রামুর গর্জনিয়ায় বর্তমান ও সাবেক ৩ চেয়ারম্যানের মধ্যে জমজমাট লড়াই চলছে

সোয়েব সাঈদ:
মুঘল সম্রাট শাহজাহানের ছেলে বাংলার সুবেদার শাহ সুজার স্মৃতি বিজড়িত জনপদ রামুর গর্জনিয়া ইউনিয়ন। স্বীয় ভ্রাতাদের সাথে উত্তরাধিকার নিয়ে সৃষ্ট যুদ্ধে পরাজিত হয়ে সুবেদার শাহ সুজা ১৬৬০ সালের ৩ জুন গর্জনিয়া হয়ে এ সড়ক দিয়ে তৎকালীন আরকান রাজা সান্দা থু ধম্মা এর আশ্রয় লাভ করেন।

ঐতিহাসিকভাবে খ্যাতি থাকলেও বর্তমানে এ জনপদের সার্বিক পরিস্থিতি মোটেও সুখকর নয়। এর অন্যতম কারণ স্বাধীনতার ৪৫ বছর পেরিয়ে গেলেও এ ইউনিয়নে এখনো বিদ্যুৎ পৌঁছেনি।

বাঁকখালী নদীতে নির্মিত ১২০ মিটার দীর্ঘ সেতু নদী ভাঙ্গনের কারণে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। এতে পুরো ইউনিয়নবাসীর সাথে পার্শ্ববর্তী এলাকার যোগাযোগও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। অবহেলিত এ জনপদে রয়েছে সড়ক যোগাযোগ, শিক্ষা, চিকিৎসাসহ নানাক্ষেত্রে সমস্যার পাহাড়। এমন ক্রান্তিলগ্নেও আগামী ২৮মে অনুষ্ঠিতব্য গর্জনিয়া ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে ঘিরে এলাকাটিতে বিরাজ করছে উৎসব আমেজ।

গর্জনিয়ায় ইউপি নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে ৫জন প্রার্থী থাকলেও মূল প্রতিদ্বন্ধিতা চলছে বর্তমান ও সাবেক ৩ চেয়ারম্যানের মধ্যে। এরা হলেন, বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ মনোনীত প্রাথী বর্তমান চেয়ারম্যান তৈয়ব উল্লাহ চৌধুরী (নৌকা), বাংলাদেশ জাতীয়বাদীদল বিএনপি মনোনীত প্রার্থী সাবেক চেয়ারম্যান গোলাম মৌলা (ধানের শীষ) এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী সাবেক চেয়ারম্যান সৈয়দ নজরুল ইসলাম (আনারস)।

এছাড়া চলমান নির্বাচনে প্রতিদ্বন্ধি অপর দুই স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রার্থী হলেন, মুহাম্মদ মুহিবুল্লাহ (মোটর সাইকেল) ও মো. শাহরীয়ার ওয়াহেদ (ঘোড়া)।

বিগত ২০১১ সালে অনুষ্ঠিত গর্জনিয়া ইউপি নির্বাচনেও প্রতিদ্বন্ধিতা করেছিলেন এ তিন প্রার্থী। ওই নির্বাচনে গর্জনিয়া ইউনিয়নে ৩ হাজার ৪৭২ ভোট পেয়ে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন তৈয়ব উল্লাহ চৌধুরী। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্ধি সৈয়দ নজরুল ইসলাম পেয়েছিলেন ২৭১৫ ভোট।

সম্প্রতি গর্জনিয়া ইউনিয়নের প্রত্যন্ত এলাকাগুলোতে সরেজমিন গিয়ে ভোটারদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, চেয়ারম্যান পদে ৫ জন প্রার্থী থাকলেও মুল প্রতিদ্বন্ধিতা হবে তৈয়ব উল্লাহ চৌধুরী (নৌকা), গোলাম মৌলা (ধানের শীষ) এবং সৈয়দ নজরুল ইসলাম (আনারস) এর মধ্যে।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, গর্জনিয়া ইউনিয়নে বর্তমান চেয়ারম্যান তৈয়ব উল্লাহ চৌধুরী জাসদ নেতা হলেও নির্বাচনী তপশীল ঘোষনার আগে তিনি আওয়ামীলীগে যোগ দেন। সেইসূত্রে আওয়ামীলীগের দলীয় মনোনয়ন পেয়ে ইউনিয়নবাসীকে চমকও দেখান।

এ ইউনিয়নে সাবেক চেয়ারম্যান সৈয়দ নজরুল ইসলাম রামু-কক্সবাজার আসনের সাংসদ সাইমুম সরওয়ার কমলের ঘনিষ্টজন হিসেবে মনোনয়ন চান আওয়ামীলীগের। মনোনয়ন পেতে ব্যর্থ হয়েই তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন।

এদিকে বিএনপি থেকে মনোনয়ন পাওয়া গোলাম মৌলার কোন বিদ্রোহী প্রার্থী নেই। ফলে বিএনপি অধ্যুষিত এলাকা গর্জনিয়ায় তিনি অনেকটা ফুরফুরে মেজাজে রয়েছেন বলেই ধারনা ভোটারদের।

বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ মনোনীত প্রাথী বর্তমান চেয়ারম্যান তৈয়ব উল্লাহ চৌধুরী (নৌকা) আমাদের রামু ডটকমকে জানিয়েছেন, তিনি জয়ের ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদি। কারণ তিনি বিগত পাঁচ বছরে এলাকার শিক্ষা, যোগাযোগ ব্যবস্থা, এলাকার জনসাধারণণের সৃষ্ট বিরোধ নিষ্পত্তিসহ নানাভাবে কাজ করেছেন। তাঁর উদ্যোগের কারণে আগামী ৩ মাসের মধ্যে গর্জনিয়া ইউনিয়ন সরকারি ব্যবস্থাপনায় বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় আসবে। এছাড়া বাঁকখালী নদীর বিচ্ছিন্ন হওয়া সেতু চালুর লক্ষ্যেও তিনি প্রাণপন চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

