‘সৎসাহস আর হিম্মত থাকলে সবকিছু পারা যায়’

রামু উপজেলার ফতেখাঁরকুল ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির পক্ষে কুঁড়েঘর প্রতীক নিয়ে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন শামীম আহসান (ভুলু)।  আমাদের রামু ডটকমের পক্ষে তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আবুল খায়ের মোহাম্মদ আতিকুজ্জামান

এবারই প্রথম আপনি জনপ্রতিনিধি হওয়ার নির্বাচন করছেন। আপনি ফতেখাঁরকুল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হতে চান কেন?

ফতেখাঁরকুলের সাধারণ মানুষ অধিকারবঞ্চিত, বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজ করতে গিয়ে তারা হয়রানির শিকার হয়। এখানে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিরাজমান থাকলেও ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর তা বিনষ্ট হয়। সম্প্রীতির সেই বন্ধন ফিরিয়ে আনা এবং তা দৃঢ় করার জন্য এবং এলাকাবাসীর হয়রানি কমানোর জন্য আমি নির্বাচনে অংশ নিচ্ছি। পাশাপাশি, ফতেখাঁরকুল ইউনিয়নকে একটি আদর্শ পৌরসভায় উন্নীত করাও আমার লক্ষ্য।

রামুই তো এখন পর্যন্ত পৌরসভা হয়নি। রামুকে বাদ দিয়ে একটি ইউনিয়ন কিভাবে পৌরসভা হবে?

ফতেখাঁরকুল তো সদর ইউনিয়ন। সরকার চাইলে সদর ইউনিয়নকে যেকোন সময় পৌরসভায় পরিণত করতে পারে। এছাড়া ফতেখাঁরকুল ঐতিহ্যবাহী একটি এলাকা।

অন্য প্রার্থীকে বাদ দিয়ে এলাকার জনগণ আপনাকে কেন ভোট দেবে ?

আমি ছাড়া এখানে আরো দুইজন প্রার্থী আছেন। একজন নৌকা প্রতীকের প্রার্থী ফরিদুল আলম। আরেকজন ধানের শীষের নতুন প্রার্থী আবুল বশর বাবু। আমরা আগে তাকে চিনতান না, নতুন ছেলে। হয়তো বা নির্বাচনী প্রতীকটা রক্ষা করার জন্য নামমাত্র প্রতীকী নির্বাচন তারা করছে। আওয়ামী লীগের প্রার্থী যিনি তিনি একসময় ইসলামী ছাত্রসমাজ করতেন। পরবর্তী সময়ে নেজামে ইসলাম করেছেন। তিনি একাধিকবার ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন এবং আমাদের ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করেছেন। তবে গতবার ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হন।

রামুর সর্বত্র ব্যাপকভাবে প্রচারিত আছে, এমপি কমল সাহেবের পক্ষে থেকে ৪০ লক্ষ টাকা খরচ করে, মন্ত্রীদের ঘুষ দিয়ে ঢাকা থেকে মনোনয়ন এনেছেন। অন্যদিকে আমি সারাজীবন মানুষের রুটিরুজির জন্য সংগ্রাম করেছি, আন্দোলন করেছি। আমার ৩৫ বছরের রাজনৈতিক জীবনে আমি সবসময় সাধারণ মানুষের পক্ষে থেকে আন্দোলন সংগ্রাম, অন্যায়ের প্রতিবাদ ও প্রতিরোধে সোচ্চার ছিলাম। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে আমি রামু ও কক্সবাজারে নেতৃত্ব দিয়েছি। এছাড়া রামু উপজেলা কম্পাউন্ডে যেসব অপরাধ ও ঘুষ দুর্নীতি হয় তার বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগ্রাম করেছি।

আমরা জানতে চেয়েছিলাম, এলাকার জনগণ আপনাকে কেন ভোট দেবে ?

২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর রামুতে সাম্প্রদায়িক সংঘাতের ঘটনায় বৌদ্ধমন্দিরসমূহে লুটপাট, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগসহ নানা ধরনের অপরাধমূলক কাজ হয়। আমি সেগুলো প্রতিহত করার চেষ্টা করেছি। সবচেয়ে প্রাচীন বৌদ্ধমন্দিরে যে আগুন দেওয়া হয়েছিল আরো কয়েকজনকে নিয়ে তা নিভিয়ে ফেলি। এছাড়া একটা রাখাইন ও আরেকটা বৌদ্ধপল্লীতে আগুন দেওয়ার চেষ্টা প্রতিরোধ করেছি। আক্রমণকারীরা ক্ষুব্ধ হয়ে আমাকে জানে মেরে ফেলার জন্য আমার মাথায় ইট নিক্ষেপ করে আমাকে রক্তাক্ত করে। এসব কারণে এখানকার বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের লোকজন আমাকে ভোট দেবেন। হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরাও আমার প্রতি একাত্ম এবং আমাকে ভোট দেওয়ার ব্যাপারে তারা খুবই তৎপর।

আপনার নির্বাচনী এলাকায় হিন্দু ও বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর বাইরে মুসলমান জনগণও আছেন অনেক। তাদের দিক থেকে কেমন সাড়া পাচ্ছেন ?

