বিস্কুট খেতে স্কুলে যাচ্ছে ৩০ লাখ শিক্ষার্থী,ঝরে পড়ার হার ৬ শতাংশ

২০০১ সালে যশোর অঞ্চলে স্কুল ফিডিং কর্মসূচি অর্থাৎ প্রাথমিক স্তরে পড়ুয়া শিশুদের বিস্কুট খাওয়ানো কর্মসূচি পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা হয়। এর উদ্দেশ্য সফলতার মুখ দেখায় সরকার ও বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি মিলে দেশজুড়ে দারিদ্র্যপীড়িত এলাকায় বিস্কুট খাওয়ানোর কার্যক্রম চালু করে।
প্রথম ধাপে কার্যক্রম সফল হওয়ায় দ্বিতীয় ধাপে ২০১০ সালে নতুন করে এ কার্যক্রম শুরু হয়। এ পর্যায়ের কর্মসূচি চলবে ২০১৭ সালের জুন পর্যন্ত। এখন পর্যন্ত ফলাফল উল্লেখযোগ্য হারে ইতিবাচক বলে জানিয়েছেন প্রকল্প কর্তৃপক্ষ।সারাদেশে ঝরে পড়ার হার ২০ শতাংশ হলেও স্কুল ফিডিং কর্মসূচি এলাকায় ঝরে পড়ার হার মাত্র ৬ শতাংশ।

জানা গেছে, বাংলাদেশ সরকার ও বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি দারিদ্র্যপীড়িত এলাকার স্কুলগুলোতে শিশুদের মাঝে বিস্কুট ও খাবার সরবরাহে কারিগরি সহায়তা ও অর্থায়ন করছে। প্রকল্পের নাম ‘দারিদ্র্যপীড়িত এলাকায় স্কুল ফিডিং কর্মসূচি’। বর্তমানে সারা দেশে প্রায় ৩০ লাখ ৩ হাজার ১২৪ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে বিস্কুট সরবরাহ করা হয়। বাস্তবায়নকারী সংস্থা হচ্ছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতর। প্রকল্পের সুবিধা পাচ্ছে দেশের দারিদ্র্যপীড়িত ও প্রত্যন্ত এলাকার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, রেজিস্টার্ড বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, অস্থায়ী রেজিস্ট্রেশন/পাঠদানের অনুমতিপ্রাপ্ত বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কমিউনিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, শিশুকল্যাণ ট্রাস্ট পরিচালিত প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং এবতেদায়ী মাদ্রাসায় অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরা।

রমজানের আগে মিরপুর, মোহাম্মদপুর, মতিঝিল ও তেজগাঁও এলাকার প্রকল্পের আওতায় থাকা বেশ কয়েকটি স্কুল ঘুরে দেখা গেছে, এসব স্কুলে নিয়মিত শিক্ষার্থীদেরকে বিস্কুট খাওয়ানো হয়। বিস্কুট খেয়ে তারা শারিরীক ও মানসিকভাবে উপকৃত হচ্ছে।
এসব স্কুলের শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, খাবারের আয়োজন কম। তবুও বাচ্চারা বিস্কুট খেতে নিয়মিত স্কুলে আসে। আর স্কুলে আনাই এই প্রকল্পের অন্যতম প্রাথমিক উদ্দেশ্য। আগে অর্ধেকেরও বেশি শিশু স্কুলে ঠিকমতো আসত না, আবার এলেও দুপুরের পর থাকত না।

জানা গেছে, সংশোধিত আকারে ২০১০ সাল থেকে কার্যক্রম শুরুর পর থেকে শিশুরা প্রতিদিন দল বেঁধে স্কুলে আসে। বর্তমানে দেশের ২৯ টি জেলার ৯৩টি উপজেলার দারিদ্রপীড়িত এলাকার স্কুল গুলোতে এই কার্যক্রম চলছে। পরিবর্তন এসেছে অনেক। শিশু শিক্ষার্থী ঝরে পড়া রোধ, শিক্ষার হার ও গুণগত মান ঠিক রাখা, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি শতভাগ নিশ্চিত করার উদ্যোগকে সফল করছে বলে জানায় প্রকল্প কর্তৃপক্ষ।

এদিকে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচিসহ দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের প্রাথমিক শিক্ষায় রীতিমতো এক বিপ্লব শুরু হয়েছে। তাও আবার স্কুল ফিডিং কর্মসূচির সফল বাস্তবায়নের কারণে। শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার হার কমেছে, শিক্ষার্থীদের শারীরিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে, শিক্ষার গুণগতমানেও উন্নতি হচ্ছে।

বর্তমানে পরীক্ষামূলকভাবে দেশের দু’টি জেলাতে রান্না করা খাবার দেওয়া হয় শিশুদের মাঝে। এর সুফলটা বিস্কুটের ফলের চেয়ে বেশি হবে বলে মনে করছেন প্রকল্প পরিচালক ও বিশেষজ্ঞরা। ২০১৭ সালের জুন মাসে এই প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলে ২০১৮ সাল থেকে গরম রান্না করা খাবার দেওয়া হবে।

বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির তত্ত্বাবধায়নে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ের পরামর্শক দ্বারা সম্পাদিত সমীক্ষা পর্যালোচনায় দেখা গেছে, যে সকল উপজেলাতে ফিডিং কর্মসূচি চালু ছিল সে সকল উপজেলার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের শিক্ষার্থী ভর্তির হার, উপস্থিতির হার, প্রাথমিক শিক্ষাচক্র সমাপনীর হার, নন ফিডিং উপজেলার তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বেশি। এছাড়া ফিডিং উপজেলায় ঝরে পড়ার হারও নন ফিডিং উপজেলার তুলনায় কম।

 প্রকল্পে প্রাক্কলিত ব্যয় মোট ৩১শ’ ৪৫ কোটি ৫২ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকার দিচ্ছে ২১শ’ ৪৫ কোটি ৯৯ লাখ এবং বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি দিচ্ছে ৯৯৯ কোটি ৫২ লাখ টাকা।

ফিডিং কর্মসূচি বাস্তবায়নে এনজিও নির্বাচন, বিস্কুট ফ্যাক্টরি নির্বাচন, বিস্কুটের মান যাচাই করার জন্য নির্বাচন, মনিটরিং, প্রশিক্ষণসহ অন্যান্য কাজে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি সহায়তা প্রদান করছে। মনিটরিংয়ের জন্য রয়েছে একাধিক স্তরবিশিষ্ট ব্যবস্থা। মন্ত্রণালয়, অধিদফতর, প্রকল্প অফিস, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি যৌথভাবে পরিদর্শনের মাধ্যমে প্রকল্পের কার্যক্রম মনিটরিংতো করছেই। এছাড়া প্রকল্প অফিস পৃথকভাবে প্রকল্পের কার‌্যক্রম মনিটরিং করে, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির পৃথকভাবে মনিটরিং করে, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার ও সহকারী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার নিয়মিত পরিদর্শনের মাধ্যমে প্রকল্পের কার্যক্রম মনিটরিং করেন।

প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে প্রতি স্কুল দিবসে ৭৫ গ্রাম ওজন বিশিষ্ট এক প্যাকেট করে উচ্চ পুষ্টিমানসমৃদ্ধ বিস্কুট সরবরাহ করা হচ্ছে। শিশুদের এ বিস্কুটে আছে, গমের ময়দা ৬৯ শতাংশ, চিনি ১২ শতাংশ, উদ্ভিদ ফ্যাট/ভেজিটেবল ফ্যাট-১৩ শতাংশ, সয়া ময়দা ৬ শতাংশ। এছাড়া আছে প্রয়োজনীয় আয়োডিনযুক্ত লবণ, জিংক, লৌহ, বেকিং সোডা এবং ১৩ রকমের ভিটামিন। প্রত্যেক শিক্ষার্থী ৭৫ গ্রাম পুষ্টিমানসমৃদ্ধ এক প্যাকেট বিস্কুট প্রয়োজনীয় বিশুদ্ধ পানি দেওয়া হচ্ছে। প্রধান শিক্ষক পুরো বিষয়টি তত্ত্বাবধান করেন।

এদিকে ২০১৮ সাল থেকে দারিদ্র্যপীড়িত অঞ্চলে বিস্কুটের পরিবর্তে রান্না করা খাবার দেয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশ, ভারত ও ব্রাজিলে চালু থাকা মধ্যাহ্ন খাবার বিতরণ কৌশলের আলোকে শুরু হয়েছে ন্যাশনাল স্কুল ফিডিং পলিসি তৈরির কাজ।

দেশে দারিদ্র্যপীড়িত এলাকায় চলমান স্কুল ফিডিং কর্মসূচির পরিচালক রাম চন্দ্র দাস বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,দারিদ্র্যপীড়িত এলাকার শিশুদের মধ্যে প্রতিদিন পুষ্টিগুণ সম্পন্ন বিস্কুট দেওয়ার ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশটা তুলনামূলকভাবে অনেক ভালো। যারা গত ৫ বছর ধরে বিস্কুট খেয়েছে তাদেরকে দেখলেও বোঝা যায়। তাছাড়া এই প্রকল্পের প্রধান উদ্দেশ্য সফল শিশুরা নিয়মিত স্কুলে আসে। সারাদেশের ঝরে পড়া শিশুর তুলনায় এই অঞ্চলের ঝরে পড়ার হার অনেক কম।

২০১৮ সাল থেকে রান্না করা খাবার দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, বর্তমানে বরগুনার বামনা ও জামালপুরের ইসলামপুর এই দু’টি উপজেলাতে পরীক্ষামূলকভাবে রান্না করা খাবার দেয়া হচ্ছে। পরবর্তীতে এটি দেশব্যাপী চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।

[বাংলা ট্রিবিউন]