সন্তানের প্রতি মনোযোগ বাড়ান, মাদক থেকে বাঁচান

দিদারুল আলম রাশেদ:

সময়ের কাজ সময়ে সম্পাদন না করলে আফসোস করা ছাড়া আর উপায় থাকেনা। ট্রাফিক জ্যামে আটকে গেছেন যথা সময়ে বাস ধরতে পারলেননা? আফসোস মার গেল টিকেটের টাকাটা, কাজের চাপে ভুলে গিয়ে সময়মত বিল পরিশোধ করতে পারলেননা? আফসোস ফাইন দিতে হল, ব্যস্ততা, অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস বা অন্য কোন কারনে ঠিক সময় মত সন্তানের প্রতি মনোযোগ দিতে পারলেননা? আফসোস আপনার অজান্তেই আপনার সন্তানটা বিপদগামী হয়েগেল নাতো? শিশু ও যুবারা স্বভাবতই নতুন কিছু জানার প্রতি কৌতুহলি হয়, নতুন বন্ধুত্বও তারা গড়েনেয় বেশ দ্রুত, বাছবিচার করার মত যথেষ্ট জ্ঞান অনেকেরই থাকেনা, মন্দ এড়িয়ে ভালটা জানার, গ্রহন করার, বন্ধু নির্বাচনে সতর্ক হওয়ার মত ব্যাপারে এ সময় তাঁদের সঠিক পরামর্শের প্রয়োজন পড়ে, অভিভাবক যদি মনযোগী হন তবে বিভিন্ন লক্ষণ বিচার করে সন্তানের মানসিক অবস্থা আঁচ করতে পারেন, সঠিক পরামর্শ প্রদানের মধ্যদিয়ে পারেন অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতি এড়াতে।

আজ ২৬ জুন বিগত বছরগুলোর ন্যায় সারা বিশ্বে মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচারবিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস হিসেবে দিনটি পালিত হচ্ছে, উদ্যেশ্য মাদকের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচার রোধে সামাজিক সচেতনতা তৈরী করার মধ্যদিয়ে মাদকমুক্ত সমাজ বিনির্মাণ করা।

“আগে শুনুন” স্লোগান সম্বলিত এবং “শিশু ও যুবাদের প্রতি মনোযোগ দেয়াই হ’ল তাদের নিরাপদ বেড়ে উঠার প্রথম পদক্ষেপ” প্রতিপাদ্যে সমৃদ্ধ ২০১৬ সালের এবারকার দিবস, যেন জানা কথাগুলোকে আবারো জানিয়ে দেয়া, কারন সময় এখন এ কথাগুলোর গুরুত্বকে অনেক বেশি পরিমাণ অর্থবহ করে তুলেছে।

মানুষের কর্মব্যস্ততার মাত্রা দিনদিন বাড়ছে। বিশ্ব কবি রবিন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটা লেখা অনেকটা এরকম – “যাঁর বাইরের সংসার বড় হয়ে যায়, তাঁর ঘরের সংসার ছোট হয়ে যায়” তেমনি ব্যাবসা বানিজ্য কিংবা কর্মস্থলে কাজের মাত্রাতিরিক্ত চাপ, পরিবারের জন্য নির্ধারীত সময়কে সংকুচিত করছে, সময়ের স্বল্পতা কখনও কখনও সন্তানদের প্রতি অভিবাবকদের যথেষ্ট মনোযোগী হওয়াকে এভাবে ব্যাহত করছে।

শিশু ও যুবারা প্রায়’ই কোননা কোন নতুন অভিজ্ঞতার হাতছানির আওতায় আসছে, দ্ধিধান্বিত হচ্ছে নিয়ত, যথাযথভাবে বিশ্লেষণ করার অভিজ্ঞতার অভাবে বিভ্রান্ত হচ্ছে আর এ ধরনের সময়গুলোর মুখোমুখি হওয়াকালীন অনেকেই তাঁর সবচেয়ে বিশ্বস্থ ও সর্বোচ্চ শুভার্থী অর্থাৎ তাঁদের অভিভাবকের যথেষ্ট সান্নিধ্য কিংবা মনোযোগ না পাওয়ার ফলে মাদকের মত ক্ষতিকারক দ্রব্যের ভুল ব্যাবহার করে বসছে। অনেক সময় দেখাযায় বিষয়টি পরিবারের গোচরে আসতে আসতে ইতমধ্যে ব্যাবহারকারী মাদকের প্রতি চরম নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। যেকোন অভিভাবকের জন্যই এধরনের পরিস্থিতি যারপরনাই আফসোসের।

