প্রকৃতি জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং বিশ্ব পরিবেশ দিবসের ভাবনা

বিশ্বজিত সেন :

একুশ শতকে প্রকৃতি পরিবেশের বিপর্যয়কর অবস্থা জলবায়ু পরিবর্তনের বিশ্বব্যাপী প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাবে সমগ্র পৃথিবী একটি নতুন সংকটকালীন সময়ে উপনীত হয়েছে। যার জন্য পৃথিবীর উষ্ণায়ন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবসহ নানান পরিবেশধর্মী বিষয়ের জন্য ৫ জুন ২০১৬ বিশ্ব পরিবেশ দিবস সারা বিশ্বের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ। জীববৈচিত্র্য ধ্বংস, প্রকৃতি পরিবেশের ক্ষতির ফলে সারাবিশ্ব যে দিন দিন বিপদাপন্ন হয়ে উঠেছে তারই অনুধাবনে জাতিসংঘ ১৯৭২ সাল থেকে বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালনের বিষয়টি সামনে নিয়ে আসে।

১৯৭২ সালের ৫ জুন থেকে ১৬ জুন পর্যন্ত জাতিসংঘের সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ এবং জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি (ইউনাইটেড নেশন এনভায়রনমেন্ট প্রোগ্রাম) এর সম্মেলনে প্রতি বছর ৫ জুনকে বিশ্ব পরিবেশ দিবস হিসেবে পালন করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। পরবর্তীতে ১৯৭৩ সাল থেকে প্রতিবছর ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালন হয়ে আসছে। বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালনের মাধ্যমে পরিবেশ রক্ষার চেতনা পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে দিতে এ দিনটি এখন বিশেষ ভূমিকা রাখছে।

বিশ্ব পরিবেশ দিবসের আলোকে দেখা যায়, বাংলাদেশ নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চল হিসেবে বিশেষভাবে পরিচিত। একই সাথে প্রকৃতির বিমুগ্ধতায় পরিপূর্ণ এদেশের শ্যামল মাটি। সবুজ শেকড়ের পত্রাঞ্জলী শোভিত বন, নদী, সাগর, হাওর, বাওর, দ্বীপাঞ্চল এবং নৈসর্গিক সৌন্দর্যের কারণে বাংলাদেশ এক অনন্য ভূখন্ড। সবুজ ক্রান্তিয় অঞ্চল চিরহরিৎের সত্বা, প্রকৃতির নির্যাসের মধ্য দিয়ে জনগোষ্ঠীর পথচলা। মাঝে মধ্যে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঘনঘটায় বিপর্যস্ত হয়েছে এদেশের সম্পদ ও মানুষ। তারপরও প্রকৃতিগত কারণে আবারও মাথা তুলেছে এ দেশ। এইভাবে প্রবহমান চির ঐতিহ্যের সবার প্রিয় মাতৃভূমি-বাংলাদেশ।

প্রকৃতিগত ভারসাম্য নিয়ে এক সময় বাংলাদেশ টিকে থাকলেও এখন সে অবস্থা আর নেই। এক সময়ে চাহিদার চেয়ে বেশি সবুজ বন নিয়ে বিস্তৃত ছিলো বাংলাদেশ। কিন্তু ক্রমাগত সবুজ নিধন, পাহাড়কাটা, পাথর উত্তোলন, প্যারাবন উজাড়, বালি উত্তোলনসহ নানান পরিবেশ বিরোধী কর্মকান্ডে বাংলাদেশ এখন পরিবেশ ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে সারাবিশ্বে পরিচিত। এর সাথে কলকারখানার বিষাক্ত গ্যাস, সাগর, নদীতে দূষিত তেল নিঃসরণ, দূষিত বর্জ্য নিক্ষেপসহ নানান প্রকৃতি পরিবেশ বিরোধী কর্মকা-ে দেশের প্রকৃতিগত অবস্থা মুমূর্ষু হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবেশ দূষণের ফলে এখন প্রতিবছর শুধু নয়, প্রায় সময়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার হচ্ছে বাংলাদেশ। পরিবেশের অবস্থা মারাত্মক পর্যায়ে চলে যাওয়ার ফলে জনস্বাস্থ্যের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। বিভিন্ন রোগবালাই বিস্তারের ফলে মানুষের প্রাণ সংহারসহ নানান বিপত্তি অহরহ ঘটে যাচ্ছে।

