ঘূর্ণি বলের উৎসবে বাংলাদেশের হাসি

ক্রীড়া ডেস্কঃ
সিরিজের আবহ সঙ্গীত ছিল ‘যন্ত্রণা ফিরিয়ে দেওয়ার সিরিজ’। গত জুলাইয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজে গিয়ে যেভাবে নাকাল হতে হয়েছে, ঘরের মাটিতে সেই তেতো স্বাদ ফিরিয়ে দেওয়া স্পিন দিয়ে। তিন দিন পুরোবার আগেই সেই সুর বাজল মধুর হয়ে। চট্টগ্রামের ২২ গজে ক্যারিবিয়ানরা দেখল ঘূর্ণি বলের প্রলয় নাচন। সেই স্পিন মঞ্চেই বাংলাদেশ হাসল জয়ের হাসি।

প্রথম সেশনে উইকেট পড়েছিল দুই দল মিলিয়ে ৯টি। দ্বিতীয় সেশনে আরও ৬টি। তৃতীয় দিন চা বিরতির আগেই চট্টগ্রাম টেস্ট শেষ। স্বস্তি আর তৃপ্তি মাখা ৬৪ রানের জয়ে বাংলাদেশ এগিয়ে গেল সিরিজে।

প্রথম ইনিংসের ৭৮ রানের লিডই শেষ পর্যন্ত গড়ে দিয়েছে ব্যবধান। দ্বিতীয় ইনিংসে ১২৫ রানেই গুটিয়ে গিয়েছিল বাংলাদেশে। কিন্তু শেষ ইনিংসে ওয়েস্ট ইন্ডিজের লক্ষ্য দাঁড়ায় ২০৪। স্পিন চ্যালেঞ্জের পথ ধরে তারা পারেনি সেই ঠিকানার কাছে পৌঁছতে। গুটিয়ে গেছে ১৩৯ রানে।

স্পিনারদের ম্যাচে মুমিনুল হকের ম্যাচ সেরা হওয়াই বলে দিচ্ছে, ম্যাচের প্রেক্ষাপটে তার প্রথম ইনিংসের সেঞ্চুরি ছিল কতটা মূল্যবান।

উইকেট স্পিন ধরেছে যথেষ্ট। তবে ভয়াবহ টার্নিং বলতে যা বোঝায়, তা নয়। অসমান বাউন্স কিছু থাকলেও ছিল না ভয়ঙ্কর কিছু। সহায়তা যতটা ছিল, তা দারুণভাবে কাজে লাগিয়েই সফল বাংলাদেশের স্পিনাররা।

চার স্পিনারের একাদশ সাজানোয় ছিল যে বার্তা, নতুন ‘স্পিন কোয়ার্টেট’ সেই আশা পুরিয়েছে পুরোপুরি। ম্যাচে বাংলাদেশের ২০ উইকেটই স্পিনারদের। প্রথম ইনিংসে ১ উইকেট নেওয়া তাইজুল ইসলাম দ্বিতীয় ইনিংসে উজ্জ্বলতম। তৃতীয় দিনে ৩৩ রানে ৬ উইকেট নিয়ে এই বাঁহাতি স্পিনার তরান্বিত করেছেন বাংলাদেশের জয়।

প্রথম ইনিংসের লিড যতটা সম্ভব বাড়ানোর চাওয়া নিয়ে শুরু হয়েছিল বাংলাদেশের দিন। চাওয়া পূরণে সবচেয়ে বড় বাজি ছিলেন যিনি, সেই মুশফিকুর রহিমই ফিরেছেন সবার আগে। দিনের দ্বিতীয় ওভারেই আউট হয়েছেন ১৯ রানে।

আটে নেমে কঠিন পরিস্থিতিতে দারুণ খেলেছেন মাহমুদউল্লাহ। স্পিনে পায়ের কাজ ছিল দুর্দান্ত। শেষ পর্যন্ত অবশ্য ইনিংস বড় করতে পারেননি। তবে তার ৩১ রানের ইনিংসটি ছিল মহামূল্যবান। মেহেদী হাসান মিরাজের ব্যাট থেকে আসা ১৮ রানও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তাদের সৌজন্যেই লিড ছাড়িয়ে যায় দুইশ, বাংলাদেশ পেয়ে যায় জয়ের মানসিক শক্তি।

