জানালার ওপারে গানের পাখি বুলবুল

।। শেখ মিরাজুল ইসলাম ।।
গত বছরের ডিসেম্বরে আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন কৃতী আলোকচিত্রী মুক্তিযোদ্ধা আনোয়ার হোসেন। গত ২২ জানুয়ারি চলে গেলেন মুক্তিযুদ্ধের আরেক কৃতীসন্তান ব্যতিক্রমী প্রতিভাবান একুশে পদকপ্রাপ্ত গীতিকার ও সুরকার আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল। সারা বাংলাদেশ এখন যাকে অভিবাদন জানাচ্ছে দেশসেরা গানের পাখি হিসেবে, ১৯৫৬ সালের জানুয়ারিতে জন্ম নিয়ে এই জানুয়ারিতেই তার দ্রুত প্রস্থান সবাইকে স্তম্ভিত করেছে।

আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের অবদান বাংলাদেশের সংগীত জগতে কতটুকু সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে, তা সময়ের মাপকাঠিতে এই মুহুর্তে ধারণা করা হয়তো সম্ভব হবে না।

আধুনিক বাংলা গানের জগতে আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের জন্য নির্দিষ্ট স্থান রাখতেই হবে। কেবল দর্শকপ্রিয়তা ও সাধারণের কাছে তার গানের কথা ও সুর হৃদয়গ্রাহ্য হয়েছে, তা ভাবাটা যথেষ্ট নয়। তার গানের আবেদন অনেক গভীর। একটি দেশের সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ ও তার নিজস্বতার সংজ্ঞা নির্দিষ্ট করতে বুলবুলের গান নিয়ে ভবিষ্যতে আরও প্রচুর আলোচনা অব্যাহত থাকবে নিশ্চিত। সেদিন আমরা আরও ভালোভাবে অনুধাবন করব বাংলা সংগীত জগতে বুলবুলের স্থান পূরণ হওয়ার নয়।

মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সাংস্কৃতিক সমাজ বিনির্মাণে শিল্পী-সাহিত্যিকদের বুদ্ধিবৃত্তিক সম্মিলনের ফাঁকফোকর গলে যে নষ্ট কাদামাটি দেশীয় সংস্কৃতির উর্বরতা ধ্বংস করে দিচ্ছিল, আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল সেই ধ্বংস অনেকটা একা সামলেছিলেন তার কালজয়ী সুর আর গানের কথায়। তার দেশপ্রেম সহজাত। মাত্র ১৫ বছর বয়সে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে ঢাকা’র জিঞ্জিরায় পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করে ওই অল্প বয়সে পাকিস্তানি ক্যাম্পে নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। বুলবুলের মানসজগতে স্বদেশি বোধকে তার অতীত প্রচণ্ড শাণিত করেছিল। দেশের জন্য তার লেখা ও সুর করা গান কিংবা পার্থিব জগতের অপার্থিব প্রেমের গান, প্রতিটি ক্ষেত্রে তার জের ও রেশ আমরা দেখেছি ও শুনেছি।

যেকোনো গানের ভাষা ও সুর একাধারে তাল আর লয়ের দ্যোতনায় শ্রোতার হৃদয়ে আসন করে নেয়। কিন্তু শব্দচয়নে মাত্রাজ্ঞান না থাকা ও হাল্কাচালে সুরের বিকৃতি যেভাবে আশি’র দশকের পর বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনকে ক্রমে কলুষিত করছিল, তার প্রতিবাদে যে কজন সুরকার বাণিজ্যিক ধারার বিপরীতে নান্দনিকতার চর্চা করে গেছেন, আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল তাদের মধ্যে ছিলেন অগ্রগণ্য। ১৯৭৮ সাল থেকে বাংলা চলচ্চিত্র অঙ্গনে তার পথ চলা শুরু। সেই সময় থেকে গীতিকার, সুরকার আলাউদ্দীন আলী ছিলেন তার ঘনিষ্ঠজন। শ্রোতা-দর্শকদের কাছে তাদের পরিশ্রম বৃথা যায়নি। ২০০১ সালে চলচ্চিত্রে গানের জন্য বুলবুল পেলেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। চলচ্চিত্রের নাম ‘প্রেমের তাজমহল’। ২০০৫ সালে পেলেন দ্বিতীয়বারের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ‘হাজার বছর ধরে’ সূত্রে। এমনকি কেবল বাজারভিত্তিক চলচ্চিত্রের জন্যও সুরারোপ করলেন নিজস্ব ঢঙে। সফলও হলেন।

আশির দশকে রাজনৈতিক দমবদ্ধ পরিবেশে সুরারোপ করলেন নজরুল ইসলাম বাবু’র কথায় কালজয়ী ‘সব কটা জানালা খুলে দাওনা’ গানটি । আমরা অবাক হয়ে শুনতে থাকলাম:

আজ আমি সারা নিশি থাকবো জেগে
ঘরের আলো সব আঁধার করে।
তৈরি রাখ আতর গোলাপ:
এদেশের প্রতিটি ঘরে ঘরে
ওরা আসবে চুপি চুপি…

যদিও প্রথমে গানের কথায় ‘জানালা’ শব্দের বদলে গীতিকার লিখেছিলেন ‘দরজা’। বুলবুল তাকে অনুরোধ করেছিলেন ‘জানালা’ শব্দটি ব্যবহার করতে। কারন তার চোখে দরজা প্রতিবন্ধকতার প্রতীক। জানালা খুললেই খোলা বাতাস ঝাপটা দেয়। সেই খোলা বাতাসে বুলবুল ফিরিয়ে আনলেন শহীদের আত্মাদের। ধীরে ধীরে দৃশ্যপট বদলাতে থাকলো। বুলবুল নিজের মতো লিখে গেলেন প্রিয় সব গান। সাবিনা ইয়াসমিনের কণ্ঠে গাওয়া দেশের গানগুলো অমরত্ব পেলো। ‘ও আমার আট কোটি ফুল’ কিংবা ‘রেল লাইনের ধারে’ গানের সর্বজনীন সুর প্রতিটি বাঙালি হৃদয় তার মৃত্যুর পর এখন আরও অনেক বেশি উপলব্ধি করছে।

তবে আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের দেশ-সমাজ-মানুষ নিয়ে তার মনন ও দার্শনিক চিন্তা-চেতনার ব্যবচ্ছেদ করতে বললে এক কথায় তার একটি জনপ্রিয় গানের কথার মাধ্যমেই উদ্ধৃত করব। এই গানের কথা ও সুরের মধ্যেই বুলবুলের সব শক্তি ও স্বাতন্ত্র্য মিশে আছে। বুলবুলকে ধারণ করতে চাইলে এই একটি গানের স্পর্শই যেন যথেষ্ট। বুলবুল’কে স্মরণ করতে হলে ফিরে যেতে হবে বারবার সেই গানের ভাষা ও সুরে:

‘সুন্দর, সুবর্ণ, তারুণ্য, লাবণ্য
অপূর্ব রূপসী রূপেতে অনন্য
আমার দুচোখ ভরা স্বপ্ন:
ও দেশ, তোমারই জন্য।