অন্য রকম প্রেম

জিনিয়া জাহিদঃ
নব্বইয়ের দশকে একটি বহুজাতিক কোম্পানির হেড অব মার্কেটিংয়ের দায়িত্ব নিয়ে বাংলাদেশে গিয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ান নাগরিক মাইকেল। নীল চোখের সুদর্শন মাইকেলের তখন বয়স ছিল ৩৯। ঢাকার বারিধারায় তিন রুমের সুসজ্জিত একটি ফ্ল্যাটে তাঁর থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল। ফ্ল্যাটটি মূলত তাঁদের অফিসের। এর আগে একজন আমেরিকান তাঁর পরিবার নিয়ে ওই ফ্ল্যাটে থাকতেন। তাঁর টার্ম শেষ হয়ে এলে এক বছরের জন্য মাইকেল ওই পোস্টে জয়েন করেন। মাইকেলের ফ্ল্যাটে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ পান আনোয়ারা, সংক্ষেপে আনু। আগের আমেরিকান পরিবারেরও গৃহকর্মী ছিলেন আনু।

তখন আনুর সঠিক বয়স কত, তিনি নিজেও জানতেন না। ধারণা করা হয়, সে সময় তাঁর বয়স ছিল পঁচিশের কাছাকাছি। গড়পড়তা বাঙালি মেয়েদের তুলনায় আনু ছিলেন অত্যন্ত লম্বা। অপুষ্টির কারণে ছিলেন ভীষণ শুকনা। গায়ের রং কালো আর দাঁত উঁচু হওয়ার কারণে অনেক চেষ্টা করেও আনুর মা-বাবা অল্প বয়সে আনুকে বিয়ে দিতে পারেননি। অভাবের সংসারে সেই ছোটকাল থেকেই মুন্সিগঞ্জের বিভিন্ন বাসাবাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করতেন আনু। বয়স কুড়ি ছাড়িয়ে গেলে মা-বাবাও তাঁর বিয়ের আশা বাদ দিয়ে দেন। ঢ্যাঙা-কালো-দাঁত উঁচু-হাড় জিরজিরে আনুর দিকে সত্যি বলতে কি কোনো পুরুষ নাকি কোনো দিন ফিরেও তাকাননি। আর এ জন্য আনুর মনে যে খুব আফসোস ছিল, তা নয়। তিনি বরং নিজেকে বেশ নিরাপদ মনে করতেন।

মুন্সিগঞ্জের যে বাসায় আনু সে সময় কাজ করেছিলেন, সেই বাড়ির ছোট মেয়ের দ্বিতীয় বাচ্চা হলে, আনুকে একটু বেশি বেতনের আশ্বাস দিয়ে তাঁরা ঢাকায় পাঠিয়ে দেন। সত্যি বলতে কি, আনুও ঢাকা শহরে আসার জন্য উন্মুখ ছিলেন। অত্যন্ত কর্মঠ আনু শুধু সদ্যোজাত বাচ্চাটি নয়, তাঁদের ছয় বছরের মেয়ের দেখাশোনাসহ বাড়ির সব কাজ করতেন।

ওই বাসায় কাজে যাওয়ার কিছুদিন পর একদিন বাসাজুড়ে আনন্দের উল্লাস বয়ে যায়। আনু জানতে পারেন, ছোট খালাম্মা ডিভি লটারি জিতেছেন। বাড়ির সবাই মিলে নাকি আমেরিকা চলে যাবেন। এই আমেরিকা যাওয়ার প্রস্তুতি হিসেবে ছোট খালাম্মা আর খালুর শুরু হয় ইংরেজি চর্চা। বাসায় হিন্দি সিরিয়াল দেখা বন্ধ। বাংলায় কোনো কথা বলা যাবে না। ইংরেজি শেখার জন্য একজন শিক্ষকও তারা রাখেন। আর ইংরেজি চর্চা এমন অবস্থায় দাঁড়ায় যে, আনুকে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করতে হয়। আনু কখনো রেস্টুরেন্টের ওয়েটার, কখনো প্রতিবেশী, কখনো ট্যাক্সি ড্রাইভার কিংবা কখনো অফিসের বস। তাঁদের সবার সঙ্গে ইংরেজি শেখা ও চর্চার কারণে আনুও ধীরে ধীরে ইংরেজি রপ্ত করতে শেখেন।