বৈশ্বিক উষ্ণায়ন, হিম প্রবাহে বরফ গলা, সমুদ্র পৃষ্টের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, সারা পৃথিবীই এখন ঝুঁকির মধ্যে পড়ে গেছে। নির্বিচারে পাহাড়, সবুজ ধ্বংস, জীববৈচিত্র্যসহ নানান প্রাণ সংহারের ফলে ইতোমধ্যে উপকূলীয় এলাকাসহ দেশের নিম্নাঞ্চল ডুবতে শুরু করেছে। কক্সবাজার জেলার কুতুবদিয়া, মহেশখালী, সেন্টমার্টিন, শাহপরীর দ্বীপসহ বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকার মানুষ দ্রুতহারে পরিবেশ উদ্বাস্তুতে পরিণত হচ্ছে। এটা শুধু কক্সবাজারে নয়, দেশের অন্যান্য নিচু বা উপকূল এলাকাতে একই অবস্থা শুরু হয়েছে। বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে যে ধরণের প্রাকৃতিক দুর্যোগ শুরু হয়েছে এর থেকে তাঁর থেকে বাঁচাতো দূরের কথা, এখন বাংলাদেশ কিভাবে টিকে থাকবে সেটা প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। দিনের পর দিন প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাবে বাংলাদেশ আরো বেশিভাবে সংকটাপনা অবস্থায় চলে যাচ্ছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়ে দেখা যায়, জাপান, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলঙ্কা, ভারতসহ বিভিন্ন দেশে সুনামী, টর্নেডো, সাইক্লোন, টাইফুন, ভূমিকম্পসহ নানান প্রাকৃতিক বিপদে বিস্তর প্রাণ এবং সম্পদের হানি হচ্ছে। সম্প্রতি বিভিন্ন দেশে ভূমিকম্পের ফলে যে আঘাতটা সেসব দেশের উপর এসেছে তারই পরিপ্রেক্ষিতে এখনো হাজার হাজার মানুষ অসহায় অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করছে। যেসব দেশে ভূমিকম্পসহ নানান প্রাকৃতিক দুর্যোগে যে পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে সেখান থেকে উঠে দাঁড়াতে ঐসব দেশের অনেক দিন সময় লাগবে। বর্তমানে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ পৃথিবীর মানুষকে আতঙ্কিত করে তুলেছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের তা-ব একুশ শতকে আরো বেশি করে বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রযুক্তির উন্নয়নের সাথে সাথে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে সমগ্র বিশ্বই এখন হুমকির মুখে। পারমাণবিক বিকীরণের তেজষ্ক্রিয়তার ভয়াবহতা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মর্মান্তিক পরিণতির কথা জাপানসহ বিশ্ববাসী স্মরণে আছে।

৫ জুন ২০১৬ আন্তর্জাতিক পরিবেশ দিবসে এবারের বিশ্বব্যাপী শ্লোগান ছিলো “ বন্যপ্রাণি ও পরিবেশ, বাঁচায় প্রকৃতি বাঁচায় দেশ। বাংলাদেশসহ সারা পৃথিবীতে এই শ্লোগান নিয়ে বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালন করা হচ্ছে। বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে এই শ্লোগানের তাৎপর্য খুঁজতে গিয়ে বারবার সামনে আসে মানুষের সেবায় প্রকৃতি ও পরিবেশের অবস্থা কি। যে প্রকৃতি এ বন মানুষকে ছায়া আশ্রয় এবং প্রকৃতির রূদ্ধরোষ থেকে বাঁচাতো, সেই বনকে তো মানুষ প্রায় ধ্বংস করে ফেলেছে। অব্যাহত সবুজ বন, পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ধ্বংস, কৃষি জমির পরিবর্তন, ক্ষতিকর তামাক চাষসহ নানান পরিবেশ বিরোধী কর্মকান্ডে বাংলাদেশের প্রাকৃতিক অবস্থায় এখন খারাপ অবস্থায় পৌঁছেছে। একই সাথে উন্নত দেশগুলোর কলকারখানা থেকে নির্গত ধোঁয়া বা কার্বন নিঃসরণ আরো ক্ষতিকর প্রভাব ডেকে এনেছে।

