মুক্তবুদ্ধির উপাসক বঙ্গজননী সুফিয়া কামাল

গৌতম রায়ঃ
বঙ্গজননী সুফিয়া কামাল (২০ জুন, ১৯১১- ২০ নভেম্বর, ১৯৯৯) একাধারে ভারতীয় উপমহাদেশে নারীর স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ের অন্যতম প্রধান ঋত্ত্বিক এবং মুক্তবুদ্ধি চর্চার অন্যতম পথিকৃৎ। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতার ভেদবুদ্ধির রাজনীতির বিরুদ্ধে যে লড়াই তিনি পরাধীন ভারতে লড়েছিলেন, অবিভক্ত পাকিস্তানের প্রথম লগ্নেই সেই লড়াইতে রাজপথে মানুষের মিছিলের প্রথম সারিতে আমরা দেখি তাকে। ভাষা আন্দোলনে তার উদ্বীপ্ত নেতৃত্ব তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানের মহিলা সমাজকে সর্বপ্রথম সদ্য স্বাধীন দেশে পশ্চিম পাকিস্তানের সাম্রাজ্যবাদী চেতনার বিরুদ্ধে, মাতৃভাষার অধিকার আদায়ের দাবির ভিতর দিয়ে যাবতীয় ভেদবুদ্ধির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ময়দানে সামিল করেছিল। পাকিস্তান যে আসলে একটি ফাঁকিস্থান – তা বুঝতে মানবদরদী সুফিয়া কামালের পাকিস্তানের জন্মের অল্প কিছুকাল পর থেকেই কোনো অসুবিধা হয় নি। তাই সাহিত্য- সংস্কৃতির পরিমণ্ডলকে অতিক্রম করে তিনি সমাজ-মনষ্কতার পরিমণ্ডলে নিজেকে ব্যাপৃত করতে দেরি করেন নি।

                                                       গৌতম রায়

অবিভক্ত পাকিস্তানে তখন সবেমাত্র কায়েম হয়েছে মার্শাল ল। দোর্দণ্ড প্রতাপ আইয়ুব খান ক্ষমতায়। তিনি ক্ষমতা দখল করেই ডাক দিয়েছেন ‘দ্বিতীয় বিপ্লবে’র। শাসনতন্ত্র বলে কোনও কিছুই তখন অবশিষ্ট নেই পাকিস্তানে। রাজনীতি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। রাজনীতিকদের বেশিরভাগই রয়েছেন কারান্তরালে। অনেকেই আত্মগোপন করে। তার বাইরে যেসব রাজনীতিক আছেন তারাও মামলা মোকদ্দমায় বিপর্যস্ত।বিচার বিভাগের স্বতন্ত্র নিরপেক্ষ অধিকার বলে তখন কোনও কিছুই গোটা পাকিস্তানে অবশিষ্ট নেই। সামরিক শাসনের সেই ভয়ঙ্কর পরিবেশের ভিতরে সরকারের সমালোচনা তো দূরের কথা, প্রবাহমান বাঙালি সংস্কৃতির কথা যদি উচ্চারিত হয়, তাহলেও তা পরিগণিত হতো রাজদ্রোহ হিসেবেই।

এই রকম একটি নেতিবাচক পরিস্থিতিতে বাঙালির অর্থনৈতিক অধিকার আদায়ের প্রশ্নের সঙ্গেই মিলে যায় সাংস্কৃতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ের প্রশ্নটিও। অর্থনেতিক দাবি এবং সাংস্কৃতিক পিপাসা সন্মিলিতভাবে বাঙালির মনোজগতে যে স্বাধীনতার দাবিটিকে উসকে দেয়, তার নেতৃত্বেই ছিলেন সর্বজনশ্রদ্ধেয়া সুফিয়া কামাল।

