রামুতে এত সংখ্যক ইটভাটা!

কক্সবাজারের রামু উপজেলাতে ইটভাটা দিন দিন বাড়ছে। ইতোমধ্যে ৭১টি ইটভাটা স্থাপিত হয়েছে। কেবল কাউয়ারখোপের বনাঞ্চলের পাশেই একসঙ্গে ১৪টি ইটভাটা তৈরি হয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের সূত্রমতে, এসব ইটভাটার অর্ধেকেরও বেশি সংখ্যক ইটভাটার পরিবেশ ছাড়পত্র নেই। এ ছাড়া সংরক্ষিত বনাঞ্চলের আশপাশে এবং ফসলি জমিতে নির্মিত হয়েছে ২৭টি মত ইটভাটা। ২০০১ সালে চিমনি বিশিষ্ট ইটভাটা স্থাপন সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা হয়। অথচ রামুতে বেশির ভাগ ইটভাটা স্থাপিত হয়েছে চিমনি বিশিষ্ট ইটভাটা। এসব পরিবেশ বিধ্বংসী ইটভাটার সিংহভাগ স্থাপিত হয়েছে সংরক্ষিত বনাঞ্চল কিংবা জনবহুল এলাকায়।

সূত্রমতে, গত বছর রামুর কাউয়ারখোপ ইউনিয়নের সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ভেতরে পরিবেশ ছাড়পত্র ছাড়া তৈরি ১৪টি ইটভাটার বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে রিট করে পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা)। কিন্তু এসব ইটভাটার কার্যক্রম বন্ধ রাখতে নির্দেশনা থাকলেও মানা হচ্ছে না বলে জানা যায়।

উন্নত জীবন যাপনের স্বার্থে মানুষ এখন দালানবাড়ি নির্মাণ করার দিকে ঝুঁকছেন। সৌন্দর্য, আভিজাত্য, স্থায়ীত্ব এবং তুলনামূলক নির্মাণ ব্যয় সুবিধার কারণে মানুষ এখন আর বাঁশ-গাছের বাড়ি নির্মাণ করতে চাননা। এসব ঝামেলা পোহানোর চেয়ে একেবারে দালানবাড়ি নির্মাণ করাই শ্রেয় বলে মনে করেন বেশির ভাগ মানুষ। আর দালানকোটা নির্মাণ করতে গেলেই প্রয়োজন ইট। ইটভাটা না থাকলে ইট আসবে কোত্থেকে। মানুষের প্রয়োজন এবং চাহিদা মেটাতে হলে ইটভাটার প্রয়োজন আছে। এক্ষেত্রে দুইটি বিষয়কে প্রাধান্য দিতে হবে। প্রথমত, পরিবেশ বিরোধী ইটভাটা স্থাপন করা যাবেনা। ৬০ থেকে ১২০ ফুট উচ্চতার চিমনি বিশিষ্ট সনাতন প্রযুক্তির এসব ভাটা যখন তৈরি করা হয় এদের কালো ধোঁয়া দ্রুত লোকালয়ে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ে। তাই সনাতন প্রযুক্তির চিমনিযুক্ত ইটভাটার পরিবর্তে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩ অনুসারে, “আধুনিক প্রযুক্তির ইটভাটা” মানে এমন কোন ইটভাটা যা জ্বালানি সাশ্রয়ী, উন্নত প্রযুক্তি সম্পন্ন, যেমনঃ হাইব্রিড হফম্যান কিল্ন্ (Hybrid Hoffman Kiln), জিগজ্যাগ কিল্ন্ (Zigzag Kiln), ভারটিক্যাল স্যাফ্ট ব্রিক কিল্ন্ (Vertical Shaft Brick Kiln), টানেল কিল্ন্ (Tunnel Kiln), বা অনুরূপ কোন ভাটাকে বুঝানো হয়েছে। দ্বিতীয়ত, কোন উপজেলায় কোন অবস্থাতেই যত্রতত্র ইটভাটা স্থাপন করা যাবেনা। রামু উপজেলার মত একটি উপজেলায় ৭১টি ইটভাটা স্থাপন করা রীতিমত উদ্বেগের বিষয়। এটি জনস্বাস্থ্য এবং এলাকার পরিবেশের জন্য এক অশনি সংকেত। এতে কোন সন্দেহ নেই। পরিবেশ বিরোধী এসব কাজ ঠেকানোর জন্য কিতাবে আইন ঠিকই আছে। কিন্তু যার যে দায়িত্ব পালন করার কথা তা পালন করলে এবং আমাদের সামাজিক জনসচেতনতা থাকলে আজকে ইটভাটার ভীতিকর এই পরিসংখ্যান দাঁড়ানোর কথা নয়। সনাতন প্রযুক্তির এসকল ইটভাটা গুলোর অধিকাংশ স্থাপন করা হয়েছে লোকালয়ে। সংরক্ষিত বনাঞ্চলে যেসব ইটভাটা নির্মিত হয়েছে এই সংরক্ষিত বনাঞ্চলও লোকালয় সংলগ্ন।

