আ’লীগের জোটেও ক্ষোভ অসন্তোষ

অনলাইন ডেস্কঃ
দলীয় মনোনয়ন নিয়ে ক্ষোভ-অসন্তোষ মেটেনি আওয়ামী লীগ এবং তার নেতৃত্বাধীন মহাজোটে। মহাজোটের প্রধান শরিক জাতীয় পার্টি তো আছেই, ১৪ দলীয় জোটের শরিকরাও কাঙ্ক্ষিত আসনে ছাড় না পেয়ে ক্ষুব্ধ। অন্যদিকে, আওয়ামী লীগের মনোনয়নবঞ্চিতরা নিজ দলের ওপরই অসন্তুষ্ট। কেউ কেউ দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে ‘স্বতন্ত্র’ প্রার্থী হয়েছেন। অনেক জায়গায় মনোনয়নবঞ্চিত প্রার্থীদের সমর্থনে প্রায় প্রতিদিনই বিক্ষোভ কর্মসূচি হচ্ছে। এই অবস্থায় বেশ কিছু আসনে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

অবশ্য মনোনয়ন নিয়ে এমন ক্ষোভ-বিক্ষোভের অবসান দ্রুতই ঘটবে বলে দাবি ক্ষমতাসীন দলের নীতিনির্ধারকদের। তারা মনে করছেন, মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ৯ ডিসেম্বরের আগেই এর সুরাহা হবে। দল ও জোটের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে যারা ‘প্রার্থী’ হয়েছেন তারা মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে দলের নির্বাচনী কর্মকাণ্ডে যুক্ত হবেন। দলের উচ্চ পর্যায়ের হস্তক্ষেপে ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থীদের অনেকেই ইতিমধ্যে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। কয়েকদিনের মধ্যে পরিস্থিতির আরও উত্তরণ আশা করছেন নেতারা।

নেতারা বলছেন, আওয়ামী লীগের দুই যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক ও আবদুর রহমান এবং দুই সাংগঠনিক সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম ও বিএম মোজাম্মেল মনোনয়ন না পেয়ে কিছুটা ক্ষুব্ধ ছিলেন। পরে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা তাদের ডেকে নিয়ে ক্ষোভ নিরসন করেছেন, নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বে সম্পৃক্ত করেছেন। এই চার কেন্দ্রীয় নেতার মতো অন্য ক্ষুব্ধ ও মনোনয়নপ্রত্যাশীদেরও পর্যায়ক্রমে ডেকে এনে ক্ষোভ নিরসনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে দায়িত্বশীল সূত্রগুলো।

মহাজোটের প্রধান শরিক জাতীয় পার্টি এখন পর্যন্ত ৪৫টি আসনে ছাড় পেয়েছে আওয়ামী লীগের কাছে। অনেক ঝোলাঝুলির পরও শেষ পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত ৬০টি আসনের সমঝোতার নিশ্চয়তা এখনও পায়নি সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের এ দল। এ অবস্থায় ছাড় পাওয়া ৪৫টি আসনসহ ১১১টি আসনে জাপার প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র জমা দিয়ে রেখেছেন। তাদের অনেকেই শেষ মুহূর্তে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতার আশা করছেন। তবে বেশিরভাগই অসন্তুষ্ট, কেউ কেউ দল থেকে পদত্যাগ করে বিএনপির টিকিটে নির্বাচনের প্রার্থীও হয়েছেন।

ঢাকা-১ আসনের বর্তমান এমপি জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম নিজ দলের মনোনয়ন পাননি। মহাজোটের প্রার্থিতা বিষয়েও এখন পর্যন্ত নিশ্চয়তা না পাওয়ায় ‘স্বতন্ত্র প্রার্থী’ হয়েছেন সাবেক এই প্রতিমন্ত্রী। এ আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী করেছে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার বেসরকারি খাত উন্নয়নবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানকে। সর্বশেষ দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে জাতীয় পার্টির তিন নেতা দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও গাইবান্ধা জেলা সভাপতি আবদুর রশীদ সরকার (গাইবান্ধা-২), লালমনিরহাট জেলা সাধারণ সম্পাদক রোকনউদ্দিন বাবুল (লালমনিরহাট-২) এবং ঢাকা মহানগর উত্তরের সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম সেন্টু (ঢাকা-১৩) দলত্যাগ করে বিএনপিতে ভিড়েছেন। দলীয় মনোনয়ন নিয়ে বাণিজ্যের অভিযোগ এনে এর আগেও ক্ষোভ-বিক্ষোভ অথবা দলত্যাগের ঘটনা ঘটেছে। অনেকেই দল ছেড়ে বিএনপির টিকিটে প্রার্থীও হয়েছেন।