যে ঘরে একজন মাদকাসক্ত আছে তাঁর ঘরের কথা একবার খোঁজ নিয়ে দেখুনতো কি ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্য দিয়েইনা তাঁরা দিন যাপন করছে। মাদকের প্রবেশের সাথে সাথে সেই ঘরের সূখ, শান্তি, সুনাম কর্পুরের মতো উবে যেতে থাকে। পারিবারিক বিপর্যয় স্পর্শ করে সমাজকে, সমাজ হয় কলুষিত, আর মাত্রা বাড়ে সহিংসতার।

একদিকে মানুষের কর্মব্যস্ততা বাড়ছে, কমছে সন্তান সন্ততিদের প্রতি মনোযোগ অন্যদিকে মাদকের অবৈধ পাচার অতি মাত্রায় বাড়ছে, বাড়ছে সহজলভ্যতা, বাড়ছে মাদক নির্ভরশীলদের সংখ্যা।
এখন সময় হচ্ছে অভিভাবকদের প্রথমে নিজেদের সচেতন হওয়া, যত ব্যস্ততাই থাকুকনা কেন, সন্তান সন্ততির ছোট বড় সকল বিষয়ে যথেষ্ট মনযোগী হওয়া, তাদের বেড়ে উঠার ক্ষেত্র যেন নিরাপদ থাকে। মাদকের কাছ থেকে দূরে রাখতে তাদের সাথে যত বেশি সম্ভব সময় ব্যয় করা, তাদের মনের অবস্থা বোঝার চেষ্টা করা, যে কোন পরিবর্তনমূলক লক্ষনগুলোকে গুরুত্ব সহকারে নেওয়া, বাড়ীর বাইরে ও ভেতরে যেখানেই তাদের অবস্থান সেখানকার পরিবেশ স্বাস্থ্যকর কিনা নিশ্চিত হওয়া।

একজন অভিভাবকের জন্য চিরাচরিত দায়িত্ব ও কর্ত্যব্যটাকে নানান অজুহাতের দোহাই দিয়ে যেন আর কোনভাবেই অবহেলা করা না হয়, জল অনেকদুর গড়িয়ে গেল বলে তাই, জানা কথাগুলোকে মানা কথায় রূপান্তরিত করার এ প্রয়াস সফল হউক।

মাদকাসক্ত হওয়ার পেছনে সাহায্যকারী কারণ সমূহ:
১) দূর্বল ব্যক্তিত্ব
২) নৈতিক শিক্ষার অভাব
৩) বেকারত্ব ও হতাশা
৪) মেনে নেওয়া ও মানিয়ে নেওয়ার অক্ষমতা
৫) কৌতুহল
৬) খারাপ বন্ধু-বান্ধবের প্রভাব
৭) নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন
৮) নানাবিধ ব্যর্থতা
৯) সচেতনতার অভাব
১০) মাদকের কুফল সম্পর্কে অজ্ঞতা
১১) অতিরিক্ত স্মার্টনেন্স মনোভাব
১২) বেপরোয়া মনোভাব
১৩) সহজে আনন্দ লাভে উৎসুক
১৪) স্বাস্থ্যগত কারণ
১৫) দারিদ্রতা
১৬) প্রতিকুল পারিবারিক পরিবেশ
১৭) মাদকের সহজলভ্যতা
১৮) মনস্তাত্মিক বিশৃংখলা
১৯) চিকিৎসা সৃষ্ট মাদকাসক্তি
২০) মাদক সম্পর্কে ভুল ধারণা
২১) বয়সের অপরিপক্ষতা
২২) খেলাধুলা ও চিত্ত বিনোদনের অভাব
২৩) শিক্ষা কার্যক্রমে মাদকের ক্ষতিকর দিকটির অপর্যাপ্ত উপস্থাপনা ইত্যাদি।

মাদকাসক্ত ব্যক্তিরা ক্রমান্বয়ে যে ক্ষতিকর চক্র পার করে থাকে:
(ক) শারীরিক ক্ষতি
১) অনিদ্রা
২) ওজন কমে যাওয়া
৩) শারীরিক কর্মক্ষমতা হ্রাস
৪) পেট ব্যাথা
৫) ফুসফুস ও হার্টে সমস্যা
৬) যকৃত প্রদাহ
৭) রক্ত শূন্যতা
৮) যৌন অক্ষমতা
৯) স্নায়ুবিক দূর্বলতা
১০) শ্বাসকষ্ট
১১) শারীরিক অবস্বাদ গ্রস্ততা
১২) এইচ.আই.ভি/এইডস আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা
১৩) সন্তান জম্ম দানে অক্ষমতা বা বিকলাঙ্গ সন্তান জম্মদানের সম্ভাবনা ইত্যাদি।
(খ) মানসিক ক্ষতি
১) হতাশা
২) আত্মহত্যার প্রবণতা
৩) সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগা
৪) মানসিক বিশৃংখলতা
৫) উশৃংখল ও অসংলগ্ন ব্যবহার
৬) সন্দেহ প্রবণতা
৭) হ্যালোসিনেশন
৮) চেতনা হ্রাস
৯) বিচার বিশ্লেষণ ক্ষমতার অবনতি
১০) বিষন্নতা
১১) স্মৃতি বিভ্রম
১২) উৎসাহহীনতা
১৩) চিন্তার অসংলগ্নতা ইত্যাদি।

