মুশফিকের কীর্তিতে উদ্ভাসিত বাংলাদেশ

ক্রীড়া ডেস্কঃ
রানের জন্য দীর্ঘ হাহাকারের পর যেন রানের জোয়ার। একের পর এক ম্যাচে দুইশর নিচে গুটিয়ে যাওয়ার পর একজনের ব্যাটেই দুইশ। সর্বনিম্ন দলীয় ইনিংসের মুখ লুকানোর দিনগুলির পর এল ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ ইনিংসের বিস্ময়। রেকর্ডে উদ্ভাসিত মুশফিকুর রহিম গড়লেন ইতিহাস। ব্যাটিং ব্যর্থতার আঁধার ফুঁড়ে হাসল বাংলাদেশ।

প্রথম দিন শেষে যা ছিল সম্ভাবনা, দ্বিতীয় দিনে তার প্রায় সবই পেয়েছে পূর্ণতা। ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় ডাবল সেঞ্চুরি মুশফিক রাঙিয়েছেন রেকর্ডে। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে মিরপুর টেস্টে বাংলাদেশ প্রথম ইনিংস ঘোষণা করেছে ৭ উইকেটে ৫২২ রানে। সোমবার ম্যাচের দ্বিতীয় দিনটি জিম্বাবুয়ে শেষ করেছে ১ উইকেটে ২৫ রান তুলে।

প্রথম দিন প্রথম ঘণ্টায় উইকেটে গিয়ে মুশফিক দ্বিতীয় দিন শেষ সেশনে ইনিংস ঘোষণার সময়ও ছিলেন অপরাজিত। ৫৮৯ মিনিট উইকেটে কাটিয়ে ৪২১ বলে খেলা ২১৯ রানের ইনিংসটায় ছুঁয়ে গেছেন রেকর্ড বইয়ের অনেক পাতা।

রান, বল ও সময়, সব দিক থেকেই এই ইনিংসে ছুঁয়েছেন বাংলাদেশ ক্রিকেটে নতুন উচ্চতা। টেস্টে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত রানের রেকর্ড এটি। বল আর সময়ের হিসেবে দীর্ঘতম ইনিংসও।

আরেকটি রেকর্ডে মুশফিক ছাড়িয়ে গেছেন বাংলাদেশের সীমানা। নিজেদের ইনিংস শেষে ব্যাটিং গ্লাভস রেখে কিপিং গ্লাভস হাতে আবার মাঠে নেমে গেছেন মুশফিক। তখনই নাম খোদাই হয়ে গেছে বিশ্বরেকর্ডে। কিপার ব্যাটসম্যান হিসেবে দুটি ডাবল সেঞ্চুরি করা ইতিহাসের প্রথম ক্রিকেটার মুশফিক।

কীর্তিতে ঠাসা এমন দিনে মাহমুদউল্লাহ হতাশ করেছেন আবারও। নিজের মৃতপ্রায় টেস্ট ক্যারিয়ারে নতুন দম দেওয়ার সুবর্ণ সুযোগ ছিল বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত অধিনায়কের। বাজে শটে নিজের পায়ে কুড়াল মেরেছেন নিজেই।

অথচ সবচেয়ে কঠিন অংশটুকু পার করে ফেলেছিলেন মাহমুদউল্লাহ। দিনের শুরুতে যথারীতি উইকেটে ছিল খানিকটা আর্দ্রতা। বল তখনও নতুন। মাহমুদউল্লাহ-মুশফিক, দুজনই ভীষণ সাবধানী ব্যাটিংয়ে কাটিয়ে দেন বিপজ্জনক সময়টুকু। প্রথম ঘণ্টায় ১৪ ওভারে আসে ২২ রান, মুশফিক করেছিলেন ৩৬ বলে ৪।

এরপর ক্রমেই জিম্বাবুয়ের বোলিং হতে থাকে নিষ্ক্রিয়, বাড়তে থাকে দুজনের ব্যাটের ধার। কিন্ত নিজেকে ফিরে পাওয়ার সব আয়োজনে জল ঢেলে দিয়েছেন নিজেই। ৩৬ রানে কাইল জার্ভিসের অনেক বাইরের বলে যেভাবে খোঁচা দিলেন, সেটির পেছনে একটি যুক্তিও পাওয়া মুশকিল।