বাংলাদেশ জাতীয়বাদীদল বিএনপি মনোনীত প্রার্থী সাবেক চেয়ারম্যান গোলাম মৌলা (ধানের শীষ) আমাদের রামু ডটকমকে জানিয়েছেন, সুষ্ঠু নির্বাচন হলে তাঁর জয় সুনিশ্চিত। ইতিপূর্বে তিনি চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে খালেকুজ্জামান সেতু নির্মাণ, কার্পেটিং সড়ক নির্মাণ, থিমছড়ি সড়ক সহ অনেক জনগুরুত্বপূর্ণ সড়ক সংস্কার করেছেন।

তিনি অভিযোগ করে বলেন, নির্বাচনে তার কর্মী সমর্থকদের প্রতিনিয়ত হুমকি-ধমকি দিয়ে যাচ্ছে প্রতিদ্বন্ধি সরকারি দলের প্রার্থী এবং অপর এক স্বতন্ত্র প্রার্থী।

তিনি এ ইউনিয়নে জুমছড়ি, মাঝিরকাটা, জাউচপাড়া, ক্যাজরবিল, বোমাংখিল এলাকার ভোটকেন্দ্রগুলো ঝূঁকিপূর্ণ বলে উল্লেখ করে এসব কেন্দ্রে সুষ্ঠুভাবে ভোটগ্রহন সম্পন্ন করার জন্য প্রশাসন ও নির্বাচনী দায়িত্বে নিয়োজিত সকলের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন।

স্বতন্ত্র প্রার্থী সাবেক চেয়ারম্যান সৈয়দ নজরুল ইসলাম (আনারস) আমাদের রামু ডটকমকে জানিয়েছেন, গর্জনিয়া ইউনিয়নের যেসব বড় উন্নয়ন হয়েছে সবকিছুতে তাঁর অবদান রয়েছে। এলাকার উন্নয়নে এখনো কাজ করে যাচ্ছেন। নির্বাচিত হলে এ ইউনিয়নের যোগাযোগ ব্যবস্থা ও বিদ্যুতায়নকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেবেন।

গর্জনিয়া ইউনিয়নে সংরক্ষিত আসনের সদস্য পদপ্রার্থীরা হলেন, ওয়ার্ড নং ১- হাসিনা বেগম (তালগাছ) ও রওশন আক্তার (মাইক)। ওয়ার্ড নং ২- জাহেদা বেগম (হেলিকপ্টার), নুরুচ্ছাফা বেগম (মাইক), বদরুজ্জাদুজা বেগম (সূর্যমূখী) ও রেহেনা বেগম (বক)। ওয়ার্ড নং ৩- আনজুমান আরা (বক), আয়েশা খানম চৌধুরাণী (সূর্যমূখী) ও নেপালী রাণী দেবী (মাইক)।

সাধারণ আসনের সদস্য পদে প্রার্থীরা হলেন, ১ নং ওয়ার্ডে গোলাম মৌলা (তালা), মোহাম্মদ ইসহাক (আপেল), মোঃ নুরুল ইসলাম (ফুটবল) ও মো. ফেরদাউস আলী (মোরগ)। ২ নং ওয়ার্ডে আহাসান উলাহ (মোরগ), আবুল কাশেম (ফুটবল) ও মুহাম্মদ আবুল কালাম (তালা)। ৩ নং ওয়ার্ডে আবু তাহের (ঘুড়ি), আবদুল জব্বার (ফুটবল), ছলিম উল্লাহ (মোরগ) ও রফিক আহাম্মদ (আপেল)। ৪ নং ওয়ার্ডে কবির আহমদ (ফুটবল), নুরুল আলম (মোরগ), মুহাম্মদ হাছান (টিউবওয়েল), মোহাম্মদ জোবাইর (আপেল) ও মোহাম্মদ হোছন (তালা)। ৫ নং ওয়ার্ডে আজিজুল হক (টিউবওয়েল), তৌহিদুল আলম (তালা), মহিউদ্দিন (ফুটবল) ও মো. শাকের আহমদ (মোরগ)। ৬ নং ওয়ার্ডে কামাল হোসেন (মোরগ), মোহাম্মদ নুরুল আমিন (তালা) ও সিরাজুল ইসলাম (ফুটবল)। ৭ নং ওয়ার্ডে অনুপম কান্তি শর্মা (ফুটবল), আতা উল্লাহ (মোরগ), মনিরুল আলম (বৈদ্যুতিক পাখা), মোহাম্মদ ইউছুপ (তালা) ও মো. ইউছুফ (টিউবওয়েল)। ৮ নং ওয়ার্ডে কবির আহমদ (ফুটবল), নাছির উল্লাহ চৌধুরী (টিউবওয়েল), মো. নুরুল আলম (তালা) ও মো. হাফিজ আহমদ (মোরগ) । ৯ নং ওয়ার্ডে আবু ইউছুপ (মোরগ), এমরানুল হক (টিউবওয়েল) ও মুফিজ আলম (ফুটবল)।

উল্লেখ্য, নির্বাচন কমিশন ঘোষিত তপশীল অনুযায়ি আগামী ২৮ মে রামু উপজেলার ১১টি ইউনিয়নের মধ্যে গর্জনিয়াসহ ৫টি ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

এছাড়া রামুর অপর ৬টি ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে আগামী ৪ জুন।