সবাই কেন এমপি হতে চায়?

চিররঞ্জন সরকারঃ
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার পর থেকে আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলো বিপুল উদ্যমে নির্বাচনের মাঠে মেনে পড়েছে। বেশিরভাগ দলে মনোনয়নপত্র বিক্রি শেষ হয়ে গেছে (এখানে বলে রাখা ভালো যে, আগে ছিল মনোনয়নপত্র ‘সংগ্রহ’। এখন বলা হচ্ছে ‘বিক্রি’। বড় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ব্যবসায়িক মনোভাব পুরোদস্তুর বাসা বেঁধেছে। আওয়ামী লীগ-বিএনপি তো এই মনোনয়নপত্র বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা সংগ্রহ করেছে। এবার দেদারসে মনোনয়নপত্র বিক্রি হয়েছে। একেকটি সংসদীয় আসন থেকে অনেকেই দলীয় মনোনয়নপত্র কিনেছেন। তিনশ আসনের জন্য প্রধান দলগুলো থেকে নাকি প্রায় দশ হাজার মনোনয়নপত্র বিক্রি হয়েছে। এটা খুব সম্ভবত একটা রেকর্ড। এমপি হওয়ার জন্য এক শ্রেণির মানুষের এই অতিউৎসাহ নিঃসন্দেহে রাজনীতির জন্য ভালো খবর। চরম অবক্ষয়গ্রস্ত রাজনীতির প্রতি এখনও মানুষের ব্যাপক আগ্রহ আমাদেরও আশাবাদী করে তোলে!

 

প্রশ্ন হলো, এত বিপুল সংখ্যক মানুষ কেন নির্বাচন করতে চায়? এমপি হতে চায়? এমপি হওয়ার সুবিধা কী? হ্যাঁ, এমপি হওয়ার অনেক সুবিধা আছে। অনেক লাভ আছে, ‘মধু’ আছে। আর মধুর সন্ধান পেলে মৌমাছিরা তো সেখানে ভিড় করবেই। এটা দিবালোকের মত স্বচ্ছ যে, আমাদের দেশে রাজনীতি এখন লাভজনক ব্যবসা। বিনা পুঁজিতে এত লাভজনক ব্যবসা আর নেই। আর সে কারণেই আমাদের সংসদ এখন পুরোটাই প্রায় ব্যবসায়ীদের দখলে ও নিয়ন্ত্রণে।

আমাদের দেশে এক দিকে যেমন ব্যবসায়ীরা এমপি হয়ে যাচ্ছেন। পাশাপাশি এমপিরাও ব্যবসায়ীতে পরিণত হচ্ছেন। ব্যতিক্রম কয়েকজন বাদ দিলে সব রাজনীতিবিদ এখন ব্যবসায়ী। এই রাজনীতিবিদরা দুর্নীতি, অনিয়ম করে কোটি কোটি টাকা কামাচ্ছেন। এমন বিনা ঝুঁকিতে, বিনা পুঁজিতে সবচেয়ে লাভজনক ব্যবসা আর বাংলাদেশে দ্বিতীয়টি নেই।

এক পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায় দশম জাতীয় সংসদের এমপিদের প্রায় সবাই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। অনেকে নিজেদের হলফনামায় রাজনীতিবিদ উল্লেখ করলেও বাস্তবে তারা পুরোদস্তুর ব্যবসায়ী। কেউ কেউ ব্যবসায়ী পরিচয় না দিলেও নিজের ও পরিবারের নামে রয়েছে বিভিন্ন ব্যবসা। আবার অনেক এমপি শিক্ষকতাকে পেশা দেখালেও আয় দেখিয়েছেন ব্যবসা থেকে। আবার এমপি হওয়ার পরই কারও কারও পাল্টে গেছে পেশাও। আগে ব্যবসা না করলেও এমপি হয়েই জড়িয়ে পড়েছেন ব্যবসার সঙ্গে। নামে-বেনামে গড়ে তুলেছেন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। তবে নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হলফনামায় এমপিরা নিজেদের ব্যবসায়ী, কৃষিজীবী, আইনজীবী, রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচয় দিলেও প্রায় সবার আয়ের মূল উৎস হচ্ছে ব্যবসা। ৩৫০ জন এমপির হলফনামার তথ্য বিশ্লেষণ করে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। দেখা গেছে, হাতে গোনা কয়েকজন এমপি ছাড়া প্রায় সবাই প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে ব্যবসার সঙ্গে জড়িত।