এরপর সত্যি সত্যি ছোট খালাম্মারা আমেরিকা চলে গেলে, ওই বিল্ডিংয়ের আরেক বাসায় আনু কাজ পেয়ে যান। একদিন নিচের ভ্যানওয়ালার কাছে সবজি কিনতে গিয়ে দেখেন সামনে ছোট একটা জটলা। কৌতূহলী হয়ে এগিয়ে গেলে তিনি দেখেন, এক সাদা চামড়ার বিদেশি দোকানদার ও রিকশাচালকদের কিছু একটা বোঝানোর চেষ্টা চালাচ্ছেন। কিন্তু কেউ কিছু বলতে পারছিলেন না। কী মনে করে আনু সামনে এগিয়ে গিয়ে পরিষ্কার ইংরেজিতে ভদ্রলোককে তাঁর সমস্যা কী, জানতে চাইলেন। আনু যা বুঝলেন তা হলো, তাঁর যাওয়ার কথা ছিল এক জায়গায়, কিন্তু রিকশাওয়ালা তাঁকে নিয়ে এসেছেন অন্য জায়গায়। সেদিন সেই বিদেশি ভদ্রলোকটিকে আনু সাহায্য করেছিলেন তাঁর কাঙ্ক্ষিত ঠিকানায় পৌঁছে দিতে। আর পুরস্কার হিসেবে পেয়েছিলেন তাঁদের বারিধারার বাসায় বেশ মোটা বেতনের গৃহকর্মীর কাজ। আরও দুজন গৃহকর্মীর সঙ্গে ওই বাসায় আনু শেফ হিসেবে কাজে যোগদান করেন। বলাবাহুল্য, আনুর ইংরেজি শেখা এই পরিবারের সঙ্গে থেকে আরও বেশি ত্বরান্বিত হয়েছিল।

পরবর্তী সময় ওই আমেরিকান পরিবার দেশে ফিরে গেলে মাইকেলের গৃহকর্মী হিসেবে আনু নিযুক্ত হন। কিন্তু মাইকেল যেহেতু একা থাকতেন, তাই একজন ফুটফরমাশ খাটা ছেলে ও আনু ছাড়া বাকি গৃহকর্মীদের বিদায় করে দেওয়া হয়। রাতে থাকার জন্য একটু দূরের বস্তিতে মোটা টাকার বিনিময়ে আনু তাঁর এক ভাইয়ের পরিবারের সঙ্গে থাকার ব্যবস্থা করেন।

ভোজনরসিক মাইকেল আনুর রান্না ভীষণ পছন্দ করতেন। তাঁর ধারণা, তিনি আনুর মতো এত স্বাদের রান্না কোথাও খাননি। সারা দিন অফিসের কাজ সেরে বাসায় ফিরে বুদ্ধিদীপ্ত আনুর সঙ্গে কথা বলতে তাঁর ভীষণ ভালো লাগত। অফিসের কথা, ব্রোকেন ফ্যামিলিতে তাঁর বেড়ে ওঠার কথা, তাঁর নিজের সংসার ভেঙে যাওয়ার কথা, ছোট-বড় আনন্দ-বেদনা সব কথাই তিনি আনুকে বলতেন। তিনিও আনুর কথা মন দিয়ে শুনতেন। কিছু টাকা হলে আনু বস্তির পাশে একটা ছাপরা হোটেল দেবেন, সে কোথাও তিনি মন দিয়ে শোনেন।