(গ) আর্থিক ক্ষতিঃ
১) সর্বশান্ত হওয়া
২) পরিবারকে অনটনে ফেলা
৩) ধার কর্জ/হাত পাতার প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়া
৪) মূল্যবান সামগ্রী বিক্রি/বন্ধকে রাখা
৫) চৌর্য বৃত্তি।
(ঘ) পারিবারিক ক্ষতি
১) পারিবারিক অশান্তি
২) সম্মান/মর্যদাহানী
৩) ঐতিহ্যে আঘাত
৪) সহিংসতা
৫) অন্য সদস্য দ্বারা (সম্ভাব ক্ষেত্রে) প্রভাবিত হওয়ার আশংকা

(ঙ) সামাজিক ক্ষতি:
১) অপরাধ পূর্ণ আচরণ
২) পরিবার/সমাজে অশান্তি
৩) পরিবার/সমাজে নৈরাজ্য সৃষ্টি
৪) সুশীল সমাজের প্রতি বিষন্নতা
৫) সমাজে অপাংতেয়।

(চ) আধ্যাত্মিক ক্ষতি:
১) ধর্মীয় অনুশাসন ও কর্মকান্ডে অনীহা
২) অন্যের প্রতি ঘৃণা
৩) ভালবাসায় ঘাটতি
৪) ক্ষমার মানসিকতা নষ্ট
৫) সৃজনশীল ও সেবামূলক কর্মকান্ডে অনুপস্থিতি
৬) ক্ষতিকারক প্রবণতা বৃদ্ধি
৭) উদার মনোভাবের ক্রমাবনতী
৮) সাহায্য-সহযোগতিা ও পরোপকারী মনোভাবের অভাব
৯) পরিবার/সমাজ/প্রতিবেশীদের শান্তির ব্যাপারে উন্মাসিকতা।

মাদক সমস্যা সমাধানে করণীয়:
১। মাদক দ্রব্যের ভয়াবহতা সম্পর্কে সর্বস্তরের জনসাধারণকে সচেতন করা।
২। মাদকের ক্ষতি ও অপব্যবহার রোধে সভা, সেমিনার, কর্মশালা ও প্রশিক্ষনের আয়োজন করা।
৩। তুলনামূলকভাবে কার্যকরী সঠিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করা।
৪। চিকিৎসা পরবর্তী পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা।
৫। সামাজিক স্বীকৃতি প্রদান।
৬। আসক্তদের প্রতি ঘৃণা বা গোড়ামীপূর্ণ আচরণ বন্ধ করা।
৭। সুস্থ সুন্দর নির্মল বিনোদন পরিবেশের ব্যবস্থা করা।
৮। সুস্থ পারিবারিক পরিবেশ তৈরী করা।
৯। ছাত্র-ছাত্রী উঠতি শিশু-কিশোরদের প্রতি অভিভাবকদের সচেতনতা বৃদ্ধি করা।
১০। মাদকের অবৈধ চোরাচালান রোধ করা।
১১। এলাকার প্রতিনিধি, সমাজের মুরব্বি ও ধর্মীয় নেতাদের মাদক বিরোধী প্রচারণায় জোরালো অংশগ্রহণ।
১২। বেকার সমস্যার সমাধান।
১৩। সাংস্কৃতিক বিকাশ ও মানোন্নয়ন।
১৪। স্কুল-কলেজগুলোতে নিয়মিত মাদক বিরোধী সেমিনার।
১৫। মাদক সম্পর্কে ব্যাপক গবেষণা।
১৬। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কেন্দ্র স্থাপন।
১৭। মাদকের কুফল ও ভয়াবহতা সর্ম্পকিত স্টিকার, লিফলেট, বুকলেট ও পোস্টার বিতরণ।
১৮। রেডিও টেলিভিশন ও বিভিন্ন গণ-মাধ্যমে মাদক বিরোধী অনুষ্ঠান সম্প্রচার।
১৯। পুনরাসক্তি প্রতিরোধে সহায়ক পরিবেশ গঠন।
২০। উপযুক্ত পরামর্শ প্রদান বিশেষভাবে উল্লেখ্য।

লেখক: দিদারুল আলম রাশেদ, নির্বাহী পরিচালক, ‘নোঙর’ কক্সবাজার।