আইনি সুরক্ষায় সংখ্যালঘু কমিশন গঠনের দাবি শাহরিয়ার কবিরের

সংখ্যালঘু নির্যাতন বন্ধে ও তাদের আইনি সুরক্ষা দিতে দেশে সংখ্যালঘু কমিশন গঠনের দাবি জানিয়েছেন লেখক সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির। জাতীয় বাজেটে সব ধর্মের অনুসারীদের জন্য সমান বরাদ্দ রাখারও প্রস্তাব করেছেন তিনি।

একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি খুলনা শাখা আয়োজিত ‘সংখ্যালঘু নির্যাতন ও আজকের বাংলাদেশ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে শাহরিয়ার কবির এ কথা বলেন। বিএমএ খুলনার কাজী আজাহারুল ইসলাম মিলনায়তনে শনিবার এ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
আলোচনা সভায় তিনি বলেন,৭২ সালের সংবিধানের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন করতে হবে। যতদিন পর্যন্ত দেশে ৭২ সালের সংবিধান পূর্ণ বাস্তবায়ন না হবে ততদিন পর্যন্ত সংখ্যালঘু শব্দ থেকেই যাবে। বাহাত্তরের সংবিধানের মূল সৌন্দর্যই হচ্ছে এতে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়েছে; যা বিশ্বের আর কোনও সংবিধানে নেই।

শাহরিয়ার কবির বলেন, অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের গড়া এই বাংলাদেশ বেশিরভাগ সময় শাসিত হয়েছে ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর দ্বারা। তারাই সংবিধানে সংখ্যাগুরু শব্দ আমদানি করেছে। একারণে সংখ্যালঘু বিষয়টিও এসেছে, যা আজ অতি বাস্তব। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর জিয়াউর রহমান অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের সংবিধানকে ইসলামিক সংবিধান বানানোর চেষ্টা করেন। যার শেষ পেরেকটি ঠুকেন, সাবেক প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। তিনি সংবিধানে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। আমরা এটি বাতিলের জন্য মামলা করেছি। হাইকোর্ট মামলাটি খারিজ করেছে। আমরা সুপ্রিম কোর্টে যাচ্ছি। এই সরকারের আমলেই সংবিধান থেকে রাষ্ট্রধর্ম ইসলামকে অপসারণ করা হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

তিনি হিন্দু সম্প্রদায়ের সদস্যদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, এই দেশ আপনাদের। এই মাতৃভূমি আপনাদের। আপনারা কেন দেশ ছেড়ে ভারতে যাবেন। আপনারা কেন দেশ ত্যাগ করবেন। দেশ ত্যাগ করতে হলে করবে জামায়াত ও হেফাজতিরা। তারা পাকিস্তানের আদর্শে বিশ্বাসী। পাকিস্তান তাদের মাতৃভূমি। তাই তাদেরকেই দেশ ত্যাগে বাধ্য করতে হবে।

একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি খুলনা শাখার সভাপতি ডা.শেখ বাহারুল আলম সভায় সভাপতিত্ব করেন। সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন কালের কণ্ঠ খুলনা ব্যুরো প্রধান গৌরাঙ্গ নন্দী। তিনি তার প্রবন্ধে সংখ্যালঘু নির্যাতনের সাম্প্রতিক তথ্য তুলে ধরার পাশাপাশি এর প্রেক্ষাপট নিয়ে আলোচনা করেন।

অন্যান্যের মধ্যে আলোচনায় অংশ নেন বিচারপতি শামসুদ্দিন মাণিক, মুক্তিযোদ্ধা ইউনুস আলী ইনু, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সাধারণ সম্পাদক কাজী মুকুল, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য ডিসিপ্লিনের প্রধান প্রফেসর ড. অনির্বাণ মোস্তফা, অ্যাডভোকেট এনায়েত আলী ও প্রফেসর ড. আফরোজা পারভীন।

বিচারপতি শামসুদ্দিন মানিক তার আলোচনায় বলেন, আমরা মনে করেছিলাম ’৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পর ধর্মীয় মৌলবাদের শ্মশান হয়েছে। কিন্তু আমাদের সেই ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। খন্দকার মোস্তাক ও জিয়া পাকিস্তানপ্রেমী ছিল। তারা ক্ষমতায় এসে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা প্রতিষ্ঠা করতে সচেষ্ট হয়। যুদ্ধাপরাধী মীর কাশেম আলী, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী জিয়ার সহায়তায় সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলে। তাদের সকল সম্পদ বাজেয়াপ্ত করতে হবে। জামায়াতিদের আর্থিক ভিত নষ্ট করতে হবে। জামায়াত একটি সন্ত্রাসী দল। জামায়াতকে নিষিদ্ধ করতে হবে। তারা পাকিস্তানের পরাজয়ের গ্লানি সহ্য করতে পারেনি।

 তিনি বলেন, শুধু জামায়াত নয় বিএনপিও পাকিস্তানপন্থী দল। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের দল আজ রাষ্ট্র ক্ষমতায়। তবে এখন কেনও সংখ্যালঘু সম্প্রদায় নির্যাতনের শিকার হবে। বিএনপি জামায়াতের নেতারা আওয়ামী লীগে প্রবেশ করছে। এই নবাগত আওয়ামী লীগাররাই সংঘালঘু নির্যাতনে প্রধানতম ভূমিকা পালন করছে।

মূল প্রবন্ধে গৌরাঙ্গ নন্দী বলেন, সাম্প্রতিককালের ধারাবাহিক হত্যা-নির্যাতনের ঘটনাগুলো দেখে একথা বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ আছে যে, একটি গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে এই ঘটনাগুলো ঘটিয়ে চলেছে। যারা এটি করছে, তারা দেশকে অস্থিতিশীল করতে চায়। বিশেষত: সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যদের হত্যা করে আইএস হত্যার দায় স্বীকার করছে; যদিও এই দায় স্বীকারের বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। তবে এটি পরিষ্কার যে, আন্তর্জাতিক একটি গোষ্ঠী আমাদের দেশে আইএস জঙ্গির উপস্থিতি প্রমাণে মরিয়া। বিস্ময়কর হচ্ছে, সরকার এই জঙ্গি গোষ্ঠীকে দমন করতে পারছে না। হত্যার মতো জঘন্য অপরাধ করেও খুনিরা পার পেয়ে যাচ্ছে। যে কোনও ঘটনার পেছনে সরকার যেমন বিএনপি-জামায়াতকে দায়ী করছে; তেমনি বিএনপিও প্রতিটি ঘটনার জন্যে সরকারকে দায়ী করছে। এই পারস্পরিক দোষারোপ পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করে তুলছে। তবে শাসকদের দায়-দায়িত্ব সব সময় বেশি, সেকারণে সরকারের উচিত অপরাধীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে শাস্তি বিধান করা।

[বাংলা ট্রিবিউন]