মুসলমানরাও আমাকে প্রচুর ভোট দেবে। কারণ আমি প্রতিবাদী — অন্যায়ের বিরুদ্ধে, জোরজুলুমের বিরুদ্ধে আমি প্রতিবাদ করি। আর আমি বিভিন্ন সভায় ঘোষণা দিয়েছি: যদি আমি চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচিত হই তাহলে আমি শুধু ফতেখাঁরকুলের চেয়ারম্যান হব না, আমি সারা রামুর চেয়ারম্যান হব। আমার রামু উপজেলা আমার ফতেখাঁরকুল ইউনিয়ন এলাকায় অবস্থিত, এখানে যত অন্যায় দুর্নীতি হবে আমি তার সব প্রতিরোধ করব।

উপজেলা পরিষদের দুর্নীতি দূর করা উপজেলা পরিষদের দায়িত্ব। তুলনামূলক নিম্নতর স্তরের একজন ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের পক্ষে সে কাজ করা কিভাবে সম্ভব ?

মানুষের সৎসাহস আর হিম্মত থাকলে সবকিছু পারা যায়। রাজনীতি দুই প্রকার — একটা ভোগের, আরেকটা ত্যাগের। আমি সারাজীবন ত্যাগের রাজনীতি করেছি। যারা ভোগের রাজনীতি করে, অন্যায় দুর্নীতি করে টাকার পাহাড় গড়েছে তারা মানসিকভাবে দুর্বল। তারা প্রশাসন এমনকি তাদের নেতাকর্মীকে পর্যন্ত কিছু বলতে পারে না। কম হলেও আমার যে কর্মীরা আছেন তারা আদর্শবান ও সচ্চরিত্রের অধিকারী। আমার সৎসাহস আছে বলে আমার দ্বারা ঐসব দুর্নীতি দূর করা সম্ভব, কিন্তু তারা যত বড় শক্তিই হোন না কেন তাদের দ্বারা সম্ভব নয়। তারা থানা, ভূমি অফিস প্রভৃতি জায়গায় বড় বড় সাইনবোর্ড লটকিয়ে দিয়ে দালালদের প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ বলে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় তাদের লোকজনই সমস্ত দালালি কাজকর্ম করে, মানুষকে হয়রানি করে।

এলাকার সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও শিক্ষাগত উন্নয়নের কাজে এখন পর্যন্ত আপনি কি কি করেছেন ?

মানুষ আপদে বিপদে আমার কাছে আসে। প্রশাসনিকভাবে বা অন্য উপায়ে তাদের সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা করি।

সুনির্দিষ্ট করে বলুন।

এলাকার অশিক্ষিত লোকদের সন্তানদের স্কুলে দেওয়ার জন্য উৎসাহিত করি বা নিজে গিয়ে স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিয়ে আসি। এলাকার রাস্তাঘাট প্রভৃতি উন্নয়নের জন্য প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে গিয়ে কাজটা দ্রুত সম্পন্ন করার জন্য ধর্না দেই। বর্ষাকালে আমার এলাকায় নদী ভাঙ্গে, সমস্ত রামু উপজেলা ভেসে যায় বন্যায়। কারণ ব্যাপক দুর্নীতির কারণে কোন কাজ ঠিকমত হয় না। গতবার একটা ব্রিজ আর একটা বাঁধ হল। আর বর্ষা আসতে না আসতেই সেগুলো ভেঙ্গে গেল। কারণ আমাদের বড় বড় নেতারা পকেট ভরে এসব কাজের টাকা আত্মসাৎ করেছেন।

আমরা জানতে চাচ্ছিলাম, আপনি নিজে এখন পর্যন্ত এলাকার সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক বা শিক্ষাগত উন্নয়নের কাজে কিভাবে জড়িত ছিলেন।

আমি একজন সাংস্কৃতিক কর্মী। এখানে একটা সিভিল সোসাইটি আছে, সেখানেও আমি কাজ করি। ২০১২ সালের সংঘাতের পর আমরা রামুর বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা, মন্দির, স্কুলে গিয়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নিয়েছি, যাতে আগামীতে আর কোন সাম্প্রদায়িক সহিংসতা না ঘটে। এছাড়া, এখানে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডেও আমি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করি। প্রতিবছর অনুষ্ঠিত মুক্তিযুদ্ধের বিজয়মেলায় আমি বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করি।

নির্বাচিত হলে এলাকার উন্নয়নের ক্ষেত্রে কোন বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেবেন ?

রাস্তাঘাটগুলো ঠিক করতে হবে। যথাযথভাবে কাজ না করার কারণে সামান্য বৃষ্টিতে ভেঙ্গেচুরে গিয়ে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। এগুলো ঠিক করতে হবে। এলাকার কোন সমস্যায় থানায় না গিয়ে চুনোপুটি রাজনৈতিক নেতাদের দ্বারস্থ হন এখানকার লোকেরা। সঠিক প্রক্রিয়ায় আইনের আশ্রয় নেওয়ার জন্য আমি মানুষজনকে সচেতন করব।

চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচিত হলে এলাকার কোন কোন সমস্যা সমাধানে অগ্রাধিকর দেবেন ?