পরিবেশ প্রকৃতির বিরুদ্ধে যতই খারাপ সময় আসুক না কেন, মানুষকেই গড়তে হবে নতুন সবুজের পৃথিবী। বাংলাদেশের বিভিন্ন রক্ষিত এলাকাতে ইতোমধ্যে সহ ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির মাধ্যমে প্রকৃতি রক্ষার কাজ এগিয়ে চলছে। সাথে সাথে নতুন প্রজন্মসহ বিভিন্ন স্তরের মানুষের প্রকৃতি রক্ষার সচেতনতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এখানেই সবুজ রক্ষার নতুন প্রাণস্পন্দন। সরকারি-বেসরকারি প্রতিনিধি এবং প্রান্তিক মানুষের নিসর্গ রক্ষায় অংশগ্রহণ, বন, পরিবেশ বাঁচাতে বিকল্প জীবিকায়নের মাধ্যমে নতুন ধারা এগিয়ে যাচ্ছে। এখন প্রত্যেককেই স্ব স্ব স্থান থেকে বন, প্রকৃতি রক্ষার জন্য কাজ করতে হবে। ভূমিগ্রাসী, বনদস্যুদের সাথে লড়াইয়ে এখনো টিকে থেকেছে সকল পর্যায়ের মানুষ।

সবাই এখন বুঝতে পারছে, এই বন নদী পাহাড়, সমুদ্র না থাকলে আমরা বাঁচবো না, বাংলাদেশ সহ পৃথিবী বাঁচবে না। নতুন প্রজন্মসহ সকলের সবুজ রক্ষার আন্দোলন, এখন মূলত ব্যক্তিগত, সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। সার্বিক পরিস্থিতিতে বন, প্রকৃতি বাঁচলে, মানুষ বাঁচবে এবং সবুজের সমারোহ সকলকে টিকিয়ে রাখবে। এ বিষয়টা এখন প্রায়োগিক এবং চূড়ান্ত বিষয়। বর্তমান সরকার পরিবেশ, বন, জীববৈচিত্র্যসহ প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা করতে নতুন এবং যুগোপযোগী আইন প্রণয়ন এবং সংশোধন করছে। এসব আইনকে কঠোরভাবে প্রয়োগ করে সকল ধরণের পরিবেশ বিরোধী কর্মকান্ড বন্ধ করতে সকলকে এগিয়ে আসতে হবে।

প্রকৃতি পরিবেশ রক্ষায় সরকার এবং দেশের মানুষের কাছে নতুন এক চ্যালেঞ্জ! বিষয়টা এখন আর একদিনের কর্মসূচী নয়, প্রকৃতি, পরিবেশ, বন রক্ষার কর্মসূচী মূলত প্রতিদিনের এবং সাংবাৎসরিক কার্যক্রম। পরিবেশ রক্ষার চেতনায় উদ্ভাসিত এদিন আমাদেরকে নিয়ে যাবে নতুন এক দিনের কাছে। যেখানে সবুজসহ সকল ধরণের জীববৈচিত্র্য রক্ষা পাবে, পরিবেশ দূষণ, কার্বন নিঃসরণসহ বিভিন্ন পরিবেশ বিরোধী কর্মকান্ড থাকবে না।

নতুন চেতনায় এবং পরিবেশ রক্ষার কর্মকান্ডের ফলে প্রকৃতির রুদ্ধ আক্রোশ থেকে মানুষ রক্ষা পাবে। বন, সবুজ, জীববৈচিত্র্যকে ভালোবাসুন, সকলের চিন্তায় এবং কর্মে সবুজের হৃদয়ের শ্যামলিমায় প্রকৃতিকে রক্ষা করুন। এই চেতনায় বাংলাদেশসহ সারা পৃথিবী উঠে দাঁড়াবে সবুজের আচ্ছাদনে পরিপূর্ণ হয়ে। এভাবেই প্রকৃতির সুন্দরতায় ভরে উঠবে সারাবিশ্বের সকল প্রান্তর। ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবসের উদাত্ত আহবান, রক্ষা করি সবুজ প্রাণ-গাইবো আবার জীবনের গান।

লেখক: সাংবাদিক, গবেষক এবং পরিবেশকর্মী।