নীতিটা গেল কোথায়: কামালকে হাসিনা

অনলাইন ডেস্কঃ
ন্যায়নীতির কথা বলে সরকারের সমালোচনাকারী কামাল হোসেনসহ ‘সুশীল সমাজের’ প্রতিনিধিদের অনেকের দুর্নীতি মামলায় দণ্ডিত তারেক রহমানের কাছ থেকে নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার অনুমোদন নেওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

দুর্নীতিতে দণ্ডিত খালেদা জিয়া ও তার ছেলে তারেকের নেতৃত্ব মেনে নিয়ে তারা বাংলাদেশে কোন ধরনের উন্নয়ন ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করবেন, সে প্রশ্নও তুলেছেন তিনি।

দেড় শতাধিক অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা মঙ্গলবার বিকালে গণভবনে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করে একাত্মতা প্রকাশের অনুষ্ঠানে এসব বলেন তিনি।

পদ্মা সেতু নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ার কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, “কিন্তু তারপরও আমাকে যারা দুর্নীতিবাজ বলে বক্তৃতা দিয়েছেন তাদের অবস্থানটা আজ কোথায়? সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কথা বলে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলে, কত নীতির বিরুদ্ধে কথা বলে সব গেছে এমন এক জায়গায়…বলে গণতন্ত্র নাকি রক্ষা করতে হবে।”

তিনি প্রশ্ন রাখেন: “গণতন্ত্রের অভাবটা কোথায়? তারা গণতন্ত্রের অভাবটা দূর করতে কাদের কাছে গেল?”

তত্ত্বাবধায়ক সরকার দাবিতে পাঁচ বছর আগে জাতীয় নির্বাচন বর্জন করে রাজনীতিতে কোণঠাসা হয়ে পড়া বিএনপি নিয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট করে এবার নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন গণফোরাম সভাপতি কামাল হোসেন। নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের জাফরুল্লাহসহ কথিত সুশীল সমাজের আরও অনেকে রয়েছেন তাদের এই দলে।

এ নিয়ে কামাল হোসেনের কঠোর সমালোচনা করে শেখ হাসিনা বলেন, “ড. কামাল হোসেনসহ যেসব সুশীল বাবুরা যারা এক জায়গায় হয়ে গিয়েছেন, অনেক নীতির কথা বলেন, এখন তাদের নীতিটা কোথায় গেল?

“কার অধীনে তারা নমিনেশন নিচ্ছেন? কার থেকে নিচ্ছেন…যে গ্রেনেড হামলায় সাজাপ্রাপ্ত, দশ ট্রাক অস্ত্র মামলা, দুর্নীতির দায়ে সাজাপ্রাপ্ত তাদের থেকে নমিনেশন নিয়ে তারা দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করবে?”

‘যারা আইনই মানেনি’ তারা নাকি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করবেন-মন্তব্য করে তিনি বলেন, “তারাই নাকি জঙ্গিবাদ, দুর্নীতি, সন্ত্রাস দূর করবে এবং দেশের উন্নতি নাকি করবে।

“যারা দেশ ধ্বংস করে দিয়ে গেছে তাদের দিয়ে কী উন্নতি হবে, আমি ঠিক জানি না।”

জিয়া এতিমখানা ও জিয়া চ্যারিট্যাবল ট্রাস্ট মামলায় দণ্ডিত বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কয়েক মাস ধরে কারাগারে বন্দি। তার অবর্তমানে ছেলে তারেক রহমান এখন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে।

স্ত্রী-সন্তান নিয়ে প্রায় এক দশক লন্ডনে বসবাসরত তারেক রহমান দুর্নীতির দুই মামলা ছাড়াও একুশে অগাস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় সাজাপ্রাপ্ত।

শেখ হাসিনা বলেন, “তাদের সাথে হাত মিলিয়ে তারা দুর্নীতি দূর করবেন, তারা সন্ত্রাস দূর করবেন, দেশের মানুষের জন্য একেবারে ক্ষীরের পাহাড় আর দুধের নহর বইয়ে দেবেন এমন একটা ভাবসাব তাদের।

“তারা এখানে কোন উন্নয়নটা করতে পারবেন আর কোন গণতন্ত্রটা করতে পারবেন, সেটা আমার প্রশ্ন। যারা সাজাপ্রাপ্ত, প্রমাণিত, বিদেশ থেকে এসে সাক্ষ্য দিতে চাইছে তাহলে আর বাকি থাকেটা কী। তাহলে দেশটাকে কোথায় তারা নিতে চায়?”

আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, “যে দলটার গঠনতন্ত্রের ৭ ধারায় আছে কেউ যদি দুর্নীতির কারণে কোন ক্রিমিনাল অফেন্স করে আর সজাপ্রাপ্ত হয় তাহলে সে ওই দলের সদস্যও হতে পারবে না। সেই রকম যারা একেবারে দুর্নীতির দায়ে সাজাপ্রাপ্ত, এতিমের অর্থ আত্মসাৎ করে সাজাপ্রাপ্ত, দশ ট্রাক অস্ত্র মামলায় সাজাপ্রাপ্ত, জঙ্গিবাদ সন্ত্রাসের জন্য সাজাপ্রাপ্ত, একুশে অগাস্ট গ্রেনেড হামলার কারণে সাজাপ্রাপ্ত, সেই সাজাপ্রাপ্তের নেতৃত্বে চলে গিয়েছেন আমাদের এই সুশীল বাবুরা।