পশ্চিম পাকিস্তানের অর্থনৈতিক বঞ্চনা পূর্ব পাকিস্তানের মানুষদের ভিতর সঞ্চারিত করেছিল, পশ্চিমের শাসকদের প্রতি সীমাহীন আক্রোশ।তাদের করে তুলেছিল পশ্চিম পাকিস্তানের প্রতি যুক্তিনিষ্ঠ সমালোচক। সংস্কৃতির প্রশ্নে তাদের ভিতরে এনেছিল ধর্ম নির্বিশেষে বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে পূর্ব বাংলার স্বাতন্ত্র্যবোধকে। পূর্ব বাংলার জাতিসত্তার এই অরাজনৈতিক বনিয়াদ গড়ে তোলার অন্যতম প্রধান ঋত্ত্বিক ছিলেন বঙ্গজননী সুফিয়া কামাল। এই দলীয় রাজনীতির বাধ্যবাধকতার বাইরে থেকে রাজনৈতিক বুনিয়াদ গড়ে তোলবার সামগ্রিক কর্মকাণ্ডের মধ্যমণি হিসেবে রবীন্দ্র জন্ম শতবর্ষ উদযাপন কমিটির সভানেত্রী হিসেবে কবি সুফিয়া কামালের ভূমিকা ছিল ঐতিহাসিক।

রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষের সময়কাল, ১৯৬১ সাল, সেই সময়ের পূর্ব পাকিস্তানে এক ভিন্ন প্রেক্ষিত নিয়ে এসেছিল। রবীন্দ্রনাথ হিন্দু সংস্কৃতির ধারক – বাহক, তাই তিনি ভারতের প্রতীক।তিনি কখনো পাকিস্তানে মর্যাদা পেতে পারেন না- পশ্চিম পাকিস্তানের তল্পিবাহক শাসকদের এমনটাই ছিল অভিমত। তাই হিন্দু সংস্কৃতির প্রতিনিধি হওয়ার দায়ে (!) সমগ্র পাকিস্তানের রেডিও, টেলিভিশনে তখন নিষিদ্ধ হয়ে রয়েছেন রবীন্দ্রনাথ।তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে রবীন্দ্রনাথের স্মৃতি বিজরিত জায়গাগুলিও ক্রমশ সঠিক দেখভালের অভাবে ক্রমেই জীর্ণ হয়ে চলেছে। গোটা পূর্ব পাকিস্তানেই সংস্কৃতি চর্চার ক্ষেত্রে বিরাজ করছে এক ভয়াবহ শূন্যতা। সুফিয়া কামালের নেতৃত্বে ঢাকাতে যখন রবীন্দ্র জন্ম শতবর্ষ পালনের জোরদার প্রস্তুতি চলছে, তখন গোটা কার্যক্রমকে ভেস্তে দিতেই পাকিস্তানের সামরিক শাসকেরা সেই সময়ের পূর্ব পাকিস্তানের সংস্কৃতি এবং রাজনীতির জগতের প্রগতিশীল মানুষজনদের ব্যাপক ধর-পাকড় শুরু করে দেয়। রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবর্ষ উদযাপনে সক্রিয়তার অভিযোগে গ্রেপ্তার হন সে সময়ের বিশিষ্ট যুবনেতা আনোয়ার জাহিদ। গ্রেপ্তার করা হয় ছাত্রনেতা জহিরুল ইসলামকে। প্রখ্যাত সাংবাদিক কে জি মোস্তাফা গ্রেপ্তার হন। বিশিষ্ট অধ্যাপক আলাউদ্দিন আল আজাদকেও গ্রেপ্তার করা হয়। চারিদিকে এক পাশবিক দমননীতি চালায় সামরিক জান্তার ধারক বাহকেরা।

