‘ইউনিয়নের আইনশৃঙ্খলাকে আমি মূল সমস্যা বলে মনে করি’

রামু উপজেলার ফতেখাঁরকুল ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে নৌকা প্রতীক নিয়ে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন রামু উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ফরিদুল আলম। তিনি ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর। আমাদের রামু ডটকমের পক্ষে সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আবুল খায়ের মোহাম্মদ আতিকুজ্জামান

আপনি কি কারণে ফতেখাঁরকুল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হতে চান?

আমি জনগণের সেবা করার জন্য ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হতে চাই।

এক বাক্যেই বলবেন, নাকি আরো কিছু বলার আছে?

না না, আর কিছু বলার নাই।

সব প্রার্থীই তো বলেন তিনি জনগণের ‘সেবা’ করতে চান। আপনি কোন প্রক্রিয়ায়, কি ধরনের সেবা করতে চান?

ইউনিয়নের উন্নয়ন করব। এরপর দেশের, এলাকার ও মানুষের সেবা করব।

আওয়ামী লীগের পক্ষে মনোনয়ন পেতে অনেকেই দিনরাত চেষ্টা করেছেন। যারা মনোনয়ন পাননি তাদের সাথে আপনার পার্থক্য কোথায়?

আমি দলীয় পদবীতে অন্যদের চেয়ে এগিয়ে। মাঠ পর্যায়ে জনপ্রিয়তায় এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার জরিপে আমি এগিয়ে বলেই আমি মনোনয়ন পেয়েছি।

আপনার দাবি করা জনপ্রিয়তা অর্জনের ক্ষেত্রে কোন যোগ্যতাগুলো আপনাকে বেশি সহযোগিতা করেছে বলে মনে করেন?

আমি বিভিন্ন সংগঠনের পাশাপাশি দলের ওয়ার্ড পর্যায় থেকে শুরু করে বর্তমানে রামু উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছি। এর আগে আড়াই বছর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ছিলাম। তার আগে এগার বছর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য ছিলাম। মোট সাড়ে তের বছর আমি আমার কাজে সততা ও ন্যায়ের পরিচয় দিয়েছি। এতে আমার জনপ্রিয়তা বেড়ে গেছে। এ কারণেই সম্ভবত বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা আমার পক্ষে রিপোর্ট দিয়েছে। আর তাই মনোনয়নটা আমি পেয়েছি।

আপনার নির্বাচনী এলাকা ফতেখাঁরকুল ইউনিয়নের সংক্ষিপ্ত পরিচয় দিন।

আমার ইউনিয়ন রামুর সদর ইউনিয়ন। রামুর সর্বশ্রেষ্ঠ উচ্চ বিদ্যালয়, সর্বশ্রেষ্ঠ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, ডিগ্রী কলেজ, উপজেলা পরিষদ, থানা, পোস্ট অফিস ও উপজেলার বৃহত্তম বাজার সবই আমার ইউনিয়নে। এছাড়া এ ইউনিয়নে শিক্ষার হার তুলনামূলক বেশি। আমার ইউনিয়নের অনেকে উচ্চ পর্যায়ের সরকারি চাকুরি করছেন। পার্শ্ববর্তী অন্যান্য ইউনিয়নের চেয়ে ফতেখাঁরকুল ইউনিয়ন এসব কারণেই বেশি পরিচিতি লাভ করেছে।

আপনার এলাকায় মোট ভোটার কত? তারা কোন শ্রেণী, পেশা, আর্থিক অবস্থা এবং শিক্ষাগত যোগ্যতার ?

আমার ইউনিয়নে মাত্র ১৯,৫৪৪ ভোট। এখানে হিন্দু, বৌদ্ধ, মুসলিম, রাখাইন সম্প্রদায়ের লোক বসবাস করে। আমার অভিজ্ঞতা ও জানা মতে, এখানে শিক্ষার হার ৮৫ শতাংশের উপর। আর্থিক অবস্থাও মোটামুটি ভাল। প্রায় অর্ধেক লোকের পেশা ব্যবসা আর অর্ধেক লোকের পেশা কৃষিকাজ। প্রধানত এই দুই কাজ করেই এলাকার বাসিন্দারা আয়রোজগার করে থাকে।

চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচিত হলে এলাকার উন্নয়নে কোন বিষয়গুলোকে আপনি অগ্রাধিকার দেবেন?

