রামু বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকদের কর্মবিরতি

সুনীল বড়ুয়া :
৩৭জন শিক্ষক কর্মচারী গত তিনমাস ধরে বেতনের সরকারী অংশ বন্ধ থাকায় গত শনিবার থেকে কর্ম বিরতি পালন করছেন কক্সবাজারের রামু বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা। ফলে গতকাল রোববারও (০৭ এপ্রিল) বিদ্যালয়টিতে পাঠদান চলেনি।

বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা জানান,চারিত্রিক স্খলন,আর্থিক অনিয়মসহ নানা অভিযোগে ইতিপূর্বে বরখাস্থ হওয়া বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক সৈয়দ করিমের পূর্ণ বেতন দিয়ে বিল প্রস্তাব না করায়,বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও ইউএনও এতদিন অন্যান্য শিক্ষক কর্মচারীর বেতন বিলেও সই করেননি। যে কারণে গত তিনমাস ধরে বেতন বিলের সরকারী অংশ না পাওয়া শনিবার থেকে কর্মবিরতি কর্মসুচী দেন শিক্ষকেরা।

কর্মবিরতি পালনকারী শিক্ষকেরা জানান, গত তিনমাস ধরে বেতনের সরকারী অংশ বন্ধ থাকায় বেশিরভাগ শিক্ষক অর্থ সংকটে পড়ে পরিবার পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। এমন পরিস্থিতিতে এসব শিক্ষকদের পয়লা বৈশাখের বোনাস পাওয়াও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। ফলে নিরুপায় হয়ে শিক্ষকেরা কর্মবিরতি পালন করছেন।

তারা জানান,গত শনিবার ও রোববার দুইদিন কোন ক্লাস চলেনি। শুধুমাত্র ছাত্রীদের হাজিরা নেওয়া হয়েছে।

তারা আরো জানান, শুধু সরকারী অংশ নয়, বেতনের বেসরকারি অংশও এতদিন বন্ধ ছিল। গত উপজেলা নির্বাচনের আগে অনেক দেন-দরবারের পর একসঙ্গে দুমাসের (জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি) বেসরকারি অংশ পেয়েছিলেন শিক্ষক-কর্মচারীরা।

এ বিষয়ে বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. জয়নাল অাবেদীন জানান,চারিত্রিক স্খলন,আর্থিক অনিয়ম,স্বেচ্ছাচারিতাসহ নানা অনিয়মের অভিযোগে ইতিপূর্বে বরখাস্থ হওয়ায় নিয়ম অনুযায়ী এতদিন বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক সৈয়দ করিম-অর্ধেক বেতন পেয়ে আসছিল। কিন্তু গত বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও ইউএনও উচ্চ আদালতের নির্দেশনার কথা বলে আমাকে পূর্ণ বেতনে বিল প্রস্তাব করার জন্য বলেন। কিন্তু বহিষ্কারাদেশের বিষয়ে শিক্ষা বোর্ড থেকে কোন চূড়ান্ত সিদ্বান্ত না আসায় ইউএনও আমাকে পর পর তিনবার আদেশ এবং আমার সঙ্গে চরম দুরব্যবহার করার পরও অামি পূর্ণ বেতনে বিল প্রস্তাব করিনি। যে কারণে তিনি ক্ষুব্দ হয়ে অন্যান্য শিক্ষক কর্মচারীর বেতনেও স্বাক্ষর না করায় তিনমাস বেতনের সরকারী অংশ আটকে যায়।

তিনি বলেন,এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষকেরা কর্মবিরতি শুরু করলে বিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি এবং ছাত্রীদের লেখাপড়ার বিষয়টি চিন্তা করে অনিচ্ছা স্বত্বেও বরখাস্থকৃত প্রধান শিক্ষকের পূর্ণ বেতনে বিল করে দিয়েছি। ফলে বকেয়াসহ অন্যান্য শিক্ষকের বিলে সই করে দিয়েছেন ইউএনও। ফলে শিক্ষক-কর্মচারীর বেতন পেতে আর কোন বাধা নেই।

এবিষয়ে রামু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি মো. লুৎফুর রহমান শিক্ষকদের বেতন বিলে স্বাক্ষর করার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, সাবেক প্রধান শিক্ষক সৈয়দ করিমকে পূর্ণ বেতন দেওয়ার জন্য উচ্চ অাদালত একটি নির্দেশনা আমি পেয়েছি। এ নির্দেশনার বিষয়ে অামি জিপির (গভরমেন্ট প্লিডার)মতামতও নিয়েছি। জিপিও আমাকে হাইকোর্টের নির্দেশনার পক্ষে মতামত দিয়েছেন । সে কারণে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষককে পূর্ণ বেতনে বিল করার জন্য বার বার তাগিদ দেওয়া হয় এবং সেই নির্দেশনার আলোকে পূর্ণ বেতনে বিল করা হয়েছে। আজ-কালের মধ্যেই শিক্ষকেরা বেতন পেয়ে যাবেন।

বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির এক সদস্য জানান, সৈয়দ করিমের বিরুদ্ধে চারিত্রিক স্খলন, প্রশ্নপত্র ফাঁস,আর্থিক অনিয়ম,স্বজনপ্রীতি,স্বেচ্ছাচারিতাসহ নানা অনিয়ম ও দূর্নীতির অভিযোগ ওঠলে গত ২০১৬সালের ১১ ডিসেম্বর এসব অভিযোগের তদন্ত করতে বিদ্যালয়ে আসেন চট্টগ্রাম মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের উপ পরিচালক মো. আজিজ উদ্দিন। এসব অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় অধিদপ্তরের নির্দেশে সৈয়দ করিমকে ২০১৭ সালের ১৫ জানুয়ারী সাময়িক বরখাস্থ এবং ২০১৮ সালের ১১মার্চ বরখাস্থ করে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি। পরবতর্তীতে এই সিদ্বান্ত অনুমোদনের জন্য চট্টগ্রাম মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানের কাছে পাঠানো হলে বিষয়টি নিয়ে চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডের আরবিট্র্যাশন (সালিশি) বোর্ডে একবার শুনানী হলেও এখনো পর্যন্ত চূড়ান্ত কোনো সিদ্বান্ত আসেনি। কিন্তু এ অবস্থায় তাকে চূড়ান্ত বেতন দেওয়া হলে বিষয়টি নিয়ে নতুন করে জটিলতা তৈরী হতে পারে।

২০০৪ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর এ বিদ্যালয়ে সৈয়দ করিমকে প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ দেওয়া হয় । যোগদানের দুই বছর হতে না হতে ছাত্রী নিবাসে থাকা দশম শ্রেনীর এক ছাত্রীকে ধর্ষনের অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে থানায় মামলা হয়। ২০০৬ সালের ৫ এপ্রিল অফিস কক্ষ থেকে পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করে। ওই দিন থেকে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করে এবং ২০০৮ সালের ৫ মে তৎকালীন বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভায় ছৈয়দ করিমকে স্থায়ী বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু পরবর্তীতে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে এবং তৎকালীন বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি নিয়ম বহির্ভুতভাবে সৈয়দ করিমকে আবারো ওই পদে নিয়োগ দেন। পরবর্তীতে আবারো সৈয়দ করিম একই অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে বরখাস্থ হন।