জেনে নিন কিডনি রোগের লক্ষণ ও ভালো রাখার উপায়

লাইফস্টাইল ডেস্কঃ
মারাত্মক যেসব অসুখের রোগীর সংখ্যা দিনদিন আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে, কিডনির সমস্যা তার মধ্যে অন্যতম। কিডনি আমাদের শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। পাঁচটি ধাপে কিডনি বিকলের দিকে অগ্রসর হয়। প্রথম চারটি ধাপ পর্যন্ত চিকিৎসার মাধ্যমে নিরাময় করা সম্ভব। কিন্তু একবার পাঁচ নম্বর ধাপে চলে গেলে তখন বেঁচে থাকার উপায় হলো ডায়ালাইসিস অথবা কিডনি সংযোজন। এসব পদ্ধতি অত্যান্ত ব্যয়বহুল, যা অনেকের পক্ষেই বহন করা সম্ভব হয় না। তাই এই ব্যাধি থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় হলো কিডনি বিকলতা প্রতিরোধ করা।

দুর্বলতা
কিডনি সমস্যার অন্যতম প্রধান লক্ষণ হচ্ছে দুর্বলতা। আর এই দুর্বলতা আসে রক্তশূন্যতা থেকে। কিডনি যদি ঠিকমতো কাজ না করতে পারে তাহলে রক্ত ক্রমাগত দূষিত হতে থাকে। যার কারণে রক্তে নতুন করে ব্লাড সেল উৎপন্ন হয় না। এছাড়াও কিডনির কার্যক্ষমতা কমে গেলে তা শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় হরমোন এরিথ্রোপ্রোটিন উৎপন্ন করতে পারে না।

শ্বাসকষ্ট
যখন কিডনি কাজ করা বন্ধ করতে শুরু করে, তখন শরীরের বর্জ্য পদার্থ রক্তে মিশতে শুরু করে। এই বর্জ্য পদার্থের বেশিরভাগই হচ্ছে অম্লীয় পদার্থ। তাই এই বর্জ্য যখন রক্তের সাথে ফুসফুসে পৌঁছায় তখন ফুসফুস সেই বর্জ্য বের করার জন্য কার্বনডাই অক্সাইড ব্যবহার করা শুরু করে। যার কারণে পর্যাপ্ত অক্সিজেন ফুসফুসে ঢুকতে পারে না। এতে শ্বাসকষ্টের সমস্যা হতে পারে।

চোখে ঝাপসা দেখা
কিডনির সমস্যা আপনার চোখে ঝাপসা দেখা কিংবা মানসিক অস্থিরতার সৃষ্টি করতে পারে। কারণ শরীরের বর্জ্য পদার্থের একটি বড় অংশ হচ্ছে ইউরিয়া। কিডনির সমস্যার কারণে ইউরিয়া শরীর থেকে বের না হয়ে বরং রক্তে মিশে যায়। এই দূষিত রক্ত মস্তিষ্কে পৌঁছে মানসিক অস্থিরতা, ঝাপসা দেখা এই ধরনের সমস্যার সৃষ্টি করে। যদি ইউরিয়ার পরিমাণ অত্যধিক হয় তাহলে তা মস্তিষ্কের ক্ষতি করতে পারে, যার ফলাফলে রোগী কোমাতে পর্যন্ত চলে যেতে পারেন।

শরীরে চুলকানি
কিডনির অক্ষমতায় শরীরে প্রিউরিটাস দেখা দেয়। প্রিউরিটাস আসলে চুলকানির মেডিক্যাল নাম। শরীরের রক্তে যখন বর্জ্য পদার্থ মিশতে শুরু করে তখন চুলকানির উপসর্গ দেখা দেয় কারণ ওই বর্জ্যের মধ্যে ফসফরাস থাকে। যেসব খাবারে ফসফরাস থাকে যেমন দুধজাতীয় খাবার, সেগুলো হজমের পর ফসফরাস বর্জ্য হিসেবে মূত্রের সাথে বের হতে পারে না। যার কারণে এটি রক্তে মিশে চামড়ায় চুলকানি সৃষ্টি করতে থাকে।

প্রস্রাবের রং পরিবর্তন এবং রক্তক্ষরণ
কিডনির সমস্যায় প্রস্রাবের রং পরিবর্তন হয়ে যায়। কারণ, কিডনির অক্ষমতায় রেনাল টিউবিউলসের ক্ষতি হয়, যা পলিইউরিয়ার সৃষ্টি করে। কিডনির অক্ষমতা যত বৃদ্ধি পাবে, প্রস্রাবের পরিমাণ ততই কমবে এবং রং গাঢ় হলুদ কিংবা কমলা রং হয়ে যাবে। সেই সাথে প্রস্রাবের সাথে রক্তক্ষরণ এবং অত্যধিক ফেনা হতে পারে।

