রোহিঙ্গা নারী যখন ‘হয়রানি মামলার হাতিয়ার’

অনলাইন ডেস্কঃ
চট্টগ্রামের ডবলমুরিং থানায় এসে গত মে মাসে ২৮ বছর বয়সী এক তরুণী দুই ব্যক্তির বিরুদ্ধে ধর্ষণের মামলা করেন। স্থানীয় এক ব্যবসায়ীসহ দুইজনকে ওই মামলা আসামি করা হয়।

কিন্তু পুলিশ তদন্তে নেমে জানতে পারে, ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বের জেরে একজনকে ফাঁসানোর জন্য মিথ্যা অভিযোগে ওই মামলা করা হয়েছে। আর এ কাজে ব্যবহার করা হয়েছে ওই তরুণীকে।

মামলায় তার নাম শরীফা বেগম বলা হলেও তদন্তে জানা যায়, ওই তরুণীর আসল নাম সুফিয়া বেগম। তিনি মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা একজন রোহিঙ্গা।

এর আগে বাংলাদেশি এক ব্যক্তিকে বিয়ে করে পরে তার বিরুদ্ধেও মামলা করেন সুফিয়া ওরফে শরীফা। কিন্তু পুলিশের তদন্তে বেরিয়ে আসে, টাকার লোভে একটি চক্রের প্ররোচনায় তিনি ওই মামলা করেছেন।

ডবলমুরিং থানার ওসি এ কে এম মহিউদ্দিন সেলিম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “চট্টগ্রামে একটি সংঘবদ্ধ চক্র নারীদের ব্যবহার করে বিভিন্ন ব্যক্তিকে ফাঁসানোর জন্য মামলা মোকদ্দমা করছে। ওই চক্রটি ইদানিং টাকার বিনিময়ে রোহিঙ্গা তরুণীদের ব্যবহার করছে হয়রানিমূলক মামলা করার জন্য।”

আর এ ধরনের মিথ্যা মামলা করার আগে তারা চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টার থেকে (ওসিসি) প্রতিবেদনও সংগ্রহ করে আনছে বলে জানান ওসি।

তিনি বলেন, “শরীফা বেগম এবং যাকে সঙ্গে নিয়ে তিনি মামলা করতে এসেছিলেন, তাদের কথাবার্তায় আমাদের সন্দেহ হয়। পরে জিজ্ঞাসাবাদে শরীফা তার আসল পরিচয় স্বীকার করে। জানায়, সে রোহিঙ্গা।”

সেই রোহিঙ্গা নারী পরে আদালাতে ১৬১ ধারায় জবানবন্দি দেন। আর পুলিশ অভিযোগটি ‘মিথ্যা’ জানিয়ে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়।

মামলার এজাহারে বলা হয়েছিল, গত ১৪ মে ডবলমুরিং থানার দেওয়ানহাট লেভেল ক্রসিংয়ের পশ্চিম পাশে এক জায়গায় শরীফাকে দুই ব্যক্তি ‘ধর্ষণ’ করে। পরে রাস্তার লোকদের সহায়তায় তিনি তার মামার সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং চট্টগ্রাম মেডিকেলের ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে গিয়ে চিকিৎসা নেন।

কর্ণফুলী উপজেলার চর পাথরঘাটার বাসিন্দা নুরুছফা ফেরদৌস ও তার সহযোগী মো. বোরহানকে আসামি করা হয় ওই মামলায়।

এজাহারে বলা হয়, শরীফা চট্টগ্রামে একটি পোশাক কারখানায় কাজ করেন। তার স্বামী মালয়েশিয়ায় যাওয়ার কথা বলে ১০ বছর ধরে ‘নিরুদ্দেশ’। নুরুছফা ইট বালুর ব্যবসার পাশাপাশি বিদেশে লোক পাঠানোর কাজ করনে। সেই সূত্রে তার সঙ্গে শরীফার পরিচয় বলে দাবি করা হয় মামলায়।

সেখানে বলা হয়, সাগরপথে বিদেশ যাওয়ার জন্য নুরুছফাকে ৪০ হাজার টাকা দেন শরীফা। বিদেশ পাঠানোর কথা বলে ১৪ মে তাকে দেওয়ানহাট এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। লেভেল ক্রসিংয়ের পশ্চিম পাশে নিয়ে তাকে ‘ধর্ষণ’ করেন নুরুছফা ও বোরহান।

এ মামলা তদন্ত কর্মকর্তা ডবলমুরিং থানার পরিদর্শক (তদন্ত) জহির হোসেন বলেন, তদন্ত শুরু করার পর তারা জানতে পারেন, শাহ আমানত সেতু এলাকায় ‘খাজা এন্টারপ্রাইজ’ নামের বালু ও ইট বিক্রির দোকানের মালিকানা নিয়ে হামিদ নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে নুরুছফার বিরোধ চলছিল। এর জের ধরে হামিদ ওই চক্রের সহায়তা নেন। তারাই ওই তরুণীকে দিয়ে মামলাটি করায়।

মামলার এজাহারে বাদীর নাম শরীফা বেগম এবং বাবা মৃত লাল মোহাম্মদ লেখা ছিল, বাড়ির ঠিকানা ছিল টেকনাফের ডেইল পাড়ার চকবাজার এলাকায়। কিন্তু তদন্তে জানা যায়, শরীফার আসল নাম সুফিয়া বেগম। বাবার নাম নূর মোহাম্মদ। কক্সবাজারের কুতুপালং ৪ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মাকে নিয়ে থাকেন সুফিয়া।