“এই হচ্ছে বাংলাদেশের এক দুর্ভাগ্য। তাহলে আমার প্রশ্ন, গণতন্ত্রের সংজ্ঞাটা কী? তারা কোন গণতন্ত্র দিতে চায়, তার সংজ্ঞাটা কী? সেই সংজ্ঞাটা তো তারা বলতে পারছেন না। সেটা তো জনগণের গণতন্ত্র না।”

এদেশের ‘সুশীল বাবুরা’ জ্ঞানী, গুণী ও সুন্দর সুন্দর কথা বললেও ব্যক্তিস্বার্থের প্রশ্নে মাথা নুইয়ে দেন মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নীতিকথা শোনান। অনেক কিছু যারা শোনান.. আবার দেখি তাদের ব্যক্তিস্বার্থটা এত বড় যে সব মিলিত হন, বিসর্জন দিয়ে দেন। তখন তাদের ব্যক্তি স্বার্থটাই বড় করে দেখা দেয়। যেমন এই যে আপনারাই স্বীকার করেন, বাংলাদেশের উন্নয়ন।

“’৯৬ সালে খুব চেষ্টা করেছিলাম বাংলাদেশটাকে এগিয়ে নিতে। ২০০৮- এ নির্বাচনে যখন জয়ী হয়ে সরকার গঠন করলাম আবার ভাবলাম দেশকে কীভাবে এগিয়ে নিতে পারব। সেই চিন্তা থেকেই কিন্তু দিন-রাত পরিশ্রম করেছি।”

দেশের উন্নয়নের এই চেষ্টায় নানা বাধা পাওয়ার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “কত বাধা এসেছে একবার আপনারাই চিন্তা করে দেখেন। একটার পর একটা বাধা, প্রতিবন্ধকতা। যাক আল্লাহর রহমতে সেগুলো এক এক করে অতিক্রম করে এগিয়ে নিয়ে যেতে পেরেছি দেশকে। একটা দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকতে পেরেছি বলেই উন্নয়নগুলো দৃশ্যমান হচ্ছে।”

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর সামরিক শাসন জারি করে ‘দেশকে পিছিয়ে নেওয়া এবং মানুষের অধিকার কেড়ে নেওয়ার’ কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, “যারা মানুষকে হত্যা করেছে, দেশটাকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে, যুদ্ধাপরাধীদের ছেড়ে দিয়ে যারা তাদের প্রতিষ্ঠিত করেছে তাদের সাথে হাত মিলিয়ে তারা কোন গণতন্ত্র চায়? সেটা আমার একটা প্রশ্ন তাদের কাছে?”

তিনি বলেন, “খালেদা জিয়ার এতিমের টাকা আত্মসাতের মামলা আমি তো করিনি। রাজনৈতিকভাবে কাউকে আমি কখনো কাউকে গ্রেপ্তার করতে চাইনি। আমি সব শক্তি দেশের উন্নয়নে লাগিয়েছি। অন্য কোনো কাজে লাগাইনি। কারণ প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে কিছু করতে চেয়ে আমরা এনার্জি নষ্ট করতে চাই না। আমি ভেবেছি, আমার যা আছে, দেশের উন্নয়নে কাজ করব।”

উপস্থিত অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “আপনারা বলেছেন, সবাই মিলে নির্বাচনে কাজ করবেন। নৌকার মাধ্যমে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি। নৌকায় ভোট দিয়েই আজকে দেশের উন্নতি।

“আমরা নির্বাচনী ইশতেহারে যা দিয়েছিলাম, তার চেয়ে কিন্তু বেশি করেছি। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও আমাদের রয়েছে। সুনির্দিষ্ট দিক নির্দেশনা না থাকলে তো গন্তব্যে পৌঁছানো যায় না। আর ক্ষমতা তো আমার কাছে হচ্ছে, একটা সুযোগ পাচ্ছি দেশের সেবা করার, মানুষের সেবা করার।”

শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রক্রিয়া অনুসরণ করার কথা পাকিস্তানিরা বললেও বাংলাদেশে কেউ কেউ এখনো পাকিস্তানের পক্ষেই বলছে।

“আমাদের যেই সুশীল বাবুরা, ড. কামাল হোসেন, মান্না এরা, তারা আবার এই কথার পাল্টা জবাব দিল যে, বাংলাদেশ পাকিস্তান থেকেও খারাপ অবস্থায়। বাংলাদেশের ভালো এদের চোখেই পড়ে না। বাংলাদেশের মানুষের কল্যাণ হয়, সেটা চোখে পড়ে না। তাহলে কোন ভালো কাজটা তারা করতে পারবে, করবে?

“আর ঐক্যজোট করলো, এমন একটা দুর্নীতিবাজের হাত থেকে নমিনেশন পেল দয়া দাক্ষিণ্য নিয়ে তাই বাংলাদেশের তো উন্নতি দেখবেই না। আমি তো সবার সঙ্গে ডায়ালগ করেছি। যতবার দেখা করতে চেয়েছে করেছি। বলেছি, দেশের জন্য একটা সুন্দর পরিবেশ চাই এবং নির্বাচনটা করি। কিন্তু যারা সব সময় ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকে তারা কখন কোন ষড়যন্ত্র করে, সে বিষয়ে সচেতন থাকা উচিত।”

এ সময় তার সরকার আমলের বিভিন্ন উন্নয়নের কথাও তুলে ধরেন শেখ হাসিনা।

সূত্রঃ বিডিনিউজ