রামুর রশিদনগরে জমে উঠেছে ত্রিমুখি লড়াই

সোয়েব সাঈদ:
রামু উপজেলার রশিদনগর ইউনিয়ন। তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের কেন্দ্রিয় শ্রম মন্ত্রী মরহুম মৌলভী ফরিদ আহমদের পৈত্রিক নিবাস এ ইউনিয়নের মাছুয়াখালী সিকদারপাড়া গ্রামে। ১৯৯৮ সালে বৃহত্তর জোয়ারিয়ানালা ইউনিয়নকে বিভক্ত করে গঠন করা হয় রশিদনগর ইউনিয়ন পরিষদ।

মৌলভী ফরিদ আহমদের ছোট ভাই রশিদ আহমদের নামানুসারে এ ইউনিয়নের নামকরণ করা হয়। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের দুপাশের সমতল ও পাহাড় নিয়ে মনোমুগ্ধকর জনপদ রশিদনগর। ১৯৯৮ সালে ইউনিয়ন পরিষদ গঠনের পর এ ইউনিয়নে তিনজন চেয়ারম্যান দায়িত্ব পালন করেছেন। এরা হলেন, মরহুম নজিবুল আলম চৌধুরী, মরহুম মৌলানা জাফর আলম ও বর্তমান চেয়ারম্যান আবদুল করিম।

আগামী ২৮ মে অনুষ্ঠিতব্য রশিদনগর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চতুর্থবারের মতো চেয়ারম্যান নির্বাচিত হবেন। কাংখিত এ নির্বাচনকে ঘিরে পুরো ইউনিয়ন এখন উৎসব মুখর। হাট-বাজার, পাড়া-মহল্লা, সড়কের অলি-গলি সর্বত্র শোভা পাচ্ছে পোষ্টার। দুপুর গড়াতেই শুরু হচ্ছে মাইকের প্রচারনা আর পথ সভা। চলছে রাত পর্যন্ত। ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলছে প্রার্থীদের গণসংযোগ।

ভোটারদের দেয়া তথ্যানুসারে এবারের নির্বাচনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী ৫বার নির্বাচিত ইউপি সদস্য সিরাজুল ইসলামের সাথে প্রতিদ্বন্ধিতা হবে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী বজল আহমদ বাবুল ও আওয়ামীলীগের বিদ্রোহী প্রার্থী এমডি শাহ আলমের মধ্যে।

নানা কারণে সমালোচনায় থাকা বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী বর্তমান চেয়ারম্যান আবদুল করিম এ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্ধিতা করলেও ভোটের মাঠে নিস্ক্রিয় রয়েছেন। এমনকি এ প্রার্থী এলাকায় তেমন প্রচারনা আর গণসংযোগও করছেন না বলে জানা গেছে।

রশিদনগর ইউপি নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে ৪ জন প্রার্থী রয়েছেন। এরা হলেন, আওয়ামীলীগ মনোনীত প্রার্থী রশিদনগর ইউনিয়ন আওয়ামীলীগ সভাপতি বজল আহমদ বাবুল (নৌকা), স্বতন্ত্র প্রার্থী সিরাজুল ইসলাম (ঘোড়া), স্বতন্ত্র প্রার্থী এমডি শাহ আলম (আনারস) ও বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আবদুল করিম (ধানের শীষ)।

বিগত ২০১১ সালে অনুষ্ঠিত রশিদনগর ইউপি নির্বাচনে ১ হাজার ৬৬৮ ভোট পেয়ে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন আবদুল করিম। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্ধী শাহ আলম পেয়েছিলেন ১ হাজার ৪৩৫ ভোট।

রামু উপজেলা নির্বাচন অফিসের তথ্যমতে, বর্তমানে রশিদনগর ইউনিয়নের ভোটার সংখ্যা ৯ হাজার ৭২৯ জন। এরমধ্যে ৪ হাজার ৯০৯ জন পুরুষ এবং ৪ হাজার ৮২০ জন মহিলা ভোটার রয়েছেন।

সম্প্রতি রশিদনগর ইউনিয়নের প্রত্যন্ত এলাকাগুলোতে সরেজমিন গিয়ে ভোটারদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, চেয়ারম্যান পদে ৪ জন প্রার্থী থাকলেও প্রতিদ্বন্ধিতা হবে আওয়ামীলীগ মনোনীত প্রার্থী রশিদনগর ইউনিয়ন আওয়ামীলীগ সভাপতি বজল আহমদ বাবুল (নৌকা), স্বতন্ত্র প্রার্থী সিরাজুল ইসলাম (ঘোড়া) এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী এমডি শাহ আলমের (আনারস) মধ্যে।

স্বতন্ত্র প্রার্থী এমডি শাহ আলম জানিয়েছেন, বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী আবদুল করিম বিগত সময়ে চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে নানা বিতর্কিত কর্মকান্ডের কারণে এবার নির্বাচনী মাঠে আলোচনায় নেই। নির্বাচনের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে ততই এ প্রার্থীর জনপ্রিয়তা কমে যাচ্ছে। এমনকি তিনি গণসংযোগ ও প্রচারনাও তেমন করছেন না।

