রমজানের সামাজিক তাৎপর্য

মোহাম্মদ নঈমুদ্দীন :

আর মাত্র দুইদিন পরই বিদায় নেবে রমজানের মাগফিরাতের ১০ দিন।

মাহে রমজান সিয়াম সাধনার মাধ্যমে যেভাবে বান্দাকে আল্লাহওয়ালায় পরিণত করে, ঠিক তেমনিভাবে অতিরিক্ত মুনাফার লোভ থেকে আত্মাকে সংবরণ করে। সত্য কথা বলতে ও হালাল উপার্জনে বাধ্য করে এবং সমস্ত অন্যায়-অপকর্ম ও কু-প্রবৃত্তি থেকে বিরত রাখে।

মাহে রমজানে বান্দার জন্য যেমন আধ্যাত্মিক শিক্ষা রয়েছে, তেমনি সামাজিক গুরুত্বও রয়েছে। মূলত রমজানের সিয়াম সাধনার সামাজিক তাৎপর্য যুক্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। সিয়াম শব্দটি সউম-এর বহুবচন। এই সউম শব্দের আভিধানিক অর্থ- ‘ঐ সব বিষয় হতে বিরত থাকা, যেগুলোর প্রতি নফস কিংবা আত্মা সাধারণত ধাবিত।’

আমরা রমজানে রোজা রাখার পরও অহরহ মিথ্যা বলি, মনের কু-প্রবৃত্তিকে দমন করতে পারি না; রোজা রেখেই অন্যদের গালিগালাজ কিংবা কাজকর্মে, আচার-আচরণে নানাভাবে কষ্ট দিয়ে থাকি; রোজা রেখে শারীরিকভাবে অপবিত্র থাকি- তাহলে সেই রোজা সঠিকভাবে আদায় হবে না। বরং তা লোক দেখানো রোজা পালন করা হবে। প্রকারান্তরে নফসকে দমনে রোজার যে সামাজিক শিক্ষা, তা অনুসরণ করা হবে না। আল্লাহর প্রিয় হাবিব (সা.) ঘোষণা দিয়েছেন- এ ধরনের কাজ বর্জন করতে না পারলে, শুধু শুধু রোজা রাখার নামে দিনভর উপবাস থাকা অর্থহীন।

হাদিস শরীফে আছে, হযরত আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি মিথ্যা বলা ও সেই অনুযায়ী আমল বর্জন করেনি, তার এ পানাহার পরিত্যাগ করা আল্লাহর কাছে কোনো প্রয়োজন নেই।’   (সহিহ বুখারী)

রোজার সামাজিক ‍গুরুত্ব হলো অশ্লীলতা, গালিগালাজ ও ঝগড়া বিবাদ থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ বিরত রাখা। রাসুলুল্লাহ (সা.) এসব আমল থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন।

হাদিসে আছে, হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেছেন, ‘সিয়াম ঢাল স্বরূপ, তোমাদের কেউ যেন সিয়াম পালনের দিন অশ্লীলতায় লিপ্ত না হয় এবং ঝগড়া বিবাদে লিপ্ত না হয়। যদি কেউ তাকে (রোজাদার) গালি দেয় অথবা ঝগড়া করে, তাহলে সে যেন বলে-  আমি একজন রোজাদার…।’ (সহিহ বুখারী)

রমজান আসলে কিছু ব্যবসায়ী মুনাফার লোভে মজুতদারী করে জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়ে দেয় এবং অতিরিক্ত লাভ করে রোজাদারদের কষ্ট দিয়ে থাকে। তাদের এই ধরনের রোজা রাখাও অর্থহীন। যারা সামান্য লোভ সামলাতে না পারে, তাদের এই রোজা নামসর্বস্ব ও লোক দেখানো রোজায় পরিণত হবে। অতিরিক্ত মুনাফার যে লোভ, তা সংবরণ করে এ ধরনের অপকর্ম থেকে বিরত থাকাই হচ্ছে রমজানের সামাজিক শিক্ষা।

রমজানের এই সামাজিক তাৎপর্য যদি কাজে লাগানো যায়, তাহলে ব্যক্তিজীবন, সমাজ জীবন ও রাষ্ট্রজীবন থেকে অস্থিরতা, ঘুষ-দুর্নীতি, চরিত্রহীনতা, মিথ্যাবলা, পশুত্ব দূর করা সম্ভব। যা একজন মানুষকে বদলে দেওয়ার পাশাপাশি গোটা সমাজ ও রাষ্ট্রকে কল্যাণমুখী করে তুলবে।

একজন রোজাদার কখনও কারো ক্ষতির কারণ হতে পারে না। মিথ্যা বলতে পারে না। কারণ রোজা রাখার মাধ্যমে তিনি তার কু-প্রবৃত্তিকে দমন করার অনুশীলন করেছেন।

তাই আসুন, ইবাদত-বন্দেগি ও সিয়াম সাধনার মাধ্যমে রোজা পালন করে এর আধ্যাত্মিক ও সামাজিক শিক্ষা কাজে লাগিয়ে মহান আল্লাহর দরবারে নিজেদের আত্মসমর্পণ করি। শপথ করি, আজকে থেকে কারো ক্ষতি না করি, অন্যায় অপকর্ম থেকে বিরত থাকি। আল্লাহ সবাইকে তওফিক দিন…আমীন।