ভোটের তোড়জোড়ের মধ্যে নয়াপল্টন রণক্ষেত্র

অনলাইন ডেস্কঃ
নির্বাচন সামনে রেখে মনোনয়ন ফরম বিক্রির কার্যক্রমের মধ্যেই ঢাকার নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে পুলিশের সঙ্গে দলটির নেতাকর্মীদের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়েছে।

বুধবার বেলা ১টা থেকে এক ঘণ্টার বেশি সময় ধরে এই সংঘর্ষে পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। আহত হন পুলিশ সদস্যসহ অর্ধশতাধিক।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ কাঁদুনে গ্যাসের শেল ও রাবার বুলেট ছোড়ে। অন্যদিকে বিএনপি কর্মীরা বেশ কিছু যানবাহন ভাংচুর করে এবং পুলিশের দুটি গাড়িতে আগুন দেয়।

এই সংঘর্ষের জন্য দুই পক্ষই পরস্পরকে দোষারোপ করেছে। বিএনপি বলেছে, ‘সরকারের নির্দেশে’ পুলিশ বিনা উসকানিতে তাদের নেতাকর্মীদের ওপর ‘হামলা’ চালিয়েছে। অন্যদিকে পুলিশ বলেছে, নির্বাচন সামনে রেখে ‘ইস্যু তৈরির লক্ষ্যে’ বিনা উসকানিতে বিএনপি কর্মীরা এ ঘটনা ঘটিয়েছে।

সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বলেছেন, ‘নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্র’ হিসেবে পরিকল্পিতভাবে নয়াপল্টনের ঘটনা ঘটানো হয়েছে বলে মনে করছেন তারা। সরকার ভিডিও দেখে হামলাকারীদের বিচারের মুখোমুখি করবে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপির মনোনয়ন ফরম বিক্রিকে কেন্দ্র করে গত দুই দিনের মত বুধবারও নয়া পল্টনের সড়কে ছিল মনোনয়নপ্রত্যাশীদের কর্মী সমর্থকদের ভিড়। পুলিশ সদস্যরা তাদের সরিয়ে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছিলেন।

এর মধ্যে বেলা পৌনে ১টার দিকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের কর্মসমর্থকরা বড় একটি মিছিল নিয়ে ফকিরাপুলের দিক থেকে বিএনপি কার্যালয়ের দিকে আসেন। তার পেছনেই ছিল দক্ষিণ বিএনপির সহসভাপতি নবীউল্লাহ নবীর সমর্থকদের আরেকটি মিছিল।

বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মীর মিছিলের কারণে বিএনপি কার্যালয়ের সামনের সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পুলিশ তাদের রাস্তা বন্ধ করে মিছিল নিয়ে যেতে নিষেধ করলে উত্তেজনার মধ্যে শুরু হয় বাকবিতণ্ডা। পরে তা সংঘর্ষের রূপ নেয়।

বিএনপি কর্মীরা পুলিশের দিকে ঢিল ছুড়তে শুরু করলে পুলিশ টিয়ার শেল ও রাবার বুলেট ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করে। ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার মধ্যে চলে লাঠিপেটা।

এক পর্যায়ে পুলিশ কিছুটা সরে গিয়ে নাইটিঙ্গেল মোড়ে অবস্থান নেয়। বিএনপি কর্মীরা তখন নয়া পল্টনের সড়কে থাকা বেশ কিছু গাড়ি ভাঙচুর করে। পুলিশের দুটি গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।

সংঘর্ষের মধ্যে বিএনপি অফিসের সামনে থাকা অনেকে আশ্রয়ের আশায় কার্যালয়ের ভিতরে ঢুকে যান। বিএনপি অফিসের সবগুলো ফটক বন্ধ করে দেওয়া হয়।

পল্টন থানার ওসি মাহমুদ হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “পার্টি অফিসের সামনে আসা নেতাকর্মীরা সড়কে বিশৃঙ্খলভাবে অবস্থান করছিল। পুলিশ তাদের সুশৃঙ্খলভাবে থাকতে অনুরোধ করেছিল। কিন্তু তারা বিনা উসকানিতে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়।”

বেলা দেড়টার দিকে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা এসে গাড়িতে দেওয়া আগুন নেভাতে কাজ শুরু করেন। বিএনপিকর্মীরা রাস্তা আটকে রাখায় ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে বেগ পেতে হয় বলে অগ্নি নির্বাপক বাহিনীর কর্মীরা জানান।

ঘণ্টাব্যাপী এ সংঘর্ষে ঢাকা মহানগর পুলিশের মতিঝিল বিভাগের উপকমিশনার মো. আনোয়ার হোসেনসহ ১৩ পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন বলে এ বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। অন্যদিকে বিএনপি নেতারা তাদের ২১ আহত কর্মীর নাম গণমাধ্যমকে বলেছেন।