আমার ইউনিয়নের চারপাশের অন্তত তিন পাশ দিয়ে বাঁকখালী নদী প্রবাহিত। বর্ষা মৌসুমে এই নদীর পানি এসে বিভিন্ন এলাকা লন্ডভন্ড করে দেয়, এলাকার মানুষের ক্ষতি করে, গাছপালা, পশুপাখি ও কৃষির ক্ষতি করে। সব মিলিয়ে প্রতি বছর প্রচুর ক্ষতি হয়। আল্লাহতাআলা আমাকে চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচিত করলে আমি বাঁকখালী নদীতে বেড়িবাঁধ দিয়ে অন্তত আমার এলাকাকে কিভাবে বন্যামুক্ত করা যায় সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেব। এই বিষয়েই আমি সর্বপ্রথম অগ্রাধিকার দেব।

এরপর আর কোন কোন বিষয় আপনার কাছে প্রাধান্য পাবে ?

এরপর আমি যোগাযোগ ব্যবস্থায় অগ্রাধিকার দিব। শিক্ষার হার আরো কিভাবে বাড়ানো যায় সে বিষয়ে আমি নজর দেব। এছাড়া আমার ইউনিয়নের মানুষকে কিভাবে নিরাপত্তা দেওয়া যায় সেই বিষয়েও আমি মনোযোগ দেব।

বাঁকখালী নদীর ‘সমস্যা’ ছাড়া কোন বিষয়গুলোকে আপনি এলাকার প্রধান সমস্যা বলে মনে করেন ?

ইউনিয়নের আইনশৃঙ্খলাকে আমি মূল সমস্যা বলে মনে করি। এছাড়া, বন্যা এলাকার প্রচুর ক্ষতি করেছে, যোগাযোগ ব্যবস্থার ক্ষতি করেছে। এসব সমস্যাও রয়ে গেছে।

আপনার ইউনিয়ন নিয়ে এসবের বাইরে আপনার আর কি কি পরিকল্পনা আছে?

ইউনিয়নে আরো অনেক সমস্যা আছে। যেমন, এখানে অনেক জায়গায় বিদ্যুৎ নেই। আমি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হলে যেসব এলাকায় বিদ্যুৎ নেই সেখানে বিদ্যুতের ব্যবস্থা করব।

ফতেখাঁরকুলের ফকিরাবাজারসহ বিভিন্ন এলাকার বেশকিছু ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে এবং বসতবাড়িতে গত কয়েক বছরে চুরি-ডাকাতির ঘটনা বেড়ে গেছে। এসব প্রতিরোধে আপনি সুনির্দিষ্ট কি পদক্ষেপ নেবেন ?

আল্লাহর হুকুমে আমি যদি দায়িত্ব পাই তাহলে আমি উপজেলা প্রশাসন, থানা প্রশাসন, উপজেলা পরিষদ প্রভৃতির সাথে শলাপরামর্শ করে চুরি-ডাকাতি, রাহাজানি, খুনখারাবি বন্ধ করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করব।

ফতেখাঁরকুলের বেশকিছু জায়গায় প্রায় প্রকাশ্যে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও জনপ্রতিনিধিদের চোখের সামনেই অবাধে মদ ও অন্যান্য মাদকদ্রব্য বিক্রি হয়। আপনি যেসব সমস্যার কথা বললেন তার মধ্যে বিষয়টি নেই। মাদকদ্রব্যের বিষয়টি কি আপনার কাছে কোন বড় সমস্যা নয় ?

এটাও বড় সমস্যা। মাদকদ্রব্য, বিভিন্ন ধরনের ট্যাবলেট এলাকার মানুষ সেবন করছে। এটা অতীতেও ছিল, এখনো আছে। আমি নির্বাচিত হলে থানা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসনের সাথে পরামর্শ করে তা বন্ধের জন্য জোরালো ব্যবস্থা নেব।

ইয়াবা চালানের একটি বড় অংশ ফতেখাঁরকুল দিয়েই যায়। আপনি বলছেন এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেবেন। আপনি যে দলের মনোনয়ন নিয়ে নির্বাচন করছেন সেই দলের লোকই অনেকটা সময় ধরে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান। তাঁরা এতদিন পর্যন্ত কোন কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারলেন না কেন ?