শিক্ষাদীক্ষা, রাস্তাঘাট, বিদ্যুৎ, ভূমি ব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি ও সন্ত্রাসকে আমি প্রাধান্য দেব। ঝরে পড়া শিশুদের আমি স্কুলে নিয়ে যাব। যেসব স্কুলে দুর্নীতি-অনিয়ম আছে সেখান থেকে তা দূর করব। এছাড়া, ভূমি অফিসের কথা ধরেন। একটা নামজারি করতে পনের-বিশ হাজার টাকা নিয়ে নেয়। আমি তো জনগণকে বলেছি, কোন টাকা ছাড়াই যাতে এই কাজ করা যায় সে ব্যবস্থা আমি করে দেব। এখানে কৃষি অফিসের কর্মকর্তা কর্মচারীরা প্রতি মাসে বেতনটা গুনে নেয় কিন্তু বাস্তবে এরা মাঠে যায় না। আমি এদেরকে বাধ্য করাব মাঠে গিয়ে কৃষকদের সহায়তা করতে।

এর বাইরে আর কোন সমস্যা সম্পর্কে বলবেন ?

এগুলোই তো সমস্যা।

ফতেখাঁরকুলের বেশকিছু জায়গায়, এমনকি আপনার বাড়ির পাশেই প্রায় প্রকাশ্যে মদ ও অন্যান্য মাদকদ্রব্য বিক্রি হয়। এছাড়া ইয়াবা চালানের একটি বড় অংশ ফতেখাঁরকুল দিয়েই যায়। বিষয়গুলো কি আপনার চোখে বড় কোন সমস্যা নয় ?

এসব সমস্যা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। আমার খেয়াল ছিল না আবার একটু সমস্যাও আছে। মাসতিনেক আগে আমি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মহোদয়ের কাছে গিয়ে বলেছি, আমি মদের উপর ভাসি। আমার বাড়ির চতুর্দিকে মদ বিক্রি হয়, ইয়াবা বিক্রি হয়। এবং কক্সবাজার জেলার সবচেয়ে বড় গডফাদাররা সব আমার এলাকার বা পার্শ্ববর্তী ইউনিয়ন বা গ্রামের। এরা খুবই শক্তিশালী। এদের বিরুদ্ধে কথা বলা মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ার সমান। এগুলো বন্ধ করার দায়িত্ব প্রশাসনের এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। পুলিশের সাথে এসব গডফাদারদের গভীর সম্পর্ক আছে। জীবনের ঝুঁকি তো আছেই, তবে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আমরা কিছু বললেও প্রশাসন তা শোনে না। আরেকটা সমস্যার কথা বলি। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার জন্য বিজিবির একটা ক্যাম্প এখানে আছে। এরা যখন ছিল না তখন মদ বিক্রি হত দূরে। এই বিজিবি আসার পর থেকে এখানে, আমাদের পাড়াতেই মদের ব্যবসাটা একেবারে চেপে বসেছে, ইয়াবার ব্যবসাটা চেপে বসেছে। তারা জেনেও যেন জানে না। পুলিশও তাদের বিরুদ্ধে কিছু করে না। আমরা কিছু বললে তারা ভিতরে ভিতরে আমাদের উপর রেগে যায়।

আপনি নির্বাচিত হলে এসবের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেওয়ার আশা রাখেন, নাকি তখনো ভয়েরই জয় হবে ?

ভয়ের জন্য করব না, সেটা না।

তাহলে কি বলতে চাচ্ছেন এসবের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব নয় ?

পরিস্থিতি এমন যে এই মদ বা ইয়াবার ব্যবসা আজকের না, দীর্ঘদিনের। আমাদের স্থানীয় বড় বড় নেতারা, মন্ত্রী মহোদয়রা কি এর কথা জানেন না ? নিশ্চয় জানেন। এখানে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থাও কাজ করছে। তারা কি জানে না ? তারা কি সেভাবে রিপোর্ট দিচ্ছে না ? কিন্তু মাদকব্যবসায়ীর নেটওয়ার্ক এত বেশি শক্তিশালী যে তাদের কাছে সবাই হার মানে। সেখানে আমাদের মত লোকেরা অত্যন্ত কঠিন অবস্থার মধ্যে আছে। তবে হ্যাঁ, আমি নির্বাচিত হলে মদ ও ইয়াবার ব্যবসা বন্ধ করার জন্য আমার জীবন দিয়ে হলেও শেষবারের মত একটা চেষ্টা করে যাব।

বিশেষ দ্রষ্টব্য:

ফতেঁখারকুল ইউনিয়ন পরিষদের তিন প্রার্থীর মধ্যে ধানের শীষের প্রার্থী আবুল বশর বাবু’র সাথে বার বার যোগাযোগ করেও তার সাক্ষাৎকার নেওয়া সম্ভব হয়নি।তাই তার সাক্ষাৎকার প্রকাশ করা যায়নি।