ইটভাটা গুলো কেবল জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকারক তা নয়, এগুলো রামুর সার্বিক পরিবেশকে দিন দিন বিপর্যয়ের মূখে ঠেলে দিচ্ছে। এসব ইটভাটার মাটি যোগান দিতে গিয়ে পাহাড়-টিলাগুলো ধ্বংস করা হচ্ছে। স্কেভেটর এবং দিনমজুর দিয়ে আবাদী জমির টপ সয়েল (উর্বর মাটি) নষ্ট করা হচ্ছে। কৃষি জমিগুলো বড় বড় গর্তে পরিণত হচ্ছে। ফসলী জমির মাটি কাটার ফলে জমিগুলো ধীরে ধীরে উর্বরতা শক্তি হারাচ্ছে। বিভিন্ন উৎস থেকে ইটভাটায় মাটি টানতে গিয়ে শত শত মিনি ট্রাক বা ডাম্পার বেপরোয়া চলাচলের কারণে প্রধান সড়ক, গ্রামীণ সড়ক-উপ সড়কগুলোর বেহাল অবস্থা হয়েছে।

রামুর পাহাড়, আবাদী জমি, যোগাযোগ ব্যবস্থা, ফসল উৎপাদন, কৃষিকর্ম এবং জনস্বাস্থ্যের স্বার্থে ইটভাটার নামে পরিবেশ বিধ্বংসী এমন কাজকে কঠোরভাবে দমন করতে হবে। যদিও অনেক দেরি হয়ে গেছে এখন আর প্রশ্রয় দেওয়া উচিত হবেনা। নতুন করে আর যাতে ইটভাটা তৈরি করতে না পারে এবং নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে নির্মিত ইটভাটাগুলোর বিষয়ে কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বিশেষ করে সরাসরি লোকালয়ে কিংবা লোকালয়ের কাছাকাছি যেসব ইটভাটা নির্মিত হয়েছে এবং নতুন করে নির্মাণ কাজ চলছে তাদের বিরুদ্ধে সরেজমিন তদন্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। স্থানীয় প্রশাসন, জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের পাশাপাশি পরিবেশবাদী সংগঠন গুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। আর সাথে প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট এলাকাবাসীর আন্তরিক সহযোগিতা। এলাকাবাসী তথা কোন সংগঠন উদ্যোগ নিলে কিংবা অভিযোগ করলে স্থানীয় প্রশাসন এবং জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের উচিত হবে দ্রুত সাড়া দেওয়া।

অতি সাম্প্রতিক সময়ের একটা ঘটনার কথা বলি। রামু উপজেলার ইটভাটা অধ্যুষিত কাউয়ারখোপ ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের উখিয়ারঘোনায় একেবারে পাড়ার মধ্যে একটি ইটভাটার নির্মাণ কাজ চলছে। গত এক বছর ধরে জোর চেষ্টা চালিয়ে কাজ অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে গেছেন। প্রথমে পাশের পাহাড় কেটে এবং পার্শ¦বর্তী বেশ কিছু কৃষি জমির অনেক গভীর পর্যন্ত খনন করে মাটি নিয়ে ওই ভাটার বিশাল কৃষিজমি ভরাট করে ফেলেন। তারপর মাঠে বিশাল মাটির স্তুপ জমা করেছেন। এরপর ভেতরে ঠিক কি কাজ হচ্ছে তা যাতে এলাকাবাসী ঠের না পান সেজন্য কায়দা করে চারদিকে পাকা দেয়াল তুলেছেন। এলাকাবাসীর জন্য হুমকি স্বরূপ এই জনবিরোধী কাজকে ঠেকানোর জন্য গত এক বছরে এলাকাবাসী সংঘবদ্ধ হয়ে অনেক চেষ্টা করেছেন। কিন্তু মালিক প্রভাবশালী হওয়ায় তারা পেরে উঠেননি। উল্টো তারা বলেন, তারা প্রশাসন থেকে অনুমতি নিয়েছেন। বাধা দিলে প্রশাসনকেই দিতে হবে। তারা আর কারো বাধা মানবেন না। যেমন কথা তেমন কাজ। এলাকাবাসীর বাধা প্রতিরোধ করার জন্য ওই মালিক কাজেরস্থলে সবসময় পর্যাপ্ত জনবল মজুদ রাখা শুরু করলেন। একাধিকবার উভয়পক্ষের মধ্যে বিচ্ছিন্ন ঘটনাও ঘটে যায়। তারউপরে এলাকার খোদ কতিপয় জনপ্রতিনিধি ওই মালিকের পক্ষ নেওয়ায় কাজ আরো গতি পায়। নিরুপায় এলাকাবাসী দলবদ্ধ হয়ে রামু উপজেলা ইউএনও অফিসে অনেকটা পড়ে থাকেন। শেষ পর্যন্ত গত মাসে স্থানীয় প্রশাসন এবং পরিবেশ অধিদপ্তর যৌথভাবে অভিযান চালিয়ে উক্ত ইটভাটার কাজ বন্ধ করে দেন। কিন্তু অনেক দেরি হয়ে গেছে। এরপরও আপাতত ঠেকানো গেছে। কিন্তু আইনগত এবং স্থায়ী ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণে তারা কিন্তু থেমে নেই। একটু একটু করে এগিয়ে চলেছেন। তারা এখনো আশায় এবং সুযোগের অপেক্ষায় বসে আছেন। তাই এলাকাবাসীকেও প্রতিনিয়ত পাহারা দিয়ে থাকতে হয়। কিন্ত এভাবে কতদিন চলে! এটা ঠিক যে, এলাকাবাসী এভাবে এগিয়ে না আসলে কেবল প্রশাসনের দিকে তাকিয়ে থাকলে এই কাজটি যেমন আপাতত ঠেকানো যেতনা, তেমনি অন্যান্যগুলোর ক্ষেত্রেও ঠিক এভাবে এলাকাবাসীকে এগিয়ে আসতে হবে।

