উইন্ডিজকে উড়িয়ে বাংলাদেশের মধুর প্রতিশোধ

ক্রীড়া ডেস্কঃ
পেস আগুনের বদলা স্পিন বিষে। মনের কোণে জমে থাকা যাতনা লাঘব প্রায় একই যন্ত্রণা ফিরিয়ে দিয়ে। সিরিজ শুরুর আগে সাকিব আল হাসান সতীর্থদের বলেছিলেন, “আমাদের মনে রাখা উচিত, ওরা আমাদের কিভাবে হারিয়েছিল।” দল মনে রেখেছে। অধিনায়কের টোটকা কাজে লেগেছে। ক্যারিবিয়ানে গিয়ে গুঁড়িয়ে যাওয়া দল নিজেদের মাটিতে উড়িয়ে দিয়েছে ক্যারিবিয়ানদের।

মিরপুর টেস্টে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ইনিংস ও ১৮৪ রানে হারিয়েছে বাংলাদেশ। টেস্ট ক্রিকেটে দেড় যুগের পথচলায় এই প্রথম প্রতিপক্ষকে ফলো অন করানো ও ইনিংস ব্যবধানে জয়ের অনির্বচনীয় দুটি স্বাদ দল পেল একদিনেই।

ম্যাচ জয়ে ধরা দিয়েছে দুই ম্যাচের সিরিজে ২-০তে জয়। বাংলাদেশের এটি চতুর্থ সিরিজ জয়, ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে দ্বিতীয়। হোয়াইটওয়াশের স্বাদ বাংলাদেশ পেল তৃতীয়বার, দুবারই প্রতিপক্ষ এক সময়ের প্রবল পরাক্রমশালী ওয়েস্ট ইন্ডিজ।

গত জুলাইয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে গিয়ে দুটি টেস্টই তিন দিনে হেরেছিল বাংলাদেশ। ফিরতি সিরিজে সাকিব আল হাসানের দল দুই টেস্টই জিতল তিন দিনেই।

রোববার মিরপুর টেস্টের তৃতীয় দিন শুরু হয়েছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রথম ইনিংস দিয়ে। সেটিতে ১১১ রানে গুটিয়ে যাওয়া ক্যারিবিয়ানরা ফলো অনের পর দ্বিতীয় ইনিংসে করতে পেরেছে ২১৩।

দিনের নায়ক, ম্যাচে বাংলাদেশের জয়ের নায়ক মেহেদী হাসান মিরাজ। প্রথম ইনিংসে উইকেট নিয়েছিলেন ৫৮ রানে ৭টি। দ্বিতীয় ইনিংসে ৫৯ রানে ৫টি। ১১৭ রানে ১২ উইকেট, বাংলাদেশের হয়ে এক ম্যাচে সেরা বোলিংয়ের কীর্তি।

উইকেট এমন ভয়ানক কিছু ছিল না। দু-একটি বল নিচু হওয়া ছাড়া বাউন্স ছিল না খুব অসমান। কিন্তু বাংলাদেশের স্পিনের জবাবই জানা ছিল না ক্যারিবিয়ানদের।

দিনের শুরুতে উইকেটে ছিলেন শিমরন হেটমায়ার। লাঞ্চ বিরতিতেও গেলেন অপরাজিত থেকে। খেলা না দেখে থাকলে কেউ হয়তো ঘুণাক্ষরেও আন্দাজ করতে পারবে না, মাঝের সময়টায় ঘটে গেছে কত কিছু!