ফরিদপুর-২ আসনে শুরুতে আওয়ামী লীগের মিত্র দল জাকের পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তফা আমীর ফয়সলকে মনোনয়ন দেওয়ার গুঞ্জন থাকলেও পরে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয় এ আসনের এমপি ও সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীকেই। সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী ও মোস্তফা আমীর ফয়সল উভয়েই মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। এ নিয়ে সাজেদা চৌধুরীর সমর্থকদের পাশাপাশি জাকের পার্টির নেতাকর্মীরাও ক্ষুব্ধ হয়ে আছেন। শেষ পর্যন্ত কে আওয়ামী লীগের সমর্থন পান, তা নিশ্চিত হতে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন ৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে।

এদিকে, ১৪ দলের শরিক দলগুলোও অসন্তুষ্ট প্রধান শরিক আওয়ামী লীগের প্রতি। দশম সংসদে শরিক এসব দলের জন্য ১৫টি আসন থাকলেও এবার তাদের ছাড় দেওয়া আসনসংখ্যা আরও কমে ১৩তে এসে দাঁড়িয়েছে। আরও কয়েকটি আসনে ছাড় পেতে শরিক দলগুলোর শীর্ষ নেতারা এখনও দৌড়ঝাঁপ অব্যাহত রেখেছেন। বর্তমান সংসদে ওয়ার্কার্স পার্টির ছয়জন এমপি থাকলেও এবার তারা পেয়েছে পাঁচটি আসন। নড়াইল-২ আসনে আওয়ামী লীগ থেকে জাতীয় ক্রিকেটে ওয়ানডে দলের অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজাকে প্রার্থী করায় ওয়ার্কার্স পার্টির বর্তমান এমপি শেখ হাফিজুর রহমান বাদ পড়েছেন। এর বদলে আরও দুই-একটি আসনে ছাড় চাইলেও এখন পর্যন্ত সাড়া পায়নি দলটি। বর্তমান সংসদে অবিভক্ত জাসদের পাঁচটি আসন, যার মধ্যে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর নেতৃত্বাধীন জাসদের অংশের তিনটি। এবারও এ তিনটি আসনেই ছাড় পেয়েছে তারা। আরও কয়েকটি আসন চাইছে দলটি।

তবে আসন বণ্টন নিয়ে ‘বঞ্চনায়’ বেশি ক্ষুব্ধ হয়েছে জাসদ ভেঙে গঠিত বাংলাদেশ জাসদ। চলতি সংসদে এ দলের দখলে থাকা দুটি আসনের মধ্যে পঞ্চগড়-১ আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী করেছে সাবেক এমপি মোজহারুল হক প্রধানকে। ক্ষুব্ধ এ আসনের বর্তমান এমপি বাংলাদেশ জাসদের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। এদিকে দলটির কার্যকরী সভাপতি মইন উদ্দীন খান বাদলের চট্টগ্রাম-৮ আসনে ছাড় দেওয়া হয়েছে। দলীয় সভাপতি শরীফ নুরুল আম্বিয়া নতুন করে নড়াইল-১ আসনে মনোনয়নের চিঠি পেয়েছেন। কিন্তু নড়াইল-১ আসনের আওয়ামী লীগের বর্তমান এমপি কবিরুল হক মুক্তিও মনোনয়নের চিঠি পাওয়ায় এ নিয়ে জটিলতা রয়েই গেছে।

এছাড়া জাতীয় পার্টির (জেপি) ছাড় পেয়েছে দলের চেয়ারম্যান ও পানিসম্পদমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর জন্য পিরোজপুর-২ আসনে। দলের আরেক এমপি প্রেসিডিয়াম সদস্য রুহুল আমিনের কুড়িগ্রাম-৪ আসনে আওয়ামী লীগ কোনো প্রার্থীর নাম ঘোষণা না করলেও তার প্রার্থিতা নিয়ে এক ধরনের অনিশ্চয়তা রয়েছে। তরীকত ফেডারেশন থেকে চট্টগ্রাম-২ আসনে দলটির চেয়ারম্যান সৈয়দ নজিবুল বশর মাইজভাণ্ডারী এবং লক্ষ্মীপুর-১ আসনে আনোয়ার খান মনোয়নের চিঠি পেয়েছেন।