আইনে বলা আছে, আবাসিক, সংরক্ষিত বা বাণিজ্যিক এলাকা, সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা বা উপজেলা সদর, সরকারি বা ব্যক্তি মালিকানাধীন বন, অভয়ারণ্য, বাগান বা জলাভূমি,কৃষিজমি, প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা;ডিগ্রেডেড এয়ার শেড (Degraded Air Shed), এসব নিষিদ্ধ এলাকার সীমানার অভ্যন্তরে ইটভাটা স্থাপনের জন্য পরিবেশ অধিদপ্তর, বা অন্য কোন কর্তৃপক্ষ কোন আইনের অধীন কোনরূপ অনুমতি বা ছাড়পত্র বা লাইসেন্স, যে নামেই অভিহিত হউক, প্রদান করতে পারবে না। পরিবেশ অধিদপ্তর হতে ছাড়পত্র গ্রহণকারী কোন ব্যক্তি নিম্নবর্ণিত দূরত্বে বা স্থানে ইটভাটা স্থাপন করতে পারবেন না। নিষিদ্ধ এলাকার সীমারেখা হতে ন্যূনতম ১ (এক) কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যে,বিভাগীয় বন কর্মকর্তার অনুমতি ব্যতীত, সরকারি বনাঞ্চলের সীমারেখা হতে ২ (দুই) কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যে, কোন পাহাড় বা টিলার উপরিভাগে বা ঢালে বা তৎসংলগ্ন সমতলে কোন ইটভাটা স্থাপনের ক্ষেত্রে উক্ত পাহাড় বা টিলার পাদদেশ হতে কমপক্ষে ১/২(অর্ধ) কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যে, বিশেষ কোন স্থাপনা, রেলপথ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও ক্লিনিক, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বা অনুরূপ কোন স্থান বা প্রতিষ্ঠান হতে কমপক্ষে ১ (এক) কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যে, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর কর্তৃক নির্মিত উপজেলা বা ইউনিয়ন বা গ্রামীণ সড়ক হতে কমপক্ষে ১/২ (অর্ধ) কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যে ইটভাটা স্থাপন করতে পারবেন না। যদি কোন ব্যক্তি আইনের এই বিধান লংঘন করে নিষিদ্ধ এলাকায় ইটভাটা স্থাপন করেন, তা হলে তিনি অনধিক ৫ (পাঁচ) বৎসরের কারাদন্ড বা অনধিক ৫ (পাঁচ) লক্ষ টাকা অর্থদন্ড বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হবেন।

আইনে এও বলা আছে যে, যদি ইট তৈরি করার উদ্দেশ্যে কৃষিজমি বা পাহাড় বা টিলা হতে মাটি কেটে বা সংগ্রহ করে ইটের কাঁচামাল হিসেবে উহা ব্যবহার করেন বা যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ব্যতীত ইট তৈরির উদ্দেশ্যে মজা পুকুর বা খাল বা বিল বা খাঁড়ি বা দিঘি বা নদ-নদী বা হাওর-বাওর বা চরাঞ্চল বা পতিত জায়গা হতে মাটি কাটেন বা সংগ্রহ করেন, তা হলে তিনি অনধিক ২ (দুই) বৎসরের কারাদন্ড বা অনধিক ২ (দুই) লক্ষ টাকা অর্থদন্ড বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হবেন। যদি স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর কর্তৃক নির্মিত উপজেলা বা ইউনিয়ন বা গ্রামীণ সড়ক ব্যবহার করে ইট বা ইটের কাঁচামাল ভারি যানবাহন দ্বারা পরিবহন করেন, তা হলে তিনি অনধিক ১ (এক) লক্ষ টাকা অর্থদন্ডে দন্ডিত হবেন।

সম্পাদক
আমাদের রামু