আওয়ামীলীগ মনোনীত নৌকা প্রতীকের প্রার্থী রশিদনগর ইউনিয়ন আওয়ামীলীগ সভাপতি বজল আহমদ বাবুল নির্বাচনে নিজের জয় সুনিশ্চিত বলে জানিয়েছেন। তিনি জানান, প্রতিদ্বন্ধি স্বতন্ত্র প্রার্থী এমডি শাহ আলম নিজেকে আওয়ামীলীগের বিদ্রোহী বলে প্রচারনা চালাচ্ছেন এবং এমনকি তাঁর (বজল আহমদ) নেতাকর্মীদের হুমকী-ধমকিও দিচ্ছেন। অথচ শাহ আলম বিএনপি-জামায়াতের এজেন্ট। ২০০৮ সালের সংসদ নির্বাচনে তিনি বর্তমান সাংসদ কমলের বিরুদ্ধে ধানের শীষের পক্ষে প্রচারনা চালিয়েছিলেন। তিনি (শাহ আলম) কখনো আওয়ামীলীগ করেননি।

বজল আহমদ বাবুল আরো অভিযোগ করেন, এ নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী আবদুল করিম কালো টাকায় ভোট কিনে নির্বাচনে জয়ের জন্য উঠেপড়ে লেগেছেন। অথচ তিনি (আবদুল করিম) চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে এলাকায় কোন সুষ্ঠু বিচার হয়নি। আইনশৃংখলা পরিস্থিতিও ভালো থাকতো না। নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে এলাকা ছেড়ে তিনি কক্সবাজারে বসবাস করে আসছেন। যে কারনে মানুষের দূর্ভোগ লেগে থাকতো।

বজল আহমদ আরো বলেন, তিনি নির্বাচিত হলে পুরো ইউনিয়নে বিদ্যুতায়ন, যোগাযোগ ও শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন, সন্ত্রাস দমন, জলাবদ্ধতা নিরসন, মাদকমুক্ত ইউনিয়ন গড়ার জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাবেন।

স্বতন্ত্র প্রার্থী সিরাজুল ইসলাম ঘোড়া প্রতীকে চেয়ারম্যান পদে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। তিনি বৃহত্তর জোয়ারিয়ানালা ইউনিয়ন পরিষদে ২ বার এবং রশিদনগর ইউনিয়ন পরিষদে ৩ বার মেম্বার নির্বাচিত হন। স্থানীয়ভাবে জনপ্রিয় এ ব্যক্তি এবার চেয়ারম্যান পদে জয়ের শতভাগ আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। সিরাজুল ইসলাম (ঘোড়া) জানিয়েছেন, এলাকার ভালোমন্দ আর জনগণের সুবিধা-অসুবিধা সবই তাঁর জানা রয়েছে। তাই নির্বাচিত হলে মানুষের চাওয়া-পাওয়াকে গুরুত্ব দেয়ার পাশাপাশি অবহেলিত এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ চালু, শিক্ষার হার বৃদ্ধি, আইনশৃংখলার উন্নতির জন্য কাজ করে যাবেন।

তিনি নির্বাচনে ৩, ৫, ৬, ৭ ও ৮ নং কেন্দ্রকে ঝূঁকিপূর্ণ বলে উল্লেখ করে এসব কেন্দ্রে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য প্রশাসনের প্রতি আহবান জানিয়েছেন।

বিগত ইউপি নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্ধিতা করে অল্প ভোটের ব্যবধানে হেরে গেলেও এবার জয় সুনিশ্চিত বলে জানিয়েছেন, স্বতন্ত্র প্রার্থী এমডি শাহ আলম (আনারস)। তিনি জানিয়েছেন, তাঁর জয় নিশ্চিত জেনে সরকার দলীয় ও বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করেছে। তিনি বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী বর্তমান চেয়ারম্যান আবদুল করিমের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বলেন, তিনি এখন ইউনিয়ন পরিষদে বসে দলীয় নেতাকর্মীদের সাথে সভা করে নির্বাচনী কার্যক্রম চালাচ্ছেন। এমনকি স্থানীয় গরিব লোকজনকে ইউনিয়ন পরিষদে ডেকে নিয়ে জাতীয় পরিচয়পত্র রেখে নগদ অর্থ দিয়ে ভোট দেয়ার অঙ্গীকার নিচ্ছে। বিষয়টি তিনি উপজেলা প্রশাসনের সভায় উল্লেখ করেছেন বলে জানান।

বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী আবদুল করিম জানান, তিনি দায়িত্ব পালনকালে এলাকায় অনেক উন্নয়ন কর্মকান্ড করেছেন। এর ধারবাহিকতা ধরে রাখতে তিনি আবারো তাকে ধানের শীষ প্রতীকে ভোট দেয়ার জন্য ইউনিয়নবাসীর প্রতি অনুরোধ করেছেন।