আওয়ামী লীগে অসন্তোষ :ঢাকা-৭ আসনে গত নির্বাচনে নির্বাচিত স্বতন্ত্র এমপি হাজী মোহাম্মদ সেলিম এবার আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন। আইনি জটিলতায় প্রার্থিতা বাতিলের আশঙ্কা থেকে আওয়ামী লীগ বিকল্প প্রার্থী হিসেবে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সভাপতি হাজী আবুল হাসনাতকে রেখেছে। এই দুইজনই মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। তবে এখানে মনোনয়নবঞ্চিত হয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন আওয়ামী লীগের গত নির্বাচনের প্রার্থী ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন।

একইভাবে যশোর-২ আসনের বর্তমান এমপি অ্যাডভোকেট মনিরুল ইসলাম এবার দলের মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। এখানে দল থেকে প্রার্থী করা হয়েছে মেজর জেনারেল (অব.) ডা. নাসিরউদ্দীনকে। যশোর জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মনিরুলকে প্রার্থী করার দাবিতে প্রতিদিনই এলাকায় মানববন্ধন, মিছিল-সমাবেশসহ বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করছেন তার সমর্থক নেতাকর্মীরা।

আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে চাঁদপুর-২ আসন থেকে মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া ও নূরুল আমিন রুহুল উভয়েই মনোনয়ন পেয়েছেন। ত্রাণমন্ত্রী মায়া শুরুতেই দলের মনোনয়ন পেয়েছিলেন। নূরুল আমিন মঙ্গলবার মনোনয়নপত্র পান। আইনি জটিলতায় মায়ার মনোনয়ন বাতিল হয়ে যেতে পারে- এমন আশঙ্কা থেকেই নতুন করে নূরুল আমিনকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে বলে দলীয় সূত্র জানায়। এ নিয়ে এলাকায় মায়া ও নূরুল আমিনের সমর্থকরা এরই মধ্যে দ্বিধা-বিভক্ত হয়ে পড়েছেন।

চাঁদপুর-৪ আসন থেকে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি মুহম্মদ শফিকুর রহমান ও বরিশাল-২ আসনে সাবেক ছাত্রলীগ নেতা শাহে আলমও মঙ্গলবার দলের মনোনয়ন পান। তারা দু’জনই বুধবার মনোনয়নপত্র জমা দেন। অবশ্য চাঁদপুর-৪ আসনে প্রথমে মনোনয়নপত্র দেওয়া হয় বর্তমান সাংসদ মোহাম্মদ শামছুল হক ভূঁইয়াকে। তিনি মনোনয়নপত্র জমাও দিয়েছেন। আর বরিশাল-২ আসনে আগে মনোনয়ন পাওয়া বর্তমান সাংসদ তালুকদার মো. ইউনুস মনোনয়নপত্র জমা দেননি। এই আসনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের শরিক জাতীয় পার্টির প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। এখানে আওয়ামী লীগ ও জাপা নেতাকর্মীরা ক্ষুব্ধ পরস্পরের প্রতি।

ঢাকা-১৭ আসনে নৌকার প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন চিত্রনায়ক আকবর হোসেন খান পাঠান ফারুক। নতুন করে চিঠি পেয়ে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ উত্তরের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কাদের খান। জাপার চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদও এই আসনে মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। এখানে চলছে ত্রিমুখী ক্ষোভ-অসন্তোষ। আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের অবশ্য উদ্ভূত পরিস্থিতিতে চিন্তিত নন। দলীয় এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেছেন, দলীয় মনোনয়ন নিয়ে ক্ষোভ-বিক্ষোভের যে ঘটনাগুলো ঘটছে, সেগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা। এত বড় একটি দলের প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে এমন ছোটখাটো ক্ষোভ থাকতেই পারে। তবে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের সময়সীমা পার হওয়ার আগেই এগুলো নিরসন হয়ে যাবে। এরপরও যারা দলের সিদ্ধান্তের বাইরে যাবেন, তাদের দল থেকে আজীবন বহিস্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়াই আছে। জোট-মহাজোটের প্রার্থিতা ও আসনবণ্টন সমঝোতাও ওই সময়ের আগেই শেষ হয়ে যাবে বলে জানিয়েছেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক।

সূত্রঃ সমকাল