পরিদর্শক জহির বলেন, সুফিয়া বছর দশেক আগে মিয়ানমার থেকে টেকনাফে আসেন। সেখানে কিছুদিন তিনি লাল মোহাম্মদ নামে এক ব্যক্তির বাসায় ছিলেন। ওই ব্যক্তির নামই তিনি বাবার নাম হিসেবে মামলায় ব্যবহার করেন। এজাহারে লাল মোহাম্মদকে মৃত বলা হলেও তিনি এখনও জীবিত আছেন।

গত ২০ মে চট্টগ্রামের নির্বাহী হাকিম মেহনাজ রহমানের আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে ওই তরুণী বলেন, বাংলাদেশে এসে কিছুদিন টেকনাফে থাকার পর তিনি চট্টগ্রামে চলে আসেন। বাকলিয়ার নোমান কলেজ এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতে শুরু করেন। তখনই ইসমাইল ভাণ্ডারি নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে তার পরিচয় হয়।

সুফিয়া ওরফে শরীফা পরে তুলাতলি এলাকায় গিয়ে একটি পোশাক কারখানায় কিছুদিন চাকরি করেন। সেখানে গিয়াস উদ্দিন নামে এক ব্যক্তিকে বিয়ে করেন। কিছুদিন পর ইসমাইলের পরামর্শে রাঙ্গুনিয়া থানায় গিয়ে গিয়াসের বিরুদ্ধে নারী নির্যাতন আইনে মামলা করেন। শিকলবাহা এলাকার সুমন নামে আরেক ব্যক্তির বিরুদ্ধেও ধর্ষণের মামলা করার কথা তিনি জবানবন্দিতে বলেন।

জবানবন্দির বরাত দিয়ে পুলিশ কর্মকর্তা জহির বলেন, ইমসাইল ভাণ্ডারির মাধ্যমে চট্টগ্রামের রাহাত্তার পুল এলাকার বাসিন্দা হামিদের সঙ্গে সুফিয়ার পরিচয় হয়। হামিদের সঙ্গে নুরুছফার ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব থাকায় ইসমাইল ও তার সহযোগীদের পরামর্শে নুরুছফা ও তার সহযোগী বোরহানের বিরুদ্ধে ওই মামলা করেন ওই রোহিঙ্গা তরুণী।

সুফিয়া ওরফে শরীফা তার জবানবন্দিতে বলেন, হামিদের সঙ্গে পরিচয়ের কিছুদিন পর টেকনাফের কুতুপালংয়ে ফিরে গিয়েছিলেন তিনি। মে মাসের ঘটনার কিছুদিন আগে বিকাশের মাধ্যমে এক হাজার টাকা পাঠিয়ে তাকে চট্টগ্রামে আনা হয়। রাহাত্তার পুল এলাকায় হামিদের বাসার সপ্তাহ খানেক রেখে তাকে সবকিছু শিখিয়ে দেন হামিদ, ইসমাইল ভাণ্ডারি ও তার সহযোগীরা।

আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে বলা হয়, ১৪ মে বিকালে সুফিয়াকে টাইগার পাস মোড়ে নিয়ে যান ইসমাইল, হামিদসহ কয়েকজন। সন্ধ্যার দিকে তাকে দেওয়ানহাট লেভেল ক্রসিং এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে এ ব্যক্তির সঙ্গে তার ‘শারীরিক সম্পর্ক’ হয়। পরে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় চট্টগ্রাম মেডিকেলে। এর মধ্যে সুফিয়া ওরফে শরীফা তার মামা ‘কাশেমকে’ ফোন করেন। চট্টগ্রাম মেডিকেলের ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে ভর্তি হয়ে প্রতিবেদন নিয়ে পরদিন ডবলমুরিং থানায় গিয়ে তিনি মামলা করেন।

তদন্ত কর্মকর্তা জহির বলেন, “যে লোকটিকে নিয়ে শরীফা মামলা করতে এসেছিল, তাকে সে তারা মামা কাশেম বলে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল।কিন্তু পরে জিজ্ঞসাবাদে মেয়েটি আসল ঘটনা প্রকাশ করে দিলে কাশেম লাপাত্তা হয়ে যায়।

“শরীফার বক্তব্যের সূত্র ধরে তদন্তে বেরিয়ে আসে, ওই ব্যক্তির আসল নাম সরোয়ার। তার সাথেই মূলত শরীফার শারীরিক সম্পর্ক হয়েছিল।”

জহির বলেন, “তদন্তে মামলাটি মিথ্যা প্রমাণিত হওয়ায় আমরা গত ২৩ অক্টোবর আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছি। সুফিয়া ওরফে শরীফাকে রাখা হয়েছে সেইফ হোমে। সরোয়ারকেও আমরা খুঁজছি।”

তদন্তের বরাত দিয়ে এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ইসমাইল ও সরোয়ার একটি দালাল চক্রের সদস্য। তাদের সঙ্গে আরও কয়েকজন আছে। টাকার বিনিময়ে নারীদের দিয়ে আদালতে ‘ভুয়া নারী নির্যাতন মামলা’ করিয়ে হয়রানি করে এই চক্রটি।

চট্টগ্রাম আদালতের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইবুন্যালের পিপি এম এ নাসের বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে কোনো মামলা মিথ্যা প্রমাণিত হলে বাদী ও সাক্ষীকে বিচারের মুখোমুখি করার সুযোগ আছে। কিন্তু সেক্ষেত্রে সাক্ষী ও বাদীর ঠিকানা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

“রোহিঙ্গাদের যেহেতু কোন স্থায়ী ঠিকানা নেই, তাই তাদের বাদী করে অসহয় মানুষকে মিথ্যা মামলায় হয়রানি করলে ঝুঁকি কমে যায়।”