রশিদনগর ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক সায়েম মো. শাহীন জানিয়েছেন, বিগত ৫ বছরে রশিদনগর ইউনিয়নে উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি। তাই এখন ইউনিয়নজুড়ে শেখ হাসিনার মনোনীত প্রার্থী বজল আহমদ বাবুলের পক্ষে গণজোয়ার শুরু হয়েছে। কয়েকজন বিতর্কিত নেতাকর্মী ছাড়া সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে নৌকা প্রতীকের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন।

রশিদনগর ইউনিয়নের ৭ নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা নুরুল আমিন ও সার ব্যবসায়ি মো. জাফর আলম জানিয়েছেন, বর্তমান চেয়ারম্যান এলাকার লোকজনকে অনেক হয়রানি করেছেন। এমনকি এলাকার কেউ প্রয়োজনে ইউনিয়ন পরিষদে গেলেই বলতেন ‘আমি তোমাকে চিনিনা’। যা ছিলো মানুষের জন্য দূর্ভাগ্যের। আবার বিগত নির্বাচনে প্রতিদ্বন্ধি প্রার্থীর পক্ষে কাজ করা লোকজনকেও হয়রানি করেছেন। তিনি কক্সবাজার থেকে সপ্তাহে ২/১দিন ইউনিয়ন পরিষদের আসলেও কখনো ইউনিয়নের প্রত্যন্ত এলাকায় যেতেন না। এ কারণে ইউনিয়নের মানুষ সরকারি সেবা ও ন্যায় বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছে। একারণে রশিদনগরবাসী এখন নতুন নেতৃত্ব হিসেবে এমডি শাহ আলমকে আনারস প্রতীকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করবে।

সংরক্ষিত আসন:
রশিদনগর ইউনিয়নে সংরক্ষিত আসনের সদস্য (নারী) প্রার্থীরা হলেন ওয়ার্ড নং ১ অনিমা শর্মা (বক), আনচার বেগম (তালগাছ), রাবেয়া খানম (মাইক) ও হাফেজা খাতুন (সূর্যমূখী)। ওয়ার্ড নং ২- গোলজার বেগম (সূর্যমূখী), মরিয়ম খাতুন (বক) ও সালমা বেগম (মাইক)। ওয়ার্ড নং ৩- গুন নাহার (সূর্যমূখী), ছেনুয়ারা বেগম (বই) ও নূর আয়েশা (মাইক)।

সাধারণ আসন:
সাধারণ আসনের সদস্য পদের প্রার্থীরা হলেন, ১ নং ওয়ার্র্ডে আলতাজুর রহমান (আপেল), নুরুল আলম সিকদার (মোরগ), মো. হারুনুর রশিদ (তালা) ও রমজান আলী (ফুটবল)। ২ নং ওয়ার্ডে ফরিদুল আলম পুতু (ফুটবল), মজিবুর রহমান (আপেল) ও মনছুর আলম (মোরগ)। ৩ নং ওয়ার্ডে আনোয়ার হোসেন (ফুটবল), আব্দু শুক্কুর (টিউবওয়েল), মোস্তাক আহমদ (মোরগ) ও মোহাম্মদ আলম (তালা)। ৪ নং ওয়ার্ডে আবদুল খালেক (মোরগ), নুরুল আবছার (আপেল), মঞ্জুর আলম (ফুটবল), মোঃ ইসহাক (টিউবওয়েল)। ৫ নং ওয়ার্ডে আবদুর রহমান (মোরগ), নূর আহমদ (ফুটবল) ও হুমায়ুন কবির (টিউবওয়েল)। ৬ নং ওয়ার্ডে আবুল শামা (ফুটবল), তোরাফ আলী (আপেল), মনজুর আলম (মোরগ), মোঃ আনোয়ার হোসেন (বৈদ্যুতিক পাখা), মোহাম্মদ গোলাম কাদের সিদ্দীকি (টিউবওয়েল) ও মো. আবুল কাসেম (তালা)। ৭ নং ওয়ার্ডে বজল আহম্মদ (মোরগ) ও হাবিব উল্লাহ (তালা)। ৮ নং ওয়ার্ডে নুরুল আবছার (টিউবওয়েল), নুরুল আলম (মোরগ), ফারুক আহমদ (আপেল), বদিউল আলম (ফুটবল) ও মিজানুর রহমান (তালা)। ৯ নং ওয়ার্ডে আবদুল করিম (মোরগ), ছৈয়দুল মোর সেলিন (তালা), মো. আয়াজ উদ্দিন (ফুটবল) ও লুতু মিয়া (আপেল)।

উল্লেখ্য, নির্বাচন কমিশন ঘোষিত তপশীল অনুযায়ি আগামী ২৮ মে রামু উপজেলার রশিদনগরসহ ৫টি ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

এছাড়া রামুর অপর ৬টি ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে আগামী ৪ জুন।