অরুচি
শরীরের বর্জ্য পদার্থের আরেকটি উপাদান হচ্ছে অ্যামোনিয়া। যদি অ্যামোনিয়া রক্তে মেশে তাহলে তা শরীরে প্রোটিন নষ্ট করে ফেলে। কিডনির অক্ষমতায় শরীর বর্জ্য হিসেবে অ্যামোনিয়া ফিল্টার করতে পারে না। রক্তে অত্যধিক পরিমাণের অ্যামোনিয়া মুখে অরুচি, ওজন হারানোর মত সমস্যার সৃষ্টি করে।

ব্যথা
একটি জেনেটিক কন্ডিশনের কারণে শরীরের অভ্যন্তরে, বিশেষ করে কিডনি এবং লিভারে এক ধরনের ফ্লুইড ভর্তি সিস্ট বা গুটির সৃষ্টি হয়। এই সিস্টের মধ্যে থাকা ফ্লুইড এক ধরনের বিশেষ টক্সিন বহন করে, যা শরীরের শিরা বা ধমনী গুলোতে ক্ষতি করতে পারে। একাধিক শিরার বা ধমনীর ক্ষতি হলে তা শরীরে ব্যথা সৃষ্টি করে। সাধারণত এই ব্যথাগুলো শরীরের পেছনের অংশে, পায়ে কিংবা কোমরে হতে পারে।

বমি
রক্তে বর্জ্য পদার্থ বেড়ে যাওয়ায় কিডনি রোগে বমি বমি ভাব এবং বমি হওয়ার সমস্যা হতে পারে।

ফোলা ভাব
কিডনি শরীর থেকে বর্জ্য এবং বাড়তি পানি বের করে দেয়। কিডনিতে রোগ হলে এই বাড়তি পানি বের হতে সমস্যা হয়। বাড়তি পানি শরীরে ফোলাভাব তৈরি করে।

সবসময় শীত বোধ হওয়া
কিডনি রোগ হলে গরম আবহাওয়ার মধ্যেও শীত শীত অনুভব হয়। আর কিডনিতে সংক্রমণ হলে জ্বরও আসতে পারে।

কিডনি ভালো রাখার উপায়:

*ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীদের নিয়মিত রক্তের শর্করা এবং প্রস্রাবের অ্যালবুমিন পরীক্ষা করা ও রক্তের হিমোগ্লোবিন এওয়ানসি (নিয়ন্ত্রণে রাখা।

*উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত রোগীদের রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা।

*ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত রোগীদের কিডনির কার্যকারিতা প্রতি ৬ মাস অন্তর পরীক্ষা করা।

*শিশুদের গলা ব্যথা, জ্বর ও ত্বকে খোস-পাঁচড়ার দ্রুত সঠিক চিকিৎসা করা উচিত। কারণ এগুলো থেকে কিডনি প্রদাহ বা নেফ্রাইটিস রোগ দেখা দিতে পারে।

*ডায়রিয়া, বমি ও রক্ত আমাশয়ের কারণে রক্ত পড়ে ও লবণশূন্য হয়ে কিডনি বিকল হতে পারে। তাই দ্রুত খাবার স্যালাইন খেতে হবে। প্রয়োজনে শিরায় স্যালাইন দিতে হবে।

*চর্বিজাতীয় খাবার ও লবণ কম খাওয়া এবং পরিমিত পানি পান করা।

*চিকিৎসকের পরামর্শ ব্যতীত অ্যান্টিবায়োটিক ও তীব্র ব্যথানাশক ওষুধ সেবন না করা।

*প্রস্রাবের ঘন ঘন ইনফেকশনের জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নেওয়া।

আরও পড়ুন: বসন্তে অসুখ থেকে দূরে থাকবেন যেভাবে

*মাত্র দুটি পরীক্ষায় জানা যায় কিডনি রোগ আছে কি-না এবং একটি সহজ সমীকরণে বের করা যায় কিডনি শত ভাগের কত ভাগ কাজ করছে। একটি হলো- প্রস্রাবে অ্যালবুমিন বা মাইক্রো অ্যালবুমিন যায় কি-না এবং অন্যটি রক্তের ক্রিয়েটিনিন।