ব্যবসার সঙ্গে যোগ আছে মুনাফা এবং টাকার। সেটা এমপিদের বিত্ত-বৈভব, অর্থের প্রাচুর্য দেখলেই বোঝা যায়। আমরা যদি একটু পরিসংখ্যানের দিকে চোখ বোলাই, তাহলে দেখব, কোটিপতি ও ব্যবসায়ীদের এমপি হওয়ার প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। দশম জাতীয় সংসদে কোটিপতির সংখ্যা ২১৩ জন। ৯০ জন এমপির পাঁচ কোটি টাকার ওপরে সম্পদ আছে। ৫৪ জনের বার্ষিক আয় এক কোটির ওপরে। ১৬৩ জনই পেশায় ব্যবসায়ী (সমকাল, ২২ জানুয়ারি ২০১৪)।

এটা নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীদের হলফনামায় দেওয়া তথ্য থেকে তৈরি করা প্রতিবেদনের চিত্র। প্রকৃত সত্য এর চেয়ে অনেকগুণ বেশি।

সুইজারল্যান্ডের বাংলাদেশ দূতাবাস ও সুইস এজেন্সি ফর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড কো-অপারেশনের (এসডিসি) যৌথভাবে প্রকাশিত ‘দ্য রিয়েল পলিটিকস অব বাংলাদেশ: দি ইনসাইড স্টোরি অব লোকাল পাওয়ার ব্রোকারস’ শীর্ষক এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ছয় বছরের কম সময়ের ব্যবধানে সংসদ সদস্যদের (এমপি) আয় বেড়েছে ৩২৪ শতাংশ। বর্তমানে এমপিদের বার্ষিক গড় আয় প্রায় কোটি টাকা, যা একজন সাধারণ মানুষের আয়ের প্রায় শতগুণ। বর্তমানে দেশে মাথাপিছু গড় আয় ১ হাজার ৩১৬ ডলার, টাকার অঙ্কে যা ১ লাখ ৫ হাজারের কাছাকাছি। সেখানে একজন এমপির আয় ন্যূনতম হলেও এক কোটি টাকা। চুরি-চামারি বাদ দিলেও ‘স্বাভাবিক’ নিয়মেই একজন এমপি এই টাকা উপার্জন করেন। হিসেব মতে, পাঁচ বছরে প্রতিটি সংসদীয় আসনে গড়ে এক হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ হয়। আর সব কাজেই সংশ্লিষ্ট এমপির কমিশন হিসেবে গড়ে ১০ শতাংশ টাকা ধরা থাকে। ফলে যিনি সবচেয়ে সৎ এবং নির্লোভ, তিনিও এক হাজার কোটি টাকার ১০ শতাংশ হিসেবে ৫ বছরে একশ কোটি টাকার মালিক বনে যান। এর বাইরে এমপি হিসেবে সম্মানি, ন্যাম ফ্ল্যাট, শুল্কমুক্ত গাড়ি, বিদেশ ভ্রমণ, দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংস্থা ও সংগঠনের পক্ষ থেকে প্রাপ্ত বৈধ-অবৈধ সুবিধা মিলিয়ে আরও প্রচুর অর্থ। সুতরাং এমপি হতে কে না চায়?

অথচ একটা সময় পর্যন্ত রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাই এমপি হতেন। তারা নানা ত্যাগ-তিতিক্ষার মধ্যদিয়ে দিনাতিপাত করতেন। তাদের খুব একটা আয়-ইনকাম ছিল না। দলের অন্যান্য সম্পন্ন নেতাকর্মীদের সাহায্য-সহযোগিতায় তারা চলতেন। কোনো রকম ফুটানি তাদের মধ্যে দেখা যেত না। তারা কখনও কর্মীদের পেছনে পয়সা ব্যয় করতেন না। কর্মীরাই নেতার জন্য চা-পানির ব্যবস্থা করতেন। এখন দুনিয়া উল্টে গেছে। ব্যবসায়ীরা যেহেতু নেতা হচ্ছেন এবং নেতা হয়ে প্রচুর টাকা কামানোর সুযোগ পাচ্ছেন, কাজেই তাদের কর্মীদের নিয়মিত মাসোহারা দিয়ে বাগে রাখতে হয়। আর এ জন্য তাকে আরও আরও টাকা বানানোর ধান্দা করতে হয়। ফলে তিনি নিজে, দল এবং সমাজ একযোগে রসাতলে যায়।

