গতবছর ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত বেশি মাদকবিরোধী অভিযানে: আসক

অনলাইন ডেস্কঃ
গেল বছর (২০১৮) সারাদেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধ এবং তাদের হেফাজতে সাড়ে চারশতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে; এর অর্ধেকের বেশি নিহত হয়েছে শুধু মাদকবিরোধী অভিযানেই।

২০১৮ সালে দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে বেসরকারি সংস্থা আইন ও শালিস কেন্দ্রের (আসক) এক পর্যবেক্ষণে এই চিত্র পাওয়া গেছে।

ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে পর্যবেক্ষণের তথ্য প্রকাশ করে আসকের উপ-পরিচালক নীনা গোস্বামী বলেন, ২০১৮ সালে আইনশৃঙ্খলা বিভিন্ন বাহিনীর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে এবং তাদের হেফাজতে মোট ৪৬৬ নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ৪ মে থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাদকবিরোধী অভিযানে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন ২৯২ জন।

২০১৭ সালে কথিত বন্দুকযুদ্ধে ১৬২ জন নিহত হয়েছিলেন বলে জানান তিনি।

গত বছর মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পর সারাদেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাদকবিরোধী শুরু হলে প্রায় প্রতিদিনই কথিত বন্দুকযুদ্ধে সন্দেহভাজন মাদক চোরাকারবারিদের হতাহতের খবর সংবাদমাধ্যমে আসে।

অভিযানে এপর্যন্ত নিহতের পরিসংখ্যান পুলিশের কাছে পাওয়া না গেলেও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর হিসাবে সেটি চারশতাধিক।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে আসকের উপ-পরিচালক নীনা গোস্বামী বলেন, ২০১৮ সালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে অপহরণ, গুম ও নিখোঁজ হয়েছেন ৩৪ জন। এদের মধ্যে ১৯ জনের সন্ধান পাওয়া গেছে, যাদের অধিকাংশই বিভিন্ন মামলায় আটক রয়েছেন।

গত বছর জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সারাদেশে অন্তত ৪৭০টি সহিংসতার ঘটনায় ৩৪ নিহত হয়েছে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।

এসব সহিংসতায় নিহতদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি- ১৯ জনই ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থক। এর বাইরে বিএনপির চারজন ও একজন আনসার সদস্যের পাশাপাশি ১০ জন সাধারণ মানুষ নিহত হয়েছেন।

গতবছর বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ও অন্যান্য দলের এবং নিজেদের মধ্যে কোন্দলের জেরে ৭০১টি রাজনৈতিক সংঘাতের ঘটনায় ৬৭ জন নিহত এবং সাত হাজার ২৮৭ জন আহত হয়েছেন বলে আসকের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে।

এতে আরও বলা হয়েছে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশের কয়েকটি স্থানে হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘরে ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে।

২০১৮ সালে নারী নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরে সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, গত বছর সারাদেশে ধর্ষণ ও গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৭৩২ জন। তাদের মধ্যে ধর্ষণ পরবর্তী হত্যার শিকার হয়েছেন ৬৩ জন আর ধর্ষণের পর আত্মহত্যা করেছেন সাত জন।

নির্বাচনের রাতে নোয়াখালীর সুবর্ণচরের এক গৃহবধূকে দলবেঁধে ধর্ষণের বিষয়টিও এসেছে আসকের প্রতিবেদনে।

সংস্থার জ্যেষ্ঠ সমন্বয়ক আবু আহমেদ ফয়জুল ফরিদ বলেন, গতবছর গৃহকর্মী নির্যাতন ও এসিড নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে ৫৪টি আর যৌতুকের কারণে ও পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ১৯৫ নারী।

এছাড়া গতবছর ২০৭ জন সংবাদিক আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, প্রভাবশালী ব্যক্তি, জনপ্রতিনিধি, সন্ত্রাসী, ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের দ্বারা শারিরীক নির্যাতন ও হামলার শিকার হয়েছেন। এছাড়া হত্যার শিকার হয়েছেন তিনজন সাংবাদিক।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, এক হাজার ১১ জন শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে ২০১৮ সালে। এদের মধ্যে ৪৪৪ জন শিশু যৌন হয়রানি ও ধর্ষণের শিকার হয়।

গত বছর গায়েবি মামলার বিষয়টিও আসকে প্রতিবেদনে উঠে আসে। একটি পত্রিকার বরাত দিয়ে এতে বলা হয়, ২০১৮ সালের শুধু সেপ্টেম্বর মাসেই ঢাকা মহানগরের বিভিন্ন থানায় পুলিশ বাদী হয়ে ৫৭৮টি নাকশতার মামলা করেছে।

এসব মামলার তথ্য অনুযায়ী পুলিশের উপর হামলার ঘটনা ঘটেছে ৯০ বার। অথচ বাস্তবে এ ধরনের ঘটনা ঘটেনি বলে ওই পত্রিকার বরাত দিয়ে বলা হয।

এতে বলা হয়েছে, ২০১৮ সালে মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার কমিয়ে আনা হয়েছে। বৃদ্ধি পেয়েছে নারী শিক্ষার হার ও স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও অগ্রগতি অব্যাহত আছে। তবে সার্বিকভাবে মানবাধিকার পরিস্থিতি ছিল চরম উদ্বেগজনক।

সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্যে আসকের নির্বাহী পরিচালক শীপা হাফিজা বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের তদন্তে কমিশন গঠনের দাবি জানান।

তিনি বলেন, “একটি স্বাধীন দেশে এসব হত্যাকাণ্ড হোক তা আমরা চাই না।”

সূত্রঃ বিডিনিউজ