নাওমি ওয়াতানাবের ‘সবটুকু জুড়েই এখন বাংলা’

অনলাইন ডেস্কঃ
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে গবেষণার সময়ই বাংলা ও বাঙালির প্রেমে পড়েন জাপানের নাগরিক নাওমি ওয়াতানাবে। এরপর বহু ক্রোশ পথ পাড়ি দিয়ে তিনি এখন বাংলাদেশেই থিতু হয়েছেন। বাংলা ভাষা শেখার পাটও চুকিয়ে ফেলেছেন।

৫৩ বছর বয়সী নাওমি ওয়াতানাবে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার কর্মকর্তা হিসেবে বাংলাদেশে থিতু হলেও তিনি এখন নিয়মিতই লিখছেন। বাংলাদেশে বসবাসের অভিজ্ঞতায় তিনি এই বাংলার সমাজ বাস্তবতা, রাজনীতি ও দর্শন নিয়ে লিখছেন।

ইতোমধ্যে ৯টি বই প্রকাশিত হয়েছে তার। এবারও তার ছোটগল্পের সংকলন নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে ‘রূপান্তরের কথকতা’।

একুশের বইমেলায় বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে ওয়াতানাবে জানালেন, জাপানের শিশুদের বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি আগ্রহী করে তুলতে এখন কালজয়ী শিশু সাহিত্যগুলো জাপানের ভাষায় অনুবাদ করতেও উদ্যোগ নেবেন।

তিনি জানান, জাপানের নিইগাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে তিনি বাংলাদেশ নিয়ে আগ্রহী হয়ে উঠেন।

১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর ১৯৭১- এর মুক্তিযুদ্ধ অবধি সময়ে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব, বাংলার রাজনীতি নিয়ে গবেষণা করেছেন ওয়াতানাবে।

তবে সেখানেই থেমে থাকতে চাইলেন না নাওমি। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেই নিয়মিত লেখালেখি করা ওয়াতানাবে চাইলেন বাংলার সমাজব্যবস্থা নিয়েও কাজ করতে।

“যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে একটি জাতি গঠন প্রক্রিয়া নিয়ে আমি আরও জানতে চাইলাম। আমি থিসিসের সময় বাংলা শিখতে এসেছিলাম কলকাতায়। তখন এসেছিলাম বাংলাদেশে। বাংলা ভাষা শেখার পর মনে হল, এ বাংলার জনপদ নিয়ে আমার অনেক কিছু লেখার আছে।”

বাংলা শেখার প্রথম পাঠ নিয়ে তিনি বলেন, “আমার মনে হয়, জাপানি ভাষার হরফ ও বাংলা হরফের মধ্যে খুব বেশি তফাৎ নেই। তবুও আমি এখনও ঠিকমতো লিখতে পারি না। যুক্তাক্ষর লিখতে গিয়ে সমস্যা হয়। তবে বাংলা বলাটা আমি খুব ভালো করে রপ্ত করেছি।”

ওয়াতানাবের মা সুতুকো কাতো ও তার স্বামী তাকাশী দুজনেই কবি। লেখালেখির উৎসাহ পান তাদের কাছেই।

নিজের লেখালেখি নিয়ে ওয়াতানাবে বলেন, “আমি সাহিত্যচর্চাকে দেখি দৈনন্দিন জীবনের অংশ হিসেবে। প্রতিদিন ভোর ৪টায় উঠে পড়ি। তারপর দেড় ঘণ্টা ডুবে থাকি সাহিত্যভুবনে। কখনও পড়ি, কখনও লিখতে বসি। প্রতিদিনই কিছু না কিছু লিখি।”

আইনের শিক্ষার্থী ওয়াতানাবে একসময় যুক্ত হন জাইকায়। আন্তর্জাতিক এই সংস্থার হয়ে কাজ করতে গিয়ে ২০০০ সালে তিনি সুযোগ পান বাংলাদেশে কাজ করার।

এ দেশে এসেই তিনি কাজ শুরু করেন বাংলার কৃষকদের নিয়ে। কৃষকদের নিয়ে নিয়মিত প্রতিবেদন তৈরি করতে গিয়ে তাদের আর্থ সামাজিক অবস্থান নিয়ে জাপানে গিয়ে প্রকাশ করেন গবেষণা প্রতিবেদন।