সংঘর্ষের সময় কাকরাইলের নাইটিঙ্গেল মোড় থেকে ফকিরাপুলের দিকে রাস্তার উভয় পাশে যান চলাচল বন্ধ থাকে। পরে বিকাল সোয়া ৩টার পর থেকে যান চলাচল স্বাভাবিক হতে শুরু করে।

বিএনপির সহ দপ্তর সম্পাদক তাইফুল ইসলাম টিপু জানান, সংঘর্ষের কারণে দুপুরে ঘণ্টাখানেক মনোনয়ন ফরম বিক্রি ও জমার কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও বেলা ২টার পর আবার তা শুরু হয়।

পাল্টাপাল্টি দোষারোপ

সংঘর্ষ থামার পর বিএনপি কার্যালয় থেকে নেমে এসে বিক্ষুব্ধ নেতা-কর্মীদের শান্ত থাকার আহ্বান জানান দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। এ সময় তিনি অভিযোগের আঙুল তোলেন সরকারের দিকে।

তিনি বলেন, “আমি মনে করি, এই আক্রমণ সরকারের নির্দেশেই হয়েছে, সরকার প্রধানের নির্দেশে হয়েছে। এই আক্রমণের বিনিময়ে আমরা শান্তি নষ্ট করব না। আমি বিনা উসকানিতে পুলিশের এই আক্রমণের তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি, আমি প্রতিবাদ জানাচ্ছি, ধিক্কার জানাচ্ছি।”

নেতাকর্মীদের উদ্দেশে রিজভী বলেন, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডন থেকে তাদের শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।

“কেউ কোনো ফাঁদে পা দেবেন না। যতই উসকানি দিক সরকারের লোকেরা, পা দেবেন না। ফুটপাতে অবস্থান করে আপনারা আমাদের মনোনয়ন ফরম বিক্রি এবং জমা নেওয়ার কার্য্ক্রমে সহযোগিতা করুন। হিমালয় পর্বতের মত আপনারা এখানে অবস্থান করবেন।”

আর পুলিশের উদ্দেশে রিজভী বলেন, “আপনারা আজ যা করলেন, আপনারা মৌচাকে ঢিল মেরেছেন কেন? আপনারা মনে করেন গুলির ভয়ে জাতীয়বাদী শক্তি মাটির নিচে ঢুকে যাবে? ঢুকে যাবে না। … লাঠিচার্জ করে, টিয়ারগ্যাস মেরে দমন করতে পারবেন না।”

অন্যদিকে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলাম ঘটনাস্থলে এসে সাংবাদিকদের বলেন, “বিনা উসকানিতে ইস্যু তৈরি করার জন্য এটা করেছে ওরা।”

নির্বাচনের মনোনয়নপত্র সংগ্রহের সময় শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পুলিশের পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হলেও বিএনপি নেতাকর্মীরা তা মানেনি বলে অভিযোগ করেন তিনি।

মনিরুল বলেন, “দুজন রাজনৈতিক প্রার্থীর মনোনয়নপত্র সংগ্রহের সময় হাজার হাজার নেতাকর্মী পার্টি অফিসের সামনে আসে। এ সময় রাস্তা বন্ধ হয়ে হয়ে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়।”

কাছাকাছি সময়ে ধানমণ্ডিতে আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর রাজনৈতিক কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসে ক্ষমতাসীন দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, নির্বাচন ‘বানচালের ষড়যন্ত্র’ থেকে বিএনপি এই হামলায় ‘উসকানি’ দিয়েছে।

“এ উসকানি কারা দিল? তাহলে কি নির্বাচন পেছানোর জন্য? তারা পরিকল্পিতভাবে নয়াপল্টনে পুলিশের উপর হামলা চালিয়ে নিজেদের বীরত্ব জাহির করল। নির্বাচন বানচালের যে ষড়যন্ত্রের আশঙ্কা আমরা করেছিলাম, সেই ষড়যন্ত্রই কি তারা শুরু করে দিল?”

পরে সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালের কণ্ঠেও একই সুর পাওয়া যায়।

তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “আমরা মনে করি এটা পরিকল্পিতভাবে হয়েছে। আমরা মনে করি, দেশ যখন সুন্দর একটা নির্বাচনের দিকে যাচ্ছে, নির্বাচন কমিশন যখন তফসিল ঘোষণা করেছে, দেশের মানুষ যখন একটা সুষ্ঠু নির্বাচনের অপেক্ষায় রয়েছে, সেই সময় আমরা মনে করি, পরিকল্পিতভাবে এ ঘটনা ঘটানো হয়েছে।”

অন্যদিকে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম নির্বাচন পেছানোর দাবি নিয়ে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের বৈঠকের আগে সাংবাদিকদের বলেন, “দুর্ভাগ্যজনকভাবে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী বিএনপি নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালিয়েছে। আমরা এর তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি। এ ধরনের পরিস্থিতি করে সরকার নির্বাচনী পরিবেশ নষ্ট করছে।”