হেটমায়ারের সেটি ছিল দ্বিতীয় দফা ব্যাটিং। ৫ উইকেটে ৭৫ রান নিয়ে দিন শুরু করা ওয়েস্ট ইন্ডিজ এ দিন টিকতে পারেনি এক ঘণ্টাও। গুটিয়ে গেছে আর ৩৬ রান যোগ করেই। বাংলাদেশের ১১২ টেস্টে প্রতিপক্ষের সর্বনিম্ন রানে গুটিয়ে যাওয়ার রেকর্ড ওয়েস্ট ইন্ডিজের এই ১১১।

৫৮ রানে ৭ উইকেট নিয়ে মিরাজ গড়েছেন বাংলাদেশের কোনো অফ স্পিনারের সেরা বোলিংয়ের রেকর্ড। বাকি তিনটি উইকেট অধিনায়ক সাকিবের।

বাংলাদেশের স্পিন জালে ক্যারিবিয়ানদের আটকে পড়ার শেষ নয় সেখানেই। দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাটিংয়ে নেমেও আবার দিশাহারা তারা। লাঞ্চের আগেই হারায় চার উইকেট!

ম্যাচের একতরফা চিত্রনাট্যে লাঞ্চের পর খানিকটা রোমাঞ্চ যোগ করেন হেটমায়ার। নিজের সহজাত আগ্রাসী ব্যাটিংয়ে কিছুটা ফিরিয়ে দিলেন আক্রমণ। পঞ্চম উইকেটে শেই হোপকে নিয়ে গড়েন ৫৬ রানের জুটি, সপ্তম উইকেটে বিশুর সঙ্গে ৪৭।

হেটমায়ারকে হাতছানি দিচ্ছিল ক্যারিয়ারের প্রথম শতরান। কিন্তু সিরিজে চার ইনিংসে চতুর্থবার আউট হলেন মিরাজের বলে। ৯২ বলে ৯৩ রানের ক্যারিয়ার সেরা ইনিংসে ছক্কা মেরেছেন ৯টি, বাংলাদেশের বিপক্ষে যা এক ইনিংসে ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ।

এরপর ছিল ম্যাচ শেষের অপেক্ষা। সেই অপেক্ষা একটু দীর্ঘায়িত করল শেষ জুটিতে কেমার রোচ ও শারমন লুইসের ৪২ রান।

তাতে জয়ের ব্যবধান খানিকটা কমল। ক্যারিবিয়ানদের হারের যন্ত্রণা কমার কথা নয়। তবে জুলাই থেকে বয়ে বেড়ানো বাংলাদেশের বেদনার ক্ষতে কিছুটা প্রলেপ ঠিকই পড়ল।

সংক্ষিপ্ত স্কোর:

বাংলাদেশ ১ম ইনিংস: ৫০৮

ওয়েস্ট ইন্ডিজ: ৩৬.৪ ওভারে ১১১ (আগের দিন ৭৫/৫)(হেটমায়ার ৩৯, ডাওরিচ ৩৭, বিশু ১, রোচ ১, ওয়ারিক্যান ৫*, লুইস ০; সাকিব ১৫.৪-৪-২৭-৩, মিরাজ ১৬-১-৫৮-৭, নাঈম ৩-০-৯-০, তাইজুল ১-০-১০-০, মাহমুদউল্লাহ ১-১-০-০)।

ওয়েস্ট ইন্ডিজ ২য় ইনিংস: (ফলো অনের পর) ৫৯.২ ওভারে ২১৩ (ব্র্যাথওয়েট ১, পাওয়েল ৬, হোপ ২৫, আমব্রিস ৪, চেইস ৩, হেটমায়ার ৯৩, ডাওরিচ ৩, বিশু ১২, রোচ ৩৭*, ওয়ারিক্যান ০, লুইস ২০; সাকিব ১৪-৩-৬৫-১, মিরাজ ২০-২-৫৯-৫, তাইজুল ১০.২-১-৪০-৩, মাহমুদউল্লাহ ১-০-৬-০, নাঈম ১৪-২-৩৪-১)।

ফল: বাংলাদেশ ইনিংস ও ১৮৪ রানে জয়ী

সিরিজ: ২ ম্যাচ সিরিজে বাংলাদেশ ২-০তে জয়ী

ম্যান অব দা ম্যাচ: মেহেদী হাসান মিরাজ

ম্যান অব দা সিরিজ: সাকিব আল হাসান