সেই বিশ্বাসের প্রতিফলন পড়ল বাংলাদেশ বোলিং শুরুর পরপরই। ১১ রানেই নেই ক্যারিবিয়ানদের ৪ উইকেট! রান তাড়ার ভবিষ্যৎ অনেকটা নির্ধারিত হয়ে গেল প্রথম ৬ ওভারেই।

টেস্ট ইতিহাসের প্রথম ওপেনার হিসেবে মুখোমুখি প্রথম বলেই স্টাম্পড কাইরান পাওয়েল। তাকে ফেরানোর পর শেই হোপও শিকার সাকিবের। আরেক প্রান্তে তাইজুলের দারুণ দুটি আর্ম বলের শিকার ক্রেইগ ব্র্যাথওয়েট ও রোস্টন চেইস। শুরুতেই টালমাটাল ওয়েস্ট ইন্ডিজ।

প্রথম ইনিংসের মতোই আগ্রাসী খেলেছেন শিমরন হেটমায়ার। তবে এবার খুব ধ্বংসলীলা চালাতে পারেননি। ফিরেছেন ১৯ বলে ২৭ রান করে। সময়ের সঙ্গে বেড়েছে তাইজুলের উইকেট ক্ষুধা। ৭৫ রানেই ক্যারিবিয়ানরা হারায় ৮ উইকেট।

নবম উইকেটে সাধ্যমত লড়েছেন সুনিল আমব্রিস ও জোমেল ওয়ারিক্যান। এই উইকেটে যে স্পিন সামলানো যায়, ৬৩ রানের নবম উইকেট জুটিতে খুব ভালো বুঝিয়েছেন দুজন। ক্যারিয়ার সেরা স্কোর গড়েছেন দুজনই। কিন্তু শুরুতে যে সর্বনাশ হয়েছে, সেটি পুষিয়ে দেওয়া ছিল দুজনেরই সাধ্যের বাইরে।

৪১ রান করা ওয়ারিক্যানকে ফিরিয়ে জুটি ভেঙেছেন মিরাজ। ৪৩ রানে আমব্রিসকে ফিরিয়ে তাইজুল শেষ করেছেন ম্যাচ। আম্পায়ার আঙুল তোলা মাত্রই ছুটে গেছেন স্মারক স্টাম্প নিতে।

তাইজুলের ছুটে যাওয়া আর সবাই মিলে ‘হাই ফাইভ’, উদযাপন বলতে এই। সাকিব-মুশফিকরা হয়তো বুঝিয়ে দিলেন, লক্ষ্য কেবল আধেকটা পূরণ হলো। সিরিজ জিতে তবেই হবে হয়ত উৎসবের আড়ম্বর!

সংক্ষিপ্ত স্কোর:

বাংলাদেশ ১ম ইনিংস: ৩২৪

ওয়েস্ট ইন্ডিজ ১ম ইনিংস: ২৪৬

বাংলাদেশ ২য় ইনিংস: ৩৫.৫ ওভারে ১২৫ (আগের দিন ৫৫/৫) (মুশফিক ১৯, মিরাজ ১৮, মাহমুদউল্লাহ ৩১, নাঈম ৫, তাইজুল ১, মুস্তাফিজ ২*; রোচ ১-০-১১-০, ওয়ারিক্যান ১৬-২-৪৩-২, চেইস ৬.৫-১-১৮-৩, বিশু ৯-০-২৬-৪, গ্যাব্রিয়েল ৩-০-২৪-১)।

ওয়েস্ট ইন্ডিজ ২য় ইনিংস:(লক্ষ্য ২০৪) ৩৫.২ ওভারে ১৩৯ (ব্র্যাথওয়েট ৮, পাওয়েল ০, হোপ ৩, আমব্রিস ৪৩, চেইস ০, হেটমায়ার ২৭, ডাওরিচ ৫, বিশু ২, রোচ ১, ওয়ারিক্যান ৪১, গ্যাব্রিয়েল ০*; সাকিব ৭-০-৩০-২, নাঈম ৭-১-২৯-০, তাইজুল ১১.১-২-৩৩-৬, মিরাজ ৮-১-২৭-২, মুস্তাফিজ ২-০-১১-০)।

ফল: বাংলাদেশ ৬৪ রানে জয়ী

সিরিজ: ২ ম্যাচ সিরিজে বাংলাদেশ ১-০তে এগিয়ে

ম্যান অব দা ম্যাচ: মুমিনুল হক

সূত্রঃ বিডিনিউজ