানো হয়। থাকে নানা পদের খাবারের আয়োজন।

লোকসংস্কৃতি গবেষক অনার্য তাপস বলেন, ‘বাংলাদেশসহ পুরো ভারতবর্ষ এবং দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশ কৃষিকেন্দ্রিক সংস্কৃতি লালন করে। কৃষিকেন্দ্রিক অঞ্চলগুলো বৈশাখ মাসে বা এপ্রিলের মাঝামাঝি সময় থেকে তাদের নতুন বছর গণনা শুরু করে। উত্তর ভারতের বৈশাখি, অসমের রঙ্গালি বিহু, তামিলনাড়ুর পুথাণ্ডু, কেরালার ভিশু, ঊড়িষ্যার বিষুব সংক্রান্তি, মিথিলার জুড় শীতল, কম্বোডিয়ার চউল চনাম থিমে, থাইল্যান্ডের সংক্রান, শ্রীলংকার আলুথ অভুরুদ্দ, বাংলার পয়লা বৈশাখ এবং তিব্বতের নববর্ষ প্রায় একই সময় অনুষ্ঠিত হয়। সৌরপঞ্জিকা অনুযায়ী গণিতভিত্তিক বছর গণনার এই প্রথা অনেক প্রাচীন। পুকুর ভরা মাছ আর গোয়াল ভরা গরুর সঙ্গে একসময় বাঙালির মাঠ ভরা ধানও ছিলো। খাবারের প্রাকৃতিক উৎস সম্পর্কে এই অঞ্চলের মানুষ চিরকালই সচেতন ছিলো। এ বিষয়টিকে কাজে লাগিয়েই সুদীর্ঘকাল ধরে এ অঞ্চলের মানুষ তাদের খাদ্যসংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে। এরই জের ধরে সংক্রান্তির খাদ্য সংস্কৃতিও নির্ধারিত হয়েছে।’

বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলের সংক্রান্তি প্রসঙ্গে সিএইচটি এক্সপ্রেসের কর্নধার ও জনপ্রিয় শেফ অর্পণ চাকমা বলেন, ‘বৈশাখ বরণ ও বছর বিদায়ের আয়োজনটা পাহাড়ে বেশ ঘটা করেই পালন হয়। বিজুর ফুল ভাসানোর মধ্য দিয়ে উৎসবের শুরু। এরপর সংক্রান্তির দিনের আয়োজনকে বলা হয় সাংগ্রাই। উৎসবকে ঘিরে বানানো হয় নানা পদের পিঠা-পুলি। বিন্নি হগা, ভাজা পিঠা, কলা পিঠার মতো পিঠা তৈরি করা হয়। তৈরি করা হয় বিশেষ পাহাড়ি পানীয়। নানাবিধ ফলের জুসের পাশাপাশি থাকে দোচোয়ানি ও বিন্নি চাল থেকে তৈরি করা জগরা। বৈসাবিকে ঘিরে পাহাড়ে তিনমাস আগে থেকে জগরা তৈরির প্রস্তুতি শুরু হয়।’

সংক্রান্তির আবশ্যিক খাবার পাজন। হরকে রকমের সবজির মিশ্রণে রান্না হয় এই পাজন বা পাজোন। পাজন শব্দটি মূলত চাকমা নৃগোষ্ঠীর। ৩০-৩২ রকমের ভিন্ন সবজি দিয়ে পাজন রান্নার চেষ্টা চলে। এই দিনে কমপক্ষে সাত বাড়িতে খাওয়ার প্রচলন আছে। চাকমাদের বিশ্বাস, এতে পারস্পরিক বন্ধন দৃঢ় হয়।

অন্যদিকে ত্রিপুরাদের কাছে এই খাবারটি পাচন নামে পরিচিত। একসময় তারা ১০৮ রকম সবজি দিয়ে খাবারটি রান্না করতো। সবজির এই মিশ্রণকে তারা ঔষধি মনে করেন। যদিও এখন সব ধরনের সবজি সংগ্রহ করা কঠিন। তাই হাতের নাগালে যা পাওয়া যায়, সেগুলো নিয়েই রান্না হয় পাচন।

শহরে একদিনে সংক্রান্তির আয়োজন হলেও গ্রামে গ্রামে সংক্রান্তির নানা আয়োজন চলছে গত একমাস ধরে। ঢাকার খুব কাছের জেলা বিক্রমপুরে মাসব্যাপী চৈত্রসংক্রান্তির মেলা হচ্ছে। একই জিনিস দেখা গেছে নরসিংদীতে। হচ্ছে মুখোশে ঢাকা হরগৌড়ি নাচ, বাইদান নাচের পালা। সব ধর্মের মানুষের অংশগ্রহণে আয়োজনগুলো হয়ে উঠছে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি।

হালখাতার শুরুটিও এই সংক্রান্তিকে ঘিরেই। সংক্রান্তিতে হালখাতা শুরু হয়ে বৈশাখ বরণেও চলে। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বর্ষবরণ আয়োজন বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠায় সংক্রান্তি আয়োজনে একটু ভাটা পড়েছে।

সূত্রঃ বাংলা ট্রিবিউন