আইয়ুব খান তার সামরিক শাসনের ভিতর দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষদের ভিতরে পশ্চিমের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক শোষণের বিরুদ্ধে যে ক্ষোভ তৈরি হতে শুরু করেছিল তাকে অন্যখাতে বইয়ে দেওয়ার নোংরা ষড়যন্ত্র শুরু করেছিলেন। যে বাঙালি জাতীয়তাবাদের অঙ্কুরোদগম ঘটেছিল একুশের মহান ভাষা আন্দোলনের ভিতর দিয়ে , সেই বাঙালি জাতীয়তাবাদ একটা পরিপূর্ণতার দিকে যাত্রা করেছিল ‘৫৪ সালে অবিভক্ত পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনে মুসলিম লীগের পরাজয়ের ভিতর দিয়ে। যদি চুয়ান্নর নির্বাচনে মুসলিম লীগের অমন শোচনীয় পরাজয় না ঘটতো, তাহলে সামরিক জান্তার আত্মপ্রকাশ এতো দ্রুততার সঙ্গে, এতো ভয়াবহতা নিয়ে অবিভক্ত পাকিস্তানে আত্মপ্রকাশ করতো কি না – তা নিয়ে অবশ্য বিতর্কের অবকাশ থেকেই যায়।তবে আইয়ুব খান সামরিক শাসন যন্ত্রের ভিতর দিয়ে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের পর একুশের চেতনা লব্ধ হিন্দু- মুসলিমের সম্প্রীতির যে বাতাবরণ পূর্ব পাকিস্তানে ভেঙে তছনছ করে ইসলামীয় বিধি বিধানের আড়ালে সাম্রাজ্যবাদী শাসন কায়েমের চেষ্টা করেন, তার প্রতিরোধে মূলত সুফিয়া কামালের নেতৃত্বে রবীন্দ্রনাথ হয়ে ওঠেন একটি প্রতিরোধের দেওয়াল। সাংস্কৃতিক চেতনাকে সর্বাত্মক করে সেই চেতনাকে কিভাবে রাজনৈতিক প্রতিরোধের অস্ত্র হিসেবে তুলে ধরে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো যায়, তা রবীন্দ্র জন্ম শতবর্ষকে কেন্দ্র করে সুফিয়া কামাল কেবল বাংলাদেশের মানুষকে বা দেশকাল নির্বিশেষে বাঙালি জাতিকেই দেখিয়ে দিয়ে যান নি।সংস্কৃতি কি ভাবে প্রতিরোধের আগুণ জ্বালাতে পারে তা তিনি গোটা বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষকে দেখিয়ে দিয়ে গেছেন।

আইয়ুব খানের যাবতীয় দমন নীতিকে উপেক্ষা করে সুফিয়া কামালের নেতৃত্বে ঢাকার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটের মিলনায়তনে সপ্তাহব্যাপী রবীন্দ্র জন্ম শতবর্ষ পালন নিছক কোনও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ছিল না। ওটি ছিল স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ সৃষ্টির অন্যতম সূতিকা গৃহ।পাকিস্তান কায়েমের পর থেকেই মুসলিম জাতীয়তাবাদের ধারক বাহকেরা রবীন্দ্রনাথের গায়ে তকমা সেঁটে দিয়েছিলেন ‘হিন্দু কবি’ হিসেবে।একুশের চেতনায় জারিত বাঙালি মুসলিম জাতীয়তাবাদের এই ধারার সঙ্গে কোনো অবস্থাতেই সহমত ছিলেন না। বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী মানুষেকে একত্রিত করে রবীন্দ্রনাথকে অবলম্বন করে সাম্রাজ্যবাদ, প্রাদেশিকতা, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের যে নেতৃত্ব এই সময়ে সুফিয়া কামাল দিয়েছিলেন, তা মহান মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক চিন্তা চেতনার উন্মেষের একটি দ্বার উন্মোচন করেছিল। সামরিক শাসনকে উপেক্ষা করে গোটা বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে প্রাদেশিকতা, ধর্মান্ধতার অসত্য অভিযোগকে ধুলোয় মিশিয়ে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্মের প্রাগভাষ রবীন্দ্রনাথকে অবলম্বন করেই সেদিন যেভাবে সুফিয়া কামালের বলিষ্ঠ নেতৃত্বের জন্যে সম্ভবপর হয়েছিল তা ভাবলেও বিস্ময় জাগে। এই দিক থেকে বিচার করলে বলতেই হয়, একাত্তরে মহান মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব যে স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন, সেই স্বাধীনতার ভিত্তি ভূমি প্রস্তুতের বহুলাংশে কৃতিত্ব বঙ্গজননী সুফিয়া কামালের প্রাপ্য।

রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবর্ষকে কেন্দ্র করে সুফিয়া কামালের নেতৃত্ব গড়ে ওঠা সামাজিক আন্দোলন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের ফলে রাজনৈতিক আন্দোলনের ক্ষেত্রে যে সাময়িক একটা গতিহীনতা এসেছিল, তা বেগবান হয়। আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের ফলে সেই সময়ের পূর্ব পাকিস্থানে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রায় নিশ্চিহ্ন হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। সুফিয়া কামালের নেতৃত্বে রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবর্ষকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক কর্মীরাও একত্রিত হওয়ার সুযোগ পান। রাজনৈতিক কর্মীদের ভিতর সামরিক শাসন সম্পর্কে প্রাথমিক ভয় কাটিয়ে তাঁদের লড়াইয়ের ময়দানে সামিল করার ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেছিলেন সুফিয়া কামাল। অন্তরের যে তাগিদ বাঙালির মনে ছিল তাকে বাইরের ডাকে পর্যবসিত করার স্পর্ধা জুগিয়েছিলেন সুফিয়া কামাল। আপন বিশ্বাসকে আঁকড়ে ধরে আবেগে দুলে ওঠবার স্পর্ধা রবীন্দ্রনাথকে কেন্দ্র করে বাঙালিকে দিয়েছিলেন সুফিয়া কামালই।

তার নিজের ভাষায়, “এল রবীন্দ্র শতবার্ষিকী। অজুহাত পেল মুর্খের দল। নিষেধ জারী করতে তৎপর হয়ে উঠে পড়ে লাগল রবীন্দ্র শতবার্ষিকী বন্ধ করার জন্য। রাজধানী ঢাকা থেকে গ্রামে গঞ্জে মফস্বলে ছড়িয়ে পড়ল অর্বাচীন দলের এ অবিশ্বাস্য আদেশের কথা। রাজধানীর গুণী সুধীজন তরুণ কিশোর দল বিক্ষুব্ধ, বিভ্রান্ত হয়ে পড়ল। ছাই ফেলতে ভাংগা কুলো একান্ত অযোগ্য আমার কাছে তখনকার দিনের শিল্পী সাহিত্যিক সমাজসেবী এসে নানারূপ পরিকল্পনায় রবীন্দ্র জয়ন্তী অবশ্য পালন করার প্রতিজ্ঞা শপথ গ্রহণ করলেন। সরকার তা শুনে আমার বাড়িতে তৎকালীন অনেক পদস্থ কর্মচারী, উপদেষ্টা ,ধর্মীয় ব্যক্তি পাঠাতে লাগলেন। আমার স্বামী তখন ও সরকারী চাকুরে। কিন্তু তিনি ও উৎসাহিত হয়ে আমাদেরকে সমর্থন করলেন। কত যে বাঁধা ব্যাঘাতের মধ্য দিয়ে অসম সাহসে ঝাঁপিয়ে পড়লাম সে আন্দোলনে।” ( একালে আমাদের কাল– সুফিয়া কামাল, পৃ- ৫৪)[ বানান অপরিবর্তিত]

সময়ের প্রেক্ষিতে বিচার করলে বলতে হয়, রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষকে কেন্দ্র করে সুফিয়া কামালের নেতৃত্বাধীন কর্মকাণ্ড ছিল পাকিস্তানের সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে সংস্কৃতিপ্রেমীদের নেতৃত্বে এক অঘোষিত যুদ্ধ, যা একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের ভিত্তি রচনা করে দিয়েছিল। অখণ্ড বাঙালি সংস্কতিকে ধ্বংসের যে ষড়যন্ত্রের ভিতর দিয়ে পাক সামরিক শাসকরা ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশের আদলেই বিভাজনকে চিরস্থায়ী করে দিতে চেয়েছিল, সুফিয়া কামালের বলিষ্ঠ নেতৃত্ব সেই নোংরা ষড়যন্ত্র কে রুখে দেয়।

সৌজন্যেঃ বিডিনিউজ