বিভিন্ন মানুষের মন বিভিন্ন রকম। কেউ হয়তো ওদিকে নজরদারি করে, আর কেউ করে না। তবে আমি যখন ওয়ার্ড পর্যায়ে দায়িত্বে ছিলাম তখন আমার এলাকায় অন্তত মাদকদ্রব্য বন্ধের চেষ্টা করেছি। যদি ইউনিয়নের দায়িত্ব পাই তাহলে সারা ইউনিয়নে কিভাবে ইয়াবা ও অন্যান্য মাদকদ্রব্য বন্ধ করা যায় সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।

ওয়ার্ডের দায়িত্ব পালনের সময় এ ব্যাপারে আপনি কতটুকু সফল হয়েছেন ?

আমি শতভাগ সফল হয়েছি।

এলাকাবাসীর সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও শিক্ষাগত উন্নয়নের জন্য এখন পর্যন্ত আপনি কি কি কাজ করেছেন?

আমি ছাত্রজীবন শেষ করে ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছি। আমার ওয়ার্ডে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলিম সম্প্রদায়ের বসবাস। আমার নিজস্ব অর্থায়নে আমি হিন্দুদেরকে মন্দির করে দিয়েছি। বৌদ্ধদেরকেও বিভিন্ন আর্থিক সহযোগিতা করেছি। এলাকার মানুষ যাতে দারিদ্রতা কাটিয়ে উঠতে পারে সেজন্য কাজ করেছি। এছাড়া কৃষির উন্নয়নের জন্য আমি নিজে সেঁচ প্রকল্পের ব্যবস্থা করেছি।

সামাজিক, সাংস্কৃতিক বা শিক্ষাগত আর কোন কাজে জড়িত ছিলেন কখনো ?

আমি গত বিশ বছর ধরে সমাজ নিয়ে সম্পৃক্ত আছি। আমি আমার সমাজের প্রধান হিসেবে এখনো দায়িত্ব পালন করছি। সমাজের মানুষের নিরাপত্তা দেওয়া, তাদের জন্য শিক্ষার ব্যবস্থা করা, তাদেরকে অসামাজিক কার্যকলাপ থেকে বিরত রাখা, এলাকার নারী-পুরুষের বিয়ের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখা ইত্যাদি দায়িত্ব আমি পালন করেছি এবং এখনো করছি।

রামুর আওয়ামী লীগ তো অনেকদিন ধরে বিভক্ত। নির্বাচনের আগেও এটা স্পষ্টভাবে দেখা গেছে। আপনার নির্বাচিত হওয়ার পেছনে এই বিভক্তি কতটুকু নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আপনি মনে করেন?

দলের ভেতর মতপার্থক্য বা ভেদাভেদ থাকুক, কিন্তু সবার প্রতীক একটাই — ‘নৌকা’। আমরা সবাই বঙ্গবন্ধুর সৈনিক, জননেত্রী শেখ হাসিনার দল করি। যে প্রতীকটা আমি পেয়েছি তা আমার একার নয়। আমি মনে করি, আওয়ামী লীগের সকল লোক নৌকা নিয়ে লড়বে এবং নৌকার পক্ষে ভোট চেয়ে আমাকে জয়যুক্ত করবে। এটা আমার বিশ্বাস।

আপনি বলছেন ‘মনে করি’। কিন্তু গত বেশকিছু দিন ধরে নির্বাচনী প্রচারণা চলছে। এসময় কেমন সমর্থন আর কেমন বিরোধিতা পেয়েছেন ?

আমি সবার সহযোগিতা পাচ্ছি। আমি অনেকদিন ধরে মাঠে আছি। মাঠের জরিপ অনুযায়ী আমি নির্বাচিত হব বলেই আমার আশা।

অনুলিখন: হাফিজুল ইসলাম চৌধুরী।