এভাবেই সময় চলে যায়। মাইকেলেরও যাওয়ার সময় হয়ে আসে। অস্ট্রেলিয়া ফিরে যাওয়ার আগে কৃতজ্ঞতার স্মারক হিসেবে মাইকেল আনুর ছাপরা হোটেলের স্বপ্ন পূরণের জন্য বেশ মোটা অঙ্কের টাকা দেন। টাকা পাওয়ার পরদিন থেকে আনু আর কাজে আসেন না। এদিকে মাইকেলেরও ফিরে যাওয়ার সময় ঘনিয়ে আসছিল। আনুর টাকা নিয়ে উধাও হয়ে যাওয়াটাকে মেনে নিতে তাঁর বেশ খারাপ লাগছিল। তারপরও যাওয়ার আগে আনুকে একবার বিদায় জানানোর জন্য মাইকেল তাঁর ড্রাইভারের মাধ্যমে আনুর বস্তির ঠিকানা খুঁজে বের করেন।

শুক্রবারের পড়ন্ত বিকেলে যখন তারা আনুর বস্তির ঘরের দরজায়, অবাক হয়ে দেখেন সারা দেহে জখমের চিহ্ন নিয়ে মেঝের ধুলায় পড়ে আছেন আনু। মুখে মাছি ভনভন করছে। জানা যায়, মাইকেলের দেওয়া টাকা নেওয়ার জন্য তার ভাই ও ভাইয়ের বউ মিলে আনুকে চুলের মুঠি ধরে লাঠিপেটা করেন। মার খেয়ে আনু অজ্ঞান হয়ে গেলে টাকা পয়সা নিয়ে ওরা পালিয়ে যান।

এক মুহূর্ত দেরি না করে, ড্রাইভারের সহযোগিতায় ঢাকার নামকরা একটি ক্লিনিকে আনুকে ভর্তি করে দেন মাইকেলে। একটু সুস্থ হয়ে উঠলে হাসপাতালের ডাক্তার, নার্সদের সামনেই হাঁটু গেড়ে আনুকে বিয়ের প্রস্তাব দেন তিনি। ঘটনার আকস্মিকতায় হাউমাউ করে সেদিন আনু কেঁদে উঠেছিলেন। লাফ দিয়ে উঠে মাইকেল সেই যে আনুর হাত ধরেছিলেন, আর কখনোই তা ছাড়েননি।

কয়েক দিন আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানের শেষে যখন মাইকেল আর আনুর সঙ্গে কথা বলছিলাম, মাইকেলকে জিজ্ঞেস করলাম, বিয়ের প্রস্তাব কি হঠাৎ করেই দিয়েছিলেন? শক্ত করে আনুকে জড়িয়ে ধরে বললেন, না। যেদিন ওকে ঘরের ধুলায় পড়ে থাকতে দেখেছিলাম, সেই মুহূর্তে কেন জানি মনে হয়েছে ও না থাকলে আমি শূন্য হয়ে যাব। যেভাবেই হোক ওকে বাঁচাতে হবে।

স্নিগ্ধ হেসে আনু বললেন, সত্যি বলতে কি, জীবনে কখনো আমার নিজের সংসার হবে, এমন স্বপ্ন দেখার দুঃসাহস করিনি। মাইকেল আমাকে বস্তি থেকে উঠিয়ে এনে ভালোবাসায় পরিপূর্ণ একটি সংসার উপহার দিয়েছে। মানুষ হিসেবে আমাকে বাঁচতে শিখিয়েছে। আমাকে পড়াশোনা করার সুযোগ করে দিয়েছে।

আমি আমার সদ্য গ্র্যাজুয়েট, সব থেকে বেশি বয়সের, সব থেকে মেধাবী ছাত্রীটির দিকে এবং তাঁর ভালোবাসার মানুষটির দিকে শ্রদ্ধার চোখে তাকিয়ে থাকি আর ভাবি, জীবন কখনোই থেমে থাকে না। সব দরজা কখনোই সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যায় না। ভালোবাসাহীন একজন আনু আজ মাথা উঁচু করে বেঁচে আছেন শুধুই আরেকজন মানুষের বাড়িয়ে দেওয়া ভালোবাসার জন্য।

ভালোবাসার জয় হোক।