চাই অভিন্ন পারিবারিক আইন

অনলাইন ডেস্কঃ
রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারে দলের নির্বাহী কমিটিতে বাধ্যতামূলক ৩৩ শতাংশ নারী সদস্য রাখার বিধান আশা করছেন মানবাধিকার কর্মী ও নারী নেত্রীরা। একই সঙ্গে একটি অভিন্ন পারিবারিক আইন করার অঙ্গীকারও দাবি করছেন। তারা বলছেন, বাংলাদেশে নারীদের সমান অধিকার নেই। বিদ্যমান পারিবারিক আইনে সম্পত্তির উত্তরাধিকার, বিয়ে, তালাক, সন্তানের অভিভাবকত্ব- সর্বক্ষেত্রেই নারীদের বঞ্চিত করা হচ্ছে। নারীর সমঅধিকার নিশ্চিত করতে অভিন্ন পারিবারিক আইন করা প্রয়োজন। তাহলে নারীর প্রতি সব ধরনের সহিংসতা অনেকাংশে কমে আসবে।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সমকালের সঙ্গে আলাপচারিতায় রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে এমন অঙ্গীকারই প্রত্যাশা করেছেন বিশিষ্ট নারী নেত্রীরা। তারা বলেন, দেশের ৫২ শতাংশ নারী ভোটারের অংশগ্রহণে একটি নির্বাচিত সংসদ আসে। তাদের অধিকার নিশ্চিতকরণে রাজনৈতিক দলগুলো কী করবে, তা তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে।

নারীর অধিকার আন্দোলনে সক্রিয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. কাবেরী গায়েন বলেন, নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলো নারীর উন্নয়ন ইস্যুতে নানান প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। প্রতিশ্রুতির পুরোপুরি বাস্তবায়ন না করলেও কাজ হয়নি, এমনটা বলা যাবে না। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার ১৯৯৭ সালে একটি নারীনীতি করেছিল, যদিও তা বাস্তবায়ন করেনি। তবে এটা সত্যি, নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে ইশতেহারে প্রতিশ্রুত বিষয় সেভাবে মনিটর করা হয়নি। তিনি আরও বলেন, নারীর অধিকার ইস্যুতে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট কিছু অঙ্গীকার আশা করছি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি একটি ‘অভিন্ন পারিবারিক আইন’-এর ওপর। কারণ, বর্তমানে যে পারিবারিক আইন রয়েছে তা চলে নিজ নিজ ধর্ম অনুসরণ করে।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি আয়শা খানম বলেন, দেশ গঠন ও দেশ পরিচালনায় নারীদের অবদান গুরুত্বপূর্ণ। নারী-পুরুষ সবার অংশগ্রহণে দেশ মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার দ্বারপ্রান্তে। পাশাপাশি উন্নত দেশে উন্নীত হওয়ার পথে এগিয়ে গেছে। সরকার পরিচালনায় নীতিনির্ধারণী, রাজনীতিতে দপ্তর ব্যবস্থাপনা, ব্যবসা, বিচারকার্য, আইন-শৃঙ্খলা ও সামরিক বাহিনী, আন্তর্জাতিক শান্তি রক্ষণ, কূটনীতি, শ্রমবাজারসহ সর্বক্ষেত্রে নারীদের অবস্থান সুসংগঠিত রয়েছে। এ পরিস্থিতিতেও রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে নারীর অবস্থান অনেকটাই ক্ষীণ। আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ বড় রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারে এ বিষয়ে স্পষ্ট অঙ্গীকার আশা করছি। দলের কেন্দ্র থেকে তৃণমূলের সব শাখায় ৩৩ শতাংশ নারীকে অন্তর্ভুক্ত রাখা বাধ্যতামূলক করার বিষয়টি নির্বাচনী ইশতেহারেই উল্লেখ থাকা জরুরি।

নারী প্রগতি সংঘের নির্বাহী পরিচালক রোকেয়া কবীর বলেন, নির্বাচনে সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরির দাবি করছি। বাংলাদেশে নিরাপত্তা থেকে শুরু করে চলাফেরা, রাজনৈতিক দলগুলো থেকে মনোনয়ন পাওয়ার ক্ষেত্রেও নারীরা বঞ্চিত হন। এ অবস্থার পরিবর্তন জরুরি। আমরা চাই, রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারে এ বিষয়গুলো স্পষ্ট করা হোক। বাংলাদেশের সবার জন্য যে সমান অধিকার- তা আমরা নির্বাচনে দেখতে চাই। মেয়েরা উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে সমান সুযোগ পান না। এ জন্য তারা স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন না। এ ছাড়া নির্বাচনে ধর্মের ব্যবহার চাই না। কারণ ধর্মের ব্যবহারের ফলে নারীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন।

মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম বলেন, নারীর প্রতি সহিংসতা এখনও বন্ধ হয়নি। এ আন্দোলন কারও একার আন্দোলন নয়। এটা সবার আন্দোলন। এত নারী আন্দোলন, সরকার ও বেসরকারি সংগঠনগুলোর এত কাজের পরও নারী নির্যাতন বন্ধ হচ্ছে না। নারী নির্যাতন, নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধে রাজনৈতিক দলগুলো বড় ভূমিকা রাখতে পারে। এ ব্যাপারে রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারে সুস্পষ্ট অঙ্গীকার থাকা জরুরি।

মানবাধিকার কর্মী অ্যাডভোকেট সালমা আলী বলেন, নারীদের মূল্যায়ন করতে হবে। নারীদের প্রাপ্য সম্মান তাদের দিতে হবে। আন্দোলনে, মাঠে যেহেতু পুরুষদের সঙ্গে নারীরাও এগিয়ে চলে। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করেই ৩৩ শতাংশ আসনে নারী প্রতিনিধি নিশ্চিত করতে হবে।