আমরা জানি যে, রাষ্ট্রপরিচালনার নীতিই হচ্ছে রাজনীতি। এক সময় বলা হতো, রাজনীতি হচ্ছে রাজার নীতি। রাজা কীভাবে দেশ পরিচালনা করবেন, সেটাই রাজনীতির মূল কথা। রাজনীতির সঙ্গে ‘নীতি’ কথাটা যুক্ত আছে। নীতি হলো কিছু আদর্শ নিয়ম-কানুন। অতীতে আমরা দেখেছি যারা রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন, তারা নীতি-নৈতিকতার চর্চা করেছেন। রাজনীতিবিদদের মানুষ শ্রদ্ধা করত। তাদের কথায় জীবন উৎসর্গ করতেও দ্বিধা বোধ করত না। রাজনীতি ছিল দেশ ও মানুষের সেবা করার সবচেয়ে উত্তম পন্থা। যারা রাজনীতির খাতায় নাম লেখাতেন তারা আত্মস্বার্থ কখনো বিবেচনায় রাখতেন না। দেশ-জাতি, মানুষের কল্যাণই ছিল তাদের মূল উদ্দেশ্য। তারা জাতির কল্যাণ সাধনায় ব্রতী হয়ে নিজেদের দিকে তাকানোর সময় পেতেন না। জনগণের স্বার্থকে সবার উপরে স্থান দিয়ে সত্য ও ন্যায়ের পথে এগিয়ে চলতেন সব ধরনের ভয়-ভীতি, লোভ-লালসাকে উপেক্ষা করে।

রাজনীতির সঙ্গে নেতা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। নেতা ছাড়া রাজনীতি কল্পনাই করা যায় নায়। যাদের হাত ধরে নীতি প্রণয়ন হয়, প্রতিষ্ঠিত হয়, নীতির প্রচার-ও প্রসার হয়, তাদের মধ্যেই আজ নীতি-নৈতিকতা নির্বাসিত প্রায়। আজকে রাজনীতির মাঠে নীতিহীন নেতার সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। তারা বিভিন্ন সংগঠনের ব্যানারে চাঁদাবাজী, টেন্ডারবাজীসহ নানা ধরনের অপকর্মের মহোৎসব পালন করে। সমাজসেবার নামে ফটোবাজি করে সমাজের বারোটা বাজায় এসব রাজনীতির নামে ঘৃন দালালরা। এমপি মন্ত্রীদের ছবির সঙ্গে রঙচটা পোস্টার ছাপিয়ে তারা বড় নেতা বনে যায়। অনুষ্ঠানের নামে চলে চাঁদা তোলার মহড়া। এসব নেতা স্বার্থের জন্য কারো পায়ে মাথা ঠেকাতেও দ্বিধা করে না। আবার স্বার্থের জন্য কারো কপাল ফাটাতেও দ্বিধা করে না।

আজকের নেতারা নীতির চর্চা করেন না তাইতো জাতি আজ নৈতিকতাহীন ও মেধাশূন্য হয়ে পড়ছে। তারা তাদের লাভের আশায় দেশের বারোটা বাজাতে একটুও চিন্তা করেন না। চাঁদাবাজ, টেন্ডারবাজ, খুনি, ছিনতাইকারী, মাদক ব্যবসায়ীরা যখন সমাজের নেতৃত্বে আসে তখন তারা মানুষের জন্য কী করবে? ধান্দাবাজদের নেতৃত্বে সমাজ কখনোই এগিয়ে যাবে না। তাইতো আমরা বার বার এগিয়ে চলার পথে হোঁচট খাচ্ছি।

একথা ঠিক যে আমাদের দেশে অনেক নেতা আছে। কিন্তু যোগ্য নেতা কি আছে? যারা লড়তে জানে, জনকল্যাণে নিজের জীবনকে উৎসর্গ করতে প্রস্তুত, যারা সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, যারা ঘুষ-দুর্নীতি-লোভ-মোহের ঊর্ধ্বে উঠে সকল মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে পারেন। তেমন নেতা কি সত্যিই আমাদের সমাজে আছে? তৈরি হচ্ছে? আমাদের পরিবারে, প্রতিষ্ঠানে সমাজে, রাজনৈতিক দলে তেমন নেতৃত্ব বিকাশের পথ কি আছে? নাকি ধান্দাবাজ-স্বার্থান্ধদেরই কেবল সামনে চলার পথ তৈরি করে দেয়া হচ্ছে?

আমরা রাজনীতিবিদরা দেশ পালটাবেন বলে আশা করি। দাবি তুলি। কিন্তু ব্যবসায়ীদের এমপি হওয়া কিংবা এমপি হয়ে ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ার যে প্রবণতা-সেটা পালটানোর দাবি করব কার কাছে? রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে? তারা সেটা মানবে কেন?

চিররঞ্জন সরকারকলামিস্ট।

সৌজন্যেঃ বিডিনিউজ