সিলেটে অভিষেক টেস্টে যে আশা জাগানিয়া বার্তা দিয়েছিলেন আরিফুল হক, এখানে ধরে রাখতে পারেননি সেই ধারাবাহিকতা। বাইরের বল গ্লাইড করতে গিয়ে ক্যাচ দিয়েছেন পয়েন্টে। জার্ভিস পেয়েছেন টেস্টে তৃতীয়বার ৫ উইকেটের দেখা।

কিন্তু জিম্বাবুয়ের অন্য কোনো বোলার প্রভাব ফেলতে পারেননি খুব বেশি। দিনের শুরুতে পায়ে টান লেগে টেন্ডাই চাটারা মাঠ ছেড়েছেন স্ট্রেচারে করে, সেটিও ভুগিয়েছে জিম্বাবুয়েকে। মুশফিক ফায়দা নিয়েছেন পুরোপুরি। অষ্টম উইকেটে দারুণ সঙ্গ দিয়েছেন মেহেদী হাসান মিরাজ।

দিনের প্রথম বাউন্ডারির আগে ৫৫ বলে কেবল ৮ রান করেছিলেন মুশফিক। সেই অধ্যাবসায়কে বৃথা যেতে দেননি পরে। কঠিন মনোযোগ আর প্রায় নিখুঁত ব্যাটিংয়ে এগিয়ে গেছেন, নিজের প্রিয় কিছু শট খেলা থেকে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করেও রান বাড়িয়েছেন দারুণ সব ক্রিকেট শটে।

ডাবল সেঞ্চুরি ছুঁয়েছেন ৪০৭ বলে। বাংলাদেশের প্রথম ব্যাটসম্যান হিসেবে করলেন একাধিক দ্বিশতক। আরেকপাশে মিরাজও রান তুলেছেন সময়ের দাবি মিটিয়ে। দুজনের ১৪৪ রানের অবিচ্ছিন্ন জুটি অষ্টম উইকেটে বাংলাদেশের রেকর্ড।

ইনিংস ঘোষণার সময় ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় ফিফটি করা মিরাজ অপরাজিত ছিলেন ৬৮ রানে। মুশফিকের ২১৯ রানের ইনিংসে চার ছিল ১৮টি, একটি কেবল ছক্কা। সিঙ্গেল নিয়েছেন ৯৯টি!

উইকেটের দুই পাশে খেলেছেন সমান তালে। ৫১ শতাংশ রান করেছেন অফ সাইডে, লেগ সাইডে ৪৯। শতকরা ৮৯ শতাংশ শটই খেলেছেন নিয়ন্ত্রণে, এটিই বলে দিচ্ছে প্রায় ১০ ঘণ্টার ইনিংসজুড়ে মনোসংযোগ ছিল কতটা তীব্র।

ইনিংস ঘোষণার পর ম্যারাথন ব্যাটিং শেষে মুশফিক আবার নেমে যান কিপিংয়ে। হ্যামিল্টন মাসাকাদজাকে ফিরিয়ে দাপুটে দিনটি বাংলাদেশ শেষ করে কাঙ্ক্ষিত ব্রেক থ্রু পাওয়ার স্বস্তিতে।

সংক্ষিপ্ত স্কোর:

বাংলাদেশ ১ম ইনিংস: ১৬০ ওভারে ৫২২/৭ (ইনিংস ঘোষণা)(আগের দিন ৩০৩/৫)(মুশফিক ২১৯*, মাহমুদউল্লাহ ৩৬, আরিফুল ৪, মিরাজ ৬৮*; জার্ভিস ২৮-৬-৭১-৫, চাটারা ২২.২-১২-৩৪-১, টিরিপানো ২৪.৪-৬-৬৫-১, রাজা ২২-১-১১১-০, উইলিয়ামস ৩০-৪-৮০-০, মাভুটা ৩১-১-১৩৭-০, মাসাকাদজা ২-০-৭-০)।

জিম্বাবুয়ে ১ম ইনিংস: ১৮ ওভারে ২৫/১ (মাসাকাদজা ১৪, চারি ১০*, টিরিপানো ০*; মুস্তাফিজ ৬-৪-১১-০, খালেদ ৫-৩-৬-০, তাইজুল ৫-৩-৫-১, মিরাজ ২-১-২-০)।