২০০৯ সাল থেকে বাংলাদেশে বসবাস করতে শুরু করেছেন নাওমি। ২০১৪ সালে তিনি বাংলাদেশে বসবাসের অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখেন তার প্রথম বই ‘যাপিত জীবনে আমার বাংলাদেশ।’ বইটি প্রকাশ করেছে বিশ্বসাহিত্য ভবন।

বইটি নিয়ে তিনি বলেন, “আমি বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরেছি বাংলাদেশের। আমি যেখানে যা দেখেছি, যা শুনেছি , তার অভিজ্ঞতা থেকে প্রথম বইটি লিখেছি।”

এরপর নাওমি ‘আমি কোথায় দাঁড়াব’, ‘প্রতিবেশীগণ’, ‘লেখকের চিঠি’, ‘সহোদর এবং কবি’ নামে বেশকটি গল্প সংকলন ও উপন্যাসও প্রকাশ করেছেন। এগুলোও বিশ্বসাহিত্য ভবন থেকে প্রকাশিত হয়েছে।

বাংলাদেশের প্রকাশনীর সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে লেখক, গবেষক রতন সিদ্দিকীর সহযোগিতার কথা কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করেন।

তিনি বলেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, মহাশ্বেতা দেবী ছাড়াও হুমায়ূন আজাদ তার সাহিত্য ভাবনার বড় একটি অংশজুড়ে রয়েছেন।

২০১৪ সাল থেকে নিয়মিত বই প্রকাশ হচ্ছে বইমেলায়। বইমেলাকে নাওমি দেখেন, লেখক-পাঠকের সবচেয়ে বড় মিথস্ক্রিয়া হিসেবে।

তিনি বলেন, “সারা বছর ফেইসবুক, স্মার্টফোন নিয়ে ব্যস্ত তরুণরা এ একটি মাস বই নিয়ে মেতে থাকে। কেউ বই কিনুক আর নাই কিনুক, তারা বই নিয়ে ভাবছে, লেখকদের সম্পর্কে জানছে; এটা খুব আনন্দ দেয় আমাকে। সারা দেশ থেকে নানা বয়সী মানুষ এসে কত ধরনের বই কিনে নিচ্ছে। এ ব্যাপারটি দারুণ লাগে আমার।”

ওয়াতানাবে জানান, তার প্রকাশিত ৯টি বই তিনি নিয়ে গেছেন জাপানে। কিছু অংশ অনুবাদ করে শুনিয়েছেন তার বন্ধুদের।

টোকিও বাংলা বইমেলা আয়োজনের মাধ্যমে সেখানে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের আবেদন তৈরি হচ্ছে বলেও মনে করেন তিনি।

“জাপানের অনেক তরুণ-তরুণী বাংলা ভাষার প্রতি দারুণ আগ্রহী হয়ে উঠেছে। বাংলা সাহিত্য নিয়েও গবেষণা করছে কেউ।”

তবে জাপানে বাংলা সাহিত্যকে জনপ্রিয় করতে ওয়াতানাবে মনে করেন, তা শিশুদের মধ্য থেকেই শুরু করা উচিৎ।

তিনি জানান, মৌলিক সাহিত্য রচনার পাশাপাশি তিনি এখন বাংলাদেশের কালজয়ী শিশু সাহিত্যগুলো জাপানি ভাষায় অনুবাদ করতে শুরু করবেন।

কথাপ্রসঙ্গে উঠে আসে গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার প্রসঙ্গটি। ২০১৬ সালের ওই জঙ্গি হামলায় নিহতদের মধ্যে ছিলেন বেশ কজন জাপানি নাগরিক।

সেই দিনের কথা স্মরণ করতে আঁতকে উঠেন ওয়াতানাবে।

“ওই কাজ কি মানুষে করেছে? ওগুলো সব অমানুষের কাজ। আমার কাছে তখন কেন জানি মনে হত, আমার খুব কাছের বন্ধুরা দূরে সরে যাচ্ছে। আমি তাদের বুঝিয়েছি। আমি জানি, বাংলার মানুষরা শান্তিপ্রিয়।”

আলাপচারিতার শেষে তিনি বলেন, “আমার যাপিত জীবনের সবটুকু জুড়েই এখন বাংলা ও বাংলাদেশ। এ দেশটাকে আমি ভালোবাসি। আর কিছুদিন পর আমি একেবারেই চলে আসব বাংলাদেশে। এখানে থাকতে শুরু করব। তখন বাংলা ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে আরো অনেক কাজ করব।”

সূত্রঃ বিডিনিউজ